Travel

আমার বাংলাদেশ পর্ব ১

Beautiful-Bangladesh

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,

তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর”

                                           -জীবনানন্দ দাশ 

বাংলাদেশ শব্দটিতে মিশে আছে স্নেহ, মায়া, তৃপ্তি, প্রশান্তিসহ অগণিত আবেগ। নামটির মতোই আমাদের এই দেশ বহন করছে অপরূপ সৌন্দর্য। চারদিক ঘিরে রেখেছে গাঢ় সবুজ এবং বিস্তীর্ণ জলরাশি। যা আমাদের চোখ ও মন জুড়িয়ে দেয়।  এই দেশের সৌন্দর্য ও রূপ-বৈচিত্র ভাবতে বাধ্য করে সৃষ্টিকর্তা যেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য্যের সমারোহ ঘটিয়েছেন আমাদের এই স্নেহময়ী দেশে।আর তাইতো কবি জীবনানন্দ দাশ অন্য কোথাও পৃথীবির রূপ খুঁজতে যাননি।

ঘাসের উপর জমে থাকা একটি ছোট্ট শিশির বিন্দু যেখানে মন্ত্র মুগ্ধ করে রাখে আমাদের। সেখানে দেশের যেকোন প্রান্তে গেলেই সৌন্দর্য্যের মুগ্ধতায় হারিয়ে যেতে পারবেন। আর যদি একরাশ মুগ্ধতা জড়িয়ে আপনার স্মৃতির পাতাকে সমৃদ্ধ করতে চান তাহলে কক্সবাজার ,বান্দরবান,রাঙামাটি এবং সিলেট উল্লেখযোগ্য। কোথাও মেঘের স্পর্শে ভিজে যেতে পারবেন তো কোথাও সমুদ্র ঢেউয়ে ভেসে থাকতে পারবেন কিংবা কোথাও পাহাড়ি সবুজ তৃপ্তি দিবে আপনার দৃষ্টিকে। 

  বান্দরবান:

কুয়াশার চাদরে ঢাকা কিংবা তুলোর মতো মেঘে মাখামাখি সবুজের লীলাভূমি বান্দরবান। প্রকৃতি এই পাহাড়ি অঞ্চলে নিজেকে মেলে ধরেছে নিজ আলপনায়।এটি বাংলাদেশের সবচাইতে কম ঘনবসতিপূর্ণ জেলা হলেও সৌন্দর্য্যের ভীড় সবচেয়ে বেশি।

কি নেই এই জেলায় আছে সর্বদা মেঘমন্ডিত নীলগিরি,পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রহস্যময় উপকথা এবং অকল্পনীয় সৌন্দর্য্যের বগালেক একসাথে পাহাড়ি সমুদ্র এবং কর্ণফুলী নদীর  মনোরম দৃশ্য নিয়ে আছে আছে নীলাচল ,সবুজের মাঝে প্রান্তিক লেক ,পাহাড়ের রাণী  চিম্বুক,আছে পাহাড়ি মেঘ ধরার জন্য তাজিংডংসহ সুউচ্চ চূড়ার সমাহার,দুর্গম পথ পেরিয়ে নাফাখুম জলপ্রপাত যেখানে সূর্যের আলোয় খেলা করে রংধনু ,আছে পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝরে পড়া রিজুক ঝর্ণা,জাদিপাই ঝর্ণা,শৈলপ্রপাত , বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দির, রামজাদী মন্দির।

কক্সবাজার:

পৃথিবীর দীর্ঘতম অখন্ডিত সমুদ্র সৈকতের গর্বটি বাংলাদেশের। এই মায়াবী ও রূপময়ী কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত প্রতি ঋতুতেই তার রূপ বদলায়। সৈকতের বুকে আছড়ে পড়া এক একটি ঢেউ, নৌকা ট্রলার নিয়ে জেলেদের কর্মচাঞ্চল্য, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, সারি সারি ঝাউবন, ভোরে পাহাড়ের পিছন থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা সন্ধ্যায় সমুদ্রের বুকে ঢুবে যাওয়া সূর্যের মায়াবী রূপ; এই সমস্ত আয়োজনই সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে অখন্ডিত সমুদ্র সৈকতকে। মেরিন ড্রাইভের একপাশে পাহাড়  আর  অন্য পাশে সমুদ্র রেখে বিমোহিত হয়ে আওড়াতে পারেন নজরুলের গানের দুটি লাইন  “তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি” এই সুন্দর প্রিয়তমার সৌন্দর্য না ,এই সৌন্দর্য সমুদ্রের।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাশেই অবস্থিত হিমছড়ি।  সবুজ পাহাড় আর অপরূপ ঝর্ণা এখানকার প্রধান আকর্ষণ। এর বিশেষত্ব হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়. এছাড়াও রয়েছে ইনানী সৈকত , কলাতলী ,লাবনী সৈকত ,ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক , সোনাদিয়া দ্বীপ ,মহেশখালী ,বৌদ্ধধর্মের অন্যতম চর্চাকেন্দ্র রামু; যাদের সৌন্দর্য একটি আরেকটির প্রতিদ্বন্দ্বী।

তবে সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপ এর কথা একটু পৃথক করেই বলতে হয়। বালি, পাথর,প্রবাল এবং জীব বৈচিত্র্যের সমন্বয় হলো বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। এর উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে সমুদ্রের মাঝে হয়তো বাতাসের বেগের সাথে সি-গাল হয়ে উড়তে মন চাইবে। আর সেখানে আকাশ এবং সমুদ্রের নীল রং মিশে একাকার , আছে ঢেউয়ের তালে মৃদু বাতাসের কোমল স্পর্শ, আছে নারকেল গাছের সারি ,আছে দারুচিনি দ্বীপ। এগুলো কেবলই সৌন্দর্য বর্ণনার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

amar bangala desh

রাঙামাটি :

বুকের মাঝে কাপ্তাই লেক ,সাজেক ভ্যালি এবং নানান নৈসর্গিক সৌন্দর্য নিয়ে মুখরিত রাঙামাটি।  কাপ্তাই লেক যেন প্রকৃতির সাথে অপরূপ সাজে নিজেকে সাজিয়েছে। ঝুলন্ত সেতু ,সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি শুভলং ঝর্ণা ,পরিপাটি আদিবাসী গ্রাম,জুম পাহাড়, ছোট-বড়ো ,উঁচু-নিচু পাহাড়, এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুনে।এই লেকের স্বচ্ছ জলে পানকৌড়ির ডুব,জল ও সূর্যস্নানের চকচকে দৃশ্য ,সাথে মিষ্টি বাতাস সব কিছুই উপভোগ করা যাবে নৌভ্রমণে।

আর যদি মেঘ ছুঁয়ে দেখার কল্পনাকে সত্যি করতে চান বা নরম মেঘের স্পর্শ পেতে চান তাহলে আছে সাজেক ভ্যালি।এই ভ্যালি পথে যেতে যেতেই মুগ্ধ হওয়া যাবে এলোমেলো সারিতে সাজানো পাহাড়ে ,আঁকাবাঁকা রাস্তায় ,বিস্তীর্ণ সবুজের হাতছানি দেখে  অথবা মেঘদল ও সূর্যের  লুকোচুরিতে।এখানে নিমন্ত্রণ ছাড়াই মেঘ এসে গল্প করবে আপনার সাথে।

কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে  সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে পুলকিত হওয়ার সাথে রক্তিম আভায় কিছু স্মৃতি রোমন্থন করা যাবে। সমগ্র জেলা যেন শিল্পীর আঁকা দৃশ্য।

সিলেট:

প্রকৃতির রূপ লাবণ্যে ঘেরা, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট।সবুজ কে বাগান ,পাহাড়,নদী ,ঝর্ণা ,টিলা আর দিগন্ত জোড়া সবুজ বৃক্ষ ,নীল আকাশের নিচে অপরূপ মায়াবী আভা সিলেট যে করেছে রূপের রানী।  এখানকার নৈসর্গিক শোভা অতি সহজেই যে কাউকে মুগ্ধ করবে। যাদের রূপে আপনি হারিয়ে যেতে চান তাদের মধ্যে আছে; স্তরে স্তরে সাজানো পাথরে সজ্জিত প্রকৃতি কন্যা জাফলং , স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি আর দুধারের অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে লালাখাল ,পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলের বিছানাকান্দি আছে মালিনীছড়া ,লাক্কাতুরা চা বাগান।

রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট । রাতারগুল একটি প্রাকৃতিক বন, শীতকালে এখানে বসে হাজারো পাখির মেলা , আছে কয়েকশো প্রজাতির গাছ যা এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে বহুগুন। আর একটু অদূরেই সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে আছে হাকালুকি হাওর।

পূর্বে চায়ের দেশ, দক্ষিণে সবচেয়ে দীর্য সমদ্র সমুদ্র সৈকত , আর দক্ষিণ পূর্বে আকাশের সাথে মিশে থাকা পাহাড় যেন বাংলাদেশের প্রকৃতিতে দান করেছে ভিন্ন মাত্রা। এই অঞ্চলগুলো বহুমাত্রিক আকর্ষণে সমৃদ্ধ।  সুসজ্জিত পাহাড় এবং এর বুক থেকে নেমে আসা ঝর্ণা, মায়াবী সবুজ ,আঁকাবাঁকা নদী , স্বচ্ছ জলরাশি ,মেঘদলের অবাধ আনাগোনা , একপাশে পাহাড়ি সবুজ আর অন্যপাশে নীল সমুদ্র জল সবই যেন চিত্রশিল্পীর নিখুতঁ চিত্রকর্ম। 

amarroom