Travel

কান্তজীর মন্দির, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আশ্চর্য্য এক উদাহরণ !

photo_2019-12-02_15-37-49

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আশ্চর্য্য এক উদাহরণ কান্তজীর মন্দির । আঠারো শতকে নির্মিত এই মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে বিশাল এক বিস্ময়ের নাম । বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই মন্দিরটি দর্শনার্থীদের চোখ জোড়ায় ক্ষণিকেই । এর পরতে পরতে রয়েছে মধ্যযুগীয় শিল্পের ছোঁয়া । এর আশ্চর্য্য কারুকাজ বিস্ময়ের অভিব্যক্তি জাগায় সকলের মাঝে । মন্দিরের টেরাকোটার চিত্রগল্প শিহরিত করে দর্শনার্থীদের । এর শৈল্পিক আঁচ মন হরণ করে সুন্দরের পুজারীদের। টেরাকোটায় আচ্ছাদিত মন্দিরটি দেখলে মনে হবে এ যেন শিল্পখচিত পৌরাণিক মহাকাব্যের দৃশ্যমান উপস্থাপনা ।

ইটের তৈরি এই মন্দিরের সৌন্দর্য্য শুধু টেরাকোটায়ই নয় এর স্থাপত্যশৈলীও মুগ্ধ করার মতো । আঠারো শতকের স্থাপত্যশৈলী সাথে পোড়ামাটির কারুকাজ । এ যেন চোখের সামনেই চকচক করছে ইতিহাস । স্থাপত্য রীতি, গঠন বিন্যাস, শিল্পচাতুর্য মন্দিরটিকে এতই মাধুর্য্যমণ্ডিত করে তুলেছে যে এর চেয়ে নয়নাভিরাম মন্দির বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই ।

পোড়ামাটির অলংকরণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের  বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি মন্দিরের গায়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । অপুর্ব সুন্দর এই মন্দিরটিতে রয়েছে ১৮ হাজারের মতো টেরাকোটার ফলক । বাংলাদেশে এরকম টেরাকোটায় সাজানো মন্দির একটিই আছে । এমনকি বাংলাদেশের সর্বোৎকৃষ্ট টেরাকোটার নিদর্শন বলা হয় এই মন্দিরকে । 

পুরো মন্দিরে মধ্যযুগের কবি বরু চন্ডিদাসের শ্রী কৃষ্ণ কীর্ত্তনের বয়ান ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিল্পীরা । চোখ জোড়ানো মাটির ফলকে গল্পের আকারে সাজানো হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, পান্ডবদের জীবনাচার, শ্রীকৃষ্ণের শৈশব থেকে দেবতা হয়ে ওঠার গল্প । শুধু পৌরাণিক কাহিনিই নয় এসব ফলকে উঠে এসেছে মোঘল শাসন ব্যাবস্থা ও সামাজিক রীতিনীতির নানা চিত্র ।

মন্দিরের বৈশিষ্ট্যঃ

ঢেপা নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা কান্তজীর মন্দিরকে কান্তজীউ মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নামেও ডাকা হয় । চমৎকার এই ধর্মীয় স্থাপনাকে নবরত্ন মন্দিরও বলা হয় । অনেকটা পিরামিড আকৃতির এই মন্দিরটি ৩টি ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে । ৩ ধাপের কোণগুলির উপরে মোট নয়টি অলংকৃত শিখর বা চূড়া ছিল । যা দূর থেকে মনে হতো প্রকান্ড ভিত্তির উপর অলংকৃত রত্ন । একারণেই এটিকে ডাকা হতো নবরত্ন মন্দির । তবে দূর্ভাগ্যবশত ভুমিকম্পের কবলে পড়ে চুড়াগুলো এখন অস্তিত্বহীন । 

মন্দিরের দেবমূর্তিগুলোকে চতুর্দিকের সবগুলো খিলান দিয়েই অবলোকন করা যায় । মন্দিরের প্রাঙ্গণটি অনেকটা আয়তাকার । তবে পাথরের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো মন্দিরটি বর্গাকার । মন্দিরটির বর্তমান উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট । নিচতলায় রয়ছে বেশ কয়েকটি প্রবেশ পথ । প্রবেশপথে রয়েছে অসংখ্য খাঁজযুক্ত খিলান । খিলানগুলোকে দৃষ্টিনন্দন দুটি স্তম্ভ দ্বারা আলাদা করা হয়েছে । চোখ জোড়ানো অলংকরণযুক্ত স্তম্ভগুলো খুবই নান্দনিক ও প্রশংসনীয় । উপরে উঠার সিড়ি রয়েছে মন্দিরের পশ্চিম দিকের বারান্দায় । মন্দিরের নিচতলায় রয়ছে ২১টি খিলান । দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রয়েছে যথাক্রমে ২৭টি ও ৩ টি খিলান । ২০ শতকের শুরুর দিকে ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর চুড়া বা শিখর বাদ দিয়েই মহারাজা গিরিজানাথ বাহাদুর সংস্কার করেন মন্দিরটি । 

মন্দিরের অভ্যন্তরে রয়েছে বৃন্দাবন থেকে নিয়ে আসা কৃষ্ণের মূর্তি সহ বিভিন্ন দেব দেবির মূর্তি । রয়েছে শিব মন্দির ।

মন্দিরে আরো রয়েছে পাথরের উপরে লিখা বিভিন্ন প্রাচীন শ্লোক । 

ইতিহাসঃ

সনাতন ধর্মাবলম্বী দেবতা কান্ত বা কৃষ্ণের নামানুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছিল কান্তজীর মন্দির বা কান্তজীউ মন্দির। মন্দিরের স্থাপনার সময় নিয়ে ছিল বিভিন্ন মতভেদ । তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে এই মতভেদের অবসান ঘটে । প্রত্নতাত্ত্বিকরা মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানতে পারেন ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির স্থাপনার কাজ শুরু হয় ।  তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় মন্দিরটির স্থাপনা কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পীরা এসে তাদের নিপুণ হাতে শুরু করেন মন্দিরের টেরাকোটার কাজ । মন্দির তৈরির কাজ সমাপ্ত না হতেই মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে মারা যান । তবে রামনাথ রায়ের শেষ ইচ্ছানুযায়ী মহারাজার স্ত্রী রূপমিনির আদেশে তাদের দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করেন । ৪৮ বছরে নির্মিত হয় কালের সেরা মন্দির । নির্মান শেষে মন্দিরের উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট । ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিকম্পের কারণে চূড়াগুলো পুরোপুরি ভেঙে যায় ও মন্দিরের অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে । চূড়াগুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় এটির বর্তমান উচ্চতা ৫০ ফুটে দাড়িয়েছে । 

সমতল থেকে মন্দিরটির ভিত্তিভূমির উচ্চতা ৩ ফুট। মেঝেতে ওঠার জন্য রয়েছে পাঁচ ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি । মন্দির ভবনের আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৬০০ ফুট । 

বর্তমানে এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংগঠন ইসকন ।

অবস্থানঃ 

কান্তনগর নামে পরিচিত এই এলাকার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে ঢেপা নদী । সাঁওতাল ও শহুরে মানুষের মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ । দিনাজপুর শহর থেকে ১৪ মাইল উত্তরের কান্তজির মন্দিরটি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ।

দিনাজপুর শহর থেকে দুই ধারে গাছপালাবেষ্টিত সরু রাস্তা ধরে যখন কান্তজির মন্দিরে যাবেন তখন নিজের ভেতরে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি অনুভব করবেন । যে প্রশান্তির কোন তুলনা হয়না ।

রাসমেলাঃ

কান্তজিউ মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর নভেম্বের মাসে রাস পূর্ণিমায় এখানে বসে রাস মেলা । কান্তজি মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই রাস মেলা চলে মাসব্যাপী । মেলায় ভিড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থী । রাস মেলা উপলক্ষ্যে দিনাজপুরের রাজবাড়ি থেকে কান্তজি বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় । মন্দিরে রাসমেলা চলাকালীন জায়গাটার গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুগুন । পূন্যার্থী ও দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ । যেন রাস মেলা নয়, বসেছে আধ্যাত্মিক মিলন মেলা । মেলা উপলক্ষ্যে বসে বিভিন্ন ছোট ছোট দোকান । এসব দোকানে পাওয়া যায় পূজার বিভিন্ন উপকরণসহ বাচ্ছাদের বিভিন্ন ধরনের খেলনা । আছাড়াও থাকে মেয়েদের চুড়ি শাখাসহ বিভিন্ন কসমেটিকস । আরো পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠাসহ অন্যান্য মুখরোচক খাবার ।

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেনে দিনাজপুর যাওয়া যায় । ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে কেয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, নাবিল পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি বাসগুলো দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । এসি বাসগুলোর ভাড়া পড়বে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা । নন এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৫০০-৬০০ টাকা । এছাড়াও উত্তরা থেকে বেশকিছু বাস দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেশ কিছু ট্রেন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । “দ্রুতযান এক্সপ্রেস” ট্রেন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রাত ৮ টায় ঢাকা ছেড়ে যায় । “একতা এক্সপ্রেস” সকাল ১০ টায় ঢাকা ছাড়ে । আর “পঞ্চগড় এক্সপ্রেস” ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে যায় বেলা ১২ টা ১০ মিনিটে । শ্রেনীভেদে এসব ট্রেনের টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা । দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস স্টেশন নেমে পীরগঞ্জের বাসে উঠে কান্তনগর নামতে হবে । সময় লাগবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট । কান্তনগর নেমে ঢেপা নদী পার হয়ে একটু সামনে হাটলেই চোখে পড়বে কান্তজীর মন্দিরটি । শীতের সময় নদী পায়ে হেঁটেই পার হওয়া যায় । আর বর্ষায় পার হতে হয় নৌকা দিয়ে । 

কোথায় খাবেনঃ

দিনাজপুরে খাবারের জন্য রয়েছে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ । রুস্তম রেস্টুরেন্ট, ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট, দিলশাদ রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন ধরনের তরকারি পাওয়া যায় । আরো পাওয়া যায় বিখ্যাত কাঠি কাবাব । এছাড়া দিলশাদ রেস্তোরাঁর পাটিসাপটার সুনাম শহরজোড়া ।

দিনাজপুরে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা পাওয়া যায় । তার মধ্যে ভাপা পিঠা, চিতল পিঠা ও জামাই পিঠা অন্যতম । দিনাজপুর গেলে কেউই এই পিঠাগুলো চেখে দেখতে ভুলবেন না ।

কোথায় থাকবেনঃ

দিনাজপুর শহরে ভাল মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে । সব থেকে ভাল হোটেল হচ্ছে “পর্যটন মোটেল” । পর্যটন মোটেলের ভাড়া পড়বে রুমভেদে ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা । রুম বুকিং করুতে এখনি যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে । আর নিশ্চিত করুন ভাবনাহীন ভ্রমণ ।

পর্যটন মোটেল ছাড়াও আরো একধিক সাশ্রয়ী হোটেল রয়েছে দিনাজপুরে । এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল আর রশীদ, হোটেল রেহানা, হোটেল নবীন ইত্যাদি ।  এই হোটেল গুলোও খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে বুকিং দিতে পারবেন ।

amarroom