Travel

চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে

sremongol feature Images

ছোটবেলায় টিভিতে ফিনলে ও ইস্পাহানী টি ব্যাগের বিজ্ঞাপনে দেখতাম চা-বাগানের ভেতর আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে মানুষ জন চায়ের পাতা তুলতো। একটা লম্বা ঝুড়ি পিছনে রেখে, কপালে বেঁধে। কিশোর বয়সে এই মনোরম দৃশ্য রেখে খুব আগ্রহ জন্মে আবার চা বাগান দেখার। পারিবারিক ভাবে আর যাওয়ার সুযোগ আসে নাই।

ইউনিভার্সিটির সেমিস্টার ব্রেক চলে। ডিপার্টমেন্টের ৪ জন বন্ধুকে শেয়ার করলাম চা বাগান দেখার আগ্রহের কথা। যেই ভাবা সেই কাজ। সাথে সাথে পরিকল্পনা করে ১ দিন পরেই বের হয়ে যাই চা বাগানের স্বর্গের সুবাসে হারিয়ে যেতে। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা। যা সিলেট সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিনে। এ উপজেলার মোট আয়তন ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার যার অধিকাংশ চা বাগান। দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির দেশ।

উদ্দেশ্য শ্রীমঙ্গল এর সৌন্দর্য উপভোগ করা। হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ট্যুর দেওয়ার। কোথায় গিয়ে উঠব, থাকব বুঝতে পারতেছিলাম না। হটাৎ এক বন্ধু বললো গত ট্যুরে কক্সবাজারে গিয়ে সে একটা অনলাইন হোটেল সার্ভিসের সেবা নেয়। যারা হোটেল ম্যানেজ করে দেয়। Amarroom.com নামের রুম বুকিং সার্ভিসের সাথে এর পূর্বে আমার জানাশোনা বা অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার বন্ধুর সাজেশনে Amarroom.com সার্ভিস থেকে হোটেল বুক করে নেই যাত্রা শুরুর পূর্বেই। খুব সহজে, পরিকল্পনাবিহীন হটাত ট্যুরে Amarroom.com সেরা ডিলের সুযোগ টা দেয়। ভিসা কার্ড থাকায় EMI সার্ভিস ও পেয়ে যাই।

চায়ের জন্য বিখ্যাত শ্রীমঙ্গলে যাত্রা শুরু। পাতা আর কুঁড়ির এই দেশ ঘেরা পাহাড় আর চা বাগানে। সবুজাভ মোড়কে ঢাকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ চা বাগান। পাশেই আছে আনারস ও রাবার বাগান। চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল যেন যথার্থ নামকরণ। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই চায়ের রাজধানীতে। যার উত্তর-পশ্চিম পাশে কিছু অংশ হাওর আর পুরোটাই চা বাগান। মাইলের পর মাইল। শত সহস্র ক্রোশ হেঁটে গেলেও ক্লান্তি আসে না। চোখে আসে অপার্থিব সৌন্দর্য।

শতবর্ষী চা-বাগান পাহাড়ের কোলে সবুজময় হয়ে আছড়ে আছে। মনে হয় যেন হেলান দিয়ে আছে। চা বাগান মিশে আছে পাহাড়ের বুকে। এক পাশে  হাওড়ের বিস্তির্ণ জলরাশি। দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপাত প্রবণ স্থান শ্রীমঙ্গল। যার জন্য এই এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত চা-বাগান, দেশের একমাত্র রেইন ফরেস্ট বা বর্ষাবন লাউয়াছড়া। প্রকৃতি শ্রীমঙ্গলকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে, ঢেলে সাজিয়েছে। অসীমের পানে শুধু চোখ যায় কেবলই সবুজের হাতছানি। চা বাগানের সারি সারি টিলা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য।
১৯টি চা বাগানের সতেজ সবুজ পাতায় পূর্ণ হয়ে আছে শ্রীমঙ্গলের নিসর্গশোভা।

পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এবং চায়ের রাজধানী হিসেবে শ্রীমঙ্গলের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি উঁচু নিচু পাহাড়, পাহাড়ের বুকজুড়ে চা বাগানের সারি, পাহাড়ি ঝরনা, চারদিকে প্রকৃতির নজরকাড়া সৌন্দর্য, হাজার প্রজাতির গাছ-গাছালি, দিগন্তজোড়া হাওর আর নীল জলরাশি ঢেউয়ের ছন্দের গল্প অনুধাবন করতে পারতাম না শ্রীমঙ্গলে না গেলে।

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাউয়াছড়ার অবস্থান। ১৯২০ সালে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গাজুড়ে প্লান্টেশন করে তৈরি গাছগাছালি ঘন সবুজে পরিণত হয়ে আজকের লাউয়াছড়া। জীববৈচিত্র্যের কলতান ঠের পাইয়ে দেয় এই পার্কে কত যে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পশুপাখি।দেশের শিক্ষা, গবেষণা, ইকো-ট্যুরিজম স্পট হয়ে  উঠেছে লাউয়াছড়া উদ্যান। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান চিরহরিৎ বন। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লূক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ। নানা প্রজাতির পাখি, শুশুক, অজগর, বনমোরগ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিড়াল আর কলাবাদুড় রয়েছে এই অভয়ারণ্যে। পাখিপ্রেমীদের জন্য লাউয়াছড়া আকর্ষণীয় জায়গা। রোমাঞ্চকর জীবনের স্বাদ পাওয়া যায় এই উদ্যানে ঘুরতে ঘুরতে।

শ্রীমঙ্গল এমন ওক জায়গা যেখানে ঘুরতে আসলে চা বাগান, পাহাড়, ঝর্ণা, উদ্যান, হাওড় সব পাশাপাশি পাওয়া যায়। এবং কয়েক দিন ব্যাপ্তি নিয়ে তা ঘুরে বেড়াতে হয়। মাধবকুণ্ড, শ্রীমঙ্গল থেকে ৬০ কিলোমিটার অদূরে। পাহাড় আর সবুজে ঘেরা পথ মাড়িয়ে মাধবকুণ্ড যেতে হয়। মাধবকুণ্ড এর অবিরাম জলধারা মন ভালো করে দেয়।

যদি ইতিহাস পছন্দ করেন, ইতিহাস আপনাকে টানে তবে শতবর্ষের স্মৃতিবিজড়িত শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রির ইতিহাস আপনার মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিবে। ১০০ বছরের পুরাতন, প্রাচীন এই সিমেট্রি। স্থলপথ সমৃদ্ধিশালী হবার পূর্বে ঘোড়ার গাড়ির যুগে গোড়াপত্তন হয় শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ডিনস্টন সিমেট্রির। সেসময় কিছু বিদেশি এই অঞ্চলে মারা যায়। তাদের সমাহিত করা হয় শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রিতে। উঁচু নিচু পাহাড়ঘেরা চিরসবুজ চা বাগানের মাঝে অবস্থিত সিমেট্রিতে বিদেশিদের কবর রয়েছে ৪৬টি।

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র জলপ্রপাত যজ্ঞকুঞ্জের ধারা। এটি জাগছড়া চা বাগান এলাকায় অবস্থিত।শ্রীমঙ্গলের বন-পাহাড়, হাওর-বিল আর সবুজের সমারোহে একাকার হয়ে গড়ে ওঠা হ্রদটির নাম পাহাড় ডোবা লেক। বিলাসছড়া চা বাগানের পাদদেশে এই জলাশয়ের অবস্থান। যেখানে সবুজ বন বনানী বেষ্টিত পাহাড় ডুবে পরিণত হয়েছে বিশাল জলরাশিতে।

স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম এবং জলচর পাখির বিচরণভূমি বাইক্কা বিল। যার আয়তন ১০০ হেক্টর। বাংলাদেশের অন্যতম জলাশয় হাইল-হাওরে এর অবস্থান। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে ১৩৩টি বিল ও বেশ ক’টি খালে খণ্ডিত হয়ে মোট ৪ হাজার হেক্টর এলাকায় সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাইক্কা বিলের প্রধান আকর্ষণ পাখি। সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতির জলজ পাখির বিচরণে মুখরিত থাকে এ বিলটি। তবে শীত মৌসুমে প্রচুর পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য এখানে একটি পাখি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। নয়নাভিরাম এ জলাভূমিতে ফোটে শাপলা, পদ্মসহ নানা প্রজাতির জলজ ফুল।

হাওর পছন্দ করলে চলে যেতে পারেন হাকালুকি হাওরে। প্রায় ১৯২ বর্গকিলোমিটার জলাভূমির বাস্তুসংস্থান হাকালুকি হাওর। কাদাখুঁড়ি, পানকৌড়ির ঝাঁকসহ আরো অনেক বিরল দৃশ্য দেখা যায় হাকালুকিতে। পানির কলকল শব্দে বিলীন হয়ে যায় জীবনের সকল অবসাদ।

চায়ের রাজধানীতে গড়ে উঠেছে চা গবেষণা কেন্দ্র। শ্রীমঙ্গলের মূল শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চা বোর্ডের অফিসে ৫০-৬০ বছরের পুরোনো চা গাছ। চা ম্যানুফ্যাকচারিংসহ টি টেস্টিং ল্যাব, গবেষণা ফ্যাক্টরিসহ বাংলাদেশের একমাত্র ভেষজ উদ্ভিদের বাগান। বিটিআরআইয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ মন মাতিয়ে দেয়।

শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ করতে চাইলে ঢাকা থেকে যেকোন বাস কাউন্টারে টিকেট করে বাসে উঠে চলে যেতে  পারবেন বা ট্রেনেও যেতে পারেন। শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ এ সবচেয়ে জরুরি হল আবাসন সমস্যা। সারাদিন ক্লান্তিকর যাত্রাশেষে ঝামেলা ছাড়াই, আরামদায়ক একটা আবাসন পেয়ে যাই amarroom.com হোটেল বুক সার্ভিসের মাধ্যমে।
চায়ের রাজধানীর ভ্রমণের এবং উপভোগ এর জন্য আপনার পাশে অগণিত হোটেল বুকিং সার্ভিস নিয়ে বেস্ট ডিলের জন্য রয়েছে amarroom.com

amarroom