amarroom

amarroom

Travel

ফেনী

stock-photo-171859023

রাজধানী ঢাকা থেকে ১৬১ কিলোমিটার দূরের ফেনী জেলার আয়তন ৯২৮ বর্গ কিলোমিটার । এ জেলার পশ্চিমে নোয়াখালী জেলা, উত্তরে কুমিল্লা জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ, দক্ষিণ-পূর্বে চট্টগ্রাম জেলা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত ।

১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ফেনী মহকুমাকে মানোন্নীত করে জেলায় রূপান্তর করা হয় । এর পূর্বে এটি নোয়াখালী জেলার একটি মহকুমা ছিল । এ মহকুমার গোড়াপত্তন হয় ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মীরসরাই, ছাগলনাইয়া ও আমীরগাঁও এর সমন্বয়ে । পরবর্তীতে এটি ফেনী থানা নামে পরিচিত হয়। অতঃপর ১৮৭৬ সালে নতুন মহকুমার পত্তন হলে খাইয়ারা থেকে থানা দপ্তরটি মহকুমা সদরে স্থানান্তরিত হয় ও নতুন মহকুমাটি ফেনী নামে পরিচিত হয় । 

নামকরণ

ফেনী নদীর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছে ফেনী । মধ্যযুগে কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় একটি বিশেষ নদীর স্রোতধারা ও ফেরী পারাপারের ঘাট হিসেবে ফনী শব্দটার  ব্যবহার পাওয়া যায় । ষোড়শ শতাব্দীতে কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর উল্লেখ করেন: “ফনী নদীতে বেষ্টিত চারিধার, পূর্বে মহাগিরি পার নাই তার ।” এবং সতের শতকে মির্জা নাথানের ফার্সী ভাষায় রচিত বাহরিস্তান-ই-গায়েবীতে ফনী শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ফেনী-তে রূপান্তরিত হয় ।

ফেনীতে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নানা নির্দশন । ফেনীর পূর্ব দিকে আদিকালে শিকারী মানুষের প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল । এর প্রমান মেলে ছাগলনাইয়াতে ১৯৬৩ সালে একটা পুকুর খননকালে পাওয়া নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের ব্যবহৃত একটা হাতকুড়াল থেকে । ফেনী নদীর তীরে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বীর বাঙ্গালী শমসের গাজীর রাজধানী ছিল । তিনি এখান থেকেই যুদ্ধাভিযানে গিয়ে রৌশনাবাদ রাজ্য ও ত্রিপুরা রাজ্য জয় করেন । ফেনী একটি ছোট জেলা হলেও গৌরব ও শৌর্য বীর্যে ফেনী বীর সন্তানদেরই জন্মভূমি । এখানে রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা কাহিনী । রয়েছে নানা দর্শনীয় স্থান । 

দর্শনীয় স্থানসমূহঃ

বিজয় সিংহ দিঘী

বাংলার বিখ্যাত সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সিংহ এ দীঘি খনন করেন বলে এর নামকরণ করা হয় বিজয়সিংহ দিঘী । মহিপাল থেকে ২ কিঃমিঃ দক্ষিণপুর্বে এই দিঘী অবস্থিত । এর আয়তন প্রায় ৩৭.৫৭ একর । দিঘীর চৌপাড় খুব উঁচু ও বৃক্ষ শোভিত । এ জেলায় এরকম বেশকিছু ঐতিহাসিক দিঘী রয়েছে । সকালের মৃদুহাওয়া, দুপুরের কোমল ছায়া কিংবা বিকেলের একখন্ড অবসর এখানে আপনার মনকে শোভিত করবে নিমিষেই । প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি একে কৃত্রিম উন্নয়ন এরও পরশ দেয়া হয়েছে ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনীর মহিপাল বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকসা বা অটোতে করে ফেনী সার্কিট হাউসের সামনে যেতে হবে । সেখান থেকে অটোতে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায় বিজয় সিংহ দীঘি ।

রাজাঝীর দীঘী বা লালদিঘী

ফেনী শহরের প্রাণ কেন্দ্রে এ দিঘীর অবস্থান । হিন্দু ধর্মের পুরাণ অনুযায়ী ত্রিপুরা মহারাজার প্রভাবশালী একজন রাজার কন্যার অন্ধত্ব দুর করার মানসে আজ থেকে ৭ শত বছর পূর্বে এ দীঘি খনন করেন । এজন্য এই দিঘীকে রাজার ঝির দিঘী বা রাজাঝির দিঘী নামে ডাকা হয় । এটির বর্তমান নাম অবশ্য লালদিঘী-তে রূপান্তরিত করা হয়েছে । ১০ একর বিশিষ্ট এর পাড় জোড়েই রয়েছে ছোট একটা শিশু পার্ক । নগরের কোলাহলের মধ্যেই এ পার্ক ও দীঘি যেন এক খন্ড শান্তির পরশ ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনীতে শহর থেকে লালদিঘী বললে যেকোনো রিক্সা নিয়ে যাবে । ভাড়া পড়বে মাত্র ২০ টাকা ।

শিলুয়ার শীল পাথর

ছাগলনাইয়া উপজেলায় শিলুয়া গ্রামে এক প্রাচীন শিলামূর্তির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে । এর শিলা পাথরের কারণেই গ্রামের নাম হয় শিলুয়া । শিলামুর্তির গায়ে খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে প্রচলিত ব্রাক্ষ্মী হরফের লিপি রয়েছে । এর থেকে এখানে যে আর্য সভ্যতা বিকাশ হয়েছিল তার প্রমাণও পাওয়া যায় । এরকম ছোট ছোট কিছু নির্দশন ফেনীকে অনন্য উচ্চতায় উচ্চসিত করেছে ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী থেকে প্রথমে ছাগলনাইয়া উপজেলায় যেতে হবে । সেখান থেকে রিকসা বা সিএনজিতে শিলুয়া গ্রামে যাওয় যাবে ।

চাঁদগাজী মসজিদঃ

মোগল আমলের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন চাঁদগাজী ভূঞা । ছাগলনাইয়ায় চাঁদগাজী বাজারের কাছে মাটিয়া গোধা গ্রামে অতীত ইতিহাসের সাক্ষী হিসাব অবস্থান করছে এ মসজিদ । মধ্যযুগের রীতি অনুযায়ী নির্মিত এই মসজিদে ব্যবহার করা হয়েছে চুন, সুরকী ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইট । মধ্যযুগীর রীতিতে নির্মিত এই মসজিদের দেয়ালগুলো বেশ চওড়া । মসজিদের ছাদের উপর তিনটি সুদৃশ্য গম্বুজ রয়েছে । মসজিদের সামনে একটি কালো পাথরের শিলালিপি রয়েছে । এই লিপি অনুযায়ী এ মসজিদের নির্মানকাল ১১১২ হিজরী ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী থেকে বাস বা সিএনজি করে প্রথমে যেতে হবে ছাগলনাইয়া । সেখান থেকে সিএনজি করে যেতে হবে চাঁদগাজী বাজার । 

শমসের গাজীর দীঘিঃ

বীর শমসের গাজী তার মাতার নামে এ দীঘি খনন করলেও এটা এখন শমসের গাজীর দিঘী হিসেবে পরিচিত । এ দীঘি ছাগলনাইয়া উপজেলা সদরের নিকটবর্তী ভারতীয় সীমান্তের কাছে সোনাপুর গ্রামে অবস্থিত । ৪.৩৬ একর আয়তনের এ দীঘির এক তৃতীয়াংশ ভারতের অভ্যন্তরে পড়েছে ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী শহর থেকে ছাগলনাইয়া আসতে হবে । তাপর সিএনজি দিয়ে যেতে হবে শমসের গাজীর দীঘিতে । 

সোনাগাজী মুহুরী সেচ প্রকল্প

সরকারী উদ্যোগে এবং জাপানের সহযোগিতায় প্রথম ১৯৭৭-৭৮ অর্থ বছরে সোনাগাজী মুহুরী সেচ প্রকল্পটি শুরু হয় এবং ১৯৮৫-৮৬ অর্থ বছরে এই সেচ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হয় । সোনাগাজীতে অবস্থিত এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প । সিডা, ইইসি, বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় জাপানের সিমুজু কোম্পানী ১শ ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেচ প্রকল্প নির্মাণ করে । এই প্রকল্প চালু হওয়ার পর ২০ হাজার হেক্টর এলাকায় সেচ সুবিধা এবং ২৭ হাজার হেক্টর এলাকা সম্পুরক সেচ সুবিধার আওতায় আসে । বর্তমানে মুহুরী সেচ প্রকল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে বিনোদন ও পিকনিক স্পট । মুহুরীর জলরাশিতে নৌভ্রমণের সময় খুব কাছ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস এবং প্রায় ৫০ জাতের হাজার হাজার পাখির দেখা পাওয়া যায় ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী লালপোল হতে বাস যোগে সোনাগাজী উপজেলা আসতে হবে । অত:পর সোনাগাজী উপজেলা হতে বাস যোগে বাদামতলী যেতে হবে । বাদামতলী হতে রিক্সা যোগে এখানে পৌঁছা যায় । 

ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার স্মৃতি জাদুঘর

ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম ১৯৫২ সালে ঢাকায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শিল্প বিভাগে পিয়নের চাকরি করতেন । ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সম্মুখে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভকালে পুলিশের গুলিতে আহত হন । ১৯৫২ সালের ০৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন । ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয় । ভাষা শহীদ আব্দুস সালামের স্মৃতি রক্ষার্থে সালামনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর । ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলায় এর অবস্থান।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনীর মহিপাল মোড় থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ফেনী-নোয়াখালী সড়কের ডান পাশে মাতুভূঞা ব্রিজের কাছেই সালামনগর -এ ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর আবস্থিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের মহিপাল মোড় থেকে মাত্র ১০ টাকা বাস ভাড়ায় এখানে যাওয়া যাবে । 

নিহাল পল্লী, ফেনী

ফেনী থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রামের কাছাকাছি কসকা বাজার সংলগ্ন ফেণী নিহাল পল্লী । আশপাশের লোকদের কাছে এটি পরশ পাথর । ঘরোয়া পিকনিক বা চড়ুইভাতি করতে অনেকেই এখানে আসে । এখানে রয়েছে বাচ্চাদের চড়ার জন্য ট্রেন । আছে বিশাল একটি পুকুর ও কয়েকটা বানর । এখানকার প্রবেশমূল্য ২০টাকা । ছায়া সুনিবিড় গ্রামের পাশ দিয়ে আরেক ছায়াবীথিতল ।

গ্রামীন ছায়াশীতল, নিরিবিলি পরিবেশে আরো আছে বিভিন্ন বিনোদন রাইড । রেলগাড়ী, হাঁস পংখী নৌকা, ঘুরন্ত চেয়ার, মেরী গো রাউন্ড সহ রয়েছ পারিবারিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পিকনিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠান অায়োজনের সু-ব্যবস্হা । রয়েছে বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্য । ভাস্কর্যগুলো পেশাদারী শিল্পীরা তৈরী করেনি বলে দেখে অদ্ভুৎদর্শন মনে হতে পারে । তবুও এ ধরনের একটি উদ্যোগের জন্য উদ্যোক্তাকে সাধুবাদ জানানো যায় ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী থেকে বারইয়ার হাট বা চট্টগ্রামগামী বাসে বা সিএনজিতে করে কসকা বাজার যেতে হবে । কসকা বাজার থেকে পাঁয়ে হেঁটে যাওয়া যায় নীহাল পল্লী । 

দুধমুখা নলদিয়া মেলা দেওয়ান আবদুর রশিদ এর মাজার

সূদূর ইয়েমেন থেকে আসা ধর্মপ্রচারক দেওয়ান আবদুর রশিদ এর মাঝারকে ঘিরে প্রতিবছর ১লা মাঘ থেকে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই মেলা । বিশাল এই মেলায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে সব কিছু পাওয়া যায় ।  এখানে কি বিক্রি হয় এটা বলার চেয়ে এটা বলা সহজ এখানে কি বিক্রি হয়না । আশির দশক থেকে ফার্নিচার বিক্রির জন্য এই মেলার প্রসিদ্ধি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে । মেলার সময় দেশের বিভিন্নএলাকা থেকে ট্রাকভর্তি কাঠের ফার্নিচারের লাইন রাস্তায় কয়েক কিলোমিটার দূরে চলে যেত । গত ৪/৫ বছর ধরে এই মেলা তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে । নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও সেনবাগ এবং ফেণীর দাগনভূঞা এই তিন উপজেলার মিলনস্থলে অনুষ্ঠিত হয় মেলাটি । স্থানীয় মুরুব্বীদের বক্তব্য অনুযায়ী তারা তাদের বাপ দাদার কাছ থেকে শুনেছেন এই মেলার বয়স হাজার বছরের কম নয় ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী থেকে বসুরহাট গামী বাসে উঠে দুধমুখা বাজারে নামতে হবে এখান থেকে রিকসায় বা অটোতে করে মেলায় যাওয়া যায় ।

দুধমূখা পীর সাহেবের মাজার বাড়ী

মাওলানা ইছহাক (র) সারাদেশে যার অগনিত ভক্ত মুরিদান ছড়িয়ে দাগনভূঞা উপজেলার দুধমুখা এলাকায় ইয়াকুব পুর গ্রামে তার নিজ বাড়ীর দরজায় তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন মাদ্রাসা ও মসজিদ ও এতিমখানা । জনশ্রুতি আছে মাওলানা সাহেবের মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করার সাথে সাথে তার কবরটি এটি চৌচালা ঘরের মতো হয়ে উঁচু হয়ে যায় । অনেকের মতে আগের দিন দাফন করার পর পরের দিন এসে দেখেন যে এটি ঘরের মতো উঁচু হয়ে আছে এবং সেভাবেই তার সমাধি আজো আছে । অনেকেই নিজেকে এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাপ দাদার কাছে শুনেছেন বলে বলে দাবী করেন ।

কিভাবে যাবেনঃ

ফেনী থেকে বসুরহাট গামী বাসে উঠে দুধমুখা বাজারের আগে নতুন পুল নামতে হবে । এখান থেকে রিক্সায় এতিম খানা বাজার যেতে হবে । অথবা মহিপাল থেকে রিজার্ভ সিএনজিতে করেও আসা যাবে । ভাড়া নেবে ২০০ টাকা ।

কোথায় থাকবেন

ফেনীতে থাকার জন্য রয়েছে সরকারী রেস্টহাউস ও বাংলো । এছাড়া ফেণী শহরে মোটামুটি মানের বেশকিছু হোটেল রয়েছে । আরো ভালো পরিবেশে থাকতে চাইলে ফেণীর নিকটবর্তী কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামে অবস্থিত ভিটা ওয়ার্ল্ডে থাকতে পারবেন । আপনার পছন্দের যেকোন হোটেল নিমিষেই বুকিং দিতে ভিজিট করুন www.amarroom.com

Travel

কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহার

5700488590_a1ac040639_h

শালবন বিহারঃ

ইতিহাস বিষয়ে জানতে ইচ্ছুক ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শনগুলো বরাবরই পছন্দের তালিকায় প্রথমে থাকে । এরকমই একটি নিদর্শন হলো কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহার । বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার এই  নিদর্শনটি কুমিল্লা জেলার ময়নামতিতে অবস্থিত । কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি এই শালবন বৌদ্ধ বিহার । প্রচলিত যে, খৃষ্টিয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন । কোটবাড়িতে লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এ বিহারটির অবস্থান । বিহারের চারপাশে অসংখ্য শাল গজারির বন ছিল বিধায় এর নাম রাখা হয়েছিল শালবন বিহার । তবে এখন আর সেই শাল গাছের বন নেই , শুধু অংশ বিশেষ রয়ে গেছে । শালবন বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুর বিহারের মতোই কিন্তু আকারে ছোট । মূলত এটি ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মচর্চা এবং বিদ্যা নিকেতন কেন্দ্র । প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় এই বিহার থেকে ৮টি তাম্রলিপি, ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক , টেরাকোটা এবং ব্রোঞ্জমূর্তি পাওয়া যায় । নিজের ইতিহাসকে জানার জন্য অবশ্যই এই বিহার একটি চমৎকার একটি জায়গা ।

টিকেট মূল্যঃ

শালবন বিহারে প্রবেশপথে টিকেট মূল্য বেশ বৈচিত্র্যের । বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য জনপ্রতি ২০ টাকা । ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য টিকেট মূল্য ৫ টাকা । বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে- সার্কভূক্ত দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে টিকেট মূল্য ২০০ টাকা ।

কিভাবে যাবেন শালবন বিহারঃ

ঢাকা থেকে সরাসরি কুমিল্লার বাস আছে, সময় লাগতে পারে সর্বোচ্চ ২ ঘন্টা । অসংখ্য বাস কোম্পানি রয়েছে যাতায়াতের জন্য । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউনিক, শ্যামলি, এনা, হানিফ ইত্যাদি । ট্রেনযোগেও খুব সহজে কুমিল্লায় যাওয়া যায় । শ্রেণীভেদে টিকেট মূল্য ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা ।

যদি কেউ চট্টগ্রাম থেকে আসেন, সেক্ষেত্রেও বাসযোগে খুব সহজে আসতে পারেন এবং সময় ব্যয় হবে মাত্র সাড়ে ৪ ঘন্টা । এক্ষেত্রে অবশ্য ট্রেনে যাতায়াত সুবিধাজনক, কারণ সময় ব্যয় হয় মাত্র তিন ঘন্টা । সেইসাথে টিকেট খরচও কম । 

কুমিল্লা থেকে টমছম ব্রীজ বাস স্ট্যান্ড থেকে ১০ টাকা দিয়ে লোকাল সিএনজি করে কুমিল্লা কোটবাড়িতে যাবেন । এরপর ৫ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে যাবেন শালবন বিহার ।

আনন্দ বিহারঃ

কুমিল্লা জেলা সদরের কোটবাড়ির ময়নামতিতে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য আনন্দ বিহার । আনন্দ বিহারের বিশেষত্ব হলো এই মন্দিরটি ছিলো উপমহাদেশের সর্বশেষ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় । এর কাঠামোগত গঠন পাহাড়পুড় বৌদ্ধ বিহারের মতো । এটি চারকোণা আকৃতির এবং প্রতিটা বাহুর দৈর্ঘ্য ৯ মিটার ।  বিহারের মাঝখানে বিশাল আঙ্গিনায় বিস্তৃত রয়েছে এক ঝাকালো মন্দির যার চারপাশে ঘিরে প্রতিটা বাহুতে সন্যাসীদের কক্ষ সুবিন্যস্ত ছিল । মন্দিরের উত্তরদিকে ঠিক মাঝখানে  পরিলক্ষিত প্রবেশদ্বারটি বিহারের একমাত্র প্রবেশপথ । আনন্দবিহারের খননকাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি, অনেক অংশেই খনন করা হয়নি । ধারণা করা  হয় যে, এটি শালবন বিহার এর চেয়ে আকারে বড় এবং বিস্তৃত  । খনন কাজের সময় এখন পর্যন্ত  ৬৩ টি রৌপ্য মুদ্রা, অনেক গুলো ব্রোঞ্জ মূর্তি , পোড়ামাটির ভাস্কর্য ফলক এবং মঠের বাইরে মৃৎপাত্র পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত একটি ভাঁটি পাওয়া যায় । ধারণা করা হয় সমতট এর রাজধানী ছিল আনন্দ বিহার । আনন্দ বিহারের  উত্তর-পূর্ব দিকে বিশাল এক দিঘী রয়েছে যা আনন্দ রাজার দিঘী নামে পরিচিত।

কিভাবে যাবেনঃ

কুমিল্লায় আসার পর আপনি কুমিল্লা বিশ্বরোড থেকে কোটবাড়ি চলে যেতে পারেন সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে । আর কুমিল্লা শহরে টমছম ব্রীজ থেকেও সি এনজি নিয়ে যাওয়া যায় এই বিহারে ।

ধর্মসাগর দিঘীঃ

বাংলাদেশে সাগর নামে যত দিঘী রয়েছে  তন্মধ্যে প্রধান কুমিল্লার ধর্মসাগর দিঘী । ধর্মসাগর বলে পরিচিত এই ঐতিহাসিক স্থান নিয়ে রয়েছে বহু উপাখ্যান ও উপকথা । কুমিল্লা একসময় ত্রিপুরার  অধীনে ছিল এবং ত্রিপুরার অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্মাণিক্য ১৪৫৮ সালে ধর্মগসাগর খনন করেন । ১৪৫৮ সালে দূর্ভিক্ষ চলাকালীন সময়ে প্রজাদের পানির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য তিনি এই দিঘী নির্মাণ করেন । দিঘিপাড়ের সবুজ বড় বড় গাছের সারি ধর্মসাগরকে করেছে স্নিগ্ধ । থরথর বড় গাছের মাঝখানে  আছে সিমেন্টের বেঞ্চি । আর তাই ধর্মসাগরের পাড় খুব সুন্দরভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে । ১৮ একরের এই দিঘীর উত্তর কোণে রয়েছে রাণীর কুঠির, পৌরপার্ক, পূর্বে কুমিল্লা স্টেডিয়াম ও কুমিল্লা জিলা স্কুল আর পশ্চিম পাড়ে বসার জন্য সুব্যবস্থা আছে ।  বিশ্রামের জন্য বাঁধানো আছে বেদী যার নাম অবকাশ ।  আপনি চাইলে নৌকায় দিঘী ঘুরতে পারেন । শীতকালে এই দিঘীতে  অসংখ্য অতিথি পাখি আসে যা পর্যটকদের মন কাড়ে । অবকাশ উদযাপন আর ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার জন্য ধর্মসাগর হতে পারে আপনার চমৎকার পছন্দ । তাই সময় পেলে ঘুরে আসুন ধর্মসাগর দিঘী ।

কিভাবে যাবেনঃ 

কুমিল্লার শাসনগাছায় নামার পর অটো বা রিকশা নিয়ে চলে যাবেন বাদুরতলা  যেখানে ধর্মসাগর অবস্থিত । ভাড়া পড়বে পনের থেকে বিশ টাকা ।

কুমিল্লার জাহাপুর জমিদার বাড়িঃ

কুমিল্লার মুরাদনগরে গোমতি বিধৌত জাহাপুর এ দাড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের প্রাচীন এক জমিদার বাড়ি । বাড়িটির জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারশত বাষট্টি সালের দিকে কিন্ত  জমিদার বাড়ির বংশধররা প্রায় চারশত বছর আগেই এখানে বসতি স্থাপন করেন । জমিদার গৌরি মোহন জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার ভাই রাম দয়াল ও কমলাকান্ত তাকে এ ব্যপারে সাহায্য করেন । জমিদার বাড়িতে ঢুকতে দেখা যায় ২ টি সিংহ নিস্তব্ধে অভিবাদন জানাচ্ছে  । এই জমিদার বাড়িতে মোট ১০টি প্রাসাদ আছে । প্রাসাদ গুলোর মধ্যে প্রথম ভবনটি তিনতলা আর সবগুলোই দুইতলা  । ভবনগুলোর মধ্যে ২ টি ভবন প্রায় ধ্বংসের পথে এবং বাকি ভবনগুলো মোটামুটি ঠিক আছে । জমিদার বাড়ির ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র এখনো টিকে আছে কারন  জমিদার বাড়ির এগারোতম বংশধররা এখনো এখানে বসবাস করছেন । ভবনগুলো ইংরেজি বর্ণ L এবং  I ধাঁচে করা হয়েছে । এই জমিদার বাড়ির সকল জমিদারদের নাম জমিদার বাড়ির শ্মশানে তাদের সমাধিতে উল্লেখ আছে । এর মধ্যে আছেন গৌরি মোহন রায়, রামকৃষ্ণ রায়, রাম মোহন রায়, অশ্বীনি কুমার রায় ও গীরিশ চন্দ্র রায় । এছাড়াও জমিদারদের কয়েকজন স্ত্রীর নাম জানা যায় । তারা হলেন রাণী নন্দ রাণী, মহামায়া রায়, ও শ্যামা সুন্দরী দেবী । রাণী মহলের সামনে একটি পুকুর ছিল, রাণীরা এই পুকুরটিতে জাফরান  মিশিয়ে গোসল করতেন । বর্তমানে জমিদার বংশধরের মধ্যে শ্রী আশীষ কুমার রায়, সমরেন্দ্র রায়, অজিত কুমার রায়, প্রফেসর অঞ্জন কুমার রায়, অধ্যক্ষ রঞ্জন কুমার রায় ও তাদের পরিবারবর্গ রয়েছেন । 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লা অথবা কোম্পানীগঞ্জগামী বিভিন্ন বাস ছাড়ে । ময়নামতি সংলগ্ন ক্যান্টেনমেন্টে পৌঁছাবেন কুমিল্লা শহরের আগে মাত্র ২ ঘণ্টায় । কোম্পানীগঞ্জের বাসে উঠলে আর বাস পরিবর্তন করতে হবে না । কুমিল্লার বাসে উঠলে ময়নামতিতে নামতে হবে । এখান থেকে আবার কোম্পানীগঞ্জের বাসে উঠে দেবিদ্বারের পান্নারপুলে নামতে হয় । সেখান থেকে বাখরাবাদ রোডে ১০ কিলোমিটার গেলেই জাহাপুর জমিদার বাড়ির অবস্থান ।

ময়নামতী ওয়ার সিমেট্রিঃ

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা  জেলায় অবস্থিত একটি কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি যা ১৯৪১-১৯৪৫ সালে বার্মায় সংঘটিত ২য় বিশ্বযুদ্ধ । যে যুদ্ধে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন । তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরি করা হয়েছিল এই সৌধটি । ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে এই সমাধি তৈরি করা হয় । এখানে ৭৩৬ টি কবর রয়েছে যার মধ্যে ৭২৩ টির পরিচয় জানা যায় । সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করা রয়েছে । প্রতিবছর প্রচুর দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এসকল রণ সমাধিক্ষেত্রে আসেন । এই সিমেট্রিতে  ২৩ জন বিমানসৈনিকের একটি গণকবর আছে ।

কিভাবে যাবেনঃ

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা সেনানিবাসের কাছে এটি অবস্থিত ।

যে কোন কুমিল্লাগামী বাস এ করে কুমিল্লা সেনানিবাসের কাছে নামতে হবে । সেখান থেকে উত্তরে রাস্তা ধরে যে কোন বাহনে করে চলে যাবেন ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি । ভাড়া লাগবে ১০ টাকা জন প্রতি ।

চন্ডীমুড়াঃ

চন্ডীমুড়া কুমিল্লা জেলা সদরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । এটি মূলত একটি মন্দির এবং মন্দিরের প্রবেশ পথে রয়েছে ১৪২টি সিঁড়ি । সিঁড়ির শেষ মাথায় রয়েছে মন্দিরের প্রধান প্রবেশপথ । ধারণা করা হয় হিন্দু ধর্মের আবির্ভাবেরও পূর্বে মন্দিরটি এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধ রাজা দেব খড়গ তার স্ত্রী প্রতীভা দেবীর অনুরোধে তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এখানে চন্ডী মন্দির ও এর পাশে আরও একটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । এখানে আলাদাভাবে পূজা আর্চনা করা হতো । বর্তমানে বিভিন্ন উৎসবে এ মন্দির প্রাঙ্গণে মেলার আয়োজন করা হয় । 

 নবাব ফয়জুন্নেসা জমিদার বাড়িঃ

নবাব ফয়জুন্নেসা জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের  কুমিল্লা  জেলার লাকসাম উপজেলায় পশ্চিমগাঁও এলাকায় অবস্থিত এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি । ভারতবর্ষের একমাত্র মহিলা নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধূরী এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । বিয়ে করেন আরেক জমিদার গাজী চৌধুরীকে । কিন্তু পরবর্তীতে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় । আর ঐ বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পাওয়া দেনমোহরের এক লক্ষ এক টাকা দিয়ে তিনি নিজে একটি বাড়ি তৈরি করেন । ঐসময় জমিদারীর প্রশিক্ষণ নেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাফল্যের সাথে জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন । তার জমিদারীর আওতায় প্রায় হোমনাবাদ পরগণার বর্তমান সময়ের কুমিল্লা জেলার মোট ১৪টি মৌজা ছিল । ১৪টি মৌজাতে রাজস্ব আদায়ের জন্য ১৪টি কাছারিঘর ছিল । তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী জমিদার । বিশেষ করে নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বেশি মনোযোগী । তার জমিদারীর অধিকাংশ আয় এই নারী শিক্ষার পিছনে ব্যয় করতেন । তার এই সাহসী উদ্যোগ ও সাফল্যের কারণে তৎকালীন ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়া তাকে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে “নওয়াব” উপাধিতে ভূষিত করেন । যা পুরো ভারত উপমহাদেশে একমাত্র মহিলা হিসেবে তিনি এই উপাধি পান ।এই জমিদার বাড়িটি ডাকাতীয়া নদীর তীরে অবস্থিত । বাড়িটিতে একটি প্রবেশদ্বার, বসবাসের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন, একটি কাছারিঘর, বাগানবাড়ি, মসজিদ ও কবরস্থান রয়েছে।

কোথায় থাকবেনঃ 

কুমিল্লা শহরে ভাল মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে । এসব হোটেলে থেকে খাবারেরও সুব্যবস্থা রয়েছে । আপনার পছন্দের যেকোন হোটেল আগে থেকেই বুকিং করে রাখতে পারেন । সেক্ষেত্রে www.amarroom.com এর সহযোগিতা নিতে পারেন । এখান থেকে দেশের যেকোনো যায়গার হোটেল রুম খুব সহজেই বুকিং করা যায় ।

Travel

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী !

6051914081_8469c89ea7_b

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা । বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই জেলাটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে সমধিক পরিচিত । এখানে রয়েছে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সুদীর্ঘ ইতিহাস । মুঘল আমলে  মসলিন কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক সময় বাংলাদেশের সমতট জনপদের অন্যতম একটি অংশ ছিল । ব্রিটিশ শাসনামলে এটি টিপারা বা ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত ছিল । এর পর ছয়টি থানা নিয়ে গঠিত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা । এই মহকুমা থেকে গঠিত হয় পৌর শহর এবং পর্যায়ক্রমে সেটা ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে মর্যাদা পায় ।

নামকরণঃ 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে ।  এক দলের মতে, সেন বংশের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে অভিজাত ব্রাহ্মণদের খুবই অভাব ছিল । ফলে পূজা অর্চনায় এ অঞ্চলে বিঘ্নতার সৃষ্টি হত । এ সমস্যা নিরসনের জন্য সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যকুঞ্জ থেকে বেশ কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন । সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ির অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া । অন্য মতানুসারে, দিল্লী থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফী হযরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহর থেকে  ব্রাহ্মণ পরিবার গুলোকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ প্রদান করেন, এর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে ।

ঐতিহ্যবাহী উৎসব

উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অসীম অবদান রাখা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আলী আকবর খান , বাহাদুর খান এর মত খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞের জন্ম এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী উৎসব ।

পুতুল নাচঃ

পুতুল নাচের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খ্যাতি দেশজোড়া । ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল । 

নৌকা বাইচঃ

 ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে শত বছর যাবত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে । প্রতিবছর মনসা পূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসের প্রথম তারিখে তিতাস নদীর বুকে ঐতিহ্যবাহী এ  নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয় ।

মোরগ লড়াইঃ 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এই ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই অনুষ্ঠিত হয় । দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেরা সেরা মোরগ নিয়ে মোরগের মালিকরা আসেন এই প্রতিযোগিতায় । প্রতিযোগিতা দেখার জন্য বিভিন্ন বয়সের মানুষরা আসেন এখানে ।  

গরুর দৌড়ঃ

ঘোড়ার দৌড় বিশ্বজোড়া খুবই পরিচিত একটি খেলা । কিন্তু গরুর দৌড় একেবারেই ভিন্ন একটি খেলা । ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার রূপসদী গ্রামে এই ঐতিহ্যবাহী গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় । 

দর্শনীয় স্থানসমূহঃ 

ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে অসংখ্য চোখ ধাঁধানো দর্শনীয় স্থান । পর্যটকদের মনে সাড়া জাগায় এসব দর্শনীয় স্থানগুলো ।  

হাতিরপুলঃ 

ঢাকা টু সিলেট হাইওয়ে রোড সংলগ্ন সরাইল থানার বারিউরা নামক বাজারের পাশে ইট নির্মিত একটি দর্শনীয় উঁচু পুল রয়েছে । পুলটির হাতির পুল নামে পরিচিত । সরাইলে দেওয়ানী লাভের পর দেওয়ান শাহবাজ আলী বর্তমান শাহবাজপুরে তাঁর কাচারী প্রতিষ্ঠা করেন । শাহবাজ আলী সরাইলের বাড়ী এবং শাহবাজপুর যাতায়াতের জন্য ১৬৫০ খ্রিঃ দিকে সরাইল থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন । বর্তমানে পরিত্যক্ত এই রাস্তাটিকে স্থানীয়রা জাঙ্গাল বলে থাকে । দেওয়ান শাহবাজ আলী এবং হরষপুরের জমিদার দেওয়ান নুরমোহাম্মদের সঙ্গে আত্মীয়তার সর্ম্পক ছিল বলে প্রমাণ পাওয় যায় । ফলে উভয় পরিবারের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উক্ত জাঙ্গালটি ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয় । এই জাঙ্গালটির উপরেই পুলটি অবস্থিত । শুধু মাত্র হাতির পিটে চড়ে দেওয়ানদের চলাচল আবার কথিত আছে পুলটির গোড়ায় হাতি নিয়ে বিশ্রাম দেওয়া হতো বলে পুলটিকে হাতির পুল নামে ডাকা হতো । পুলটির গায়ে  অপূর্ব সুন্দর কারুকার্য  দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল । 

বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে পুলটিকে আকর্ষনীয় করার জন্য সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে । সংস্কারের সময কিছু কারুকার্য নতুন করে তৈরী করা হয়েছে । যেগুলো খুবই দৃষ্টিনন্দন ও চমৎকার । 

গঙ্গাসাগর দীঘিঃ

গঙ্গাসাগর দীঘি এক কালে আগরতলার নদী বন্দরের মতো ব্যবহার হতো । এর পূর্বনাম ছিল রাজদরগঞ্জ বাজার । ত্রিপুরা রাজ্যের ভাটি অঞ্চলের খাজনা আদায়ের মহল অফিস ছিল এ রাজদরগঞ্জ বাজারে । রাজদরগঞ্জ বাজারের পরবর্তী নাম হয় মোগড়া বাজার । এখানে ‘সেনাপতি বাড়ি’ নামে একটি জায়গা আছে । তাই মনে করা হয়ে থাকে যে, ত্রিপুরা-রাজ্যের কোন এক সেনাপতি এখানে বসবাস করতেন স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে। ত্রিপুরা-রাজ্য এখানে একটি বিরাট দীঘি খনন করান। গঙ্গা দেবীর নামানুষারে দীঘির নামকরণ করেন ‘গঙ্গাসাগর দীঘি’। সেই থেকেই জায়গাটির নাম গঙ্গাসাগর হয়।

কেল্লা শহীদ মাজারঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার খড়মপুরে অবস্থিত হজরত সৈয়দ আহম্মদ (রঃ) এর দরগাহ । এই দরগাহটি কেল্লা শহীদের দরগাহ নামে দেশব্যাপি পরিচিত । কেল্লা শহীদের দরগাহ সর্ম্পকে সুন্দর একটি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে । খড়মপুরের কিছু হিন্দু জেলেরা তিতাস নদীতে মাছ ধরার সময় হঠাৎ তাদের জালে একটি খন্ডিত মস্তক আটকা পড়ে যায় । ভয়ার্ত জেলেরা খন্ডিত মস্তকটি উঠাতে গেলে এটি বলতে থাকে ‘‘একজন আস্তিকের সাথে আর একজন নাস্তিকের কখনো মিল হতে পারে না। তোমরা যে পর্যন্ত কলেমা পাঠ করে মুসলমান না হবে ততক্ষণ আমার মস্তক স্পর্শ করবে না।’’ খন্ডিত মস্তকের কাছ থেকে এ কথা শুনে  কলেমা পাঠ করে ঐ জেলেরা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যায় । মস্তকের নির্দেশ মোতাবেক ইসলামী মতে খড়ম পুর কবরস্থানে মস্তক দাফন করে । এ থেকেই শাহ পীর সৈয়দ আহম্মদ গেছুদারাজ ওরফে কেল্লা শহীদের পবিত্র মাজার শরীফ নামে এটি পরিচিতি লাভ করে । প্রতি বছর ওরসে এই মাজারে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে ।

আবি ফিউচার পার্কঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দক্ষিণ প্রান্তে ভাদুঘরে কুরুলিয়া খালের তীরে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একমাত্র  বিনোদন কেন্দ্র আবি ফিউচার পার্ক ।  প্রায় ৪৮০ শতক জায়গার উপর নির্মিত এই পার্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে খালের তীরে হাঙর মাছের মাথার আকৃতির নৌকা ঘাট । এখানে রয়েছে নাগরদোলা, টয় ট্রেইন ও নৌকাসহ মোট ৬টি রাইড । পার্কটি সহজেই দর্শনার্থীদের মন জয় করে । খালপারের এই অনন্য সুন্দর পার্কটি দর্শনার্থীর প্রাণে লাগায় প্রশান্তির ছোঁয়া । 

ধরন্তি হাওরঃ

পশ্চিমে মেঘনা আর পূর্বে তিতাসকে কেন্দ্র করে মাঝখানে গড়ে ওঠেছে সুবিশাল হাওর । সূর্যের আলোয় শেষ বিকেলের চিকচিক করা জলরাশি মনে দেয় অন্যরকম দোলা ।  হাওরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সরাইল-নাসিরনগর সড়ক । ধরন্তি গ্রামে এই সড়কটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলে মনে হবে সূর্য যেন লুকাচ্ছে পানির গভীরে । এ যেন কক্সবাজার কিংবা পটুয়াখালীর সমুদ্র সৈকত । বর্ষাকালে  হাওর থাকে পানিতে টইটম্বুর । তখনই দেখা যায় এ হাওরের অদ্ভুত সৌন্দর্য ।  

এই হাওরে সমুদ্রের মতো বেলাভূমি না থাকলেও সৌন্দর্যের দিক থেকে এটি কোন অংশেই কক্সবাজার থেকে কম নয় । হাওরের দিগন্ত জোড়া থৈ থৈ পানি আর মেঘের লুকোচুরি খেলায় বর্ষার বিকেলটা হয়ে ওঠে মোহময় । হাওরে ছোট ডিঙ্গি নৌকা ও স্পিড বোট নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে । সাথে কারো যদি মাছ ধরার নেশা থাকে তবে তো কথাই নেই । এখানেই লেগে যেতে পারেন প্রকৃতি দর্শনের পাশাপাশি মৎস শিকারে ।   

ঢাকা থেকে মাত্র ঘন্টা তিনেকের দূরত্বে অবস্থিত এ হাওরে খুব সহজেই আসা যাবে । ঢাকা থেকে বাসে চেপে প্রথমে আসতে হবে সরাইল বিশ্বরোডে । বিশ্বরোড থেকে সিএনজিতে করে পৌঁছে যেতে পারবেন ধরন্তি হাওরে । ট্রেনে করেও আসতে পারেন এখানে । সেজন্যে ঢাকা থেকে ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অথবা আশুগঞ্জ স্টেশন নেমে বাস অথবা সিএনজি করে চলে যাওয়া যাবে ধরন্তি৷।  

বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিসৌধঃ  

যাদের কারণে বাংলাদেশ পেয়েছে লাল সবুজের পতাকা তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল । বাংলার সূর্য সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধি সৌধ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় । ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ার দরুইন গ্রামে পরম যত্নে শায়িত মোস্তফা কামালের কবরের পাশে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতি ফলক ও সৌধ । 

বাংলার এই বীরের সমাধি সৌধ দেখতে প্রতিদিন ভীড় জমান শত শত দর্শনার্থী ।  

হরিপুর জমিদার বাড়িঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামে তিতাস নদীর পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত হরিপুর জমিদার বাড়ি । উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এ বাড়িটি কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে ।  অনেক বড় বড় বারান্দা ডিঙিয়ে মূল বাড়িটির অবস্থান । নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বাড়িটির বাইরের অবয়বটি এখনও অবিকল রয়ে গেছে । কারুকাজ খচিত দেয়াল, স্তম্ভ ও কার্নিশ দেখে মন জোড়ায় সবার । তবে বাড়িটির দেয়ালের অধিকাংশ পলেস্তারা খসে পড়ছে দিন দিন আর সেখানে জমেছে শেওলা । দৃষ্টিনন্দন কারুকাজের অধিকাংশই বিলীন হয়ে যাচ্ছে ।  প্রায় ৪৮০ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তিনতলা জমিদার বাড়িটিতে রয়ছে প্রায় ৬০টি কক্ষ, রং মহল, দরবার হল, ধানের গোলা, গোয়ালঘর, রান্নার ঘর, নাচ ঘর, পুকুর, খেলার মাঠ, মন্দির ও সীমানা প্রাচীর । 

জানা যায়, প্রায় ১৭৫ বছর আগে জমিদার গৌরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরী বাড়িটি নির্মাণ করেন। 

বিশাল আয়তনের বাড়িটির পুরো ভবনের কোথাও কোনো রডের গাঁথুনি নেই । লাল ইট সুরকির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি ভবনের দুপাশে দুটি সুউচ্চ গম্বুজ সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । দোতলায় উঠার জন্য ছয় দিকে ছয়টি সিঁড়ি ও তিনতলায় উঠার জন্য দুই দিকে দুটি সিঁড়ি রয়েছে । বাড়ির পশ্চিম দিকে তিতাস নদীর পাড়ে শান বাঁধানো ঘাটের উত্তর দিকে কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরী ও দক্ষিণ দিকে গৌরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর সমাধি মঠ রয়েছে ।

উলচাপাড়া জামে মসজিদ 

প্রাচীন স্থাপত্যের অসাধারণ এক উদাহরণ উলচাপাড়া জামে মসজিদ । মসজিদটিতে যেসব শিলালিপি পাওয়া গেছে তা থেকে অনুমান করা হয় এটি ১৭২৭-২৮ খ্রীস্টাব্দে নির্মান করা হয়েছে । মসজিদটির আয়তন ৫২*৫৩ ফুট । এর ভিতরে রয়ছে ৪ ফুট পুরু দরজা । গম্বুজের কেন্দ্র থেকে নিচ পর্যন্ত অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন  কারুকাজ দিয়ে তৈরি করা হয় । ফরাসী ভাষার একটি শিলালিপি মসজিদের ভিতরে পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু এর অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ।

ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলা থেকে সি এনজি যোগে যাওয়া যাবে সদর থানার অধীনে উলচাপাড়া গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদটিতে ।

আরাফাইল মসজিদ 

প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষিত মোঘল আমলের ঐতিহাসিক নির্দশন আরাফাইল মসজিদটি সরাইল উপজেলার সদর থেকে প্রায় ১ কি.মি. পশ্চিমে আরিফাইল গ্রামে অবস্থিত । ৭০ফুটx২০ফুট আয়তনের এই মসজিদটি ১৬৬২ খ্রি. নির্মিত । স্থাপত্য কলা কৌশল ও অপূর্ব নির্মাণ শৈলীর কারণে মসজিদটিকে দেখতে অনেকটা তাজমহরে মতো মনে হয় । ৩৫০ বছর পূর্বে নির্মিত মসজিদটির দেয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি । 

মসজিদটির পাশেই রয়েছে বিশাল আয়তনের একটি দীঘি, যার নাম সাগর দীঘি । মসজিদের দক্ষিণে রয়েছে দুটি কবর, যা ‘জোড়া কবর’ নামে পরিচিত । ঈশা খাঁ নির্মিত মসজিদটির জোড়া কবর দুটি ঈশা খাঁর দুই স্ত্রীর সমাধিসৌধ বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন ।  

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিশ্বরোড মোড় এসে সিএনজি যোগে সরাসরি যাওয়া যাবে আরাফাইল মসজিদে । 

কি খাবেনঃ

এ জেলা মিষ্টান্নের জন্য বেশ বিখ্যাত । এখানকার ছানামুখী মিষ্টির খ্যাতি দেশজোড়া ।   এছাড়া তালের রস দিয়ে তৈরি তালের বড়া ও তালের রসমালাই দেশের অন্য কোন জায়গায় পাওয়া যায়না । 

কিভাবে যাবেনঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে বেশ কিছু পরিবহনের বাস রয়েছে । এছাড়া চট্টগ্রাম বা সিলেটগামী যেকোন বাস দিয়েও যাওয়া যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া । ট্রেনেও সরাসরি যাওয়া যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া । সিলেটগামী সকল ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে থামে । 

কোথায় থাকবেনঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল রয়েছে । www.amarroom.com এর মাধ্যমে সহজেই আপনার পছন্দের যেকোন হোটেল বুকিং করতে পারবেন ।  

Travel

নীলাচল, স্বর্ণ মন্দির, মেঘলা প্রান্তিক লেক !

17378683836_6838e00b9e_h

চিম্বুক পাহাড়

পাহাড় নাকি সাগর, এই দুটি প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মধ্যে কোনটা বেশি প্রিয় তা হয়তো নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য । তবে পাহাড়ী সৌন্দর্যের রোমান্টিকতা মন ছুয়ে যায়নি এমন পর্যটক পাওয়া মুশকিল বটে । আর বাংলাদেশের পাহাড়ী সৌন্দর্যের মধ্যে পাহাড়ের রানী হলো চিম্বুক পাহাড়। বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কারনে দেশের গন্ডী পেরিয়ে আজ বিদেশেও পরিচিত দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাহাড় চিম্বুকের ।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে এই পাহাড়টি  সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ ফুট উঁচু । চিম্বুক যাওয়ার রাস্তার দুই পাশের পাহাড়ী দৃশ্য এবং সাঙ্গু নদী ভ্রমণকে করে তুলে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক । পাহাড়ের মাঝে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়ার সময়টা সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর ।  মনে হবে মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছেন অন্য কোন জগতে । এ পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের দৃশ্য সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর । পরিকল্পিতভাবে সাজানো এ পাহাড়চূড়াতে উঠা সবচেয়ে চমকপ্রদ । উঠেই দক্ষিণে সিঁড়ি নেমে গেছে বিশাল নব চত্বরে । শরতে এই ভিউ পয়েন্ট থেকে দাঁড়িয়ে দেখা যায় বিশাল মেঘের সমুদ্র আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপেও শীতল বাতাস মনে এনে দেয় প্রশান্তি । দিগন্তজুড়ে আঁকাবাঁকা পাহাড় মনে হয় যেন সমুদ্রের ঢেউ । প্রায় পঁচিশ শত ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা কক্সবাজার আর চট্টগ্রাম এর বিভিন্ন অঞ্চল গুলোকে দেখা যায় । বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে মনে হয় মেঘের স্বর্গরাজ্যে ভাসছে চিম্বুক ।

পাহাড়ি রাস্তায় জিপে করে আদিবাসীদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অতি সাধারণ জীবনযাত্রা আপনাকে করবে অবাক আর বিস্মিত । গ্রামের এসব আদিবাসীরা প্রকৃতির মতই অত্যন্ত সরল আর  সাধারণ । তারা তাদের ঘরগুলো মাচার মতো উঁচু করে তৈরি করে জীবন যাপন করে । 

চিম্বুকের  উত্তর দিক দিয়ে সড়ক চলে গেছে থানচি আর পূর্বকোণ বরাবর নীলগিরি ৷ উত্তর দিকেও কয়েক স্তরে নির্মাণ করা হয়েছে মনোরম ভিউ পয়েন্ট যার কারণে অনায়াসে পর্যবেক্ষণ করা যায় চারপাশ । এর আরও  একটি বিশেষত্ব হলো ঠিক নিচে রাস্তার পাশে বারো মাস মেলে পাহাড়ের ফল যার মধ্যে রয়েছে পেঁপে, কলা, আখ, ডাব, কমলা, বরই ইত্যাদি । সব ফলই টাটকা হওয়ায়  পর্যটকরা এসব ফল খেতে খুবই পছন্দ করেন । কিছু বার্মিজ ও আদিবাসী পণ্যও পাওয়া যায় এখানে ।  

কীভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে প্রথমে বান্দরবান শহরে যেতে হবে এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বেশকিছু বাস ছেড়ে যায় । 

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে পূরবী এবং পূর্বাণী নামে দুটি নন এসি বাস ৩০ মিনিট পর পর বান্দরবানের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায় ।

  বান্দরবান শহরে পৌছার পর রুমা বাস স্টেশন থেকে চাঁদের গাড়ি হিসেবে পরিচিত জীপ, ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার, পাজেরো ইত্যাদি  যানবাহনের সাহায্যে চিম্বুক যাওয়া যায় । গ্রুপ করে বাস এ যেতে চাইলে বান্দরবান-থানচি পথে যাতায়াত করা বাস ভাড়া নিতে হবে । এসব বাস স্পেশাল বাস যা দূর্গম পাহাড়ী পথে চলাচল করতে সক্ষম ৷ তবে  বাসে যাতায়ত করা ঝুঁকিপূর্ণ । মনে রাখতে হবে চিম্বুক-থানচি পথে বিকেল ৪ টার পরে কোনো বাস চলাচল করে না । তাই ৪ টার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে বান্দরবান ।  

স্বর্ণ মন্দিরঃ  

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট হচ্ছে বুদ্ধ ধাতু জাদি ক্যাং । এই জাদিটি বান্দরবান স্বর্ণ মন্দির নামে সুপরিচিত । বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তীর্থ স্থান এই মন্দিরটি দেশী বিদেশী পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষনীয় স্পট । এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত হলেও এটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত নয় । মূলত এর সোনালী রঙের কারণেই এটির নামকরণ করা হয়েছে স্বর্ণমন্দির । বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা বড় এই হীনযান বৌদ্ধ মন্দিরে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি । 

অপরূপ সৌন্দর্যের এই মন্দিরটি বান্দরবান শহরের বালাঘাটা এলাকায় অবস্থিত । এই মন্দির থেকে বান্দরবানের বালাঘাটা উপশহর ও এর আশপাশের সুন্দর নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখা যায় । মন্দিরটি বালাঘাট থেকে ৪ কিমি এবং বান্দরবন সদর থেকে ১০ কিমি দূরে অবস্থিত। 

বান্দরবানে যেসব মারমা জাতিগোষ্ঠী বসবাস  করে তারা হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী 

। ২০০০ সালে পূর্ব এশীয় ধাচে নির্মিত এই মন্দির স্থানীয়দের কাছে কিয়াং নামে পরিচিত । এই পাহাড়ে দেবতা পুকুর নামে একটি লেক আছে, লেকটি সাড়ে তিনশত ফুট উচুতে হলেও সব মৌসুমেই পানি থাকে । স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনে করে এটি দেবতার পুকুর তাই এখানে সব সময় পানি থাকে ।

মন্দিরটিতে প্রবেশের জন্য কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয় । বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের টিকিটের বিনিময়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয় । জনপ্রতি টিকেট মূল্য ২০ টাকা ।  তবে মন্দিরের মূল অংশে যেখানে জাদিটি আছে সেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ । সন্ধ্যা ছয়টার পরে ভিন্ন ধর্মালম্বীদের প্রবেশের অনুমতি নেই । তাছাড়া মন্দির চত্ত্বরে শর্টপ্যান্ট, লুঙ্গি এবং জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ । 

কীভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান এর  বাস রয়েছে । এসি বা নন এসি বাসে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে । উল্লেখযোগ্য বাসগুলো হলো শ্যামলি, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি । 

চট্টগ্রাম থেকেও বান্দরবান আসা যাবে । বহদ্দরহাট বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বান্দরবান এর বাস রয়েছে । পূরবী এবং পূর্বাণী নামক দুটি নন এসি বাস রয়েছে । ৩০ মিঃ পর পর এসব বাস বান্দরবানের উদ্দ্যেশে রওনা দেয় । সকাল ৮টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত বান্দরবানে লোকাল গাড়ী চলাচল করে ।

মেঘলাঃ 

মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রটি বান্দরবান শহরের প্রবেশদ্বার বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের পাশে অবস্থিত । জেলা শহরে প্রবেশের ৫ কি:মি: আগে এ পর্যটন এলাকার অবস্থান ।  এখান থেকে দেখা যায়  সবুজ প্রকৃতি, লেকের স্বচ্ছ পানি আর পাহাড়ের চূঁড়ায় চড়ে ঢেউ খেলানো বান্দরবানের নয়নাভিরাম দৃশ্য । বেশ কিছু উঁচু নিচু পাহাড় দ্বারা ঘেরা একটি কৃত্রিম লেককে ঘিরে গড়ে উঠেছে মেঘলা । বৈচিত্র্য পিয়াসী মানুষ আত্মিক ক্ষুধা মেটাতে মেঘলায় ছুটে আসে বারংবার । লেকের উপর রয়েছে দুটি ঝুলন্ত ব্রীজ সাথে রয়েছে চিত্তবিনোদনের নানা উপকরণ যেমন –  সাফারি পার্ক, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, উন্মুক্ত মঞ্চ, চা বাগান, ক্যাবল কার ও প্যাডেল বোট । সাথে পাহাড়ী কন্যা বান্দরবান এর নজরকাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য তো রয়েছেই ।   

এইখানে জনপ্রতি  প্রবেশ ফি ২০ টাকা এবং গাড়ির পার্কিংয়ের জন্য ১৫০-২০০ টাকা।

নীলাচলঃ 

মেঘলার কাছে অবস্থিত আরেকটি অপূর্ব  পর্যটন স্থানের নাম নীলাচল যার অবস্থান সমুদ্র থেকে ২০০০ ফুট উঁচুতে । বান্দরবান শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়ায় অবস্থিত এ পর্যটন স্পটটি অসাধারন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে আছে । নীলাচলের আরেক নাম টাইগার হিল । নীলাচল থেকে বান্দরবানকে পাখির চোখে দেখা যায় যা  ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর । বর্ষা, শরৎ কি হেমন্ত— তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ ।

নীলাচল থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি রাতের বেলা চিরসবুজ আলোকেও উপভোগ করা যায় মনের মতো করে । শীতের সকালে নীলাচল কুয়াশায় ঢাকা থাকে । বেলা বাড়ার সাথে সাথে সোনালী রোদটা অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা করে । এখানকার পাহাড়ের গায়ে গায়ে পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে । টিকেট ঘরের পাশে ‘ঝুলন্ত নীলা’ থেকে শুরু করে ক্রমশ নীচের দিকে আরও কয়েকটি বিশ্রামাগার আছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘নীহারিকা’ এবং ‘ভ্যালেন্টাইন’ পয়েন্ট । পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো এ পয়েন্টগুলো  একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা ।

তবে মূল নীলাচল থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় আরও ভালোভাবে ।

নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের একেবারে চূড়ায় আছে  কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র । নীলাচলের মূল পাহাড়ের শিখরের চারপাশেই মনোরম স্থাপনা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্রগুলো । এ জায়গায় দর্শনার্থীদের জন্য সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি রয়েছে ।  

নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হল এখানকার রিসোর্ট যার নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট । 

কিভাবে যাবেনঃ 

বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় নীলাচলে বাস স্ট্যান্ড থেকে জিপ অথবা অটোরিকশা করে নীলাচল যাওয়া যায় । এক্ষেত্রে ভাড়াটা আলোচনা করে নিতে হবে ।   

কিভাবে যাবেনঃ 

বান্দরবান শহরের অদূরে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে সিএনজি ও লোকাল বাসে খুব সহজেই আসা যাবে । ৪-৫ জনের গ্রুপ হলে সি এনজি রিজার্ভ নিয়ে আসাই ভাল হবে । 

প্রান্তিক লেকঃ

প্রকৃতিকণ্যা বান্দরবান শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে হলুদিয়া নামক স্থানে অন্যন্য সুন্দর প্রান্তিক লেকের অবস্থান । বান্দরবান জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত এ প্রান্তিক লেক ও পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত বলে এই লেকের নাম হয়েছে প্রান্তিক লেক । পাহাড় বেষ্টিত ৬৮ একর এলাকা জুড়ে প্রান্তিক পর্যটন কেন্দ্রের মাঝে ২৫ একর জুড়েই রয়েছে বিশাল প্রান্তিক লেক । এখানে শিক্ষা সফর ও পিকনিকের ব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে মাটির তৈরি উন্মুক্ত মঞ্চ । । অপূর্ব সুন্দর এ লেকের চারপাশ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ গাছালিতে টইটম্বুর।  কোলাহলমুক্ত শান্ত এ পরিবেশে রয়েছে শুধু হরেক রকম পাখির কলকাকলি । লেকের পাশে পাহাড়ে রয়ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস । পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা । লেকের নীল জল আর পাড়ের সবুজ বনানী যেন তৈরী করে দৈবালোকের মায়া । গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস প্রাণে দেয় অসাধারণ প্রশান্তি ।   

এসব অসাধারণ দৃশ্য অবলোকনের জন্য দর্শনার্থীদের ২০ টাকা প্রবেশ মূল্যের টিকিট কাটতে হবে ।  

কিভাবে যাবেনঃ

বান্দরবান জেলা সদর থেকে সিএনজি নিয়ে খুব সহজেই প্রান্তিক লেক পৌছাঁ যায় । 

অথবা ঢাকা বা চট্রগ্রাম থেকে বান্দরবানগামী যে কোন বাসে সুয়ালক হলুদিয়া নামক স্থানে নেমেও সিএনজি দিয়ে এখানে আসা যাবে ।

কোথায় থাকবেনঃ

বান্দরবানে থাকার জন্য বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল রয়েছে । এসব হোটেলে রয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা । www.amarroom.com থেকে খুব সহজেই হোটেলগুলো বুকিং করে রাখা যাবে ।

Travel

ইলিশের শহর খ্যাত চাঁদপুর !

chadpur2

ইলিশের শহর খ্যাত চাঁদপুর জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল । পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে এ জেলার অবস্থান । 

রাজধানী ঢাকা থেকে এ জেলার দূরত্ব প্রায় ৯৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর থেকে প্রায় ২০৮ কিলোমিটার । এ জেলার দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর জেলা ও

নোয়াখালী জেলা, পূর্বে কুমিল্লা জেলা, উত্তরে কুমিল্লা জেলা,

মেঘনা নদী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী । পদ্মা ও মেঘনা নদী দুটি চাঁদপুর শহরের কাছে এসে মিলেছে ।

নামকরণ   ইতিহাস

১৮৭৮ সালে ত্রিপুরা জেলা যে তিনটি মহকুমা নিয়ে গঠিত হয়, তার মধ্যে চাঁদপুর অন্যতম । ১৯৮৪ সালে চাঁদপুর জেলায় উন্নীত হয় ।

বার ভূঁইয়াদের আমলে চাঁদপুর অঞ্চল বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদরায়ের দখলে ছিল । এ অঞ্চলে তিনি একটি শাসনকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন । ঐতিহাসিক জে এম সেনগুপ্তের মতে, চাঁদরায়ের নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে চাঁদপুর ।

অন্যমতে, চাঁদপুর শহরের পুরিন্দপুর মহল্লার চাঁদ ফকিরের নাম অনুসারে এ অঞ্চলের নাম হয় চাঁদপুর । কারো মতে, শাহ আহমেদ চাঁদ নামে একজন প্রশাসক দিল্লী থেকে পঞ্চদশ শতকে এখানে এসে একটি নদী বন্দর স্থাপন করেছিলেন । তার নামানুসারে নাম হয়েছে চাঁদপুর । 

বর্তমান চাঁদপুর প্রাচীন বঙ্গে সমতট রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল । খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদের শেষ দিকে চৈনিক পরিব্রাজক ওয়ান চোয়াঙ সমতট রাজ্যে আগমন করেছিলেন বলে তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে পাওয়া যায় । তিনি সমতটকে সমুদ্র তীরবর্তী নিম্ন আদ্র-ভূমি রূপে বর্ণনা করেছেন যা এই অঞ্চলকে বুঝায় । প্রাচীন বাংলার গুপ্ত পাল ও সেন রাজবংশের রাজারা এই অঞ্চল শাসন করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় । তবে এলাকার কোনো স্বতন্ত্র আদি নাম সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি ।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর সমগ্র বাংলা মুসলিম শাসনের অধিকারে আসার সাথে সাথে এ অঞ্চলও স্বাভাবিকভাবে মুসলিম শাসনের অন্তর্ভূক্ত হয় । 

দর্শনীয় স্থানসমূহ

তিন নদীর মোহনা বা মিনি কক্সবাজার

চাঁদপুর জেলায় পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত একটি পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে মিনি কক্সবাজার । এটি নদীকেন্দ্রীক বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যটন কেন্দ্র । এর চারদিকে নদী হওয়ায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো দেখায় তাই পর্যটকরা এর নাম দিয়েছেন  মিনি কক্সবাজার। স্থানীয়ভাবে বালু চর, পদ্মার চর ও মেঘনার চর নামেও এটি সুপরিচিত । বেসরকারিভাবে ‘স্বপ্ন ট্যুরিজম’ এ পর্যটন কেন্দ্রটি পরিচালনা করে।

চাঁদপুর ত্রিনদী মোহনা বড়স্টেশন মোলহেড থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলের দক্ষিণ পূর্ব অংশে এর অবস্থান । নদীপৃষ্ঠ থেকে কিছুটা উঁচু হওয়ায় শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমের ভরা জোয়ারেও এটির পুরো অংশ পানিতে ভেসে যায় না । বছরজুড়ে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে এখানে । নদী ভাঙ্গন আর গড়ার মধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে উৎপত্তি হওয়া এ স্থানটি ২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকে ধীরে ধীরে দেশব্যাপি মানুষের কাছে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে ।

চারদিকে নদী ও দূর থেকে স্থানটি দক্ষিণ পূর্বাংশে চাঁদপুর জেলা শহরকে এবং এর বিপরীত দিকে ছোট আকৃতিতে শরীয়তপুর জেলাকে অনুধাবন করা পর্যটন কেন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ । শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের আগ পর্যন্ত এ পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বিশেষ ভাবে । এসময়টা ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের মন কাড়ে । এ স্থানটি পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলে অবস্থান হওয়া দু’দিকে মেঘনা ও পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশির ছোট ছোট ঢেউ আর বালুকাময় বিস্তীর্ণ চরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা এখানে ভিড় করে । দর্শনার্থীরা এখান থেকে ভোরের সূর্যোদয় দেখতে দেখতে হারিয়ে যান অন্য জগতে । অনেকে আবার বিকেলে এসে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রশান্তি আনেন মনে প্রাণে । দু’দিক থেকে দু’নদীর ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়া, পদ্মা-মেঘনায় জেলেদের ইলিশ ধরার দৃশ্য আর বিস্তীর্ণ বালির ফাঁকে সবুজ ঘাস মিনি কক্সবাজারকে দিয়েছে অনাবিল সৌন্দর্যের তকমা । এছাড়া জনপ্রিয় স্থানটিতে পর্যটকদের জন্যে মেঘনা ও পদ্মা নদীর মিঠা পানিতে সাঁতারের পাশাপাাশিও গোসলের সুযোগ রয়েছে । তবে সাতার না জানলে পানিতে বেশি দূর না যাওয়াই ভাল । 

হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ

যাদের ঘুরাঘুরির তালিকায় প্রথম দিকে থাকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শম এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সমূহ, তাদের জন্য হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ হতে পারে সোনায় সোহাগা । চাঁদপুর জেলার একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হলো হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ।

মসজিদটি চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার হাজীগঞ্জ বাজারের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত । উপমহাদেশের বৃহৎ মসজিদ গুলোর একটি এই হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ স্থাপত্যশৈলী এবং অলঙ্করণ অন্তত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন ।

১৩৩৭ বঙ্গাব্দে হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারী মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই মসজিদটির প্রথম মোতওয়াল্লী । বাংলা একাদশ শতকের কাছাকাছি সময়ে মকিম উদ্দিন (র:) নামে এক বুজুর্গ অলিয়ে কামেল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পবিত্র আরব ভূমি হতে সপরিবারে চাঁদপুরের বর্তমান হাজীগঞ্জ অঞ্চলে আসেন । তারই বংশের কৃতি পুরুষ এই হাজী আহমাদ আলী পাটোয়ারি ।

প্রায় ২৮৪০৫ বর্গফুটের এই মসজিদটির ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১০০০০ জন মুসল্লি । আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের ৬ষ্ঠ বৃহত্তম মসজিদ । এছাড়া জুমাতুল বিদা’র বৃহত্তম জামাতের মসজিদ হিসেবে খ্যাত এই পবিত্র স্থাপনাটি ।

মসজিদটি নির্মানকালের উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, নির্মাণ কালীন সময়ে এই এলাকায় কোন ইট ভাটা না থাকায় তিনি এখানে রেল লাইনের পাশে ইটভাটা তৈরি করেন । ইট ভাটাটি আজোও সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায় । এছাড়া হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারি জাহাজ ভাড়া করে কলকাতা থেকে লোহার ভীম ও মর্মর পাথর নিয়ে আসেন মসজিদ তৈরির জন্য । দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটির নির্মাণ এবং অলঙ্করণে ইট, টেরাকোটা ও টাইলস এর অসাধারণ ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় । এছাড়া দুতলা বিশিষ্ট বিশাল এই মসজিদটিতে ২ টি গম্বুজ ও ১ টি মিনার রয়েছে । মিনারটির উচ্চতা ১৮৮ ফুট । সুদীর্ঘ এই মিনারে উঠার জন্য রয়েছে বিশাল সিঁড়ি । এখানে মসজিদটির পাশাপাশি রয়েছে আলীয়া মাদ্রাসা, হাফেজীয়া মাদ্রাসা, ফোরকানীয়া মাদ্রাসা ও গ্রন্থাগার । আলীয়া মাদ্রাসা ছাড়া বাকী মাদ্রাসাগুলো মসজিদ কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় ।

জানা যায়, মসজিদটির কাজ সমাপ্তির পর ১৩৪৪ সনের ১০ অগ্রহায়ণ প্রথম জুমার নামাজের আযান দেয়া হয় । উক্ত জুমার নামাজে উপস্থিত হন অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী একেএম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নওয়াব মোশারফ হোসেন ও নওয়াবজাদা খাজা নসরুল্লাহ্সহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ । উক্ত দিবসে নামাজের ইমামতি করেন পীরে কামেল আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আবুল বাশার জৈনপুরী (র:) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ।

তুলাতলী মঠ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি চাঁদপুর জেলায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান । সেসব দর্শনীয় জায়গা গুলোর মধ্যে তুলাতলী মঠ অন্যতম । প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী ঐতিহাসিক তুলাতলী মঠটি চোখ জোড়ায় পর্যটকদের । আনুমানিক ২৫০ বছর পূর্বে সেই সময়ের জমিদার যাত্রামনি মজুমদার এই মঠটি প্রতিষ্ঠা করেন ।  ৩০০ বছরের প্রাচীন তুলাতলী মঠের পূর্ব পাশে একটি প্রাচীন নৌপথ ছিলও । আঃ রব খন্দকারের দাদা জাহনী খন্দকার ১৮০২ সালে মঠটি ঝোঁপের মধ্যে দেখতে পেয়ে পুনঃসংস্কার করেন ।

চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার কড়ইয়া ইউনিয়নের  তুলাতলী গ্রামের মনোরম পরিবেশে দশ শতক জায়গার উপর এই ঐতিহাসিক মঠটি অবস্থিত । এই মঠটির পাশে বায়াত্তর শতক জমির উপর রয়েছে নারায়ণ মন্দির । প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে হাজার হাজার লোকের সমাগমে অনুষ্ঠিত হয় ঢোল উৎসব ।

এখানে যেতে হলে জেলা সদর থেকে বাসযোগে প্রথমে কচুয়া যেতে হবে । কচুয়া থেকে সিএনজি, অটোরিকশা অথবা মোটর সাইকেল করে যাওয়া যাবে মঠটিতে ।

রক্তধারা স্মৃতিসৌধঃ 

ইলিশের শহর রূপসী চাঁদপুরে ভ্রমণকাল আপনার ভ্রমণ তালিকায় রক্তধারা স্মৃতিসৌধ রাখতে ভুলবেন না । মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই সৌধটি একাত্তরের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে ।

পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থল চাঁদপুর বড় স্টেশনের মোলহেডে বধ্যভূমিতে অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ রক্তধারার। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগে ২০১১ সালে নির্মিত হয় ‘রক্তধারা’ । একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালিকে এখানে এনে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হতো । সে জন্যই এ বধ্যভূমিতে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়, যার নাম রাখা হয় রক্তধারা । ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তে মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় পুরাণ বাজার এবং বড় স্টেশনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কয়েকটি নির্যাতন কেন্দ্র বা টর্চার সেল স্থাপন করে । নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার ও রেলগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে যারা চাঁদপুরে পৌঁছতো, সন্দেহ হলে তাদেরকে আটকে রেখে এখানে নির্যাতন করা হতো । এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষদের এ টর্চার সেলে এনে অমানবিক নির্যাতন করা হতো । নির্যাতন শেষে হাত-পা বেঁধে জীবন্ত, অর্ধমৃত বা হত্যা করে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর খরস্রোতে ফেলে দিতো । ধারণা করা হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে এখানে হত্যা করে মেঘনা নদী মোহনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে । মানুষের রক্তস্রোত মেঘনা-ডাকাতিয়ার স্রোতে মিলিত হয়ে এখানে রক্তের বন্যা বয়ে যেত । বর্তমান প্রজন্মের জন্য সৌধটি একটি আলোকবর্তিকা । তাদের এই আত্মত্যাগকে চির অম্লান রাখতেই নির্মাণ করা হয়ে হয়েছে এই স্মৃতিস্তম্ভটি ।

রক্তধারা’র স্থপতি চঞ্চল কর্মকার । একটি স্তম্ভে তিনটি রক্তের ফোঁটার প্রতিকৃতি দিয়ে বোঝানো হয়েছে রক্তের ধারা । টেরাকোটায় আঁকা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর চিত্র । অসাধারণ এই ভাস্কর্যটি দেখতে সারা দেশ থেকে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন ।

চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে এই স্মৃতিস্তম্ভের দূরত্ব মাত্র ৭৫০ মিটার । চাইলে হেঁটেই যেতে পারবেন রাস্তাটুকু । এছাড়া রিকশা বা অটোরিকশাতে করেও যেতে পারেন । ঘাট থেকে ভাড়া নেবে জন প্রতি ১০ টাকা । এছাড়া চাঁদপুর জেলার প্রাণকেন্দ্র শপথ চত্বর মোড় থেকেও রিক্সা, অটোরিকশা নিয়েও যাওয়া যায় । বাস স্ট্যান্ড থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২ কিমি ।

কিভাবে যাবেনঃ

চাঁদপুরে বাসে বা লঞ্চে যাতায়াত করা যায় । সবচেয়ে সহজ যাতায়ত মাধ্যম হলো লঞ্চে যাওয়া । ঢাকা সদরঘাট থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন অসংখ্য ভালো মানের লঞ্চ যাতায়াত করে ।

বাসে যেতে চাইলে সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে পদ্মা পরিবহন, আল আরাফাহ পরিবহন, রয়েল কোচ কিংবা বিলাস বাস দিয়েও যেতে পারবেন ইলিশের শহর চাঁদপুরে । 

কোথায় থকবেনঃ

চাঁদপুরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল রয়েছে । পছন্দের হোটেল রুম বুকিং করতে ভিজিট করুন www.amarroom.com । 

Travel

গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত

guliakhali2

গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতঃ

মুরাদপুর সৈকত নামে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর সৈকত গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত । 

এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । অনিন্দ্য সুন্দর গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতকে অপরূপ সাজে সাজাতে প্রকৃতি কোন কার্পন্য করেনি । এর প্রকৃতি ও গঠনের দিক থেকে এটি অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে পুরোপুরি আলাদা । একদিকে দিগন্ত জোড়া জলরাশি, অন্যদিকে কেওড়া বন ।

কেওড়া বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল দেখতে দেখতে হারিয়ে যাবেন অন্য কোন জগতে । সমুদ্রের অনেকটা গভীরে চলে যাওয়া এই বনটি অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা করে । এটি একই সাথে সোয়াম্প ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের মতো দেখতে । অন্যান্য  সৈকতের মতো এখানে শুধু বালি নেই । সৈকত জোড়া সবুজ গালিচার মতো ঘাস এটিকে অন্যান্য সমুদ্র সৈকত থেকে করেছে অন্যন্য । এই সবুজের মাঝ দিয়েে এঁকে বেঁকে চলে গেছে সরু সরু নালা । নালাগুলো জোয়ারের সময় পানিতে ভরে উঠে । আর শীতে তো কথাই নেই । পাখি, ঢেউ আর বাতাসের মিতালীর অনন্য সৌন্দর্য  দেখা যায় এই সমুদ্র সৈকতে ।

সৈকতটি স্বল্প পরিচিত বলে মানুষের আনাগোনা কম । ফলে সর্বদা এখানে থাকে নিরবিলি পরিবেশ । সাগরের মতো অতটা ঢেউ বা গর্জন না থাকলেও এই নিরবিলি পরিবেশের সমুদ্র সৈকতটি দু’হাতে বিলিয়ে দিবে অনাবিল আনন্দ । সৈকত থেকে  চাইলে জেলেদের নৌকাতে সমুদ্রে ঘুরে দেখা যাবে । একই সাথে সমুদ্র দর্শন হবে সাথে মাছও ধরা হবে । 

কিভাবে যাবেনঃ

সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতে আসতে হলে প্রথমে আসতে হবে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড বাজারে । সরাসরি ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ডেআসা যাবে অথবা চাইলে চট্রগ্রাম হয়েও সীতাকুণ্ড আসা যাবে । 

ঢাকা থেকে সরাসরি সীতাকুন্ডে দুইভাবে আসা যায়-   ট্রেনে কিংবা বাস এ প্রথমে সীতাকুণ্ড আসতে হবে ।  ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড সরাসরি  মেইল ট্রেন রয়েছে । ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা ।  এছাড়া আন্তঃনগর ট্রেনে প্রথমে ফেনী আসার পর সীতাকুণ্ড যেতে হবে । সেক্ষেত্রে শ্রেণী অনুযায়ী খরচ পড়বে ২৬৫ টাকা থেকে ৮০০ টাকা । 

তবে তুলনামুলকভাবে সহজ হলো বাসে যাতায়াত, যদিও খরচ ট্রেনের তুলনায় একটু বেশি ।  ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো এসি বা নন এসি বাসে খুব সহজে সীতাকুণ্ড আসা  যাবে এবং খরচ পড়বে জনপ্রতি ৪২০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা ।          

আবার চট্রগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড আসতে হলে 

 অলংকার মোড়, এঁকে খান মোড় অথবা  কদমতলী থেকে বাসে করে সীতাকুণ্ড যাওয়া যাবে ।   

সীতাকুন্ড বাজার থেকে গুলিয়াখালী আসার জন্য সীতাকুন্ডের বাস স্ট্যান্ড ব্রীজের নিচ থেকে সরাসরি সিএনজি নিয়ে গুলিয়াখালি বীচের বাঁধ পর্যন্ত যাওয়া যাবে । গুলিয়াখালি বীচের বাঁধ পর্যন্ত জনপ্রতি সিএনজি ভাড়া নিবে ৩০ টাকা, আর  রিজার্ভ নিলে ভাড়া পড়বে ১৫০-২০০ টাকা ।

ভাড়ার পরিমাণ অবশ্যই দরদাম করে ঠিক করে নিবেন । বীচ থেকে সীতাকুণ্ড ফিরে আসার জন্যে আগে থেকেই সিএনজি চালকের নাম্বার নিয়ে রাখতে পারেন অথবা আসা যাওয়াসহ রিজার্ভ করে নিতে পারেন । সন্ধ্যা হয়ে গেলে অনেক সময় সিএনজি পাওয়া যায়না । 

কি খাবেনঃ 

সৈকতে খাওয়ার জন্য তেমন কোন সু-ব্যবস্থা নেই । শুকনো খাবার সীতাকুণ্ড বাজার থেকে নিয়ে নিতে হবে । 

কোথায় থাকবেনঃ   

সৈকতের কাছে থাকার জন্য কোন আবাসিক হোটেল নেই। সীতাকুণ্ড বাজারে কিছু আবাসিক হোটেল আছে, যেখানে রাত্রিযাপন করতে পারবেন।। তবে ভালো কোথাও থাকতে চাইলে আপনাকে চট্টগ্রামে চলে যেতে হবে।

বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতঃ

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত সীতাকুণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় যাওয়া আসা ও দেখার পরেও হাতে  অনেকটুকু সময় থাকবে । এই সময়ে আপনি চাইলে সীতাকুণ্ডের আশেপাশের আরও অনেক দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন । গুলিয়াখালীর আশেপাশে ভ্রমণ স্থান গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত । 

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে এই সৈকতের অবস্থান ।   

বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে রয়েছে সুন্দর একটি জনশ্রুতি। এই এলাকায় অত্যধিক হারে বাঁশের ঝাড় বিদ্যমান বলে এর নামকরণ করা হয় বাশবাড়িয়া । এক সময় এখানকার প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের ঝাড় ছিল বল জানা যায় । 

প্রাকৃতিক সূন্দর্যের লীলাভূমি এই বাঁশবাড়ীয়ায় রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত । 

ঝাউ গাছের সারি, খোলামেলা পরিবেশ, জেগে উঠা সবুজ ঘাসের চর,  পিকনিক স্পট এসব মিলিয়ে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত সেজেছে অপরুপ সৌন্দর্যে । বাশবাড়িয়া যেন ভিন্ন জগতের এক প্রশান্তি  নিয়ে অপেক্ষা করছে দর্শনার্থীদের জন্য ।

বাঁশবাড়ীয়া বেড়িবাঁধ পেরিয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেই বাম দিকে পড়বে দৃষ্টিনন্দন ঝাউবাগান । এর পাশে রয়েছে কেওড়া বন ও পিকনিক স্পট । নারিকেল ও ঝাউ বাগানের মধ্যে পিকনিক স্পটে দল বেঁধে বনভোজনের রয়েছে আলাদা আনন্দ । পিকনিক স্পটের পাশেই রয়েছে কাংখিত বিশাল সমুদ্র সৈকত । যেখানে দাড়িয়ে অনাবিল আনন্দে নিজেকে একাকার করে দেয়ার সুযোগ ।  

এ সৈকতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে  সূর্যাস্ত অবলোকন । এখান থেকে সুর্যাস্তের সময় চারিদিকে অদ্ভুত এক মায়া তৈরি হয় । প্রকৃতি যেন তার বিশালতার ঢালা সাজিয়ে রাখে তখন । সৈকতে রয়েছে সুন্দর একটি লোহার ব্রীজ, যা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে সমুদ্রের উপর দিয়ে । এই ব্রিজটিই পর্যটকদের  সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করে । এছাড়া চাইলে এখান থেকে স্পিডবোট ভাড়া নিয়ে ঘুরে দেখা যাবে চারপাশের অপূর্ব সৌন্দর্য । 

কিভাবে যাবেনঃ

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত ঘুরাঘুরির পর বাঁশবাড়িয়া  সিএনজি রিজার্ভ করে আসতে পারবেন । অথবা গুলিয়াখালি না গিয়েও সরাসরি ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম থেকে বাঁশবাড়িয়া আসা যাবে । 

ঢাকা থেকে বাসে চট্রগ্রাম গামী যে কোন বাসে উঠে নামতে হবে চট্রগ্রামের সীতাকুন্ড বাজারের আগে বাঁশবাড়িয়া বাজারে । বাসের সুপারভাইজারকে  বলে রাখলেই বাঁশবাড়িয়া  বাজারে নামিয়ে দিবে । ঢাকা থেকে ট্রেনে যেতে হলে ফেনী স্টেশনে নামতে হবে। তারপর  ফেনীর মহিপাল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে  বাঁশবাড়িয়া যেতে হবে । ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৭০ টাকা ।  বাঁশবাড়িয়া বাজারে নেমে লোকাল সিএনজি দিয়ে যেতে পারবেন বাশবাড়িয়া সী বিচে । জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ২০-২৫ টাকা । 

চট্টগ্রাম থেকে আসতে চাইলে শহরের অলংকার বা এ কে খান মোড় থেকে সীতাকুণ্ড যাওয়ার যেকোন বাস বা টেম্পুতে করে বাঁশবাড়িয়া বাজারে নামতে হবে । বাঁশবাড়িয়া বাজার পর্যন্ত ভাড়া নিবে ৩০-৪০ টাকা । বাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে বাঁশবাড়িয়া ঘাট পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ২০-২৫ টাকা  । 

কি খাবেনঃ 

গুলিয়াখালীর মতো এখানেও খাবারের তেমন কোন সুব্যবস্থা নেই । তবে শীতের সকালে গেলে কোন ভাবেই টাটকা খেজুরের রস চেখে দেখতে ভুলবেন না । প্রতি লিটার খরচ পড়বে মাত্র ২০-৩০ টাকা । 

কুমিরা ঘাট

চট্টগ্রামস্থ বঙ্গোপসাগরীয় দ্বীপ সন্দ্বীপ পারাপারে জন্য জনপ্রিয় ঘাট হলো কুমিরা ঘাট । সম্প্রতি নির্মিত একটি দীর্ঘ জেটির জন্য এই ঘাট যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক । তীর থেকে সমুদ্র অভ্যন্তরে ছুটে চলা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এক কিলোমিটার দীর্ঘ জেটিটি সহজেই যে কোনো পর্যটকের মন কাড়ে । এটার রয়েছে বিভিন্ন স্থানীয় নাম যেমন ঘাটঘর ব্রীজ, কুমিরা-সন্দ্বীপ ফেরীঘাট ব্রীজ,

এবং কুমিরা ব্রীজ় । প্রাকৃতিক নৈসর্গিক এই ঘাটের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে দাড়ালে মনে হবে সমুদ্রের বুকে দাড়িয়ে আছেন । আর সেই সাথে দেখা যাবে সীতাকুণ্ডের সেই বড় বড় পাহাড় গুলো । দেখার মতো জিনিস এর মধ্যে রয়েছে শিপইয়ার্ডেরই স্ক্র্যাপ বিভাজন চলমান জাহাজ, যেটা যে কারও মন কাড়বে । সে সাথে রয়েছে দিনশেষে মাছ ধরে জেলেদের ঘাটে ফেরার প্রাণবন্ত দৃশ্য । আকাশ পরিষ্কার থাকলে সীতাকুন্ডের বিশাল পাহাড় গুলো এই জেটি থেকে দৃষ্টিগোচর হয় । সমুদ্র পাড়ে থেকে পাজাড় গুলো অবলোকন সে এক অভাবনীয় দৃশ্য । 

দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধের দিনে আলাদা ভাবে বোটে চড়ার ব্যবস্থা রাখা হয় । ভাড়া রাখা হয় জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা ।  

কিভাবে যাবেনঃ

চট্টগ্রামের এ কে খান মোড় অথবা অলংকার মোড় থেকে লোকাল বাসে কুমিরা ঘাটঘর রোড যেতে হবে । ভাড়া জনপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা । কুমিরা ঘাট গজর রোড থেকে রিক্সা অথবা টমটমে যাওয়া যবে কুমিরাঘাটে । টমটম ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা ও রিক্সা ভাড়া ২০ টাকা । 

আবার সরাসরি ঢাকা থেকেও কুমিরাঘাট আসা যাবে ।  চট্টগ্রামগামী যেকোন বাসে প্রথমে ছোট কুমিরা নামতে হবে । সেখান থেকে ৫টাকা অটো ভাড়া দিয়ে কুমিরাঘাট রোড আসতে হবে । কুমিরঘাট রোড থেকে রিক্সা অথবা সিএনজি করে আসা যাবে কুমিরাঘাটে । 

কোথায় থাকবেনঃ

কুমিরাঘাটঘর রোডে একটি মোটামুটি মানের হোটেল রয়েছে । চাইলে সেখানে থাকা যাবে অথবা চট্টগ্রামে ফিরে এসে সেখানে ভাল মানের হোটেল গুলোতে থাকতে পারবেন । সহজেই যেকোন হোটেল বুকিং করার জন্য যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে । 

ভাটিয়ারীঃ  

সমুদ্র আর পাহাড়ে ঘেরা ভাটিয়ারী  ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একটি তীর্থস্থান । এটি চট্টগ্রাম জেলার সদর উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি এলাকা ।

প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি চট্টগ্রামকে পরিপূর্ণ করেছে ভাটিয়ারী । বর্ণিল সাজে সজ্জিত চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক স্থান সমূহের মধ্যে ভাটিয়ারী সবথকে দৃষ্টিনন্দন । 

ভাটিয়ারী যাওয়ার রাস্তা দেখে যেন মনে হয় এক মিনি পার্বত্য অঞ্চল । চারিপাশে ছোট ছোট টিলা, তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে আকা-বাকা, উচু নিচু রাস্তা ।  

ভাটিয়ারীতে রয়েছে ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্ট, ভাটিয়ারী ক্যাফে ২৪, ভাটিয়ারী লেক, ভাটিয়ারী গলফ ক্লাব, ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এডভেঞ্চার ট্রেইল । 

ভাটিয়ারী সানসেট পয়েন্ট বাংলাদেশ আর্মি পরিচালিত অনন্য সুন্দর একটি রেস্তোরা । যেখানে দাঁড়িয়ে দূর সাগরের সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারবেন অনায়াসে । 

সানসেট পয়েন্ট থেকে দেখতে পাওয়া যায় সবুজ গলিচাময় ভাটিয়ারী গলফ ক্লাব । অনুমতি সাপেক্ষে সেখান থেকেও ঘুরে আসা যাবে ।  প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা ভাটিয়ারী গলফ এ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব দেশের প্রায় ১২টি গলফ ক্লাবের মধ্যে অন্যতম।   

তারপর দেখে আসতে পারেন অনাবিল রূপমাধুর্য্যের ভাটিয়ারী লেক । সর্ব সাধারণের জন্য উম্মুক্ত এই অনিন্দ্য সুন্দর এই লেকটিতে   চাইলে প্যাডেল নৌকা অথবা ইঞ্জিল চালিত নৌকা নিয়ে লেকের চার পাশে ঘুরে দেখা যাবে । চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা এই লেকের মধ্যে ঘুরাঘুরি দিবে অনাবিল আনন্দ । 

কিভাবে যাবেনঃ

চট্টগ্রাম শহরের অলংকার মোড় থেকে ভাটিয়ারীর দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার।

চট্টগ্রাম শহর থেকে সরাসরি লোকাল সিএনজিতে করে ভাটিয়ারী যাওয়া যায় । ভাড়া জনপ্রতি ৩০-৪০ টাকা ।  চাইলে লোকাল বাসেও যাওয়া যাবে ।  সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ১৫ থেকে ২০ টাকা । 

কোথায় থাকবেনঃ

চট্টগ্রাম শহরের কাছেই ভাটিয়ারীর অবস্থান হওয়ায় খুব সহজেই চট্টগ্রামের ভাল মানের হোটেল গুলোতে থাকা যাবে ।  www.amarroom.com থেকে খুব সহজেই হোটেল বুকিং করতে পারবেন ।

Travel

ছাতক উপজেলা, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি ।

lal paharb

ছাতক উপজেলাঃ 

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ছাতক উপজেলা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি । এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য অতীব সুন্দর দর্শনীয় স্থান । সুনামগঞ্জ জেলার অধীন এই উপজেলার আয়তন ৪৪০ বর্গকিলোমিটার । সীমান্তবর্তী এই উপজেলায় রয়েছে নান্দনিক সব প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান । ছাতকের উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, পশ্চিমে দোয়ারাবাজার ইউনিয়ন ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে জগন্নাথপুর উপজেলা এবং পূর্বে সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও সিলেট সদর উপজেলা ।
১৩ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই ছোট্ট উপজেলায় যে কতটা সৌন্দর্য লালন করে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা । 

এ উপজেলাটি সিলেট বিভাগের একমাত্র শিল্পাঞ্চল । 

এখানে নল-খাগড়া ও বাঁশের সহজলভ্যতার কারণে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথমদিককার কাগজের মণ্ড তৈরির কারখানা । বাংলাদেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ ছাতকের বাজনা মহলে তৈরি করেছে আকিজ ফ্যাক্টরি যেখানে বিভিন্ন প্লাস্টিকের বোতল উৎপাদন করা হয় । 

এছাড়া চুনের ভাটায় চুনা পাথর পুড়িয়ে চুন তৈরির প্রাচীন এই শিল্পটি অনেক আগে থেকেই চালু আছে এ অঞ্চলে । 

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিঃ

১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সিমেন্ট কারখানা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি । প্রতিষ্ঠালগ্নে যার নাম ছিল  আসাম-বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরি । ফ্যাক্টরিটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ লক্ষ ৩৩ হাজার মে.টন । এর কাঁচামাল চুনাপাথর ভারতের মেঘালয় থেকে আমদানি করা হয় । এছাড়াও
টেকেরঘাট এর নিজস্ব পাথর উত্তোলন কেন্দ্র থেকেও চুনাপাথর সংগ্রহ করা হয় । 

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সুরমার ঠিক তীরে অবস্থিত । ফ্যাক্টরিটিতে আগেকার যুগের সকল যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো এখনও বিদ্যমান । এ ফ্যাক্টরির অবকাঠামো দেখলে আশ্চর্য্যই হতে হয় । ব্রিটিশ শাসনকাল পেরিয়ে এই যুগে এসেও ঠায় দাড়িয়ে আছে সগৌরবে । নদী তীরের এই ফ্যাক্টরির অভ্যন্তরে ঢুকলে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে । এর চারপাশের সবুজ আর বিস্তৃত টিলা গুলো তৈরি  করে রেখেছে অপার্থিব সৌন্দর্য্য । ফ্যাক্টরির অভ্যন্তরে রয়েছে কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য সুবিশাল বাংলো । বাংলো গুলোর সামনে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের তৈরিকৃত বাগান । নিয়মিত পরিচর্যার ফলে বাগানগুলোকে মনে হয়ে যৌবনা রূপবতী । বাংলোর পাশেই রয়েছে তৎকালীন নির্মিত আধুনিক হাসপাতাল । বর্তমানে এখানকার সুযোগ সুবিধা কমে এলেও তখনকার সময়ে এখানে সার্জারি পর্যন্ত হতো ।  হসপিটাল পেরিয়ে গেলে সামনে পড়বে বিশাল মাঠ যেখানে রয়েছে সবুজ গালিচার মতো ঘাস ও বিস্তৃত গাছের সারি ।  এর সামনেই রয়েছে মূল ফ্যাক্টরি । যেখানে তৈরি হয় দেশের কাচামালের তৈরি সিমেন্ট । 

এই ফ্যাক্টরির পুরো অবকাঠামোর সাথে সবুজ প্রকৃতি যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে পর্যটকদের ডাকছে । এখানে ঘুরতে আসলে কেউই নিরাশ হবেন না ।  

লাফার্জসুরমা সিমেন্ট ফ্যাক্টরিঃ 

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এর পাশ ঘেষেই গড়ে ওঠেছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি । ছাতকের নোয়ারাই ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ ফ্যাক্টরিটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক সিমেন্ট উৎপাদন কারখানা । এ ফ্যাক্টরির অভ্যন্তরে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সবুজ পরিবেশ । এর অভ্যন্তরে হাটলে মনে হবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস । অত্যাধুনিক সব অবকাঠামোর সাথে নির্মল সতেজ পরিবেশ সৃষ্টি করে অন্যরকম এক অনুভূতি । ছাতক উপজেলা থেকে খেয়াতে সুরমা পাড়ি দিয়ে তারপর আসতে হয় এখানে ।  অল্প সময়ের এই নৌকা ভ্রমণ চমৎকৃত করে রাখবে অনেক দিনের জন্য । বাংলাদেশের সবথেকে দীর্ঘ এই নদীর জলরাশি প্রাণে দিবে অপূর্ব এক প্রশান্তি । 

দুরবিন শাহ মাজারঃ

দুর্বিন শাহ বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন মরমী গীতিকবি । বাংলা লোক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার এই বাউলসাধক ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর ছাতকের সুরমা নদীর উত্তর পারে নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন । এই তারামনি টিলা বর্তমানে  দুরবীন টিলা নামে পরিচিত । তার পিতা সফাত আলি শাহ ছিলেন একজন সুফি সাধক এবং মা হাসিনা বানু ছিলেন তৎকালীন নামকরা একজন পিরানী । ফলে তার সঙ্গীতচর্চার গোড়াপত্তনই হয় পারিবারিক ঐতিহ্যে ।
তার অধিকাংশ গান ছিল সুফিবাদ ও মরমিবাদ ভিত্তিক । তবে এসবের বাইরেও ভিন্ন ধাচের অসংখ্য গান তিনি লিখেছেন । এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি । ১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমকে সফরসঙ্গী করে ।  তার গানের কথা ও সুরে বিমোহিত হয়ে সঙ্গীত প্রেমীরা তাকে ‘ জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন । একটা সময় মুখে মুখে উচ্চারিত হতো তার গান । এই বাউল সাধকের মাজার রচিত হয় তারই জন্মস্থান দূরবিন টিলায় । বছরে দুইবার এই টিলায় তার ভক্তরা আয়োজন করেন ওরস এর ।  তখন দূর দূরান্ত থেকে তার স্মরণে ছোটে আসেন হাজারো ভক্তরা ।

ইংলিশ টিলাঃ

প্রাচীন এক অনন্য নিদর্শন রয়েছে ছাতকে । শত বছরের পুরনো গল্পগাথা নিয়ে দাড়িয়ে আছে অনন্য এক টিলা যার নাম ইংলিশ টিলা । ছাতকের উপজেলার ৬নং ওয়ার্ডের বাগবাড়ি গ্রামের প্রায় মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত জর্জ ইংলিশ এসকুয়ারের সমাধিস্থল ইংলিশ টিলা । ১৭৯৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে জর্জ ইংলিশ এসকুয়ার নামের এক ইংরেজ বণিক  স্ব-স্ত্রীক ছাতকে আসেন ব্যবসার কাজে । তিনি এখানে কোম্পানী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চুনাপাথরের ব্যবসা শুরু করেন । যেটি ছিল ছাতকে সর্বপ্রথম চুনাপাথরের ব্যবসা । তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টায় ছাতকে সম্ভাবনাময় চুনাশিল্পের দ্বার উন্মোচিত হয় । জর্জ ইংলিশ ছাতকে থেকে প্রায় ৫০ বছর ব্যবসা-বানিজ্য পরিচালনা করে ১৮৫০ সালে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন । তার মৃত্যুর পর স্ত্রী হেনরী স্বামীর ব্যবসা-বানিজ্য দেখাশুনা করতে শুরউ করেন । ঐ বছরই মিসেস হেনরী স্বামীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে টিলার উপর নির্মাণ করেন একটি দর্শনীয় বিশাল স্মৃতিসৌধ । পরবর্তীতে স্মৃতিসৌধটি সাহেব মিনার নামে পরিচিতি লাভ করে এবং টিলাটির নাম হয়ে যায় ইংলিশ টিলা ।
 কয়েকবছর পর তার স্ত্রী মিসেস হেনরী  ব্যবসা-বানিজ্য গুটিয়ে নিজ দেশে চলে গেলে চলে গেলে ইংলিশ টিলা ও সাহেবের মিনার সরকারী সম্পত্তিতে পরিণত হয় । প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার ও বর্গাকারে সাড়ে চারফুট চওড়া এ মিনারটির গায়ে মার্বেল পাথরে খোদাই করে ইংরেজীতে লিখা আছে ‘ইংলিশ দম্পতির’ ইতিহাস ।

ছাতক বাজার থেকে দশ মিনিট হেঁটে বাগবাড়ীতে এই টিলার অবস্থান । রিক্সা ভাড়া নিবে ১০-১৫ টাকা ।  

লাল পাহাড়ঃ

ছাতকের লাল পাহাড় বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর একটি পাহাড় । এর লালচে রঙ নজর কাড়ে যেকোন পর্যটকের ।  এ পাহাড়টি শুধু এর লাল রঙ এর জন্যই বিখ্যাত নয়, এই পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছিল জনপ্রিয়  বাংলা সিনেমা “ছোঁয়ে দিলে মন” এর কাহিনি । ছবিটির অসংখ্য দৃশ্য এই পাহাড়ে নেয়া ।  পাহাড়টি এ অঞ্চলের অঘোষিত প্রাকৃতিক ওয়াচ টাওয়ার । এখানের উপর থেকে চারপাশে তাকালে শুধু সবুজ আর সবুজ প্রত্যক্ষ হয় । 

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি পেরিয়ে একটু সামনে হাটলেই পাওয়া যাবে লাল পাহাড় ।  চাইলে অটোরিকশা করেও যাওয়া যাবে । ভাড়া জনপ্রতি ৫-১০ টাকা । 

রোপওয়েঃ

এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম রোপওয়ে ছাতকে অবস্থিত । সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সিলেটের ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই রোপওয়েটির দৈর্ঘ্য ১৯ কিলোমিটার ।  

সারা দেশের রেল লাইনে পাথরের চাহিদা মিটানোর লক্ষ্যে ও ভোলাগঞ্জ থেকে সংগৃহিত পাথর সারা দেশে সরবরাহের জন্য ১৯৬৫ সালে ছাতক-ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয় । ১১৯টি ট্র্যাসেলের ওপর ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রোপওয়ে লাইন স্থাপিত হলে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে । এ রোপওয়ে লাইন দিয়ে ভোলাগঞ্জ থেকে উন্নতমানের বড় বড় পাথর এনে প্রথমে রাখা হয় ছাতকে । পরে ছাতক থেকে সড়ক, রেল ও নৌপথে সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে ।
পাথর পরিবহনে ৪২৫টি বাকেটের মধ্যে বর্তমানে ৩৫টি বাকেট সচল রয়েছে । অকেজো অবস্থায় ১২০টি বাকেট গুদামে রক্ষিত রয়েছে । লাল পাহাড় থেকে অনতিদূরে এই রোপওয়ের অবস্থান ।


ছাতক গ্যাসক্ষেত্রঃ 

ছাতক গ্যাসক্ষেত্র ১৯৫৯ সালে আবিস্কৃত হয়  । এই কূপটি ছাতক-১ হিসেবে পরিচিত । এই গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয় । এর পরে কূপে অত্যাধিক পানি আসার কারণে উৎপাদন স্থগিত ঘোষণা করা হয় । এই গ্যাসক্ষেত্রটিতে মোট মজুদ প্রায় ৩৩২ বিলিয়ন ঘনফুট, যার অধিকাংশই উৎপাদন করা হয়নি । 

ছাতক উপজেলা থেকে একেবারে নিকটকেই এর অবস্থান । 

বাঁশতলাঃ

ছাতক উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউড়া গ্রাম পেরুলেই আকাশের সঙ্গে পাহাড়ের মিলনমেলা চোখে পড়ে । এখানেই রয়েছে ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিসৌধ । ভারত থেকে নেমে আসা চিলাই নদীর ওপর নির্মিত মনোরম সুইস গেট, তিনদিকে মেঘালয় পাহাড়ে ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ । পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি স্রোতস্বিনী নদীর কলতান আর পাখির কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা ।

টিলার ওপর চোখ জুড়ানো স্মৃতিসৌধ নজরকাড়ে সবার । শুধু স্মৃতিসৌধ নয়, এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সমাধি । তিন দিকে মেঘালয় পর্বতমালা ঘিরে থাকা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এক কথায় অসাধারণ ।
পাহাড়বেষ্টিত বাঁশতলা এলাকায় এবং তার আশপাশে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হন, তাঁদের সমাহিত করা হয় বাঁশতলার এই নির্জনে। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ ।
 ছাতক উপজেলা থেকে খেয়ায় সুরমা নদী পার হয়ে  সিএনজি বাংলাবাজার হয়ে সরাসরি চলে যেতে পারবেন বাশতলা ।


শিখা সতেরঃ 

ছাতক শহর থেকে ৫ কিঃমিঃ দূরে সিলেট-ছাতক হাইওয়ে রোড এবং সিলেট-ছাতক রেল পথের মাঝামাঝি অবস্থিত শিখা সতের । 

এখানে সমাহিত আছেন সতের জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মাধবপুরের লালপুল এলাকায় দেশের মুক্তিকামী ১৭ জন দামাল ছেলেকে পাকহানাদার বাহিনী জীবন্ত কবর দিয়েছিল ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৮ জন উদ্যমী যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সমবেত হয় । তারা সুনামগঞ্জের সুরমা নদী পথে ছাতকের নোয়ারাই হয়ে ভারতের চেলা এলাকায় প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় । বেতুরা এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় রাজাকার ফরিদ মিয়া ও তার সহযোগী রাজাকাররা মুক্তি পাগল যুবকদের বোকা বানিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তোলে দেয় । ওই সময় এক যুবক পালাতে সক্ষম হলেও বাকি যুবকদের হাত-পা বেঁধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছাতক থানায় নিয়ে যায় । সারাদিন বেঁধে রেখে রাতভর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে পরের দিন সন্ধ্যায় লালপুল এলকায় তাদের জীবন্ত কবর দেয়া হয় ।
১৯৭২ সালের ১২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী সরকারি অর্থায়নে শিখা সতেরর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন । সেই থেকে শিখা সতেরো সগৌরবে দাড়িয়ে আছে বাংগালীদের বীরগাথা বুকে নিয়ে । 

কিভাবে যাবেন ছাতকঃ

ঢাকা সায়েদবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি ছাতক যাওয়ার বাস রয়েছে । তবে কেউ চাইলে সিলেট হয়েও ছাতকে আসতে পারবেন । সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে বাস ও সিএনজি সরাসরি ছাতক যায় । ভাস ভাড়া জনপ্রতি ৬০-৭০ টাকা । সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ৮০-১০০ টাকা । 

কোথায় থাকবেনঃ

ছাতকে মুটামুটি মানের রেস্ট হাউস ও হোটেল রয়েছে । রইছ বোর্ডিং, রয়েল পার্ক হোটেল ও মাহবুব বোর্ডিং এ ৩০০-১০০০ টাকার ভিতরে থাকতে পারবেন । তবে আধুনিক সুযোগ সুবিধা পেতে সিলেট ফিরে এসে রাত্রিযাপন করাটাই আরামদায়ক হবে । 

সিলেটের যেকোন হোটেল মুহুর্তেই বুকিং দিতে ভিজিট করুন www.amarroom.com

Hotel

ভীমরুলী ভাসমান পেয়ারা বাজার

floating market1

পেয়ারা বাজারঃ 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাসমান বাজার বা ফ্লোটিং মার্কেট রয়েছে । পানির ওপরে ভাসমান নৌকাতে করে বিভিন্ন জিনিষ বিক্রি করা হয় সেসব বাজারে । বাংলাদেশেও রয়েছে এরকম সুন্দর ভাসমান বাজার । এগুলো অবস্থিত ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় । নাম ভীমরুলী, আটঘর ও কুড়িয়ানা ভাসমান বাজার । মূলত এগুলও ভাসমান পেয়ারা বাজার নামে পরিচিত হলেও এখানে আখ ও আমড়াসহ বিভিন্ন সবজি বিক্রি করা হয় । এই তিনটি বাজারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভিমরুলী ভাসমান বাজার । ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলী বাজারে রয়েছে বাংলাদেশের এই ভাসমান বাজারটি । বাজারটি তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় বসে সবুজের ঢালা সাজিয়ে । জুলাই ও  আগস্ট পেয়ারার মৌসুম হলেও মাঝে মাঝে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে বাজারের কেনা বেচা । 

এই বাজারের পাশ ঘিরেই রয়েছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম পেয়ারা বাগান ।

পেয়ারার জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলে মাইলের পর মাইল জুড়ে রয়েছে পেয়ারা বাগান । 

আটঘর, কুড়িয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার, সদর ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪,০০০ একর জমি জুড়ে চাষ হয় পেযারার । জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বলে দুপাশের মাটি তুলে মোটা আইল বানানো হয় । তারপর আইলের উপরে লাগানো হয় পেয়ারা গাছ । পেয়ারা গাছের সারির দুপাশে তৈরি করা হয়  ডিঙ্গি নৌকা চলার জন্য নালা । আর এসব পেয়ারা বিক্রির জন্য ঝালকাঠির ভিমরুলিতে জমে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার । এই এলাকায় রয়েছে অসংখ্য অগণিত পেয়ারার বাগান । চাষিরা সরাসরি নৌকাতে করে বাগান থেকে পেয়ারা পেড়ে নিয়ে আসে ভাসমান বাজারে । তারপর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে । প্রতি বছরের জুলাই, আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকশ কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন ও কেনাবেচা হয় । 

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বড় বড় ইঞ্জিন বোট নিয়ে বাজারে উপস্থিত হয়ে পেয়ারা কিনেন । পেয়ারা কেনা হয় নৌকা হিসেবে কিংবা মন হিসেবে । 

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ পেয়ারাই আসে এ অঞ্চল থেকে ।  তাই সারাদেশই এই বাজার ও বাগানের ওপর নির্ভরশীল বলা চলে । ভিমরুলি গ্রামের আশেপাশে শুধু পেয়ারা বাগানই না, রয়েছে অসংখ্য আখ ও আমড়ার বাগান । পেয়ারা আর আখের মৌসুম শেষ হলে আসে আমড়ার মৌসুম । এ অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই হয় আমড়ার ফলন । আর সবশেষে আসে সুপারি মৌসুম । এ অঞ্চলের সুপারিও বিক্রি হয় দেশজুড়ে । 

পর্যটকরা সাধারণত বিভিন্ন জিনিষ কিনে নিয়ে যায় । আবার ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে পেয়ারা বাগানের ভিতরে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি ইচ্ছামত খেতে পারবেন পেয়ারা । 

বাজারের বর্ণনা

বরিশালের এই অঞ্চলে ভিমরুলীসহ তিনটি ভাসমান বাজার রয়েছে । তিনটিই একই খালে অবস্থিত । বাকি দুইটি হলো কুড়িয়ানা বাজার ও আটঘর বাজার । 

ভিমরুলী বাজারেই হয় পেয়ারার বেশি কেনাবেচা । বাগান মালিকেরা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন বাজারে । এই হাটগুলোর সবচেয়ে জমজমাট সময় হচ্ছে জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ।

যাওয়ার উপযুক্ত সময়ঃ

ভাসমান পেয়ারা বাজারগুলো দেখতে আগস্ট মাসই সবচেয়ে উপযোগী সময় । সকাল ১১ টার পর পেয়ারা বাজারের ভীড় কমতে থাকে । তাই জমজমাট বাজারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সকাল ১১ টার আগেই বাজারে যেতে হবে ।


কি দেখবেন

বাংলাদেশের এই প্রাকৃতিক পরিবেশে খালের উপরে ভাসমান বাজারটি ছাড়াও অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্য আছে উপভোগ করার জন্য । 

এই বাজারে নৌকায় যেতে যেতে চারপাশটাকে স্বর্গের অপ্সরী মনে হবে । খালের সাথে লাগোয়া গাছ গাছালি সম্মোহনী রুপ ধারণ করে । খালের মধ্য দিয়ে চলার সময় চাইলে হাত বাড়িয়ে পেয়ারা ধরা যায় । আর যদি ভাগ্যক্রমে বৃষ্টি শুরু হয় তাহলে তো কথাই নেই । চারপাশটাকে মনে হবে স্বর্গরাজ্য । অপার্থিব সৌন্দর্য্যে মোহনীয় হয়ে উঠবে পরিবেশ । নৌকায় বসে ভিজতে ভিজতে খালে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না ।

খালের মধ্যে বাঁক নিয়ে চলা পথে ঘুরতে ঘুরতে মনে হবে এ যেন অপরুপ মায়ার জগত । পুরো খাল জুড়ে রয়েছ সবুজের ছড়াছড়ি । বর্ষাকাল হওয়ায় আকাশেও থাকে মেঘেদের বিরামহীন খেলা ।
ছোট নৌকা হলে ঢুকে পড়া যায় বাগানের মাঝের আইল গুলোতে । আর ট্রলার হলে খালের পাড়ে নেমে বাগানে হেঁটে বেড়ানো যাবে । এসব তৈরি করবে অসাধারন ভালো লাগার সব অনুভূতি । নতুন এক স্বাদ যুক্ত হবে ভ্রমনে ।
ফিরতি পথে সন্ধ্যের আধাঁরীতে খালের মাঝে বয়ে চলা দিবে গা শিরশিরে অনুভূতি । অস্পষ্ট পথ ধরে দক্ষ মাঝির বয়ে চলা মন কাড়বে সবার । আকাশে তারাদের মেলা, সে এক অসাধারণ দৃশ্য । মেঘের আড়ালে ক্ষনিক পর পর উঁকি দিবে শশী আর তা তীর ভাংগা আলো । ট্রলারের ছাদে শুয়ে সেই আলো আঁধারির আকাশ দেখতে দেখতে বাঁচতে ইচ্ছে হবে আরো বহু বছর ।

খাবার

খাবারের জন্যেও এ এলাকার রয়েছে অসামান্য খ্যাতি । এ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিখ্যাত খাবার । 

কুড়িয়ানা বাজারের ঋতুপর্ণা হোটেলের গরম গরম রসগোল্লার স্বাদ নিতে কোন ভাবেই ভুলে যাবেন না । কুড়িয়ানা বাজারে বৌদির হোটেল দুপুরের খাবারের জন্য বিশেষ ভাবে খ্যাত ।  কুড়িয়ানা বাজারে ভাসমান এই হোটেলের খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু । এখানকার গুঠিয়ার সন্দেশ খুবই জনপ্রিয় । 

ভিমরুলী বাজারের সাদা ও লাল মিষ্টিও অনেক জনপ্রিয় । এটিও চেখে দেখতে পারেন ।
এছাড়া বরিশাল শহরের পুরান বাজার এলাকার হক এর রসমালাই, রসগোল্লা ও ছানা । বটতলা এলাকার শশীর রসমালাই ও নয়াবাজার মোড়ের নিতাই মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্পঞ্জ মিষ্টিও অত্যন্ত সুস্বাদু ।
 


কিভাবে যাবেনঃ 

বরিশালে রেলপথে যাওয়ার কোন ব্যাবস্থা নেই । তবে নদীপথ অথবা সড়ক পথের পাশাপাশি আকাশপথেও যাওয়া যাবে বরিশাল । যারা সাশ্রয়ে ও আরামে ভ্রমণ করতে চান তাদের জন্য নদী পথে বরিশাল যাওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক ।


নদীপথে যেতে হলে আসতে হবে ঢাকার সদরঘাটে । ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে । সন্ধ্যায় যাত্রা লঞ্চে বরিশাল যেতে জনপ্রতি ডেক ভাড়া ২০০-২৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ (নন এসি) টাকা এবং ডাবল কেবিন ভাড়া ১৮০০ (নন এসি) টাকা । এছাড়া ২০০ টাকা বেশি দিয়ে এক কেবিনে ৩ জনও যাওয়া যাবে ।  বরিশাল লঞ্চ ঘাটে পৌছানোর সেখান   থেকে সিএনজি বা রিক্সায় নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে আসতে হবে । সেখান থেকে লোকাল বাসে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট আসতে হবে । স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করে পর্যায়ক্রমে আটঘর, কুড়িয়ানা ও ভীমরুলী বাজার ঘুরতে পারবেন। ট্রলারভেদে ভাড়া লাগবে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা । 

অথবা স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ২০ টাকা সিএনজি ভাড়ায় কুড়িয়ানা বাজার এসেও নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করা যাবে । এখান থেকে ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ।


বাসে যারা যেতে চান তারা গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকেও যেতে পারবেন ।  ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কয়েকটা বাস বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । গাবতলী থেকে সরাসরি স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাটে যাওয়ার বাস রয়েছে । বাসে বরিশাল কিংবা স্বরূপকাঠি নেমে আগের উল্লেখিত রুটে আসতে  পারবেন ভাসমান পেয়ারা বাজার । 

সাতলা শাপলা বিলঃ 

গ্রামের নাম সাতলা । সাতলার লাল শাপলার সমারোহের কারণে সেটার নাম এখন শাপলা গ্রাম । এই শাপলা গ্রাম যেন এক লাল শাপলার রাজ্য । বিলের পানিতে ফুটে থাকা অনিন্দ্য সুন্দর হাজারো লাল শাপলা যেন সূর্য্যের রক্তিম আভাকেও হার মানায় ।

এই শাপলা বিলের লাল আর সবুজের মাখামাখি দূর থেকেই চোখে পড়বে পর্যটকদের । কাছে গেলে ধীরে ধীরে সবুজের পটভূমিতে লালের অস্তিত্ব আরো গাঢ় হয়ে ধরা দেয় । চোখ জুড়িয়ে দেয় শাপলার বাহারি সৌন্দর্য । সূর্যের সোনালি আভা শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে বিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ । নৌকা দিয়ে বিলের ভেতর ঢুকলে মনে হবে বাতাসের তালে তালে এপাশ-ওপাশ দুলতে দুলতে হাসিমুখে অভ্যর্থনা দিচ্ছে শাপলারা । সে হাসিতে বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দধারা । পেয়ারা বাজার ঘুরে বরিশাল শহরে রাত কাটিয়ে পরদিন ছুটতে পারেন শাপলা বিলের উদ্দেশ্যে । 

অবস্থানঃ 

বরিশাল শহর থেকে শাপলা গ্রামের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার । বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামে রয়েছে এই অসীম সৌন্দর্যের শাপলা বিল ।
গোটা সাতলা গ্রাম জুড়েই শাপলার চাষ করা হয় । সাতলার প্রায় ১০ হাজার একর জলাভুমিতে শাপলার চাষ করা হয় । শাপলা গ্রামের প্রায় ৭০% অধিবাসীই শাপলা চাষ এবং শাপলা বিক্রির সাথে যুক্ত । 

কখন যাবেনঃ

অন্যান্য শাপলা বিলে শীতকালে শাপলা ফুটলেও এখানে সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই ৩ মাস শাপলা ফোটে । বছরের এই মাসগুলোতে সাতলা গেলে হাজারো শাপলা দেখতে পাবেন ।

শাপলার আসল রূপ দেখতে হলে অবশ্যই খুব ভোরে যেতে হবে কারণ বেলা গড়ানোর সাথে সাথেই শাপলা ফুল বুজে যায় । 

কিভাবে যাবেনঃ

সড়কপথে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল যাওয়ার সময় উজিরপুরের নুতনহাট মোড়ে বাস থেকে নামতে হবে । সেখান থেকে সরাসরি অটো করে সাতলার শাপলা বিল যেতে পারবেন । যারা নদীপথে আসবেন তাদেরকে বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে রিক্সা করে প্রথমে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড আসতে হবে । সেখান থেকে মাহেন্দ্র দিয়ে সাতলা বাজার আসতে হবে ।  সাতলা বাজার থেকে ভ্যানে করে আসতে হবে পূর্ব সাতলা জনতা বাজার । এখানে আসলেই দেখা মিলবে আপনার কাঙখিত শাপলার ভূবনের ।

Travel

নীলগিরি, পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা রাস্তা !

nilgiri2

নীলগিরিঃ

প্রকৃতি ও রোমাঞ্চপ্রেমিদের প্রথম পছন্দ বান্দরবান । বিশাল বৈচিত্র্যময় পর্যটনভূমি বান্দরবান জেলায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান । বৈচিত্র‍্যে ভরপুর আকর্ষনীয় বান্দরবানকে বিধাতা সাজিয়েছেন আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে । পাহাড়কন্যা বান্দরবানের সব থেকে সৌন্দর্য্যের মাধুরী মাখা জায়গা হচ্ছে নীলগিরি । নীলগিরিকে  বাংলার দার্জিলিং বলে অভিহিত করা হয় । কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাংলার দার্জিলিং বললে বরং কমই বলা হবে নীলগিরিকে । রুপ-মাধুর্যে দার্জিলিং থেকে সহস্র গুণ এগিয়ে আছে আমাদের নীলগিরি । 

রূপসী কন্যা নীলগিরির দীগন্ত জোড়া সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরির রূপ দিয়ে বিমোহিত করে রাখে ভ্রমণপিয়াসীদের । সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় যদি মেঘ ছোঁয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে নীলগিরি আপনার সেই ইচ্ছে পুর্ন করবে সহাস্যে । 

নীলগিরির চূড়া থেকে চারপাশে চোখ মেলে তাকিয়ে সারি সারি মেঘদলের পাহাড়ে আছড়ে পড়ার দৃশ্য আপনাকে বিমোহিত করবে । কী নেই নীলগিরিতে ! প্রকৃতি যেন তার সবটুকু সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে আছে নীলগিরির বুকে । নীলগিরির চূড়া থেকে পাহাড়ের সারির পাশাপাশি আকাশ পরিস্কার থাকলে আপনার চোখে পড়বে বগালেক, কেওক্রাডং পাহাড়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ চট্টগ্রাম বন্দর ও সাঙ্গু নদী । 

নীলগিরি তার রূপের পসরা সারা বছর সকল ঋতুতেই মেলে রাখে । একেক সময়ে একেক রূপ নিয়ে সাজে নীলগিরি । সকালে মেঘের ভেলার আছড়ে পড়া সাথে সূর্যোদয়ের আলোর খেলা । পাহাড়ের সবুজ বনে  বিকেলের সূর্যাস্ত কিংবা জ্যোৎস্না রাতের মায়াময় পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ হতে বাধ্য করবেই । সাধারণত বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তে মেঘের ভেলার লুকোচুরি খেলা দেখার উত্তম সময় । এ সময় মেঘ পাহাড় থেকে গয়না নিয়ে সাজে অপরুপ সাজে । আর এই সাজ দেখতে নীলগিরিতে যেতে হবে খুব সকালে । শরৎ আর হেমন্তে নীল আকাশের মেঘ ও পাহাড়ে সবুজ বৃক্ষরাজি মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে । শীতে কুয়াশার চাদরে মুড়ে থাকে চারপাশ । সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য ! শীতের কুয়াশার সাথে মেঘের মিলন ঘটে তৈরি করে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের মুহূর্ত । 

এখানকার প্রকৃতির কারুকাজ সবার হৃদয়ে ছড়ায়  সীমাহীন মুগ্ধতা । বর্ষার বৃষ্টি আর আকাশে মেঘের গর্জন সেই সাথে রংধনুর হাসিমাখা আলোক রশ্মি, বাতাসের সাথে ছন্দ আর তাল মিলিয়ে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় এই পরিবর্তনের দৃশ্যগুলো পর্যটকদের ডাকে নিবিড় আহ্বানে । ছোট ছোট পাহাড়ের কোল ঘেষে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সবাইকে আকর্ষণ করে মায়াবী এক টানে ।

নীলগিরি চূড়ায় হেঁটে ওঠার জন্য রয়েছে নান্দনিক কারুকাজে তৈরি ওয়াক ওয়ে । নীলগিরি পাহাড়ের চূড়াতেই রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত মনোমুগ্ধকর একটি পর্যটন কেন্দ্র । এখান থেকে সহজেই নীলগিরির আসল রুপ চাক্ষুষ করা যাবে ।
পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত ছিমছাম একটি রেস্টুরেন্ট । নানা ঢংয়ে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি অতীব সুন্দর প্রশস্ত চত্বর । চত্বরে বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে নজরকাড়া নকশায় দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চ ও শেড । যেখানে বসে অপরুপ সাজের নীলগিরিকে আপাদমস্তক দেখা যাবে অসীম আনন্দে । 

কিভাবে যাবেন নীলগিরিতেঃ 

নীলগিরিতে আসার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি কোন বাস বা ট্রেন নেই । ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা বান্দরবান আসতে হবে নীলগিরি যাওয়ার জন্য । ট্রেনে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে হবে । চট্টগ্রামের বদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাস বান্দারবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ।  এ দুটি বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া লাগে । চট্রগ্রামের দামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকেও বিভিন্ন বাসে করে বান্দরবান আসতে পারবেন ।

বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে সরাসরি চলে আসুন বান্দরবানে । সময় লাগবে ৮-১০ ঘন্টা । ভাড়া পড়বে ৬০০-৭০০ টাকা ।
বান্দরবান থেকে জীপ, চান্দের গাড়ি, মাহেন্দ্র, সিএনজি অথবা লোকাল বাস দিয়ে নীলগিরি যেতে পারবেন । 

কোথায় থাকবেন
নীলগিরিতে রাত্রি যাপনের জন্য রয়েছে সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত বেশ কিছু কটেজ । এগুলোর নামও বেশ চমকপ্রদ ।   মেঘদূত, নীলাঙ্গনা, আকাশনীলা, হেতকরা রাইচা, মারমা রাইচা নামের কটেজগুলো শুধু নামেই সুন্দর নয়, এগুলোর সুযোগ সুবিধাও বেশ উন্নতমানের ।
পাহাড়ে অবস্থিত এসব কটেজে অবস্থানের জন্য দিনপ্রতি গুণতে হবে কটেজ ভেদে ৪ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত । 

যারা সাশ্রয়ে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তারা 

বান্দরবান শহরে  আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত যেকোন হোটেলে থাকতে পারেন । যেকোন হোটেল বুকিং করতে ভিজিট করুন www.amarroom.com । এখান থেকে খুব সহজেই পছন্দের যেকোন হোটেল বুকিং করতে পারবেন । 

শৈলপ্রপাতঃ 

পাহাড় আর ঝর্ণার দেশে যাবেন অথচ শৈলপ্রপাত যাবেন না তা কি করে হয় ? বান্দরবান ভ্রমণে শৈলপ্রপাত ঝর্ণা একটি বোনাস দর্শনীয় স্থান । বান্দরবান শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে থানচি সড়কে অসাধারণ এই ঝর্ণাটির অবস্থান । 

নীলগিরি যাওয়ার পথেই এই শৈলপ্রপাত ঝর্ণার অবস্থান বলে সহজেই  যাওয়া যায় । গাড়ী রাস্তার পাশে থামিয়েই বেড়াতে পারবেন প্রকৃতির অপরুপ দান এই ঝর্ণাটিতে । অনন্য এই জলপ্রপাতটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে অবাক বিস্ময়ে । বর্ষা মৌসুমে এর রূপ থাকে ভয়ংকর সুন্দর । বর্ষায় ঝর্ণা ধারার বেগ বেড়ে যায় দ্বিগুণ । বর্ষাকালে এ ঝর্ণার দৃশ্য নয়ন জোড়ালেও স্রোতের বেগের কারণে ঝর্ণাতে নামা দুস্কর হয়ে পড়ে । রাস্তার পাশেই শৈলপ্রপাতের অবস্থান হওয়ায় বছরের বেশীর ভাগ সময়ই দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরপুর থাকে ঝর্ণাটি ।
। শৈলপ্রপাত ঝর্ণা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব এক সৃষ্টি । এখানে সর্বদা ঝর্ণার হিমশীতল পানি বহমান থাকে । এই ঝর্ণার পানির ধারা খুবই স্বচ্ছ এবং হিমশীতল ।

এছাড়া পাহাড়, ঝর্ণা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার মিতালী দেখতে দেখতে এখানে করা যাবে বনভোজন । ঝর্ণার পাশেই রয়েছে বনভোজন করার জন্য আদর্শ পরিবেশ ।
এখানে দুর্গম পাহাড়ের কূল ঘেসে রয়েছে বম নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস । এখানে আসলে তাদের সংগ্রামী জীবন প্রত্যক্ষ করা যায় । ঝর্ণার পাশেই গড়ে ওঠেছে  উপজাতি তরুণীদের হাতের তৈরী বস্ত্র ও নানা প্রকার তৈজসপত্রের ছোট ছোট দোকান । বম উপজাতীয় তরুণীরা হাতে বোনা চাদর, মাফলার, বেডশিট, বেত ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র বিক্রি করে । এগুলো স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে কিনে নেয়া যাবে । এছাড়া বমদের উৎপাদিত বিভিন্ন মৌসুমী ফলমূলের স্বাদ চেখে দেখা যাবে সহজেই ।
এই ঝর্ণার পানি ব্যবহার করতে পারার কারনে বম উপজাতি ছাড়াও গড়ে ওঠেছে কয়েকটি গ্রাম । এই ঝর্ণার পানি স্থানীয় মানুষদের একমাত্র পানীয় জলের উৎস । গৃহস্থলীর কাজেও তারা ব্যবহার করে শৈলপ্রপাতের পানি । 


কিভাবে যাবেনঃ
যেহেতু শৈলপ্রপাতকে উদ্দেশ্য করে আলাদাভাবে আসা দরকার পড়বেনা সেহেতু এখানে আসার তেমন কোন ঝক্কি নেই । নীলগিরি ভ্রমণের পথে চালককে বলে রাখলেই দর্শন করিয়ে আনবে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের শৈলপ্রপাতকে । তবে কেউ যদি চান আলাদাভাবে শুধু শৈলপ্রপাত দর্শনে যাবেন সেক্ষেত্রে বান্দরবান থেকে সিএনজি অথবা চান্দের গাড়িতে করে শৈলপ্রপাত যেতে পারবেন । গাড়ি রিজার্ভ করলে  যাওয়া আসা মিলিয়ে ভাড়ার পড়বে ৫০০-৮০০ টাকা । 

মিলন ছড়ি হিলসাইড রিসোর্টঃ

পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান প্রকৃতির অপূর্ব মহিমার এক উদাহরণ । যান্ত্রিক জীবনের কংক্রিটের মিছিলে মন আকুপাকু করে এরকম প্রকৃতির সাজানো বাগানে হারিয়ে যেতে ।  খোলা প্রাণে নিশ্বাস নিতে উতলা হয়ে ওঠে হৃদয় । হাঁপিয়ে উঠা জীবন মনকে শান্তির পরশ দিতে চলে যেতে পারেন মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে । 

রিসোর্টটি বান্দরবান শহর থেকে ৩ কিঃমিঃ দক্ষিণ পূর্বে নীলগিরি ও শৈলপ্রপাত ঝর্ণায়  যাওয়ার পথে পড়ে । বান্দরবানের পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা মিলনছড়ি রিসোর্টটি সাজানো হয়েছে বিশাল সৌন্দর্যে । পাহাড়ি পরিবেশে প্রশান্তিময় একান্ত কিছু সময় কাটাতে জুড়ি নেই মিলনছড়ি রিসোর্টের । 

রিসোর্ট থেকে অবারিত সবুজের খেলা এবং সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে সর্পিল গতিতে বয়ে চলা মোহনীয় সাঙ্গু নদীটি অনাবিল সুখ দিবে মনে । 

এই রিসোর্টটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যা দেখে মনেই হয়না এটি কোন কৃত্রিম ঘর । মনে হবে এ যেন প্রকৃতির খেয়ালে আপনা হতেই তৈরি হওয়া আবাস । কটেজগুলো বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সুনিপুণ ভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রকৃতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ।

কটেজগুলোকে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাড়ির আদল । চমৎকার এই কটেজ গুলো নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের ঢালে । যা সৃষ্টি করেছে অপার্থিব সৌন্দর্য্য ।  কটেজগুলোর নামও বেশ সুন্দর । কোনটার নাম পাখির নামে, কোনটা আবার আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর নামে । কটেজের ওপর দেয়া হয়েছে পাতার ছাউনি । আর ঘরের সিলিং ও দেয়ালগুলো শীতলপাটি দিয়ে সুনিপুণ ভাবে মোড়ানো হয়েছে ।  পোকামাকড় ও মশা থেকে বাঁচার জন্য রয়েছে নেট ।  

রিসোর্টের সম্পূর্ণ এলাকাটি ঘন সবুজ গাছ দিয়ে মোড়া । চারপাশের নিবিড় জঙ্গলে রয়েছে নানা ধরনের গাছের সমাহার । আরো আছে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা হরেক রঙের ফুলের শোভা ও মোহনীয় সুবাস । কটেজের বারান্দায় পাতা চেয়ারে গা এলিয়ে সামনের অবারিত সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতে পারবেন সবুজের সমারোহে ।
তাই প্রাকৃতিক পরিবেশে আনন্দময় অবকাশ যাপনের জন্য এই রিসোর্টের কোন তুলনাই হয়না ।  এই যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ দূর করতে জুড়ি নেই মিলনছড়ির । কিছুটা প্রশান্তিময় সময় কাটাতে ছুটিতে চলে আসতে পারেন এই হিলসাইড রিসোর্টে ।

কি খাবেন রিসোর্টেঃ

রিসোর্টটিতে রয়েছে একসাথে ১০০ জন বসে খাওয়ার মতো একটি রেস্টুরেন্ট । এটির নামও বেশ অনন্যসুলভ; রিগ্রী ক্ষ্যাং রেস্তোরাঁ ।  এখানে জনপ্রিয় ব্যাম্বু চিকেনসহ বান্দরবানের নানা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আদিবাসী খাবার পাওয়া যাবে । 

কিভাবে যাবেনঃ

বান্দরবান শহরের অদূরে এই রিসোর্টে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনা । এখানে রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্যে গেলে বান্দরবান শহর থেকে সিএনজি বা চান্দের গাড়িতে করে যেতে পারবেন । আর যদি শুধু ঘুরার উদ্দেশ্যে যান তাহলে আলাদা করে গাড়ি ভাড়া করতে হবেনা । নীলগিরি বা শৈলপ্রপাত যাওয়ার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে খুব সহজেই ঘুরে দেখে আসতে পারেন মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট । 

রিসোর্টের ভাড়াঃ 

রিসোর্টটিতে রয়েছে দুটি ডরমিটরি, ১২টি নন-এসি রুম এবং ১১টি এসি রুম ।

এসব রুমে একসাথে ৮০ জনের থাকার সু-ব্যবস্থা রয়েছে ।
ডরমিটরি তে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৯০০-১০০০ টাকা। অন্যান্য রুমের ভাড়া পড়বে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ।

Travel

ডিম পাহাড়, মেঘের ওপরে ভাসছে একটি সড়ক ।

Dim-Pahar-Bandarban

মেঘের ওপরে ভাসছে একটি সড়ক । সড়কের ধারে ধারে ফুটে আছে নানা রঙের পাহাড়ি ফুল । সাদা মেঘে আচ্ছন্ন রাস্তাটি পাড়ি দিতে দিতে চারিদিকের সবুজের সমারোহ অবলোকন । যেন স্বর্গের কোন অপ্সরী ভুল করে তার রুপ মাধুর্য্য নিয়ে চলে এসেছে এ পৃথিবীতে । অসাধারণ ভাল লাগার এরকম অনুভূতি পাওয়া যাবে বান্দরবানের ডিম পাহাড়ে । অদ্ভুত সুন্দর এই পার্বত্য অঞ্চলের রুপ যেন পূর্ণতা পেয়েছে ডিম পাহাড়ের জন্য । দূর থেকে দেখতে এই পাহাড়কে ডিমের মতো মনে হয় বলেই এই পাহাড়ের নাম ডিম পাহাড় । সাদা মেঘে আচ্ছন্ন থাকা এই পাহাড়কে শুধু স্বর্গের সাথেই তুলনা করা যায় । বান্দরবানের অপরূপ সবুজের মাঝ দিয়ে নির্মিত দেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা ‘থানচি-আলীকদম’ এর সৌন্দর্য্যের বর্ণনা এভাবে লিখে দেয়া সম্ভব না । নিজের চোখে না দেখলে এর রুপগাথা বিশ্বাস হবে না । চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ । গাড়ি দিয়ে ওঠার সময় আকাশটাকে মনে হবে ছাদ আর নিচের দিকে তাকালে মনে হবে পাতালপুরি । মাথার উপরে আকাশের ছাদ আর পায়ের তলায় পাতালপুরি নিয়ে মনে হবে আপনি আছেন কোন কল্পনার রাজ্যে । যে রাজ্যের রুপের মাধুর্য বর্ণনাতীত । মেঘদল গুলো যেন অসীম আনন্দের বার্তা জানান দেয় প্রতি মুহুর্তে । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজারফুট উঁচুতে তৈরি করা এই রাস্তায় যেতে যেতে মনে হবে যেন মেঘের ওপরে ভাসছেন । কল্পনার সীমারেখাকেও হার মানায় এই পাহাড়ের সৌন্দর্য্য । 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে নির্মিত ডিম পাহাড়ের ওপর থানচি-আলি কদম রাস্তাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ । ডিম পাহাড় বান্দরবানের আলীকদম এবং থানচি উপজেলার ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত । রাস্তাটি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু সড়কপথ । ৩৩ কিলোমিটার সবুজাভ পাহাড়ে আঁকাবাঁকা সর্পিল এই পথ । 

থানচি-আলীকদম রাস্তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটার নাম এই ডিম পাহাড় । পাহাড়টা দেখতে ডিমের মত বলেই এমন নাম । স্থানীয় ম্রো আদিবাসীরা এই পাহাড় কে ডাকে ‘ক্রাউডং’ পাহাড় । এত সুন্দর পাহাড়  বাংলাদেশের আর কোথাও অয়াওয়া যাবে না  । আপনি যদি বাইকে করে এই পাহাড়ের উপর আসেব তবে অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা বাতাস সারা শরীর দিয়ে শিহরণ বইয়ে দিবে । ডিম পাহাড় মেঘের এত কাছে হওয়ায় বোধ হয় সবসময় ঠাণ্ডা বাতাস থাকে । শীতলতা  একদম সরাসরি অনুভব করা যায় । প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ডিম পাহাড়ে পৌঁছালেই গা হিম করা ঠান্ডা বাতাস । আর পাহাড় থেকে যে অনাবিল সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় সেটা স্মৃতির মানস্পটে গাথা থাকবে চিরদিন । 

ঘনসবুজ পাহাড়ের পাথুরে ঢাল বেয়ে বয়ে চলছে  ঝর্ণাধারা । ঝর্ণার শীতল জলের কলকল শব্দে মুখরিত থাকে আশপাশের পরিবেশ । অন্যদিকে ডিম পাহাড়ে রাস্তায় দাড়িয়ে ছোঁয়া যায় আকাশের সাদা মেঘ ! বান্দরবানের থানচি থেকে আলীকদম হয়ে এই রাস্তা চলে গেছে আরেক পর্যটন নগরী কক্সবাজারের দিকে । 

রাস্তা তৈরির ইতিহাসঃ

 এ সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে । প্রথম দুই বছরে মাত্র ৬ কিলোমিটার রাস্তার  নির্মাণ কাজ শেষ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) । এরপর সওজ জানিয়ে দেয় তাদের পক্ষে পাহাড়ের চূঁড়ায় সড়ক বানানো সম্ভব নয় । সওজ রাস্তা তৈরি করতে ব্যর্থ হলে সড়কটি নির্মানের।জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ডাকা হয় । এরপরে ২০০১ সালে সেনাবাহিনীকে রাস্তাটি নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় । হেলিকপ্টারে করে রাস্তার ম্যাপ তৈরি করা হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে । তারপর  পাহাড়ের পর পাহাড়ের গা কেটে তৈরি হয় এ পথটি । সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ টানা এক যুগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে সড়কটি নির্মাণ করে । সড়কটি নির্মানের জন্য সেনাবাহিনীর ইসিবি ১৬ ও ১৭ ইউনিটের কাছে থানচি আলিকদমসহ ভ্রমণপিপাসু সকল মানুষ কৃতজ্ঞ । ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা । এবং সময় লেগেছে প্রায় ১ যুগ । 

নির্মাণ-কালীন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ৩ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেন ।

বান্দরবানের দুই প্রতিবেশী উপজেলা থানচি আর আলীকদমের মধ্যে সড়ক পথে দূরত্ব ছিল ১৯০ কিলোমিটার ।  এই পথটি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলে।দূরত্ব হয়ে যায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার । 

এ সড়ককে ঘিরে একে একে সন্ধান মিলছে অসংখ্য ঝিরি, ঝরণা ও জলপ্রপাতের ।

আদিবাসীদের উপকথাঃ 

আলীকদমে বসবাসকারী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের মধ্যে ডিম পাহাড় নিয়ে অত্যন্ত চমৎকার একটি উপকথা প্রচলিত রয়েছে । উশে নামে অত্যন্ত মা ভক্ত এক ছেলে ছিল । ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় মা’ই তার একমাত্র সম্বল ছিল । সেই মা একদিন অজানা রোগে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন । এখন মরেন কি তখন মরেন অবস্থা । গ্রাম্য ওঝা উশের মায়ের অবস্থা দেখে জানালেন এই রোগ কোনভাবে নিরাময় হবে না । ধীরে ধীরে প্রাণ হরণ করবে আত্মঘাতী এই ব্যাধী ।
তবে মাকে বাঁচানোর জন্য একটা উপায় রয়েছে । উশের সম্প্রদায় যেখানে বাস করে সেখান থেকে ৩ দিনের হাঁটা দূরত্বে ডিম পাহাড়ের অবস্থান । পূর্ণিমা রাতে ডিম পাহাড়ের চূড়ায় এক স্বর্গীয় ফুল ফোটে । আবার ভোর হতেই সেই ফুল ঝরে যায় । এই ফুলের রস যদি তার মাকে খাওয়ানো যায় তবেই তিনি সুস্থ হবেন ।
এদিকে ডিম পাহাড়ে কেউই কখনও পৌঁছাতে পারে নি । যারা সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তারা কখনও ফিরে আসেনি । কারণ সেই পাহাড়ে এক দানব থাকে যে স্বর্গীয় ফুলগুলোকে পাহারা দেয় । কেউ পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করলেই দানবটা তাকে খুন করে ফেলে । এসব জানার পরেও মা ভক্ত উশে সিদ্ধান্ত নিলে সে যেভাবে হোক যাবেই । যেকোনো মূল্যে তার মাকে বাঁচাতে হবে । তার বন্ধু থুই প্রু তাকে একা যেতে দিবেনা তাই তাকেও সাথে নিয়ে রওনা দিল ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে । পাহাড়ি পথে তিন দিন তিন রাত হাঁটার পর অবশেষে তারা পৌঁছালো ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি ।
থুই প্রু কে চূড়ার নিচে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে রওনা দিল । ঠিক মধ্যরাতে পূর্ণিমার আলোয় উশেকে আবারও দেখতে পেল থুই । একটা থলের ভেতরে সেই কাঙ্ক্ষিত ফুল দিয়ে থিকে ছুড়ে দিল উশে ।  উশেকে ইশারা দিয়ে থুই জানাল যে সে ফুলগুলো পেয়েছে । উত্তরে উশে জানাল সে নিচে নামবে, থুই যেন তার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু আর কখনও থুই নিচে নেমে আসেনি । 

অদ্ভুত ঘটনাঃ 

সম্প্রতি ডিবিসি নিউজের একটি খবরে দেখানো হয় ডিম পাহাড়ের আশ্চর্য্য একটি ঘটনা । রাস্তাটির সমতল জায়গাতে গাড়ি রাখা হলে সেটি আপনা আপনি নিচের দিকে যেতে শুরু করে । গাড়ির চালকরা তাই সাবধানে গাড়ি পার্কিং করেন । শুধু যে গাড়ি নিচের দিকে নামে তাই না । মানুষজন হাটার সময় মনে হয় অদৃশ্য কেউ একজন নিচের দিক থেকে টেনে রেখেছে । ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের সাথে কথা বলেন । তিনি বলেন হয়তোবা সেখানে মধ্যাকর্ষন বল কাজ করছেনা । তবে সেটা জানার জন্য প্রাথমিক ভাবে একটি বিশেষ চুম্বকীয় পরিক্ষা করা প্রয়োজন । 

কিভাবে যাবেন ডিম পাহাড়ঃ

ঢাকা থেকে প্রথমে আসতে হবে চট্রগ্রাম – কক্সবাজার সড়কের চকোরিয়া বাস টার্মিনালে । ঢাকা থেকে নন এসি বাস ভাড়া পড়বে  ৭৫০ টাকা । সেখান থেকে লোকাল বাসে কিংবা চান্দের গাড়িতে করে থানচি বাজার চলে যান । এরপর সেখান থেকে চান্দের গাড়ি কিংবা মোটরবাইকে করে ডিম পাহাড়ের অদ্ভুত মায়াবী সৌন্দর্য্য দেখে আসুন ।

অথবা ট্রেনেও যাওয়া যাবে । ট্রেনে প্রথমে আসতে হবে চট্রগ্রাম তারপর চট্রগ্রাম থেকে বাসে করে আসতে হবে চকোরিয়া । চট্রগ্রাম থেকে চকোরিয়াতে জনপ্রতি বাস ভাড়া ১৭০ টাকা । চকোরিয়া বাস টার্মিনাল থেকে মাতামুহুরী পরিবহণ প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত আলিকদমের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । আলিকদম থেকে প্রতিদিন সকাল ৭.০০ টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫.৩০ পর্যন্ত চকোরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দুই দিক থেকেই ৪০ মিনিট পরপর গাড়ী ছেড়ে যায় । ভাড়া জনপ্রতি ৬০ টাকা । সময় লাগবে ১ ঘন্টা ৪০ মিনিটের মতো । চকরিয়া থেকে আলীকদম চাঁন্দের গাড়িতে আসা যাবে । লোকাল ভাড়া জন প্রতি ৬৫ টাকা । রিজার্ভআয়া ভাড়া পড়বে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকার মতো । 

আলীকদম থেকে থানচির পথে বাইকে চড়াই উত্তম । কারণ এই রাস্তার আসল সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে বাইকে চড়ার জুড়ি নেই । 
থানচি বাজার এবং আলীকদম বাজার থেকে বাইক পাওয়া যায় । এরা সারাদিন থানচি থেকে আলীকদম আসা যাওয়া করে । বাইকে চালকসহ তিনজন বসা যাবে । ২ জনের জন্য ভাড়া ৬০০ টাকা এবং ১ জনের জন্য ৫০০ টাকা । 

কোথায় থাকবেনঃ

থাকার জন্য চট্টগ্রাম শহরে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত বিভিন্ন হোটেল রয়েছে । www.amarroom.com এর মাধ্যমে আপনার পছন্দের যেকোন হোটেল মুহুর্তেই বুকিং দিতে পারবেন ।