amarroom

amarroom

Travel

খৈয়াছড়া ঝর্ণা, পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলের স্রোত !

khoiachora1

প্রকৃতির রহস্যময়তার সীমানা নেই । পৃথিবীর জায়গায় জায়গায় রহস্যের চাঁদর বিছিয়ে পৃথিবীর বাসিন্দাদের বিস্মিত করে রাখে প্রকৃতি । এরকম হাজারো বিস্ময়ের মাঝে অন্যতম উপাদান হলো জলপ্রপাত । পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলের স্রোত বিস্ময়ে হতবাক করে, মনে দেয় অফুরন্ত সুখ ও আনন্দ । প্রতিদিনের ক্লান্তি ভূলে অফুরন্ত জীবনিশক্তি করাগত করতে তাইতো পর্যটকরা ছুটেন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে । এরকমই অসংখ্য জলপ্রপাত নিয়ে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম জেলাটি । পাহাড়ের গা বেয়ে নিরন্তর জলপতন দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীরা আসেন চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে । মিরসরাইকে জলপ্রপাতের জননী বলা যেতে পারে । কারণ এখানে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় জলপ্রপাত । পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে চলা জলের এ এক অসাধারণ সমাহার । প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা চট্রগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের উপর দিয়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ অনেক দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যান । কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না পথিমধ্যে এই মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের বুকে রয়েছে অনন্য সাধারণ সব ঝর্ণা ও ঝিরি । পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এসব ঝর্ণাসমুহ সর্বদা বিলিয়ে দিচ্ছে তার রুপ-মাধুর্য । এসব ঝর্ণার মধ্যে অন্যতম  জলপ্রপাত হচ্ছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা, সুপ্তধারা ঝর্ণা ও সহস্রধারা ঝর্ণা । 

খৈয়াছড়া ঝর্ণাঃ 

মিরসরাই তথা বাংলাদেশের সব থেকে রুপবতী ঝর্ণা এই খৈয়াছড়া । রুপে গুণে অনন্য এই ঝর্ণাটিকে ঝর্ণার রাণী বলে ডাকা হয় । এই ঝর্ণার রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব । ঝর্ণাটির রয়েছে মোট ৭টি ধাপ । 

অন্যান্য ঝর্ণার মতো এটি সরাসরি পাহাড় বেয়ে নিচে এসে পড়েনি । এই ৭টি ধাপে ঝর্ণাটি নিরন্তর পানি বর্ষণ করে পাহাড়ের পাদদেশে ।

ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তাটি খুবই মনোমুগ্ধকর । গাড়ির রাস্তা পার হয়ে যখন পায়ে হেঁটে চলা শুরু করবেন তখন এর চারপাশের দৃশ্য আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে । উঁচু-নিচু রাস্তা পার হয়ে একসময় এসে পড়বেন পাহাড়ি ঝিরিপথে । এরপরই শুরু হবে আপনার আসল রোমাঞ্চ । ঝিরি পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হয় ঝর্ণার পথে । কখনো হাঁটুপানিতে পাথরের ওপর দিয়ে হাটতে হবে তো কখনো কখনো সেই পানিই কোমর ছাড়িয়ে বুক পর্যন্ত উঠে আসবে । গড়পরতায় দেড় ঘণ্টার মতো হাটার পর চলে আসবেন ঝর্ণার কাছে । এরপর যখন খৈয়াছড়ার দর্শন পাবেন, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাবেন । স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি দেখে মাথা আপনা আপনি নুইয়ে আসবে কৃতজ্ঞতায় । 

৭ ধাপের এই ঝর্ণার নিচের তিনটি ধাপই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে খুব সহজেই দেখা যাবে । ওপরের চারটি ধাপ দেখতে হলে বাম পাশের প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে বেশ খানিকটা ওপরে ।
ওপরের ওঠার পর ঝর্ণার রূপ-সুধা পাহাড়ে ওঠার পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে নিমেষেই । ওপরে উঠলে প্রথমেই দেখা মিলবে একটি ধাপের । এর বাম পাশ দিয়ে সামান্য হাঁটলেই দেখা মিলবে অপর তিনটি ধাপের । চাইলে এই তিনটি ধাপের পাশ দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে যেতে পারেন আরো ওপরে । সেখানে আশপাশের বহুদূর বিস্তৃত পাহাড় আর জঙ্গলের অপূর্ব দৃশ্য কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনাকে ভুলিয়ে দেবে আপনার পরিশ্রম আর নিরাপদে নিচে ফিরে যাওয়ার ভাবনার কথা ।
এই ঝর্ণার পানিতে গোসল করার লোভ সামলানো অসম্ভবেরও অনেকটা উপরে । তাই সাথে অতিরিক্ত কাপড় ও তোয়ালে নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে । ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিয়ে মনকে শান্ত ও পবিত্র করতে করতে কতোটা সময় যে কেটে যাবে টেরও পাবেন না । 

অবস্থানঃ 

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এই ঝর্ণাটি চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারে অবস্থিত । ঝর্ণাটির একদম পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত বলে সরসরি কোন যানবাহন ঝর্ণাটির পাদদেশে যেতে পারেনা । প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে প্রবাহিত হওয়া এই ঝর্ণাটিতে যেতে হলে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে পায়ে হেঁটে। 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩০ মিনিট পরপরই বাস ছেড়ে আসে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে । সেসব বাসে করেই আসতে হবে মিরসরাই । চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে মিররসরাই পার হয়ে বারতাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামতে হবে । বাসের সহযোগীকে বললেই নামিয়ে দিবে । বড়তাকিয়া পর্যন্ত আসতে সময় লাগবে ৫ ঘন্টার মতো । বড়তাকিয়া বাজারে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের কাছে গিয়ে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলেই পেয়ে যাবেন খৈয়াছড়া ঝর্ণার রাস্তা । গ্রামের রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলে পথে রেললাইন পরবে, রেললাইন পার হয়ে আরো দশ মিনিটের মতো হাঁটলে ঝিরিপথ পাবেন । চাইলে বড়তাকিয়া থেকে ঝিরি পর্যন্ত  সি.এন.জি নিয়ে আসা যাবে । ভাড়া পড়বে ৭০-৮০ টাকা । এখান থেকে শুরু হবে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল ট্র্যাকিং । প্রয়োজনে সেখান থেকে সাথে গাইডও নেয়া যাবে । তবে ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা যেহেতু একটিই আর প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা এ রাস্তায় যাতায়াত করেন সেহেতু পথ হারিয়ে ফেলার ভয় নেই ।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা পাবেন বহূল আকাঙখিত খৈয়াছড়া ঝর্ণার ।

সুপ্তধারা ঝর্ণা সহস্রধারা ঝর্ণাঃ 

রূপবতী ঝর্ণাধারা তার মোহিনী রূপ দিয়ে যুগে যুগে মানব হৃদয়ে পাগলহারা ঢেউয়ের দোলা তুলে বয়ে গেছে অবিরত । কলকল সুরের মূর্ছনায় আত্মহারা করেছে হৃদয় । বর্ষাকাল ঝর্ণা প্রেমীদের জন্য আদর্শ সময় । ঝর্ণাগুলোও এইসময় পূর্ণ রূপ আর যৌবন নিয়ে হাজির হয় সবার সামনে । এইসময় নিবিড় সজীবতা ধারণ করে প্রকৃতি । চির সবুজ গাছপালা ঘেরা পাহাড় হতে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়া জল আশ্চর্য ভাব জাগায় মনে । বর্ষা ব্যতীত বছরের অন্যান্য সময় প্রায় শুষ্ক থাকে সুপ্তধারা । কেবল বর্ষা ঋতুতেই এটি অম্লান বদনে হাজির হয় আর সবাইকে মুগ্ধ করে প্রাণচাঞ্চল্য রূপ দিয়ে ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় চন্দ্রনাথ রির্জাভ ফরেস্টের চিরসবুজ বনাঞ্চলের ইকোপার্কের পাশেই অবস্থিত অনন্য সুন্দর প্রাকৃতিক জলপ্রপাত সুপ্তধারা ঝর্ণা । সুপ্তধারা ঝর্ণার কাছেই সহস্রধারা ঝর্ণা নামে আরো একটি জলপ্রপাত রয়েছে । তাই ভরা বর্ষায় ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সীতাকুন্ডের ইকোপার্কটিতে ঢুঁ মারার জুড়ি নেই । 

ইকোপার্কের সিঁড়ি পথ বেয়ে নেমে খানিকটা ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে সুপ্তধারা এবং সহস্রধারা ঝর্ণার । সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে এই দুটি ঝর্ণাধারা বর্ষাকালে তার রূপের পেখম মেলে অবিরত কাছে ডাকে প্রকৃতি প্রেমীদের । বর্ষা মৌসুমে মোহনীয় রূপ নেয় সীতাকুণ্ডের সহস্র ধারা ও সুপ্ত ধারা নামের এ দুটি পাহাড়ি ঝর্ণা । বর্ষা মৌসুমে অবিরত ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে । তবে বর্ষাকাল ছাড়া বছরের বাকি সময় এই দুটি ঝর্ণায় পানি খুবই কম থাকে । তাই শুষ্ক মৌসুমে দূর থেকে দেখলে মনে হবে ঝর্ণায় কোন পানি নেই । তবে ঝর্ণার কাছে গেলে সামান্য কিছু পানির দেখা মিলে ।
আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে ওঠা,
আবার জঙ্গলাকীর্ণ লম্বা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা । কোথাও কোথাও আবার সিঁড়ি না থাকায় পাহাড়ি ঝর্ণা ধরে হেঁটে যাওয়া । এ যেন রোমাঞ্চপ্রিয়দের চরম আকাঙখিত স্থান । রোমাঞ্চ প্রিয় পর্যটকদের কাছে ঝর্ণা দু’টি এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে ।
বছরের অধিকাংশ সময় সুপ্তধারায় পানি কম থাকে বলে এটির নামকরণ করা হয়েছিলো সুপ্তধারা । তবে বর্ষা মৌসুমে এসে সুপ্ত ধারা আবার নবযৌবন ফিরে পায় । সুপ্তধারার একদম কাছেই সহস্রধারা ঝর্ণা । তাই চাইলে একইসাথে দুটি ঝর্ণার রূপ-মাধুর্যকে আলিঙ্গন করা যাবে ।


কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বাসে  সীতাকুন্ড বাস স্টপেজ থেকে ২ কিলোমিটার দূরে ফকিরহাট নামক জায়গায় নামতে হবে । ফকিরহাট থেকে সিএনজি করে যেতে পারবেন সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে ।
আবার চট্টগ্রাম শহর থেকেও সরাসরি ইকোপার্কে আসা যাবে । চট্টগ্রাম শহর থেকে সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার । চট্টগ্রাম শহরের মাদারবাড়ী ও কদমতলী বাস ষ্টেশন থেকে সীতাকুণ্ড যাবার লোকাল বাসগুলো পাওয়া যায় । 

ঢাকা থেকে ট্রেনেও আসা যাবে সীতাকুন্ড ইকোপার্কে । ঢাকা মেইল ট্রেনটি সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে থামে । ঢাকা থেকে রাত ১১ টায় যাত্রা শুরু করে পরদিন সকাল ৬ টা থেকে ৭ টার মধ্যে ট্রেনটি সীতাকুণ্ড স্টেশনে পৌঁছায় । 

 আন্তঃনগর ট্রেনে আসতে চাইলে নামতে হবে ফেনী স্টেশনে । কারণ আন্তঃনগর ট্রেন সীতাকুণ্ডে থামেনা । ফেনী স্টেশনে নেমে  ১০ থেকে ১৫ টাকা অটোরিক্সা ভাড়ায় মহিপাল বাসস্ট্যান্ড আসতে হবে । মহিপাল বাসস্ট্যান্ড হতে ৬০-৮০ টাকা ভাড়ায় লোকাল বাসে সীতাকুণ্ড যাওয়া যাবে । সেখানে নেমে রিক্সা করেই যাওয়া যাবে ইকোপার্কে। 

কোথায় থাকবেনঃ

মিরসরাই ও সীতাকুন্ড উভয় জায়গাতেই মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে । তবে শহরের তুলনায় এগুলোর সুযোগ সুবিধা অনেক কম । অধিক সুযোগ সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম শহরে থাকার জন্য হোটেল বেছে নেওয়াই উত্তম হবে । www.amarrom.com সবসময় আপনাদের সাথেই আছে হোটেল বুকিং এর ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে । তাই দেরী না করে এখনই আমাদের মাধ্যমে আপনার চাহিদা অনুযায়ী রুম বুকিং করে নিন ।

Hotel

নুহাশ পল্লী, কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের বাগানবিলাস ।

nuhash polli1

বাংলা কথা সাহিত্যের অনন্য রূপকার হুমায়ুন আহমেদ । হিমু, মিসির আলি ও শুভ্রের মতো চরিত্রের স্রষ্টা তিনি । কথার জাদুতে মুগ্ধ করে রাখতে জুড়ি ছিলোনা অনন্য সাধারণ এই কথাশিল্পীর । তার কারণে তরুনরা নতুন করে বৃষ্টির প্রেমে পড়তে শিখেছে । শিখেছে জোছনাকে আলিঙ্গন করতে । তার কথার জাদুতে তৈরি হয়েছে শত শত হিমু, শুভ্র আর মিসির আলী ।  

তার অবদান শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয় । বাংলা সাহিত্য ছাড়িয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যেও রেখে গেছেন অনন্য সাধারণ একটি উপকরণ । যার নাম তিনি রেখেছিলেন নুহাশ পল্লী । খেয়ালি এই কথার জাদুকর ঠিক তার কথামালার মতোই কল্পনার রঙে রাঙিয়েছেন অসম্ভব সুন্দর এই নন্দনকানন । 

নিজের কল্পনা দিয়ে যেমনটা তৈরি করতেন বিভিন্ন চরিত্র ঠিক যেন সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তার এই বাগানবিলাস ।  

কথার জাদুকর তার এই দৃষ্টিনন্দন বাগান বাড়িটি রাজধানীর অদূরে গাজিপুরে নির্মাণ করে গেছেন। বাগানে রয়েছে নানা ধরনের স্থাপনা । রয়েছে অসংখ্য ফলজ, বনজ গাছের ছড়াছড়ি । পাশাপাশি তিনি বানিয়েছেন ঔষধি গাছের সুবিশাল বাগান । কল্পনার যত মাধুর্য তার হৃদয়ে ছিল তার সবটা মিলিয়ে মনের মতো করেই এক স্বপ্নজগত তৈরি করে গেছেন প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ । তাইতো একটুখানি সময় পেলেই সবুজে ছাওয়া বাগান বাড়িটিতে বারবারই ছুটে গেছেন তিনি । এই নুহাশ পল্লীতেই তিনি  গড়ে তুলেছেন শুটিং স্পট, বিশাল আকৃতির দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো । একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটি ছিল তার শৈল্পিক চিন্তাধারার আরেক রূপ । শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো মনকাড়া বাংলোটির নাম দিয়েছেন ‘ভূত বিলাস’ । রয়েছে  রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষস আকৃতির মূর্তি । আরো রয়েছে অনন্য সাধারণ একটি সাদা পদ্মের পুকুর ও মন মাতানো সুইমিং পুল । 

বর্ণনাঃ
হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন একজন নিখাদ প্রকৃতিপ্রেমী । প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ভালবাসতেন তিনি । জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নুহাশ পল্লীতে হেঁটে বেড়িয়েছেন এবং একান্ত কিছু মুহূর্ত প্রকৃতির একদম কাছে থেকে অতিবাহিত করেছিলেন । 

নুহাশ পল্লীতে প্রবেশ করেই চোখে পড়বে বড় একটি চত্বর । উত্তর দক্ষিণে লম্বা পুরো জায়গাটা । বা পাশে গাছের নিচে গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা । ডান পাশে সুন্দর একটি জল ফোয়ারা ও সুইমিং পুল । পাশেই মা-ছেলের স্ট্যাচু ।

নুহাশ পল্লীর উত্তর প্রান্তে রয়েছে একটি বড় পুকুর  যেটির উপর নির্মিত হয়েছে চোখ জোড়ানো একটি কাঠের সেতু । কাঠের সেতু দিয়ে পুকুরের মাঝে কৃত্রিম দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা । হুমায়ুনের জীবদ্দশায় এই পুকুরের মাঝেই কৃত্রিম দ্বীপে একটি তাঁবু টানানো হত । সেখানে মাঝমাঝেই সময় কাটাতেন খেয়ালি হুমায়ুন । 

হুমায়ুন  ও তাঁর স্ত্রী শাওনের প্রথম কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা যায় । হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সেই কন্যার নাম দিয়েছিলেন লীলাবতি । এই পুকুরটির নামও কন্যা সন্তানের নামানুসারে রাখা হয়েছে লীলাবতি পুকুর । পুকুরের সামনে দাড়ালেই “দিঘী লীলাবতী” লেখা ফলকটি চোখে পড়ে । 

পুকুরের উত্তর পাড়ে রয়েছে মাঝারি সাইজের বটগাছ । দক্ষিণে একটি একতলা ছোট ঘর ।
হুমায়ুন আহমেদ বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই পুকুরের পাশেই ‘ভুতবিলাস’ নামে একটি বাংলো নির্মাণ করা হয় । জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর হুমায়ুন আহমেদ ভুত বিলাস বাংলোর উদ্বোধন করেছিলেন । তিনি ভাবতেন মধ্যরাতে ভুতবিলাসের বারান্দায় বসে থাকলে ভুতের সাথে সাক্ষাত হতে পারে । 

নুহাশপল্লীর সুইমিং পুলের পানি বড্ড বেশি নীলাভ । এই সুইমিং পুলেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং হুমায়ূন আহমেদ একসঙ্গে সাঁতার কেটেছিলেন । এখনো জলজ্যান্ত সেই উপজীব্য । সেখানে এখন কেবলই স্মৃতির ছোট্ট ঢেউ আছড়ে পড়ে পাড়ে । পাশেই রয়েছে  শুষ্ক কেয়া বন । 

হুমায়ুন আহমেদ ভালবাসতেন বৃষ্টি এবং ভরা পূর্ণিমার জোছনা । বৃষ্টি দেখার জন্য তিনি ‘বৃষ্টি বিলাস’ নামে একটি বাংলো নির্মাণ করেছিলেন ।  টিনশেডের বিশাল বারান্দাসহ ‘বৃষ্টিবিলাস’ বাংলো তৈরি করা হয়েছিল । এই বাংলোর বারান্দাতে বসেই হুমায়ূন আহমেদ রিনিঝিনি বৃষ্টিপড়া দেখতেন। এখান থেকে তিনি জোছনা দেখতেও পছন্দ করতেন ।

হুমায়ুন আহমেদ যাতে নির্বিঘ্নে জোছনার খেলা দেখতে পারেন এজন্য এখানকার সবুজ উঠান সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখা হত ।

স্থপতি আসাদুজ্জামান খানের তৈরি করা বেশকিছু ভাস্কর্য রয়েছে নুহাশ পল্লীতে। শিশুদের আনন্দ দিতে এখানে ভুত এবং ব্যাঙের আকারের বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে । রয়েছে ড্রাগন আকৃতির ভাস্কর । আরো আছে মৎস্যকন্যার মূর্তিসহ একটি পানির রিজার্ভার । এটির পাশেই অবস্থিত একটি রাক্ষসের মূর্তি । স্থাপনা গুকির মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে কনক্রিট দিয়ে তৈরি ডাইনোসারের মূর্তি । বাচ্ছাদের আনন্দ দিতে এসব মূর্তির জুড়ি নেই । ঢালুতে লাগানো বাচ্চাদের খেলনাগুলোতে অবশ্য জং ধরে আছে আগের মতো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় । 

এছাড়া এখানকার নান্দনিক ট্রি হাউজটি শিশুদের আনন্দের অন্যতম একটি উৎস ।
বৃক্ষপ্রেমি হুমায়ুন যখনই দেশ বিদেশে ভ্রমন করতেন তখনই বিভিন্ন রকমের গাছের চারা সংগ্রহ করতেন । একবার বৃক্ষমেলায় গাঁজার গাছ দেখে সেটা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন ।  কিন্তু দোকানী জানালো এটা শুধু প্রদর্শনীর জন্য, বিক্রি করা যাবেনা । অনেক চেষ্টার পরও কিনতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ন হলেও শেষে একজন প্রকাশকের মাধ্যমে একটি গাঁজার গাছ নিয়ে এসে এই নন্দন কাননে ঔষধি গাছের সাথে রোপন করেন । নুহাশ পল্লীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফল গাছ এবং ঔষধি গাছ রয়েছে । এছাড়া তিনি এখানে খেজুর গাছ এবং চা বাগান করেছেন । তার খেজুর গাছের ফল জীবদ্দশায় দেখে যেতে না পারলেও এখন অসংখ্য খেজুর ধরে প্রতি বছর ।  

এছাড়াও রয়েছে শালবন ও অর্কিডের বাগান ।
নুহাশপল্লীতে রয়েছে দাবা খেলার জন্য বিশেষ একটি ঘর । যেখানে হুমায়ূন অতিথিদের সাথে দাবা খেলতেন । রয়েছে নামাজ পড়ার জন্য সুন্দর পরিপাটি একটি  নামাজ ঘর ।
হুমায়ুন তার চলচ্চিত্র নির্মাণের স্টুডিও হিসাবেও এই বাগান বাড়িটি ব্যবহার করতেন । কাদামাটি ও টিন দিয়ে তৈরি করা শুটিং স্টুডিও এখনও জানান দেয় হুমায়ুনের স্মৃতি ।
এই বিশাল নন্দনকাননের স্রষ্টা ১৯ জুলাই ২০১২ সালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন । নিজের তৈরি বিশাল এই বাগান বাড়িতেই তিনি শায়িত আছেন শান্তির চিরনিদ্রায় । 

তার ভক্তরা নুহাশপল্লীতে ঢুকেই প্রথমেই খোঁজেন তার সমাধিস্থল । প্রবেশপথ দুয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বা পাশে শায়িত আছেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ । কথার জাদুকর হুমায়ুন আহমেদের সমাধিস্থলে গিয়ে মনে হবে এই চত্বরের প্রতিটি বালুকনায়, ঘাসে, জলে-স্থলে মিশে আছেন তিনি । এখানে যতটা অক্সিজেন আছে নিশ্বাস নেওয়ার সবটুকুতে মিশে আছেন ওই মানুষটি । তিনি হারিয়ে যান নি অমর হয়ে আছেন তার কর্মে ও রেখে যাওয়া স্মৃতিতে । 

ইতিহাসঃ 

নুহাশ পল্লী হুমায়ুনের বড় পুত্র নুহাশ হুমায়ুনের নামানুসারে রাখা । হুমায়ুন  এই নন্দনকাননটি গাজিপুরের পিরুজালি বা পিরোজ আলি গ্রামে নির্মাণ করেন । অভিনেতা ডাঃ ইজাজ এখানকার জমিটি কিনতে সহায়তা করেন হুমায়ুন আহমেদকে । ১৯৯৭ সালে ২২ বিঘা জমির উপর স্থাপিত নুহাশপল্লীর বর্তমান আয়তন প্রায় প্রায় ৪০ বিঘা । পিরুজালী গ্রামের বেশীরভাগ পথই ঘন শালবনে আচ্ছাদিত । আলো আধারিতে ঢেকে থাকা এমনই একটি পথে গাজীপুর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নুহাশপল্লীতে যেতে হবে । কথার জাদুকর হুমায়ুন আহমেদের জন্য নুহাশপল্লী ছিল একখন্ড স্বর্গ । টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করার পর তিনি তাঁর বেশীরভাগ অবসর সময় এখানেই কাটিয়েছেন ।


কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে গাজীপুরে আসার জন্য বিভিন্ন বাস পাওয়া যায় । ঢাকার আজিমপুর গুলিস্তানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে টঙ্গীর বাস পাওয়া যায় । 

এছাড়া সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন গাজিপুর ।
ট্রেনেও ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরে যাওয়া যাবে । 

ঢাকা থেকে যে মাধ্যমেই আসুন না কেন গাজীপুরের হোতাপুর বাস স্ট্যান্ডে আসতে হবে । ঢাকা থেকে হোতাপাড়া যেতে বাসে চড়ার স্থানভেদে ভাড়া লাগবে ৫০ থেকে ৮০ টাকা । হোতাপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে টেম্পো, রিকশা অথবা সিএনজিতে করে নুহাশ পল্লী যাওয়া যাবে । টেম্পোর ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা । রিকশা ভাড়া পড়বে ৫০ থেকে ৬০ টাকা । এবং সিএনজি ভাড়া পড়বে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা । ৩-৪ জন একটি সিএনজি তে যাওয়া যাবে । 

টিকেটঃ 

এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নুহাশ পল্লী সকল দর্শনার্থীদের জন্য সপ্তাহের ৭ দিনই ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে । ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য প্রবেশ ফি দরকার হয়না । ১২ বছরের উপরে জনপ্রতি ২০০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে ভিতরে আসতে হবে । তবে যারা শুধু হুমায়ূন আহমেদের কবর জিয়ারত করতে  আসেন তাদের জন্য কোন প্রবেশ ফি লাগেনা । কবর জিয়ারতের জন্য মূল গেটের বাইরে বাম দিক দিয়ে  আলাদা আরেকটি গেট আছে।  যে কেউ সেই গেট দিয়ে সমাধির ভএতরে ঢুকে কবর জিয়ারত করতে পারবেন ।
নুহাশপল্লী পিকনিকের জন্যও ভাড়া দেয়া হয় । প্রতিদিন পিকনিকের জন্য ১টি গ্রুপে সর্বোচ্চ ৩০০ জন আসতে পারবে । এবং সব কটি বাংলো ব্যবহার করতে পারবে ।  পিকনিকের জন্য সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া পড়বে ৬০ হাজার টাকা এবং অন্যদিন সরকারি ছুটি ব্যাতিত ৫০ হাজার টাকা । তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য দিনগুলোতে ভাড়ার পড়বে ৪০ হাজার টাকা।

খাওয়াঃ 

নুহাশ পল্লীতে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই । তবে পিকনিকের দল যদি বড় হয় তবে নুহাশ পল্লীর সাথে আগে থেকে যোগাযোগ করলে উনারা খাবারের ব্যবস্থা করে দিবেন ।

থাকাঃ 

নুহাশপল্লীতে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই । তবে চাইলে গাজিপুরে এসে থাকা যাবে । গাজীপুরে বেশ কয়েকটি ভাল মানের হোটেল রয়েছে । হোটেল বুকিং করতে আজই যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে ।

Travel

চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মহামায়া লেক

chandranath3

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবাসভূমি সীতাকুন্ড উপজেলা । পাহাড় আর সমতলের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এ জনপদটি শুধু হিন্দুদের বড় তীর্থস্থানই নয় বরঞ্চ ভ্রমণপিয়াসীদের অন্যতম গন্তব্যও বটে । চন্দ্রনাথ মন্দির এরকমই একটি তীর্থস্থান । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঠিক চূড়ায় এই মন্দিরের অবস্থান । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সবুজের রাজ্য আর সুবিশাল সমুদ্র অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডকে দিয়েছে অনন্য পুর্ণতা ।

আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়ার পর চূড়ায় উঠার পর রাজ্যের সব ভাললাগা ভর করে । পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সুবিশাল সমুদ্র হারিয়ে যাওয়ার ডাক দেয় পর্যটকদের । 

 পাহাড়টির অবস্থান সীতাকুণ্ড বাজার থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার পূর্বে । সীতাকুণ্ড বাজার থেকে পায়ে হেঁটে, রিক্সায় করে কিংবা অটোরিকশা দিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উঠার রাস্তার কাছে যাওয়া যায় । পায়ে হেঁ‌টে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গেলেই উপভোগটা বেশি করা যায় । পায়ে হেটে হেটে পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তায় চোখে পড়বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনা । অধিবাসীদের জীবন যাত্রার চিত্রটাও চাক্ষুষ করা যাবে । এছাড়াও পাহাড়ের একটু গভীরে গেলে চোখে পড়বে জুম চাষ । পাহাড়ের বুকে জুম চাষ সে এক অসাধারণ দৃশ্য । পাশাপাশি রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা ফুলের বাগান ।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে রয়েছে ছোট একটি ঝর্ণা । এই ঝর্ণার কাছ থেকে পাহাড়ে উঠার দুটি পথ রয়েছে । ডান দিকের পথটিতে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের চূড়া অবধি সিঁড়ি । বাম পাশের পথটি সম্পূর্নই পাহাড়ি । সাধারণত পাহাড়ি পথ দিয়ে উপরে উঠা তুলনামুলক সহজ এবং রোমাঞ্চকরও বটে । তবে নামার জন্য পাহাড়ি পথের চেয়ে সিঁড়ির পথ ধরে নামাটাই সহজ । 

 ১১৫২ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়টি হেঁটে উঠা পরিশ্রমের কাজ হলেও আশপাশের অসাধারণ দৃশ্যগুলো আপনাকে যোগাবে অলৌকিক শক্তি । প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এই পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্যও আপনাকে ক্লান্তি অনুভব করতে দিবেনা । বরং রোমাঞ্চের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সুখের অতলে ।  সাধারণত ১ ঘন্টা ৩০ মিনিটের মত সময় লাগে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে । তবে সময়টা নির্ভর করে একান্তই হাটার গতির উপর । ধীরে হাটলে আরো বেশি সময় লাগবে । দ্রুত হাটলে ১ ঘন্টায়ও চূড়ায় উঠা যাবে । বর্ষাকালে পাহাড়কে পরিপূর্ণ যৌবনা মনে হলেও পাহাড়ে উঠা বেশ বিপজ্জ্বনক । তাই তখন অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ ।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের একদম চূড়াতেই অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মাঝামাঝিতে এবং একদম চূড়ায় মন্দিরের পাশে রয়েছে ছোট ছোট টং দোকান । এই দোকানগুলোতে হালকা খাবার এবং পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায় ।

চন্দ্রনাথ মন্দিরের উৎসবঃ  

বাংলাদেশের সবথেকে প্রাচীন মন্দিরগুলোর একটি এই চন্দ্রনাথ মন্দির । পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরে বছরজুড়ে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হয় । উৎসব উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত সাধু-সন্ন্যাসী, পূজারী ও দর্শনার্থীদের আগমণ ঘটে । উৎসবের সময় এলাকাটি জনাকীর্ণ আকার ধারণ করে । সবথেকে বড় যে উৎসব এখানে উদযাপন করা হয় সেটা হচ্ছে শিবচতুর্দশী মেলা । চন্দ্রনাথ মন্দিরে প্রতিবছর শিবরাত্রি তথা শিবচতুর্দশিতে বিশেষ পূজা হয় । এই পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বিশাল মেলার । এটিই শিব চতুর্দশী মেলা নামে পরিচিত । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আশেপাশে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর  ফাল্গুন মাসে এই মেলার আয়োজন করে থাকে । মেলাটি দোলপূর্ণিমা পর্যন্ত স্থায়ী থাকে ।

কিভাবে যাবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ঃ

সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়ে বাস বা ট্রেনে করে আসা যাবে । ঢাকা থেকে সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও মহাখালি  থেকে চট্রগ্রাম গামী যে কোন বাসে করেই যেতে পারবেন সীতাকুন্ড । নন-এসি বাসের ভাড়া ৪২০- ৪৮০ টাকা। এসি বাসের  ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা।

ঢাকা থেকে ট্রেনে সীতাকুন্ডে দুইভাবে আসা যাবে । ঢাকা থেকে চট্রগ্রামগামী যে কোন আন্তঃনগর ট্রেনে এসে ফেনী স্টেশনে নামতে হবে । ফেনী স্টেশন থেকে রিক্সা বা অটো দিয়ে ফেনী মহিপাল বাস স্ট্যান্ড যেতে হবে । ভাড়া নিবে ১৫ থেকে ২০ টাকা । সেখান থেকে ৫০-৮০ টাকা ভাড়ায় লোকাল বাসে সীতাকুন্ড যেতে পারবেন । সীতাকুণ্ড থেকে সিএনজি বা রিক্সা করএ চলে যেতে পারবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ।

আবার ট্রেনে সরাসরি চট্টগ্রাম নেমেও যাওয়া যাবে সীতাকুণ্ড । চট্টগ্রামে রেলস্টেশন থেকে অটোরিক্সা রিজার্ভ নিয়ে সীতাকুণ্ডে আসতে ভাড়া লাগবে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা । লোকাল বাসে করেও যাওয়া যাবে সীতাকুণ্ড । সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম নগরীর অলংকার, এ কে খান মোড় অথবা কদমতলী যেতে হবে । লোকাল বাসে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে আগের রাস্তার মতোই  সিএনজি বা রিক্সা করে চলে যেতে পারবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উঠার প্রবেশমুখে ।

সীতাকুন্ড ইকোপার্কঃ 

বন্যপ্রানী ও জীব-বৈচিত্র যাদের টানে তাদের জন্য সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের জুড়ি নেই । 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত এই ইকোপার্কটু বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য । ১৯৯৮ সালে সীতাকুন্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয় । বন্যপ্রাণীর এই অভয়ারণ্যটি প্রায় ৮০০ হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই ইকোপার্কটি  দুটি অংশে বিভক্ত । ১,০০০ একর জায়গা নিয়ে অবস্থান বোটানিক্যাল  গার্ডেনের ও ৯৯৬ একর জায়গা জুড়ে ইকোপার্ক এলাকার অবস্থান । বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং পর্যটকদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই পার্কটিতে রয়েছে বিরল প্রজাতির সব গাছ গাছালি, হাজারো রকমের চোখ ধাধানো ফুলের গাছ ও নান ধরনের জীবজন্তু । 

উঁচুনিচু নির্জন পাহাড়, হরিণ, ভালুক, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, খরগোশ এবং হনুমানসহ নানা প্রজাতির পাখির কলরব, প্রাকৃতিক ঝর্ণা, চিরসবুজ বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ ইকোপার্কটি মন কাড়বে যে কারো ।
 সন্ধ্যার আকাশে সূর্য যখন গোধূলীর রক্তিম আভা তৈরি করে তখন ইকোপার্কে এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয় । দুই অংশে বিভক্ত ইকোপার্কের প্রধান ফটকের ভেতরের ডান পাশে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন ।  এখানেই রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা প্রচলিত ও বিলুপ্ত প্রজাতির ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ গাছড়া।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে একটি চমৎকার অর্কিড হাউস । দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০ ধরনের অর্কিড রয়েছে এখানে । রয়েছে দুর্লভ কালো গোলাপসহ প্রায় ৩৫ জাতের গোলাপ, পদ্ম, জবা, নাইট কুইন, স্থলপদ্ম, রঙ্গন, নাগবল্লী, রাধাচূঁড়া, কাঠ মালতী, কামিনী, বাগানবিলাস, অলকানন্দা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, ফনিকাসহ ১৫০ জাতের ফুল । এখানকার পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আর বন্যপ্রাণী । পার্কটিতে রয়েছে
মায়া হরিণ, বানর, হনুমান , শূকর ,
সজারু, মেছোবাঘ, ভালুক, বনরুই ও
বনমোরগ । এছাড়াও আছে দাড়াঁশ ,
গোখরা, কালন্তি, লাউ ডগাসহ নানা প্রজাতির সাপ ও জলজ প্রাণী ।

ইকো পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার ভেতরের ওয়াচ টাওয়ার । ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনেক দুর পযর্ন্ত সবুজের সমারোহ চাক্ষুষ করা যায় । এর আশপাশের এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের গাছ, বুনোফুল এবং গুল্মলতায় পরিপূর্ণ । পার্কটিতে রয়েছে আলাদা পিকনিক কর্নার । খাবার পানি, রেস্টহাউস এবং টয়লেটসহ পিকনিকের সব ব্যবস্থাই রয়েছে পার্কটিতে । 

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে । সীতাকুন্ড বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে মাত্র ২ কি. মি. দক্ষিণে ফকিরহাট নামক স্থান দিয়ে এ পার্কে প্রবেশ করতে হয় । 

মহামায়া লেকঃ 

চট্রগ্রাম সদর থেকে ৪৫ কিঃ মিঃ দুরে মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে  দেশের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম এ কৃত্রিম লেকটির অবস্থান । আশপাশের সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানির লেক । চারিদিকে পাহাড়কে ধারন করে অপরূপ সৌন্দর্য ছড়ায় এ লেকটি । ঠিকরে পড়া সৌন্দর্য্যে রয়েছে অপরুপ মায়া । তাইতো এই লেকের নাম হয়েছে মহামায়া লেক । অপার্থিব সৌন্দর্যের এই লেকটি দেখে চোখ জোড়াবে যে কারো ।
প্রায় ১১ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত স্বচ্ছ পানির লেকটি ছড়ায় অপরূপ মাধুর্য । এখানকার ঠান্ডা পানির ঝরনা, সবুজের সমারোহ আর নীলাকাশ যে অসীম মায়া ছড়ায় তা নিজ চোখে না দেখে কল্পনা করাও কঠিন ।
এই জলাধারের চারপাশে তাকালে মনে হয় সবুজের চাদর বিছিয়ে সুধা পানের আহবান জানাচ্ছে লেকটি ।
নৌকা দিয়ে ঘুরে লেকটির আসল রূপ অবলোকন করা যায় ।  ঘুরাঘুরির পাশাপাশি চাইলে বর্শি দিয়ে মাছ ধরাও যায় । এজন্য কোন পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই । শুধু সাথে করে একটি বর্শি আর টোপ নিয়ে আসলেই হবে ।
নীল স্বচ্ছ পানির এই কৃত্রিম হ্রদে নৌকা ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ হবে ৪০ টাকা । আর পুরো নৌকা রিজার্ভ করলে নৌকা ভেদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ।
লেকটির পাড়ে চাইলে পিকনিকও করা যাবে । পিকনিকের জন্য সবুজের সমারোহ আর স্বচ্ছ পানির এই লেকটি একটি আদর্শ জায়গা ।  পিকনিকের ফাকে খেলাধুলা করার মতোও জায়গা রয়েছে গাছের ফাকে ফাকে । 


 কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকার সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে আসে। এসব বাসে করে মিরসরাই বাসস্ট্যান্ডে  আসতে হবে । মিরসরাই বাস স্ট্যান্ড থেকে সিএনজি অটোরিক্সা দিয়ে ঠাকুরদিঘী বাজারে আসতে হবে । ঠাকুরদিঘী বাজারের পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে মহামায়ায় প্রবেশ করা যাবে । 

কোথায় থাকবেনঃ

থাকার জন্য মিরসরাই বা সীতাকুণ্ডে  মোটামুটি মানের হোটেল পাওয়া যাবে । খুব ভাল মানের হোটেল না থাকায় চট্টগ্রামের হোটেল গুলোতে থাকাই বেশি আরামদায়ক হবে । চট্টগ্রামে আপনার পছন্দের হোটেল থেকে বাছাই করে www.amarroom.com এর মাধ্যমে খুব সহজেই বুকিং করতে পারবেন ।

Travel

মহেশখালী, বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ !

moheshkhali1

শীত বসন্ত কিংবা বর্ষা, যেকোন ঋতুতেই ঘুরে বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে মহেশখালী দ্বীপ । পাহাড় আর সমুদ্রের মিশেলে গড়া এই দ্বীপ অপার সৌন্দর্য্য লালন করছে যুগের পর যুগ ধরে । বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর সৌন্দর্য্য দর্শন শুরু হয় বিশাল এক রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে । কক্সবাজার থেকে বড় বড় সাম্পানে ফেনাতুলা বিশাল বিশাল ঢেউয়ের বুক চিরে আসতে হয় এই দ্বীপে । বুকে কাপন ধরানো বিশাল বিশাল ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে সাম্পানের গায়ে তখনও বুক চিতিয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকে হার না মানা সাম্পান । ঢেউ এর সাথে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চলে দৈত্যাকৃতির কাঠের নৌকাটি । সাম্পান যখন মাঝপথে তখন আর খালি চোখে পাড় দেখা যায় না । মাঝ সাগরে ধ্বক করে ওঠে বুকের ভেতর । সে এক ভয়ানক সুন্দর রোমাঞ্চের অনুভূতি । 

নৌকা দ্বীপের কাছাকাছি আসার সাথেই চোখে পড়ে উপকূলীয় বনের শ্বাসমূল । শ্বাসমূল গুলো যেন জানান দেয় আপনি চলে এসেছেন আপনার কাঙ্ক্ষিত দ্বীপ মহেশখালী ।

মহেশখালীতে রয়েছে থরে থরে সাজানো ছোট বড় টিলা ও পাহাড় । কোন এক শিল্পী যেন তুলি দিয়ে খুব যত্ন করে সাজিয়েছেন তার ক্যানভাস । পাহাড় কেটে তৈরি করা রাস্তায় রোমাঞ্চের স্বাদ পাওয়া যাবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে । 

পাহাড়ি রাস্তাগুলোয় ভরদুপুরেও থাকে আবছা আলো । পাহাড়ময় অরণ্য ফুঁড়ে রোদ যেন তাতিয়ে উঠতে পারেনা । আলো ছায়ার অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় । টিলাময় সবুজ বন আর উপত্যকায় বিস্তৃত এই দ্বীপটি খুব সহজেই মন কাড়ে পর্যটকদের । কালের স্বাক্ষী আদিনাথ মন্দিরকে বুকে ধারণ করে আছে দ্বীপের সবচেয়ে বড় পাহাড় মৈনাক পর্বত । এ পর্বতের চূড়া থেকে প্রকৃতির মন মাতানো সব দৃশ্য দেখা যায় । পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িয়ে ফুরফুরে বাতাসের সাথে প্রাকৃতিক দৃশ্যের অবলোকন- এ যেন স্বর্গের কোন পরীর ডানায় ভর করে স্বর্গভ্রমণ ! মৈনাক পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে বিস্তৃত সাগর আর রাশিকৃত উপকূলীয় বন দেখতে দেখতে কতোটা সময় যে কেটে যায় তা একদমই টের পাওয়া যায়না ।

পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে মিষ্টি পানের বিশালাকার বরজ । পাহাড়ের গা ছোঁয়া লতানো গাছগুলো আক্ষরিক অর্থেই চোখ ধাধায় । 

মহেশখালী জেটিতে যাওয়ার রাস্তায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে আরেক বিস্ময় !  রাস্তার দু’ধারে রয়েছে চোখ জুড়িয়ে দেওয়া প্যারাবনের সবুজের সমারোহ । সবুজের আচ্ছাদনে সূর্য্যের উঁকিঝুঁকির সাথে শত শত ডানা ঝাপটানো পাখি তৈরি করে বিশাল এক মায়া। 

অবস্থানঃ 

মহেশখালী দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড় দ্বীপ । এটি কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা । কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপটির আয়তন ৩৮৯ বর্গকিলোমিটার । মহেশখালী দ্বীপটি সোনাদিয়া দ্বীপ, মাতারবাড়ী দ্বীপ ও ধলঘাটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত । ১৯৮৩ সালে মহেশখালী থানা থেকে উপজেলা পদমর্যাদা পাওয়া এ দ্বীপটির রয়েছে ১টি পৌরসভা এবং ৮টি ইউনিয়ন । 

দ্বীপের নামকরণঃ 

মহেশখালী নামকরণের দুটি কিংবদন্তি রয়েছে । একটি কিংবদন্তি হচ্ছে, বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর দ্বারা প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল মহেশখালী । 

আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, মহেশখালীর তৎকালীন এক প্রভাবশালী বাসিন্দা ছিলেন নূর মোহাম্মদ শিকদার । তিনি একদিন পাহাড়ে শিকার করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন তার হারিয়ে যাওয়া গাভীটি পাহাড়ের মধ্যে একটি সুন্দর শিলাখন্ডে বাট থেকে দুধ ঢালছে । তিনি শিলা খন্ডটিসহ তার গাভী নিয়ে বাড়ি আসেন । সেদিন রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখতে পান যে, শিলা খন্ডটি একটি দেব বিগ্রহ । 

এ বিগ্রহ যে জায়গা থেকে নিয়ে এসেছেন সে জায়গায় রেখে তার উপর একটি শিব মন্দির নির্মাণ করতে হবে । নাহলে তার অমঙ্গল হবে । এরপরই তিনি সেখানে শিব মন্দিরটি নির্মাণ করেন । শিবের ১০৮টি নামের মধ্যে আদিনাথ ও মহেশ অন্যতম । আদিনাথ নামে সেই মন্দির স্থাপিত হয় ও নাম রাখা হয় আদিনাথ মন্দির । এবং এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় মহেশখালী। 

দ্বীপের ইতিহাসঃ

মহেশখালী এক সময় কক্সবাজারের সাথে যুক্ত ছিল । প্রায় ৪০০ বছর আগে প্রচন্ড ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূখন্ড থেকে পৃথক হয়ে জন্ম হয় এই দ্বীপের । মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই দ্বীপে কোন সুশৃঙ্খল জাতির আবাস ছিলোনা । তবে ধারণা করা হয় পর্তুগিজ জলদস্যুরা এই দ্বীপটি ব্যবহার করতো । ব্রিটিশ শাসনামলে এই দ্বীপটি বন্দোবস্তি প্রথার মাধ্যমে মালিক হন রবার্ট ওয়ারলেজ নামক একজন ইংরেজ । ওয়ারলেজ পরবর্তীতে ইংরেজ কালেক্টর চার্লস ক্রাফটসের নিকট মালিকানা বিক্রি করে দেন । চার্লস ক্রাফটস যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে স্থানীয় দেওয়ান কালিচরণ কানুনগোর কাছে বিক্রি করে দেন দ্বীপটির মালিকানা । নিঃসন্তান কালিচরণের মৃত্যুর পর মহেশখালীর মালিক হন তার স্ত্রী প্রভাবতী । প্রভাবতীর বৃদ্ধ অবস্থায় পালকপুত্র চন্ডিচরণের মৃত্যু হয় । ফলে প্রভাবতীর পরে মহেশখালীর মালিক হন চন্ডিচরণের পুত্র শরৎচন্দ্র । শরৎচন্দ্র ছিলেন মহেশখালীর একজন প্রজাবৎসল জমিদার । তিনি তার প্রজাদের পানীয় জলের অভাব মোচনের জন্য বিশাল একটি দিঘী খনন করেন । যার একটি অংশ এখনও বিদ্যমান । দেশ বিভাগের পর জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত অজিত কুমার রায় বাহাদুর চৌধুরী মহেশখালী দ্বীপের জমিদার ছিলেন । 

আদিনাথ মন্দিরের লোক কাহিনীতে নূর মোহাম্মদ শিকদারের উল্লেখ পাওয়া যায় । গোরক্ষ বিজয়ে ফয়জুল্লাহ, সুকুর মুহাম্মদ প্রভৃতি মুসলমানের নামও পাওয়া যায় । এতে করেই বুঝা যায় যে, আদিনাথ মন্দির ছিল হিন্দু-মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক সেতুবন্ধন । বর্তমানে এই মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে বৌদ্ধদের একটি রাখাইন বৌদ্ধ বিহার ও মুসলমানদের একটি মসজিদ । এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অপরুপ বহিঃপ্রকাশ ।  

কি কি দেখবেনঃ 

পুরো দ্বীপটিই একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান । এর প্রতিটি কোণে কোণে জড়িয়ে রয়েছে বহুকালের ইতিহাস, রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য্য । যে কয়েকটি জায়গা পর্যটকদের সবথেকে বেশি আকৃষ্ট করে সেগুলো হলো মৈনাক পর্বতে অবস্থিত আদিনাথ মন্দির, আদিনাথ জেটি ও রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির । 

মৈনাক পর্বত আদিনাথ মন্দিরঃ

কালের স্বাক্ষী এই মৈনাক পর্বত । যার বুক চিরে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো আদিনাথ মন্দির । আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান মৈনাক পাহাড়ে হওয়ায় এই পাহাড়ের আরেক নাম আদিনাথ পাহাড় । সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ৩০০ ফুট উচুতে আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান । ইতিহাসবিদদের মতে,  মন্দিরটির অবকাঠামো ষোড়শ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল । মৈনাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত রয়েছে পাকা সিঁড়ি । সিঁড়ির বাম পাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠেছে তাঁতের কাপড়ের দোকান । স্থানীয় তাঁতে বোনা কাপড়ের দোকানগুলোর বিক্রেতা প্রায় সবাই রাখাইন মহিলা ও তরুণী । দোকানে দোকানে শোভা পাচ্ছে বাহারি ডিজাইনের বিভিন্ন রঙের শাড়ী । এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন আসবাবপত্র ও হাতে বুনা বিভিন্ন ধরনের ক্রাফটস ।

চূড়ার একপাশে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে গেছে সংকীর্ণ ট্রেইল । রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের জন্য এই ট্রেইলটি অনবদ্য এক উপঢৌকন ।

পাহাড়ের ঠিক মধ্যখানে আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান । দর্শনার্থীদের বসার জন্য ভেতরে রয়েছে পাকা মেঝের এক পাশে দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চ । দেয়ালের অন্য পাশে পাহাড়ের খাদ নেমে গেছে নিচে । এর একটু সামনে এগিয়ে গেলেই মূল মন্দির আর শিবমূর্তি । প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে মন্দিরকে কেন্দ্র করে বসে আদিনাথ মেলা । মেলা চলে টানা ১৩ দিন ধরে । তখন দেশ-বিদেশ থেকে পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের ঢল নামে মন্দর প্রাঙ্গণে ।

 আদিনাথ জেটিঃ 

মৈনাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু হয়ে মহেশখালী চ্যানেলে গিয়ে থেমেছে পাকা আদিনাথ জেটি । সামুদ্রিক লাল কাঁকড়া আর উভচর মাডস্কিপারের খেলা দেখতে হলে জেটির রাস্তা ধরে এগুতে হবে সামনের দিকে । জেটির পুরো পথটাই গিয়েছে উপকূলীয় প্যারাবনের ওপর দিয়ে । মহেশখালী ডক পর্যন্ত চলে গেছে জেটির সরু পথ । মহেশখালীর এই প্যারাবনের মোট আয়তন প্রায় ১৭ হাজার একর । প্যারাবনজুড়ে রয়েছে বাইন গাছসহ বিভিন্ন গাছ-গাছালি ও শ্বাসমূল । 

বড় রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির
মহেশখালীতে অন্যতম আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো ঐতিহাসিক রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির । শতাব্দীর অন্যতম পুরানো রাখাইন সম্প্রদায়ের এই মন্দির দেখার জন্য মহেশখালীতে পর্যটকদের ঢল নামে । মূল বৌদ্ধ মন্দিরটি আনুমানিক প্রায় ২৮০ বৎসর পূর্বে নির্মিত হয় । তবে বিভিন্ন পর্যায়ে এর সংস্কার সাধনের পর বর্তমান অবস্থায় রয়েছে । এর কারুকাজ দেখলে যে কারো চোখ ধাধিয়ে যাবে । সৌন্দর্য্যমন্ডিত এই মন্দিরটি রাখাইন পাড়ার বৌদ্ধদের মিলনস্থল ।  

স্থানীয়দের জীবিকাঃ 

এই দ্বীপের বাসিন্দারা প্রায় সবাই কৃষিজীবি অথবা মৎস্যজীবি । পান, লবণ, শুটকি, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং মুক্তা চাষ করেই বেশিরভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে । দ্বীপটি লবণ ও পান ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র । মহেশখালীর মিষ্টি পানের সুনাম সারাদেশজুড়ে রয়েছে। পান চাষ এখানকার ঐতিহ্যবাহী পেশা । এছাড়া এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ বালি ।

কীভাবে যাবেন :

মহেশখালিতে স্থলপথ ও নদীপথ দুদিকেই যাওয়া যায় । 

স্থলপথে মহেশখালী যেতে চাইলে প্রথমে আসতে হবে চট্টগ্রাম । তারপর চট্টগ্রামের চকোরিয়া হয়ে আসতে হবে বদরখালী । বদরখালি থেকে আসতে হবে গোরকঘাটা । এই রুটে চট্টগ্রাম থেকে মহেশখালী আসতে জনপ্রতি খরচ পড়বে ১৫০ টাকা এবং সময় লাগবে দেড় থেকে দুই ঘন্টা । 

নদীপথে যেতে চাইলে প্রথমে আসতে হবে কক্সবাজারে । তারপর মহেশখালী যাওয়ার ৬নং ঘাটে যেতে হবে । তারপর সেখান থেকে ট্রলার, স্পীড বোট অথবা সাম্পানে করে  আসবেন মহেশখালী । ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা । মহেশখালি এসে সবকিছু ঘুরে দেখার জন্য রিক্সা অথবা ইজিবাইক রিজার্ভ করে নিতে পারেন । 

কোথায় থাকবেনঃ

মহেশখালীতে থাকার তেমন কোন সুব্যবস্থা নেই । কোন হোটেল বা রিসোর্ট এখনও গড়ে ওঠেনি । তাই থাকার জন্য কক্সবাজারে ফিরে আসতে হবে । কক্সবাজারে অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্টের মধ্য থেকে আপনার পছন্দের সবথেকে সেরা রিসোর্টটি খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন । নিরাপদ ও ঝামেলাহীন ভ্রমণে www.amarroom.com সবসময় আছে আপনার পাশে । 

Travel

খাগড়াছড়ি, ঐশ্বর্য্যময় সৌন্দর্য্যের অহঙ্কার !

khagrachori3

ঐশ্বর্য্যময় সৌন্দর্য্যের অহঙ্কার খাগড়াছড়ি জেলা । ঝর্ণা ও পাহাড়ের অসম্ভব সুন্দর মিশেলের এই পাহাড়ি জেলা । অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির এক অনবদ্য রূপ নিয়ে গড়ে ওঠেছে  খাগড়াছড়ি । এখানকার প্রকৃতিতে গাঢ় সবুজ পাহাড়, ঝিরঝির শব্দের ঝর্ণা, ওপরে সুনীল আকাশ, পাহড়ের মাঝে মাঝে শুভ্র মেঘ, সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে এক জন্ম দিয়েছে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের । খাগড়াছড়ির প্রবেশ পথেই চোখে পড়বে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র । আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র বাংলাদেশের একটি অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন স্পট । এরকম জায়গা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই । এই পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে গা ছমছম করা একটি সুড়ঙ্গ । সুড়ঙ্গপথ দিয়ে নিচে নামতে নামতে গায়ের লোম দাড়িয়ে যায় । মনে হয় নিঃশব্দ অচিন কোন রাজ্যতে হারিয়ে যাচ্ছেন যেখানে আর কেউ থাকেনা । রোমাঞ্চকর এই জায়গাতে ক্ষণে ক্ষণে রোমাঞ্চিত হতে হবে । শুধু এই পর্যটন কেন্দ্রই নয় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান যেখানে গেলে পাওয়া যাবে শত বর্ষের সজীবতা । শহরের ধুলাময় জীবন থেকে একমুঠো শান্তির পরশ খোঁজে পেতে পার্বত্য খাগড়াছড়ির জুড়ি নেই । এক চিলতে রোদের ফাঁকে সবুজের সমারোহ মনে আঁকে শান্তির ছায়া । পাহাড় আর মেঘের মিতালী দেখতে দেখতে হারিয়ে যাবেন অদ্ভুত শান্তির রাজ্যে । সকল কোলাহল আর ব্যস্ততা ভূলিয়ে প্রকৃতি দিবে সুশীতল শান্তির পরশ । চরম পুলকে ভরে উঠবে মন । স্নিগ্ধ বিকেলের পাহাড়ি ফুরফুরে বাতাস রাঙিয়ে দিবে যে কারো মন । অসহিষ্ণু মনকেও দিবে শীতল এক অনুভূতি । মায়াবি পরিবেশে পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয়ও পাবে অপরূপ পূর্ণতা । 

খাগড়াছড়ির অবস্থানঃ 

চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন পাহাড়ি এই জেলাটি দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত । ৫ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার এ জেলার আয়তন ১০৪২ বর্গমাইল । এর নামকরণেরও রয়েছে সুন্দর একটি গল্প। খাগড়াছড়ি একটি নদীর নাম ছিল । নদীর পাড়ে ছিল খাগড়ার বিশাল বন । পরবর্তীতে সেই বিশাল বন কেটে পরিষ্কার করে জনবসতি গড়ে উঠে । তখন থেকেই এটি খাগড়াছড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে । 

দর্শনীয় স্থানসমূহঃ

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে দর্শনীয় স্থানের ছড়াছড়ি । পাহাড় ও ঝর্ণার অপূর্ব মিশেল এই অঞ্চলের । এই পর্বে রয়েছে পাহাড়ি দর্শনীয় স্থানগুলির বর্ণনা ।
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রঃ
বাংলাদেশের সবথেকে ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন কেন্দ্র হল আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র । মূল শহর হতে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে এর অবস্থান । আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার ও প্রাকৃতিক রহস্যে ঘেরা রোমাঞ্চকর একটি গুহা । রয়েছে ৩ হাজার ফুট উচ্চতা সম্পন্ন আলুটিলা পাহাড় । পাহাড়ের পাশেই অবস্থান আলুটিলার গুহার । স্থানীয়রা এই গুহাকে ডাকেন “মাতাই হাকড়” বা দেবতার গুহা । তাদের বিশ্বাস এই গুহায় কোন এক সময় দেবতার আবাস ছিল । 

এই গুহাটির তলদেশে  প্রবাহমান ঝর্ণা রয়েছে । এই ঝর্ণার জন্যই গুহাটিকে রহস্যময় গুহা ডাকা হয় । 

শীতল ও অন্ধকার এই গুহাটিতে প্রবেশকালে একমাত্র আলোর উৎস সাথে নেয়া আগুনের মশাল । গুহার সুড়ঙ্গপথ অনেক পিচ্ছিল তাই খুব সাবধানে পা ফেলে যেতে হয় । একটু এদিক সেদিক হলেই দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে । টানেলের মতো দেখতে গুহাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ ফুট । গুহাটির উচ্চতা কিছু জায়গায় অনেক কম থাকার ফলে হামাগুড়ি দিয়েও যেতে হবে । রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের জন্য এটি বরং বেশি আনন্দের । ২৬৬টি সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে অসাধারণ রোমাঞ্চের স্বাক্ষী হয়ে থাকবেন আজীবন । 

পর্যটন কেন্দ্রের ওয়াচ টাওয়ার অপেক্ষা করছে আরেক বিষ্ময় নিয়ে । এখান থেকেই পুরো অঞ্চলের সব থেকে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায় । ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় খাগড়াছড়ি শহর, আকাশ আর পাহাড়ের সৌন্দর্য্য । এই সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হবেনা এমন কঠিন হৃদয় নেই কারো। ওয়াচ টাওয়ার থেকে খাগড়াছড়িকে মনে হবে এক টুকরো দার্জিলিং । মনে হবে প্রকৃতির সকল রূপসুধা যেন চোখের সামনেই ধরা দিয়েছে । 

কিভাবে যাবেনঃ 

খাগড়াছড়ি সদর থেকে বাস, চান্দের গাড়ি অথবা অটোরিকশা করে আসা যাবে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে । ২০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে আলুটিলায় প্রবেশ করে মশাল কিনে নিতে হবে । অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য সাথে টর্চ লাইট থাকলে ভাল হবে । গুহার পাথুরে সিড়ি গুলো অনেক পিচ্ছিল তাই পা পিছলে যায় এরকম জুতা পরিহার করাই বাঞ্চনীয় ।  

রিসাং ঝর্ণাঃ 

পাহাড়ি খাগড়াছড়ির অন্যন্য রূপকে আরো অধিক সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে রিছাং ঝর্ণা । খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা গ্রামে অবস্থিত এই পাহাড়ি ঝর্ণাটি প্রকৃতির অনন্য এক শৈলী । খাগড়াছড়ি শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ঝর্ণার উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট ।  

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই ঝর্ণার কলধ্বণি শুনতে পাওয়া যায় । নিজস্ব পরিবহন নিয়ে  অনায়াসেই চলে যাওয়া যায় একেবারে ঝর্ণার পাদদেশে । সামান্য পায়ে হাঁটা পথ যাত্রার আকর্ষণকে বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ । উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষে পায়ে হেঁটে যেতে যেতে যে কারো দৃষ্টি আটকে যাবে পাহাড়ী সবুজের পরতে পরতে । এখানকার পুরোটা পরিবেশই পাথুরে । পাহাড়ের প্রায় ১০০ ফুট উপর হতে ঝর্নার পানি নিচে পড়ছে । নিচে পড়ার পর তা আবার আরও ১০০ ফুট পাথরের ওপর গড়িয়ে নেমে আসে সমতলে । পানির গতিপথ ঢালু হওয়ায় প্রাকৃতিক ওয়াটার স্লাইডিং এর সৃষ্টি হয়েছে, যা এই ঝর্ণার প্রধান আর্কষণ । এই বৈশিষ্ট্য একে অনন্য এক স্বকীয় রূপ দিয়েছে যা কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায় ।

কিভাবে যাবেনঃ

জেলা শহর হতে হেরিংবোন রাস্তায় জীপ, প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস করে ঝর্ণায়  যাতায়াত করা যায় । জেলা সদর থেকে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র পেরিয়ে সামান্য পশ্চিমে মূল রাস্তা থেকে উত্তরে ঝর্ণার দূরত্ব সাকুল্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার ।


শান্তিপুর অরণ্য কুটিরঃ 

বিশাল অরণ্যের মাঝে এক কুটির । নাম শান্তিপুর অরণ্য কুটির । খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই শান্তিপুর অরণ্য কুটির । ৬৫ একর অরণ্যবেষ্টিত ভূমিতে এই কুটিরের অবস্থান । বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে ধ্যান করার জন্য কুটিরটি ব্যবহার করতেন । এটি মূলত একটি বৌদ্ধ মন্দির । এই মন্দিরে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ও বাংলাদেশের সবথেকে বড় বুদ্ধ মূর্তি । ১৯৯৯ সালে নির্মিত হয়েছিল বুদ্ধের এই মুর্তিটি । ৫০ ফুট উচ্চতার মূর্তিটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ৪ বছর । কুঠিরের সামনে রয়েছে সুবিশাল মাঠ । কুঠিরটি বিভিন্ন গাছ গাছালিতে আচ্ছাদিত রয়েছে । এর মধ্যে রয়েছে আগর, মেহগনি, রাবার, তেজপাতাসহ অসংখ্য বনজ গাছ গাছালি । 

প্রতিবছর এই মন্দিরে বৌদ্ধ পুর্নিমা পালন করা হয় । তখন পুন্যার্থীদের ঢল নামে শান্তিপুর অরণ্য কুটিরে । সব থেকে বেশি মানুষের সমাগম ঘটে চিবর দান উৎসবে । প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেয় এই উৎসবে । 


কিভাবে যাবেনঃ 

খাগড়াছড়ি থেকে পানছড়ির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার । লোকাল বাস,সিএনজি অথবা মোটর সাইকেল যোগে পানছড়িতে আসতে হবে । পানছড়ি থেকে জীপ অথবা কার দিয়ে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শান্তিপুর আসতে হবে । সেখানেই রয়েছে শান্তিপুর অরণ্য কুটির । 

নিউজিল্যান্ড পাড়াঃ

বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ড ! তাও কি সম্ভব?  অসম্ভবের মতো শুনালেও অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য খাগড়াছড়ি সদরের একটি পাড়াকে নিউজিল্যান্ড পাড়া ডাকা হয় । খাগড়াছড়ি সদর থেকে নিউজিল্যান্ড পাড়ার দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার । পানখাইয়া পাড়া থেকে বেরিয়ে পেরাছড়া গ্রামের দিকে যাওয়ার রাস্তাটাই হলো সেই নিউজিল্যান্ড সড়ক ।

সড়কের দুই পাশে দিগন্ত জোড়া সবুজ ক্ষেত খামার পর্যটকদের মনে অন্য রকম দোলা দেয় । বিস্তৃত সবুজ শস্যক্ষেত আর দূরের পাহাড়ের সারির মিতালি সৃষ্টি করেছে নান্দনিক এক সৌন্দর্য্য । নৈসর্গিক এ সৌন্দর্যের কারণে দিনে দিনে নিউজিল্যান্ড পাড়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে । অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির এক অনবদ্য উপহার এই নিউজিল্যান্ড পাড়া । যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ শস্য ক্ষেত্র, দূরের দৃষ্টি সীমানায় আছে সারি সারি উঁচু পাহাড় । পাহাড়ের চূড়া যেন লেগে আছে ঠিক আকাশের সীমানায় । আকাশ, পাহাড়, মেঘ আর সবুজের সমারোহ তৈরি করে নৈসর্গিক এক রুপকথার রাজ্য । যে রাজ্যে হারিয়ে যেতে নেই কোন মানা, নেই কোন বারণ । সেই মায়াবি রাজ্যে হারিয়ে যেতে যেতে মনে হবে, আহা ! জীবন কত সুন্দর । চারপাশের এই সবুজ স্নিগ্ধ রূপ দেখে বিমোহিত হবেনা এমন মানুষ এ পৃথিবীতে পাওয়া যাবেনা । 

কিভাবে যাবেনঃ

খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশা যোগে মাত্র ১০ মিনিটেই চলে যাওয়া যাবে নিউজিল্যান্ড পাড়ায় । 

হাতিমাথা বা হাতিমুড়াঃ

সামনে বিশাল পাহাড় । পাহাড় বেয়ে উঠে গেছে আঁকাবাঁকা সিড়ি । ৩০৮টি সিড়ি ডিঙ্গিয়ে যেতে হবে পাহাড়ের ওপাশের গ্রামে । হ্যা, এরকমই রোমাঞ্চকর জায়গা খাগড়াছড়ির পেনাছড়া ইউনিয়ন । এই ইউনিয়নে পৌঁছানো আরেক কষ্টের কাজ । মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় ঘন্টা ছোট ছোট টিলার ওপর দিয়ে ট্র‍্যাকিং করে তারপর আসতে হয় পেনাছড়া । 

চাকমা ভাষায় হাতিমাথা রাস্তাকে ডাকা হয় এদি সিরে মোন । এই রাস্তাটি স্বর্গের সিড়ি বলেও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত । দুর্গম এই পাহাড় ডিঙ্গিয়ে পেনাছড়ার ১৫টি গ্রামের বাসিন্দারা প্রতিদিন যাতায়াত করেন । 

কিভাবে যাবেনঃ

দুর্গম এই সিড়ি দিয়ে ওঠার স্বাদ আস্বাদন করতে হলে প্রায় দেড় ঘন্টার লম্বা রাস্তা ট্র‍্যাকিং করে পাড়ি দিতে হবে । খাগড়াছড়ি সদর থেকে পানছড়ির লোকাল বাসে উঠতে হবে । তারপর জামতলী যাত্রী ছাউনির পাশে নামতে হবে । তারপর চেঙ্গি নদী পার হয়ে দেড় ঘন্টার ট্র‍্যাকিং শেষে পাওয়া যাবে বহু আকাঙখিত হাতিমাথা । 


হার্টিকালচার পার্কঃ 

খাগড়াছড়ি জেলার জিরোমাইলে অবস্থিত হার্টিকালচার পার্ক । অসাধারণ মনোরম পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে এই পার্কটি । হার্টিকালচার পার্কে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর একটি ঝুলন্ত ব্রিজ । রয়েছে শহরের ভিউ দেখার জন্য সুউচ্চ একটি ওয়াচ টাওয়ার । পার্কটিতে আরো রয়েছে মনোমুগ্ধকর একটি সুইমিংপুল ।

কিভাবে যাবেনঃ

খাগড়াছড়ি সদর বাজার হতে অটোরিক্সা অথবা রিক্সাযোগে অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যাবে হার্টিকালচার পার্কে । অটোরিক্সায় জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ১০ টাকা । পার্কের প্রবেশ মূল্য মাত্র ২০ টাকা ।

ভাষা উৎসবঃ
সরকারি ভাষা হিসেবে এখানে  বাংলা ভাষা প্রচলিত । স্থানীয় বাঙালিরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে । এছাড়াও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে । চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ইত্যাদি প্রচলিত ভাষা রয়েছে ।

ভাষার পাশাপাশি এসব নৃগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা উৎসব রয়েছে । চাকমাদের উৎসবের নাম বিঝু উৎসব, মারমাদের সাংগ্রাই উৎসব এবং ত্রিপুরাদের বৈসাবী উৎসব ।

কি খাবেনঃ

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় খাবার রয়েছে । এই সব গুলোই পাওয়া যাবে ঐতিহ্যবাহী সিস্টেম রেস্তোরায় । এই রেস্টুরেন্টটি পানখাই পাড়ায় অবস্থিত । 

কোথায় থাকবেনঃ 

খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে । সব থেকে ভাল মানের হোটেল হচ্ছে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল । এখানে এসি বা নন এসি রুম পাওয়া যায় । রুম ভাড়াও খুবই সীমিত । পর্যটন মোটেল ছাড়াও রয়েছে হোটেল ইকো ছড়ি ইন, হোটেল শৈল সুবর্ন, হোটেল জেরিন, হোটেল লবিয়ত, হোটেল শিল্পী ইত্যাদি । আপনার পছন্দমতো যেকোন হোটেলই বুকিং করতে যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে । নিরবচ্ছিন্ন সেবায় আমরা সবসময় আছি আপনাদের পাশে ।

Travel

দিনাজপুর, উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জেলা !

dinajpur1

করতোয়া ও ইছামতি নদী তীরে গড়ে ওঠা দিনাজপুর বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা । দিনাজপুরের ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ । ১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জেলা । সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে ভরপুর এই জেলাটিতে রয়েছে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন দর্শনীয় স্থান ।

আত্রাই, কাকড়া, ঢেপা, দীপা নদীসহ জেলাটিতে রয়েছে ২৩টিরও বেশি নদী । 

রংপুর বিভাগের অধীনে থাকা দিনাজপুর জেলা লিচু ও ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত । এছাড়া এখানে গম ও ভুট্টাসহ নানা ধরনের ফসলাদি চাষ করা হয় । এখানকার শতকরা প্রায় ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষ কৃষির সাথে জড়িত । ইতিহাস ঐতিহ্যের বর্ণালী এই জেলায় রয়েছে নজরকাড়া অসংখ্য স্থান । যেসব স্থানগুলোকে এক পলক দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে ছোটে যান পর্যটকেরা । এখানে প্রাকৃতিক নান্দনিক স্থানের পাশাপাশি রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক বহু নিদর্শন । 

নামকরণঃ

দিনাজপুর জেলার ইতিহাস বেশ

সুপ্রাচীন । জেলাটি ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । জনশ্রুতি মতে, জনৈক দিনাজ অথবা দিনরাজ নামক রাজা দিনাজপুর রাজপরিবার প্রতিষ্ঠা করেন । রাজার নামানুসারেই এখানকার মৌজার নাম হয় “দিনাজপুর” । পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার মৌজা থেকে নতুন জেলা গঠন করে এবং সে মৌজার নামানুসারে ও রাজার সম্মানে জেলার নামকরণ করে “দিনাজপুর” জেলা ।

ইতিহাসঃ

দিনাজপুর প্রাচীন আমলে পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ ছিল । লক্ষ্ণৌতির রাজধানী দেবকোটের অবস্থান ছিল দিনাজপুর হতে ১১ মাইল দক্ষিণ দিকে ।
দেওয়ানি গ্রহণের ফলে ১৭৬৫ সাল দিনাজপুর জেলা ব্রিটিশ শাসকদের অধিভুক্ত হয় । ১৭৭২ সালে এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের অরাজকতা বৃদ্ধি পেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একজন ইংরেজ কালেক্টর নিয়োগ দেয় । তারপর ১৭৮৬ সালে লক্ষ্ণৌতি, পানজারা, বাজিন্নাতাবাদ, তেজপুর, ঘোড়াঘাট, বারবকাবাদ ও বাজুহা, এই ছয়টি এলাকা নিয়ে দিনাজপুর (তখনকার ঘোড়াঘাট) জেলা গঠন করা হয় ।
১৮০০ সালের দিকে জেলাটির একটি বিশাল অংশ রাজশাহী, রংপুর ও পূর্ণিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয় । ১৮৩৩ সালে আবার বেশ কিছু এলাকা বগুড়া ও মালদার আওতায় নিয়ে যাওয়া হয় । ১৮৭০ সালে আরো কিছু এলাকা মালদা ও বগুড়া জেলার অধীনে স্থানান্তর করা হয় । ১৮৫৬ সালে দিনাজপুরকে পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় । বাংলার প্রথম দিককার ৪০টি পৌরসভার মধ্যে দিনাজপুর পৌরসভা অন্যতম ।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ে দিনাজপুরের একটি বড় অংশ চলে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আওতায় । যেটার নাম রাখা হয় পশ্চিম দিনাজপুর । বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৮৪ সালে দিনাজপুরের দুটি মহকুমা ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়কে আলাদা জেলায় ভাগ করে দেয়া হয় । 

দর্শনীয় স্থানসমূহঃ

দিনাজপুর জেলায় রয়েছে ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা মেটানোর অসংখ্য উপকরণ । প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি ও জমিদার বাড়িসহ প্রত্নতাত্ত্বিক বহু নিদর্শন । 

১৮ ও ১৯ শতকে নির্মিত বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে দিনাজপুরে । তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – উইলিয়াম কেরী নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল, দিনাজপুর জিলা স্কুল, দিনাজপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও জুবিলি হাইস্কুল । 

রামসাগর দিঘীঃ

রামসাগর দিঘী বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন সমূহের মধ্যে অন্যতম একটি স্থান । দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৮ কিঃমিঃ সোজা দক্ষিনে তেজপুর গ্রামে অবস্থিত রামসাগর দিঘী । এটির পাড় বাদে শুধু জলভাগের আয়তন ৬০ একর । তবে চারিদিকের টিলাকৃতির পাড়সহ এটির আয়তন প্রায় ১৩০ একর । দিঘীর সব থেকে আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে ১৫০ ফুট দীর্ঘ বেলেপাথরে বাধাই করা ঘাট । রামসাগরের গভীরতা গড়ে প্রায় ৩০ ফুট । এই দীঘির জল কোন মৌসুমেই শুকায় না । 

রাজা রামনাথ ১৭৫০-১৭৫৫ খ্রীষ্টাব্দে খরার কারণে দুর্ভিক্ষে পীড়িত লোকদের কর্মসংস্থান ও পানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য দীঘিটি খনন করেন । রাজা রামনাথের নামানুসারে দিঘীর নাম রামসাগর দিঘী বলে পরিচিত লাভ করে । 

দিঘীর পাড় বর্তমানে অসংখ্য গাছপালায় সুসজ্জিত করা । সুবিশাল জলরাশির সাথে সবুজ বৃক্ষরাজি এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করে । পর্যটকরা ইতিহাসের স্বাক্ষী এই দিঘীর পাড়ে বসে মনকে রাঙান অসীম আনন্দে ।  

ঐতিহাসিক রামসাগর দীঘিটি বর্তমানে পর্যটন বিভাগ তত্ত্বাবধান করে । তারা রামসাগর দীঘির সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে যাচ্ছেন অক্লান্তভাবে । পর্যটকদের সুবিধার জন্য নির্মান করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত একটি মনোরম রেস্ট হাউজ ।

রামসাগর দিঘীকে কেন্দ্র করে পর্যটন বিভাগ সেখানে গড়ে তোলেছে জাতীয় উদ্যান ।  এছাড়া পর্যটকদের মনোরঞ্জন করতে গড়ে  তোলা হয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা । যেখানে  বানর, হরিণ সহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে । শিশুদের বিনোদনের জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে একটি আকর্ষনীয় শিশুপার্ক । রয়েছে বনভোজনের ব্যবস্থা । বনভোজনের নির্বিঘ্নতা নিশ্চিত করতে রামসাগরে রয়েছে ৭ টি বনভোজন কর্নার । এছাড়া ২০১০ সালের রামসাগরে  ব্যক্তিগত উদ্যোগে রামসাগর গ্রন্থাগার নামে একটি লাইব্রেরি তৈরি করা হয়েছে । চাইলেই যে কেউ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এখানকার যেকোন বই পড়তে পারবেন । 

স্বপ্নপুরি পার্কঃ 

স্বপ্নের মতো করে সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে স্বপনপুরি বিনোদন পার্ক । এটি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জে অবস্থিত । প্রায় ৪০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা পার্কটিতে বেড়াতে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ঢল নামে । দিনাজপুর শহর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরের এই পার্কটিতে রয়েছে চিত্তবিনোদনের বিভিন্ন উপাদান ।
এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে নান্দনিক কৃত্রিম লেক ও বিশাল উদ্যান । উদ্যানে রয়েছে বিচিত্র গাছগাছালি এবং দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান । এর অভ্যন্তরে রয়েছে ছোট বড় একাধিক পাহাড় । 

এছাড়া এখানে রয়েছে শিশুদের জন্য আলাদা শিশুপার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানা । রয়েছে শালবন, ঘোড়ার রথ, হংসরাজ সাম্পান, খেলামঞ্চ, বিভিন্ন ভাস্কর্যসহ অসংখ্য নজরকাড়া চিত্তাকর্ষক উপাদান ।
বনভোজন করার জন্য স্বপ্নপুরী একটি আদর্শ জায়গা । এখানে বনভোজনের জন্য রয়েছে আলাদা পিকনিক স্পট । 

রাত্রি যাপনের জন্যেও বিশাল এই পার্কের ভিতরে রয়েছে সুব্যবস্থা । এখানে থাকার জন্য রয়েছে ৫টি নান্দনিক কটেজ । এগুলোর নামও বেশ সুন্দর । সন্ধ্যাতারা, নীলপরী, নিশিপদ্ম, রজনীগন্ধা মেঠোঘর এবং ভিআইপি কুঞ্জ । দিনাজপুর শহর থেকে এখানে যেতে হলে প্রথমে বাসে করে যেতে হবে ফুলবাড়ি । ফুলবাড়ি থেকে সিএনজি যোগে যাওয়া যাবে স্বপ্নপুরি পার্কে । 

নয়াবাদ মসজিদঃ

ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত নয়াবাদ মসজিদটি কালের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ । ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দিনাজপুর শহর হতে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামে অবস্থিত । ১৭৯৩ সালে নির্মিত এই মসজিদটি ১.১৫ বিঘা জমির উপর তৈরি করা হয়েছে । 

মসজিদটি সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্ব কালে তৈরি করা হয়েছিল । তখন এখানকার জমিদার ছিলেন দিনাজপুর রাজ পরিবারের সর্বশেষ বংশধর রাজা বৈদ্যনাথ । ইতিহাসবিদদের মতে, কান্তজির মন্দির তৈরির সময় বিভিন্ন জায়গা হতে আগত মুসলমান স্থপতি ও কর্মীরা ধর্মীয় উপাসনার জন্য এই মসজিদটি নির্মান করেন । তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোনে চারটি অষ্টভুজ মিনার রয়েছে । উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে রয়েছে একটি করে জানালা । পশ্চিম পাশের দেয়ালে মোট তিনটি মিম্বর রয়েছে যেগুলি মসজিদের প্রবেশ দরজা বরাবর তৈরি করা । মসজিদটি তৈরির সময় যে সকল পোড়ামাটির কারুকাজ ছিল তার অধিকাশংই নষ্ট হয়ে গেছে । অসংখ্য টেরাকোটার মধ্যে বর্তমানে মাত্র শ’খানেক টেরাকোটা বিদ্যমান । মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি কবর ।  জনশ্রুতি আছে, মসজিদ নির্মানকালে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে তাকে সেখানেই দাফন করা হয় । 

দিনাজপুর রাজবাড়িঃ

দিনাজপুর রাজবাড়ি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি স্থাপনা । দিনাজপুর জেলার রাজারামপুর গ্রামের সন্নিকটে এই রাজবাড়িটি অবস্থিত । স্থানটি “রাজ বাটিকা” নামেও পরিচিত ।
দিনাজপুর রাজবাড়ি স্থাপন করেন দিনাজপুরের স্থপতি রাজা দিনাজ ।  তবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে ইলিয়াস শাহীর শাসনামলে রাজা গণেশ এই বাড়িটি নির্মান করেন । 

দিনাজপুর শহর থেকে সিএনজি যোগে যাওয়া যাবে দিনাজপুর রাজবাড়ী । 

ঘুঘুডাঙা জমিদার বাড়িঃ 

ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি জমিদার ফুল মোহাম্মদ চৌধুরী নির্মিত একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি ।
পূর্নভবা নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে এ জমিদার বাড়ির অবস্থান । ঘুঘুডাঙা  দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার  দক্ষিণে কোতয়ালী থানার আউলিয়াপুর ইউনিয়নে অবস্থিত । 

এ জমিদার বাড়িতে উল্লেখযোগ্য যেসব জিনিসপত্র ছিল তার মধ্যে রয়েছে সোনার চেয়ার, ১০১ ভরি ওজনের সোনার কৃত্রিম কইমাছ, রূপার বাটযুক্ত সুদর্শন ছাতা, রূপার বাট নির্মিত একটি বিরাট হাত পাখা, রৌপ্য নির্মিত ৪টি লাঠি, এছাড়া বড় বড় ভোজ সভার রান্নার জন্য ১৩-১৪টি বিরাট তামার ডেকচি । তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করার অপরাধে পাকিস্তানি বাহিনী ঘুঘুডাঙা জমিদার বাড়িটি ধ্বংস করে দেয় ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে । 

জাদুঘরঃ

দিনাজপুর জাদুঘর বাংলাদেশের প্রত্নতাত্বিক সম্পদের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা । এটি
দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়া এলাকায় অবস্থিত । বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাচীন নিদর্শনের সংগ্রহশালাটি দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসেন অসংখ্য মানুষ ।
এই জাদুঘর নির্মানের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ।
সীতাকোট বিহার আবিষ্কারের পর পুরো উত্তরবঙ্গ চষে বেড়িয়ে যেসকল প্রত্নসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন তা দিয়ে শুরু করলেন একটি জাদুঘর নির্মানের প্রক্রিয়া । অবশেষে ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে স্থানীয় কয়েকজন সম্মানিত ব্যাক্তিদের সহায়তায় তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন দিনাজপুর জাদুঘর । নিজের সংগৃহীত দুষ্প্রাপ্য মূর্তি, মুদ্রা, শিলালিপিসহ সব প্রত্নসামগ্রী জাদুঘরে দান করে উজ্জ্বল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন । তার দেখাদেখি অনেকেই নিজেদের সংগ্রহে থাকা প্রত্নসম্পদ দান করে জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেন । ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে জাদুঘরটিতে প্রায় ৮০০ প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন ছিলো ।

বর্তমানে বেশ সমৃদ্ধ এই জাদুঘরটি দ্বিতল ভবনে উন্নিত করা হয়েছে ।  

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিঃ
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছাড়াও দিনাজপুরে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের ছড়াছড়ি । বাংলাদেশে আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাখনির মধ্যে তিনটিরই অবস্থান দিনাজপুরে । তবে বর্তমানে শুধু বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে । প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০০ টন কয়লা উত্তোলন করা হয় এই খনি থেকে । বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদিত কয়লা ব্যবহার করে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় । সাম্প্রতিক কালে দিনাজপুরের হাকিমপুরে বাংলাদেশের একমাত্র লৌহ খনি আবিষ্কৃত হয়েছে । খনিটিতে লোহার পাশাপাশি ক্রোমিয়াম ও নিকেলেরও উপস্থিতি রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞ দল । এমনকি খনিটিতে স্বর্ণও পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা । 

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সড়কপথ কিংবা রেলপথে করে দিনাজপুর যাওয়া যায় । ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলি ছেড়ে যায় । বাস সার্ভিসের মধ্যে রয়েছে নাবিল পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, এস এ পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ,কেয়া পরিবহন ।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর দ্রুতযান এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ।

সিংড়া জাতীয় উদ্যানঃ

সিংড়া জাতীয় উদ্যান দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল । স্থানীয়ভাবে এটি সিংড়া শালবন নামে পরিচিত । দিনাজপুর জেলা শহর থেকে সড়ক পথে ৪০ কিঃমিঃ উত্তরে এবং বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে ১০ কিঃমিঃ দূরে ভোগনগর ইউনিয়নে এর অবস্থান । এই বনভূমির মোট আয়তন ৩৫৫ হেক্টর এবং এর মধ্যে সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের পরিমাণ ৩০৫.৬৯ হেক্টর । ডালাগ্রাম, চাউলিয়া, সিংড়া ও নর্তনদী এ ৪টি মৌজায় সিংড়া জাতীয় উদ্যান বিস্তৃত । সিংড়া জাতীয় উদ্যানের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে নর্ত নদী । 

সিংড়া জাতীয় উদ্যানে মূলত পত্রঝরা শালবৃক্ষের প্রাধান্য দেখা যায় । তবে শাল ছাড়াও এখানে রয়েছে জারুল, তরুল, শিলকড়ই, শিমুল, মিনজিরি, সেগুন, গামার, আকাশমনি, ঘোড়ানিম, সোনালু, গুটিজাম, হরতকি, বয়রা, আমলকি এবং বিভিন্ন ধরনের নাম না জানা উদ্ভিদ ও লতা-গুল্ম ।

এক সময়ে এই বনে বাঘ, নীল গাইসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্য জীবজন্তুর আবাস ছিল । তবে বনভূমি ধ্বংস ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এ বনভূমি থেকে জীবজন্তু হারিয়ে যেতে থাকে । বর্তমানে এই বনে খরগোশ, শেয়াল, সাপ ও বেজি সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গের দেখা পাওয়া যায় ।

দেশী শুমচা, হাঁড়িচাচা, ব্রঞ্জ ফিঙ্গে, নীল গলা বসন্ত বৌরি, বড় তিত, খুরুলে পেঁচা, মেঘ হও মাছরাঙা, ইউরেশীও-কণ্ঠী ঘুঘু , তিলা ঘুঘু, বাংলা কাঠ-ঠোকরা, বেনে বউ, বুলবুলি, টুনটুনি, লম্বা লেজ রাতচরা ইত্যাদি পাখি বর্তমানে দেখা যায় । 

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সড়কপথ কিংবা রেলপথে করে দিনাজপুর যাওয়া যায় । ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলি ছেড়ে যায় । বাস সার্ভিসের মধ্যে রয়েছে নাবিল পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, এস এ পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ,কেয়া পরিবহন ।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর দ্রুতযান এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ।

কোথায় থাকবেনঃ  দিনাজপুর শহরে বেশ কিছু ভাল মানের হোটেলে রয়েছে । পর্যটন মোটেল, হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল রেহানা, হোটেল নবীন, ইত্যাদি হোটেলগুলোতে থাকার জন্য ভাল সুযোগ সুবিধা রয়েছে । ভ্রমণে ঝামেলা এড়াতে আগে থেকেই হোটেল রুম বুকিং দিয়ে রাখুন । খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে আপনার পছন্দ মতো যেকোন হোটেল বুকিং দিতে পারবেন । 

Travel

সুনামগঞ্জ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বিশাল সমাহার !

sunamganj

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বিশাল সমাহার নিয়ে সেজে আছে দেশের উত্তর পূর্বে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলা । যুগে যুগে এখানে জন্ম হয়েছে কবি, গায়ক ও সাধকদের । তাদের গুণের কারণেই সুনামগঞ্জ পূর্ণতা পেয়েছে তার নামকরণের স্বার্থকতা । শুধু গুণীজনদের কারণেই নয়, বিধাতা সুনামগঞ্জকে দুহাত ভরে দিয়েছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য । 

অসংখ্য অগণিত প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষদের জন্য ঠায় দাড়িয়ে আছে ভাটি অঞ্চলের এই জেলাটি । সুনামগঞ্জ জেলার স্থানে স্থানে যেন শৈল্পিক কারুকাজের অপার সৌন্দর্য্য বিদ্যমান । বিধাতা নিজ হাতে সাজিয়েছেন অপরূপ সৌন্দর্য্যের এই লীলাভূমিকে । মন মাতানো রূপে পর্যটকদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুনামগঞ্জ জেলা । 

মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত টাংগুয়ার হাওরে তৈরি হয় মায়া ছড়ানো রূপ । হাওরের বিশাল জলরাশি ক্ষনিকের জন্য ভুলিয়ে দেয় শত বছরের ক্লান্তি । নয়নাভিরাম প্রকৃতির দান যাদুকাটা নদী ও বারেক টিলা । বারেক টিলায় দাড়িয়ে যাদুকাটা নদী দেখতে দেখতে পাওয়া যাবে নৈসর্গিক সজীবতা ।  এর রূপ ও মহিমা বলে শেষ করা যাবেনা । বারেক টিলার অদূরেই রয়েছে শিমুল বাগান । মানবসৃষ্ট এই শিমুল বাগানের সৌন্দর্য্য মোহিত করে রাখে পর্যটকদের । শিমুল গাছের বাগান যে মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছে তার উপমা দেয়া ভার। ফাল্গুনে গাছে গাছে ফুটে আগুন লাল শিমুল । দেখে মনে হয় গাছের ডালে ডালে আগুন লেগে আছে । শীতকালে ফুল না থাকলেও সবুজের যে সমারোহ থাকে তা দেখে চোখ জোড়ায় । সবুজের সমারোহ তৈরি করে স্বর্গীয় এক পরিবেশ । শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশই নয়, এখানে রয়েছে স্মৃতি বিজড়িত লাউড় রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ । যা ইতিহাসকে চোখের সামনে অবলোকন করার সুযোগ দিবে । 

কি কি রয়েছে সুনামগঞ্জেঃ 

সুনামগঞ্জে যেরকম মোহনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য রয়েছে তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক স্থান । এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গা গুলো হলো- 

. টাংগুয়ার হাওরঃ 

পর্যটনে যখন সুনামগঞ্জ নাম আসে তখন চোখের সামনেই যে চিত্র ভাসে সেটা হলো টাংগুয়ার হাওর । টাংগুয়ার হাওরে নৌকা নিয়ে ঘুরে পাওয়া যাবে অনাবিল আনন্দ । নৌকায় হাওরের মাঝখানে রাত্রিযাপন দিবে অসাধারণ রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা । টাংগুয়ার হাওরে সিলেটের রাতারগুলের মতো রয়েছে জলার বন । আয়তনে ছোট হলেও এ সৌন্দর্য্য কোন অংশেই কম নয় । জলার বনেই পাশে রয়েছে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার । এখান থেকেই পাওয়া যাবে টাংগুয়ার হাওরের আসল সৌন্দর্য্য অবলোকনের সুযোগ । হাওরের জলরাশি পাড়ি দিতে দিতে মেঘালয়ের পাহাড়সারি দিবে অনাবিল আনন্দ । আকাশ, পাহাড় আর হাওর যেনো মিলে একাকার হয়ে গিয়েছে । হাওরের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে টেকেরঘাটে পানির রঙ হয়ে যায় স্বচ্ছ ও নীল । 

. জাদুকাটা নদীঃ 

নামের সাথে এর সৌন্দর্য্যের রয়েছে অসম্ভব মিল । নদীটির দিকে তাকালে অসম্ভব মায়া আর জাদুর টান তৈরি হয় । যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানির ধারা, নীল আকাশের প্রতিবিম্ব আর সবুজ পাহাড়ের অপূর্ব ক্যানভাস মোহিত করবে যে কাউকে । 

. বারেক টিলাঃ 

জাদুকাটা নদীর অপারে অবস্থিত বারেক টিলা । টিলার রুপ মাধুর্য এক কথায় অতুলনীয় । টিলার উপর থেকে জাদুকাটা নদীর দিকে তাকালে মনে হবে স্বর্গের কোন জলধারা বয়ে চলছে । বারেক টিলা বা বারিক্কা টিলা সুনামগঞ্জের অসাধারণ একটি দর্শনীয় জায়গা । টিলার চূড়া থেকে আশপাশের চোখ ধাধানো দৃশ্যগুলো দেখে শিহরণ উঠবে মনে । 

. শিমুল বাগানঃ 

এক দিকে মেঘালয়ের পর্বতমালা অন্য দিকে রূপবতী যাদুকাটা নদী । নদীর তীরেই রয়েছে তিন হাজার শিমুল গাছের বিশাল এক বাগান । বিশাল গাছের লম্বা সারি মনে প্রশান্তি আনার জন্য যথেষ্টই বটে । ফাল্গুন মাসে রক্তিম শিমুল ফুল গাছে গাছে ছেয়ে থাকে ।  বছরের এই একটি মাসেই শিমুলের রক্তলাল সৌন্দর্য দেখা যায় । এছাড়াও শীতকালের সবুজের সমারোহ একদমই নিরাশ করবেনা । 

. শহীদ সিরাজ লেক বা নীলাদ্রিঃ 

বাংলার কাশ্মীর হিসেবে খ্যাত শহীদ সিরাজ লেক বা নীলাদ্রি শিমুল বাগান থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । চমৎকার নীল পানি, ছোট বড় টিলা আর পাহাড়ের সমন্বযয়ে গড়ে ওঠা নীলাদ্রি কোন অংশেই কাশ্মীর থেকে কম নয় । চোখে না দেখলে এই লেকের অপার্থিব সৌন্দর্য্য কল্পনাও করা যাবেনা । প্রকৃতির মায়াবি এই কন্যার নীল পানি মুগ্ধ করে দেয় পর্যটকদের । 

. লাকমা ছড়াঃ 

নীলাদ্রির পাশেই অবস্থান এই ছড়ার । লাকমা    ছড়ার উৎপত্তিস্থল ভারতের মেঘালয়ে । ছড়ার উপরের দিকে বিজিবি উঠতে দেয়না । তাই ছড়ার নিচের দিক থেকে সৌন্দর্য্য অবলোকন করে সন্তুষ্ট থাকতে হবে । 

. শনির হাওরঃ

তাহিরপুর উপজেলার আরেকটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হচ্ছে শনির হাওর । বর্ষায় এক পশলা বৃষ্টি হলেই সমুদ্রের রুপ ধারন করে হাওরটি । ছোট ছোট ডেউগুলি মারাত্মক হয়ে ওঠে বর্ষায় । আর সে কারণেই এই হাওরের নামের স্বার্থকতা পাওয়া যায় । শনির হাওরের ছলছল পানির শব্দ নূপুরের নিক্কণের চেয়েও মধুর । অপরূপ সৌন্দর্য্য নিয়ে দিগন্তজুড়ে ছেয়ে আছে রাশি রাশি জল ।

ডলুরা সমাধীসৌধঃ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বীর সন্তানদের সমাধিসৌধ রয়েছে সুনামগঞ্জের ডলুরায় । সীমান্তঘেষা এই সৌধ দেখতে নবীনগর থেকে খেয়া পার হয়ে হালুয়াঘাট হতে রিক্সা বা টেম্পুযোগে আসা যাবে ।

সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরঃ 

সুনামগঞ্জ সদরেই অবস্থিত সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘর । পুরাতন কোর্টের সামনেই এর অবস্থান । বাস স্ট্যান্ড থেকে পায়ে হেটেই চলে আসা যাবে এখানে । এখানে যানা যাবে সুনামগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য । 

হাছন রাজার বাড়ি মিউজিয়ামঃ

 সুনামগঞ্জে রয়েছে মরমী কবি হাছন রাজার স্মৃতি বিজড়িত জমিদার বাড়ী । যে জায়গায়টায় থেকে তিনি লিখিছেন শত শত ভূবন ভুলানো গান ও কবিতা ।

শাহ আব্দুল করিমের বাড়িঃ 

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় । দিরাই উপজেলা হতে কয়েক কিলোমিটার দূরেই শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি অবস্থিত । শুষ্ক মৌসুমে গাড়ি করে আসা যায়। আর বর্ষায় আসতে হয় নৌকায় । দিরাই উপজেলা থেকে রিক্সা ভাড়া ৫০ টাকা, সি এন জি ভাড়া ২০ টাকা ও মোটর বাইক ভাড়া ৫০ টাকা । বর্ষায় নৌকা ভাড়া মাত্র ২০ টাকা ।  

ট্যুর প্ল্যানঃ

ব্যস্ততার ভীড়ে মায়াবী সুনামগঞ্জের পরিপূর্ণ রূপকে কাছে থেকে অবলোকন করতে হলে অন্তত দুইদিনের দরকার । যারা দুইদিন সময় বের করতে পারবেন না তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই । একদিনের সুনামগঞ্জ ভ্রমণেও অনেকগুলো স্পট ঘিরে আসা সম্ভব । এক দিন ও দুইদিনের জন্য আলাদা আলাদা ট্যুর প্ল্যান দিয়ে দেয়া হলো । 

দুই দিনের ট্যুর প্ল্যানঃ 

ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি সুনামগঞ্জের বাসে ওঠে পড়তে হবে । শ্যামলী, ইউনিক, এস আলম, হানিফ ইত্যাদি বাস সরাসরি ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে আসে । নন এসি ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত । রাত ১০টার বাসে ওঠলে সকাল ৬টায়ই পৌঁছে যাবেন সুনামগঞ্জ । সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে নেমে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সের নিন । তারপর লেগুনা করে চলে যান তাহিরপুর বাজারে । জনপ্রতি ভাড়া নিবে ৮০ টাকা । বাজারে নেমে সরাসরি চলে যান নৌকার ঘাটে । সেখান থেকে দরদাম করে । নৌকা রিজার্ভ করে নিন একদিন এক রাতের জন্য । মাঝিকে দুপুরে ও রাতে খাবার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য বলবেন । তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসুন । মাঝিকে বাজার বুঝিয়ে দিয়ে ওঠে পড়ুন নৌকায় হাওর বিলাসের উদ্দেশ্যে । 

ওয়াচ টাওয়ার ও জলাবন ঘুরে দেখে দুপুরের মধ্যে চলে যান ট্যেকেরঘাটে । যখন দেখবেন হাওরের পানি নীল রূপ ধারণ করা শুরু করেছে তখনই বুঝে নিবেন আপনি টেকেরঘাটের আশেপাশে চলে এসেছেন । পুরো হাওরের মধ্যে শুধু টেকেরঘাট এলাকার পানি স্বচ্ছ ও নীল । টেকেরঘাটে নেমে বাইক রিজার্ভ করে একই সাথে ঘুরে আসতে পারবেন বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান । শিমুল বাগান, বারিক টিলা, জাদুকাটা নদীর জন্য বাইক ভাড়া নিবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা । একটি বাইকে চালক বাদেও বসতে পারবেন দুইজন । আপনারা স্পটগুলো ঘুরে অনাবিল আনন্দ নিতে থাকবেন আর মাঝি ততক্ষণে আপনাদের জন্য রান্নাবান্না করে নিবে । নৌকায় ফিরে এসে দুপুরের ভোজন পর্ব সেরে নিন । তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার চলে যান নীলাদ্রি লেক ও লাকমাছড়া দেখতে । এবারে আর বাইক রিজার্ভ করা লাগবেনা । টেকেরঘাট থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাটা রাস্তার দূরত্ব নীলাদ্রী লেক । লেকের স্বর্গীয় রুপ অবলোকন শেষে চলে যান লাকমাছড়ায় । নীলাদ্রি লেক থেকে হেটে সময় লাগবে সর্বোচ্ছ ২০ মিনিট । লাকমাছড়া বৃষ্টির মৌসুমে অনেকটা সিলেটের বিছানাকান্দির মতো রূপ ধারণ করে । লাকমছড়ার রূপ দর্শন শেষে সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসুন নৌকায় । তারপর বেরিয়ে পড়ুন হাওরের রাতের সৌন্দর্য দর্শনে। মাঝিকে বলে হাওরের মাঝখানে রাতের খাবারটা সেরে নিন । অদ্ভুদ এক পুলকে ভরে উঠবে মন । হাওরের মাঝখানে ভোজনের এরকম অভিজ্ঞতা মনে থাকবে সারাজীবন । তারপর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিন হাওরের মাঝখানে । সকালে ফিরে আসুন তাহিরপুরে  । তাহিরপুর থেকে আগের মতো লেগুনা করে আসতে হবে সুনামগঞ্জ সদরে । তারপর  নবীনগরে এসে সুরমা নদী খেয়া যোগে পার হয়ে হালুয়াঘাট চলে যান । হালুয়াঘাট থেকে রিক্সা অথবা টেম্পু যোগে ৫/৬ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি ডলুরা নামক স্থানে পৌঁছতে হয়। রিক্সাভাড়া নিবে ৫০ টাকা, টেম্পু ভাড়া ২০ টাকা । ডলুরা সমাধিসৌধ দেখে ফিরে আসুন সুনামগঞ্জ সদরে । সদর থেকে চলে যান সুনামগঞ্জ পুরাতন কোর্টে । সেখানেই রয়েছে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর । জাদুঘর ঘোরা শেষে হাসন রাজার স্মৃতি বিজড়িত জমিদার বাড়ীতে চলে যান । সুনামগঞ্জের ট্রাফিক পয়েন্ট এলাকা থেকে রিক্সায় যেতে সময় লাগবে ১০-১৫ মিনিট ।  সবগুলো স্পট ঘুরা শেষে রাতের বাসে সহজেই ঢাকা ফিরতে পারবেন । 

একদিনের ট্যুর প্ল্যানঃ 

একদিনের ট্যুর প্ল্যানে সুনামগঞ্জের অনেক দর্শনীয় জায়গাগুলোকে বাদ দিতে হবে । তবে সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর প্রায় সবকটিই একদিনে দেখা সম্ভব । ঢাকা হতে বাস যোগে সরাসরি চলে আসুন সুনামগঞ্জে । তারপর সেখান থেকে ১০ টাকা অটো ভাড়ায় চলে আসুন সুরমা ব্রিজ । সেখান থেকে বাইক রিজার্ভ করতে হবে পুরো দিনের জন্য । ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা ভাড়া পড়বে । ভাল করে দরদাম করে নিতে হবে এবং অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে কোন কোন জায়ায় যাবেন । একদিনে যাদুকাটা নদী, বারিক টিলা, শিমুল বাগান ও নিলাদ্রী লেক খুব স্বচ্ছন্দেই ঘুরে আসা যাবে । তবে হাতে সময় থাকলে নিলাদ্রী লেকের পাশেই লাকমা ছড়ায় যেতে পারেন । ঝামেলা এড়ানোর জন্য এইসব স্পটগুলিই ড্রাইভারকে প্রথমেই বলে রাখতে হবে । বলে রাখা ভাল একটি বাইকে চালক বাদে আরো দুজন বসা যাবে । 

সুনামগঞ্জ থেকে প্রথমে লাউড়ের গড় হয়ে যাদুকাটা নদীতে যেতে হবে । নদী পার হয়ে বারিক টিলার উপর থেকে যাদুকাটা নদীর রুপ দর্শন শেষে শিমুল বাগান যান । শিমুল বাগান ঘোরাঘুরির পর নীলাদ্রী লেক যান । সেখান থেকে হাতে সময় থাকলে লাকমাছড়ায় যেতে ভুলবেন না । সব জায়গা ভ্রমণ শেষে আবার আগের পথে সুনামগঞ্জ ফিরে আসুন । 

সুনামগঞ্জে থাকার ব্যবস্থাঃ 

সুনামগঞ্জে থাকার জন্য মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে । যারা নৌকায় রাত কাটাতে পারবেন না তারা এসব হোটেলে আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখতে পারবেন । বুকিং এর জন্য আজই যোগাযোগ করুন আমাদের ওয়েবসাইট www.amarroom.com এ ।  আপনার পছন্দের সেরা হোটেলের সেরা রুমটিই আপনার জন্য দেয়া হবে ।

Travel

প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল !

borishal

ধান নদী খাল, তিনে মিলে বরিশাল । বরিশাল নাম আসলেই চোখের সামনে ভাসে বড় বড় নদী ও ছোট ছোট খাল । প্রাচ্যের ভেনিস নামেই সমধিক পরিচিত বাংলাদেশের এই জেলাটি । বরিশাল মানেই কীর্তনখোলা নদী আর বড় বড় লঞ্চ ও স্টিমার । চোখ ধাধানো মন মাতানো সব দর্শনীয় স্থান বুকে নিয়ে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে আছে জেলাটি । হাজার বছরের ইতিহাস সাথে প্রাকৃতিক সাম্রাজ্য মিলে তৈরি হয়েছে বরিশাল । বরিশাল নামকরণের খুব সুন্দর একটি ইতিহাস রয়েছে । ব্রিটিশ শাসনামলে এখানের তৈরি লবণকে বলা হতো বরি সল্ট । সেই বরি সল্ট থেকে কালক্রমে নাম হয়ে ওঠে বরিশাল । এর নামকরণের ইতিহাস যত সুন্দর তার থেকেও সুন্দর তার রূপ । বরিশালের পথে যাত্রা দিয়েই শুরু হয় বরিশালের সৌন্দর্য্য সুধা পান । নদীর ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে ছোটে চলা লঞ্চে যে কল্পনাতীত ভাললাগার অনুভূতি তৈরি হয় তা কল্পনাকেও হার মানায় । নৈসর্গিক সৌন্দর্যের শহরের যাত্রা শুরু হয় অসম্ভব ভাল লাগা দিয়ে । এই শহরেই জন্মেছিলেন প্রেমের কবি জীবনানন্দ দাশ । সবুজ বেষ্টনী ঘেরা এই শহরেই বেড়ে ওঠেছিলেন জননেতা এ. কে. ফজলুল হক । এছাড়া বাংলার অসংখ্য কৃতি সন্তানের জন্মভূমি এ বরিশাল । প্রাচীন আমলে চন্দ্রদ্বীপ নামে পরিচিত এই শহরটিতে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারা বাজার । নিজ নিজ নৌকাতে করে পেয়ারা বাগান থেকে মাঝিরা পেয়ারা নিয়ে আসে বিক্রির জন্য । পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে এরকম বাজারের অস্তিত্ব থাকলেও আমাদের দেশে এই একটি মাত্র ভাসমান বাজার রয়েছে । 

বরিশালের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বরিশালে রয়ছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান ।সেগুলোর মধ্যে ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের প্রথম পছন্দগুলিকে দেয়া হল। 

কীর্তনখোলা নদীঃ 

কীর্তনখোলা বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত একটি নদী । কীর্তনখোলা নদীকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠেছে বরিশাল জেলা । এই নদীর কাছে বরিশালবাসীর হাজার বছরের ঋণ । কীর্তনখোলা নদী দিয়েই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বিভাগীয় এ শহরটি । কীর্তনখোলা নদীর উপরে বরিশাল নদী বন্দর অবস্থিত । এটি বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম নদী-বন্দর । নদীটির সূচনা হয়েছে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ এলাকা থেকে । নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার । নদীটি সবচেয়ে প্রশস্ত নলছিটি এলাকায় । এ জায়গায় নদীটির প্রস্থ প্রায় আধা কিলোমিটার । ব্রিটিশ শাসনামলে নদীটি আরো বেশি প্রমত্তা ছিলো । সেসময়ে এর প্রস্থ ছিলো ১ কিলোমিটারের মতো । গত শতাব্দী ধরে নদীটির প্রস্থ ও নাব্যতা কমে গেলেও এর সৌন্দর্য্য হারায়নি এক বিন্দুও । বরং কালে কালে এর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগণে ।

কড়াপুর মিয়া বাড়ি মসজিদঃ 

কড়াপুর মিয়া বাড়ি মসজিদ বরিশালের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন । মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি বরিশাল সদরের কড়াপুর এলাকায় অবস্থিত । দোতলাবিশিষ্ট বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই মসজিদে রয়েছে মোট ৯টি দরজা, ৩টি গম্বুজ ও ২০টি ছোট বড় মিনার ।
মোঘল স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদটি নির্মাণে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস । ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে তখনকার জমিদার হায়াত মাহমুদকে প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয় এবং তার জমিদারিও কেড়ে নেয়া হয় । সুদীর্ঘ ষোল বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি এই দোতলা মসজিদটি নির্মাণ করেন ।
মসজিদটি কাশিপুর চৌমাথা থেকে ৩.৫ কিলোমিটার দূরত্বে উত্তর কড়াপুরে অবস্থিত ।
দর্শনার্থীরা কাশিপুর থেকে সিএনজি অথবা  আলফা গাড়িতে করে মসজিদটিতে আসতে পারবেন ।

 
আবদুর রব সেরনিয়াবাদ সেতুঃ
মুক্তিযুদ্ধে নিহত বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব সেরনিয়াবাদের নামানুসারে এই সেতুর নামকরণ করা হয় । বরিশাল জেলার সবথেকে বড় সেতু এটি। সেতুটির উপর থেকে কীর্তনখোলার আসল রূপ ও সৌন্দর্য্য দর্শন করা যায় । বরিশাল জেলা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দক্ষিনে কর্ণকাঠি এলাকায় অবস্থিত এই সেতুটিতে সিএনজি যোগে আসা যাবে । 

দুর্গাসাগর দিঘীঃ 

চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যে ২০০ বছর শাসন করেছেন বিভিন্ন রাজারা । পুরো বরিশালজুড়ে তাদের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এরকমই একটি নিদর্শন দুর্গাসাগর দিঘী । ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন, ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন রায় এই দিঘীটি খনন করেন । দিঘীটির ইতিহাসে রয়েছে প্রেমের এক অসাধারণ কাহিনি । বাংলা বারো ভুইয়াদের একজন রাজা শিব নারায়ন রায় স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে এই দিঘীটি খনন করেন । কথিত আছে, রাজার অনুরোধে রানী দূর্গাবতী যতটুকু জায়গা না থেমে হেটেছিলেন ততটুকু জায়গাজুড়ে এই দিঘীটি খনন করা হয়েছিল । রানী দূর্গাবতীর নামেই দীঘিটির নামকরন করা হয় দুর্গাসাগর দীঘি । সরকারী হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দীঘিটি ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমিতে অবস্থিত ।


শেরেবাংলা কে ফজলুল হক জাদুঘরঃ
দুর্গাসাগর দিঘীর অদূরেই রয়েছে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জাদুঘর । বানারীপড়ার চাখারে অবিস্থিত এ জাদুঘরটি শেরেবাংলার জন্মভিটাকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে । 

বিবির পুকুরঃ 

শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কৃত্রিম জলাশয় বিবির পুকুর । নজরকাড়া এই পুকুরের রয়েছে একটি অসাধারণ ইতিহাস । ব্রিটিশ শাসনামলে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা বরিশালে আসে । উইলিয়াম কেরি নামক একজন ধর্মপ্রচারক পর্তুগিজ দস্যুদের কাছ থেকে জিন্নাত বিবি নামের এক মুসলিম মেয়েকে উদ্ধার করেন । কেরি মেয়েটিকে পালিত মেয়ে হিসেবে লালন পালন করেন । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জিন্নাত বিবি তৎকালীন সময়ে জনগণের জলকষ্ট দূর করার জন্য জলাশয় খনন করেন । তখন থেকেই এই পুকুরটি বিবির পুকুর নামে পরিচিতি পায় । 

লাকুটিয়া জমিদার বাড়িঃ

৩০০ বছরের পুরনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি বরিশাল শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে লাকুটিয়া গ্রামে অবস্থিত । ১৭০০ সালে রুপচন্দ্র রায়ের পুত্র রাজতন্ত্র রায় নির্মান করেন ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি । লাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি মঠ, সুবিশাল দীঘি এবং সবুজের সমারোহে পরিপূর্ণ একটি মাঠ । উনিশ শতকেও জমিদার রাজচন্দ্র রায়ের এই জমিদার বাড়িটি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল । কিন্তু কালক্রমে সবই এখন মরচে পড়া স্মৃতি ।
লাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে যেতে হলে
বরিশাল শহরের নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে । সেখান থেকে শ্মশান মোড়ে এসে লাকুটিয়া বাবুরহাটে যাওয়ার সিএনজি অথবা টেম্পোতে করে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে । ভাড়া পড়বে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা ।
গুটিয়া মসজিদঃ



বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কপথে উজিরপুর উপজেলা । সড়কের পাশে গুঠিয়ার চাংগুরিয়া গ্রাম । এ গ্রামেই আছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ মসজিদ । শিক্ষানুরাগী এস. সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু চাংগুরিয়ার নিজবাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির উপর তৈরি করেন এই মসজিদটি । 

২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মসজিদটিতে রয়েছে একটি সুবিশাল মিনার, প্রায় ২০ হাজার অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ্, এতিমখানা, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, বিশাল পুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান ।  মসজিদ লাগোয়া মিনারটির উচ্চতা ১৯৩ফুট । ঈদগাহের প্রবেশ পথের দুই ধারে দুটি ফোয়ারা রয়েছে । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় মসজিদের নির্মাণ কাজে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার শ্রমিক নেওন্তর কাজ করেছে ।

৩০ গোডাউন (রিভার ভিউ পার্ক বধ্যভূমি) :


বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এর বিপরীতে অবিস্থিত ৩০ গোডাউন এলাকা । এখানে রয়েছে বধ্যভূমি ও রিভার ভিউ পার্ক। কীর্তণখোলা নদীর ধারে অবস্থিত এই পার্ক সহজেই দর্শনার্থীদের মন কাড়ে । বরিশাল সদর থেকে রিক্সা যোগে ১০ মিনিটেই পৌছে যাওয়া যাবে ৩০ গোডাউন । ভাড়া পড়বে ২০ টাকা । 


 হিজল তলার বিলঃ 

একই সাথে ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক একটা স্থান হিজল তলার বিল । এই বিলে অতি প্রাচীন দুটি হিজল গাছ আছে যার বয়স প্রায় ১২০ বছর । গাছগুলো একটি বিলের মধ্যে ঠায় দাড়িয়ে আছে । তাই বিলের নামটিও হয়েছে হিজল তলা বিল । এখানে আসলে দর্শনার্থীদের চোখ ক্ষনিকেই ধাধিয়ে যায় । 

এখানে আসতে ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চে সফিপুর নামতে হবে । সফিপুর ইউনিয়নের ৩ ও ৪নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এই বিলটি ।

ব্রজমোহন কলেজঃ 

কালের স্বাক্ষী এই ব্রজমোহন কলেজ । বরিশালের বেশিরভাগ নামি-দামি ব্যাক্তিত্ব এই কলেজ থেকে অধ্যয়ন করেছেন । 

 জীবনানন্দ দাশ এর বাড়িঃ 

প্রেমের কবি বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশের জন্মস্থান এই বরিশালে । বরিশাল সদরেই তার বসতভিটা । লঞ্চঘাট থেকে রিক্সাযোগে অথবা পায়ে হেটেই যাওয়া যাবে জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে ।

অক্সফোর্ড মিশন গীর্জাঃ 

বরিশাল সদরে অবস্থিত বেশ পুরোনো গীর্জা -অক্সফোর্ড মিশন গীর্জা । বরিশাল শহরেই এই গীর্জাটির অবস্থান । 

 বঙ্গবন্ধু উদ্যান বা বেলস পার্কঃ 

পূর্বের নাম বেলস পার্ক । বর্তমানে সবাই বঙ্গবন্ধু উদ্যান নামেই চিনে । বরিশাল শহরের মানুষদের বিকালে আড্ডা ও হাটাহাটির জন্য এই পার্কটি প্রসিদ্ধ । 

শ্বেতপদ্ম পুকুরঃ 

বরিশাল সদরে এই পুকুরটির অবস্থান। বর্ষায় সাদা পদ্মের বাহারে আলোকিত হয়ে থাকে এই পুকুরটি । 

বরিশাল কিভাবে যাবেনঃ 

সড়ক পথে, নদী পথে কিংবা আকাশপথে বরিশালে যেতে পারবেন । ফেরিঘাটে জ্যামে না পরলে  ঢাকা থেকে বরিশাল সড়ক পথে যেতে সময় লাগবে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা । ঢাকার গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে ভোর ৬ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত আধা ঘন্টা পরপর বাস ছেড়ে যায় বরিশালের উদ্দেশ্যে । বেশিরভাগ বাসগুলো সাধারণত পাটুরিয়া ঘাট হয়ে বরিশাল যায় । তবে কিছু বাস মাওয়া ঘাট পাড়ি দিয়ে বরিশালে যায় । শাকুরা, হানিফ, শ্যামলী ইত্যাদি বাসগুলো উল্লেখযোগ্য । এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৭০০ টাকা, নন-এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা । 

বরিশালে নদীপথে ভ্রমণই সবথেকে আরামদায়ক । ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ বরিশালের পথে যাত্রা করে । সন্ধ্যায় ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলো  ভোর ৪ থেকে ৫ টার মধ্যে পৌঁছায় বরিশাল লঞ্চঘাটে । লঞ্চের জনপ্রতি ডেক ভাড়া ২০০ টাকা, নন এসি সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ টাকা এবং নন এসি ডাবল কেবিন ভাড়া ১৮০০ টাকা, এসি সিংগেল রুম ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, এসি ডাবল রুম ভাড়া ২০০০ টাকা থেকে ২২০০ টাকা ।

বিমানপথে ভাড়া পড়বে ৩ হাজার টাকা । বিমানপথে মাত্র ১ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন ঢাকা থেকে বরিশাল। 

কোথায় থাকবেনঃ 

বরিশাল শহরেই বেশ ভাল মানের হোটেল রয়েছে । ভ্রমণে ঝামেলা এড়াতে আগে থেকেই আমাদের মাধ্যমে হোটেলের রুম বুকিং করে রাখুন । খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে হোটেল রুম বুকিং করতে পারবেন ।

Travel

ডিবির হাওরের শাপলা বিল, সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে ।

dibir haor shapla bil 2

প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত সিলেট । সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে জৈন্তাপুরে অবস্থিত ডিবির হাওরের শাপলা বিল । লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত সিলেটের ডিবির হাওর । মেঘালয় সীমান্তবর্তী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সিলেটের এই অনিন্দ্য সুন্দর হাওরটি । 

এখানে প্রতিদিন ভোরে নিজ নিজ সৌন্দর্য্য নিয়ে ফুটে ওঠে অগণিত শাপলা ফুল । শাপলার লাল সৌন্দর্য্যকে দেখতে প্রতিদিন ভোর হওয়ায় সাথে সাথেই দলবেধে নৌকায় ভেসে বেড়ান অগণিত ভ্রমণপিপাসু মানুষ । ভোরে শাপলাগুলোকে মনে হয় সদ্য বিবাহিত বধুর ঠোটের গাঢ় লাল লিপস্টিক । সূর্যের সাথে শাপলাগুলোর যেন পূর্ব জনমের মিতালী । পুব আকাশ আলোকিত করে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে যখন সূর্যটা ভোরের জানান দেয় তখন সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে ফুটতে থাকে গাঢ় লাল শাপলাগুলো । অপূর্ব মোহনীয় সকালে পাহাড় ও মেঘের সাথে রক্তিম লাল শাপলাগুলোকে মনেই হবেনা এটি এই পৃথিবীর কোন ফুল । পৃথিবীর সকল ফুলের সৌন্দর্য্য যেন লুটিয়ে পড়ে শাপলার পদতলে । যেদিকে চোখ যায় শুধু শাপলা আর শাপলা । প্রায় ৭০০ একর জায়গা জুড়ে ডিবির হাওরের অবস্থান । এবং প্রায় পুরোটা জুড়ে রয়েছে লাল শাপলার বাহারী রূপ । দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশিতে এ যেন শাপলার মেলা । ইন্দ্রলোকের কোন পরীর রূপ যেন ফুটে উঠেছে প্রত্যেকটি স্থানে স্থানে । 

হাওরের লাগোয়াই রয়েছে মেঘালয় রাজ্যের সুউচ্চ পাহাড় । পাহাড়ের পাদদেশের শাপলার সৌন্দর্য্য না দেখলে এর রূপ-মাধুর্য কল্পনাই করা দুষ্কর । প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের এই শাপলার রাজ্যটি চারটি বিল নিয়ে গঠিত হয়েছে । ডিবির বিল, হরফকাটা বিল, ইয়াম বিল ও কেন্দ্রী বিল মিলে গঠিত হয়েছে ডিবির হাওর । এই বিলগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় বিল হচ্ছে ডিবির বিল । তাইতো পুরো হাওরের নামই রাখা হয়েছে ডিবির হাওর । 

ইতিহাসঃ 

এক সময় এই বিলে কোনো ধরনের শাপলা ছিল না । সীমান্তের ওপারে থাকা খাসিয়ারা লাল শাপলা দিয়ে পূজা -অর্চনা করতো । সে শাপলা পাহাড়ি ঢলের মাধ্যমে এখানে এসে দিনে দিনে তৈরি করেছে বিশাল এক শাপলার রাজ্য । 

ডিবির হাওরের ইতিহাস বেশ পুরোনো । এখানে রয়েছে প্রাচীন বিভিন্ন রাজার সমাধিস্থল । এ হাওর ঘিরে রয়েছে নানা করুণ কাহিনী । এখানে রয়েছে সর্বশেষ স্বাধীন জৈন্তারাজ্যের রাজা বিজয় সিংহের সমাধিস্থল ।
প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ স্বাধীন রাজ্য ছিল জৈন্তাপুর রাজ্য । শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) তথা ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকা তখন মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে । তখনো জৈন্তিয়া তার স্বাধীনতার ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছিল । জৈন্তিয়া রাজ্য প্রায় ৩৫ বছর স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হয় । হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রামায়নেও জৈন্তিয়া রাজ্যের উল্লেখ আছে ।
১৮৩৫ সালে ইংরেজরা রাজা বিজয় সিংহের সেনাপতি রাজেন্দ্র সিংহকে কৌশলে বন্দি করে রাজ্যের সবকিছু লুট করে নিয়ে যায় । এই রাজ্যেরই স্মৃতি বিজড়িত অংশ হচ্ছে ডিবির হাওর । ডিবির হাওরের পাশেই সমাধিস্থ করা হয় রাজা বিজয় সিংহকে ।

এছাড়াও এখানে রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এক মন্দির । ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, জৈন্তা রাজ্যের রাজা রাম সিংহকে প্রেমের অপরাধে এই ডিবির হাওরের কেন্দ্রী বিলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয় । তার স্মৃতিতেই গড়ে উঠেছিল এই মন্দির । সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান । ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের কাছেই অবস্থিত । স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরকেও পর্যটকরা দেখে আসতে পারেন । প্রেমের স্বাক্ষী এই মন্দিরকে কেইবা উপেক্ষা করতে পারে ! 

ডিবির বিলে অতিথি পাখিঃ 

পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি রয়েছে । এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতির পাখি শীতের মৌসুমে অতিরিক্ত শীতের কারণে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তুলনামূলক কম শীতের দেশে অস্থায়ীভাবে আবাস গড়ে ।  বাংলাদেশে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি শীত কাটাতে আসে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । যেসব জায়গায় খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে সেসব জায়গায় অস্থায়ী ঘর বাঁধে এসব পাখিরা ।

ডিবির হাওরে অসংখ্য মাছ পাওয়া যায় তাই শীতকালে এটি শাপলার রাজ্যের পাশাপাশি হয়ে উঠে অতিথি পাখির রাজ্য । চারিদিকে অজস্র লাল শাপলা, সাথে অসংখ্য অগণিত অতিথি পাখি । না দেখে কেউ এই চিত্রের কল্পনাও করতে পারবেনা । শীতকালে ডিবির হাওর যেন হয়ে ওঠে সৌন্দর্য্যের এক মিলনমেলা ।

পাখির মুক্ত বিচরণভূমি ডিবির হাওরে বালিহাঁস, পাতিসরালি,পানকৌড়ি, সাদাবক ও জল ময়ুরীর মতো অতিথি পাখিরা আসে । তাদের ডানার ঝাপটায় অন্যরুপে সাজে ডিবির হাওর ।
শীতকালে আকাশে মুক্ত ডানায় ভর করে বাতাসে গা ভাসিয়ে দলবেঁধে হেলে-দুলে মনের সুখে উড়ে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি । 

পাখিদের মুখরতায় ডিবির হাওর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে উচ্ছল । ঝিলে ধূসর রঙের হরেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখি মেলে ধরে সীমান্তের সৌন্দর্যকে, ফুটিয়ে তুলে শাপলার রঙ বহুগুনে । 

পর্যটকরা ডিবির হাওরকে চিনেন শুধু লাল শাপলার বিল হিসেবে । কিন্তু শীতকালে এটি যে অতিথি পাখিরও আস্তানা সেটা অনেকেরই অজানা ।
হাওরের এরকম বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য হাওরের চারপাশে রাস্তার উপর হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে হবে অথবা নৌকায় করে পুরো বিল ঘুরতে হবে । তবেই পান করার যাবে ডিবির বিলের প্রেম-সুধা ।

কিভাবে যাবেনঃ 

প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর সিলেট জেলা । সিলেটের উত্তর পূর্বে অবস্থিত জৈন্তাপুর উপজেলা। এই উপজেলায়ই অবস্থিত ডিবির হাওরের শাপলা বিল । একেবারে কম খরচেই ঘুরে আসতে পারেন সৌন্দর্যের লিলাভূমি সিলেটের শাপলা বিল থেকে ।
ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেনে করে সিলেট আসা যায় । ভাড়া পড়বে শ্রেণিভেদে ১৭৫ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত । অথবা বাসে করেও সিলেট আসা যায় । ঢাকা থেকে বাসগুলো সাধারণত সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ছাড়ে । শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক ইত্যাদি নন এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৪৭০ টাকা । গ্রীনলাইনসহ অন্যান্য এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৯০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত । 

বাস বা ট্রেন যেটাতেই আসেন না কেন আপনাকে নামতে হবে কদমতলীতে । কদমতলী হচ্ছে বাস এবং ট্রেনের শেষ স্টপেজ । ঢাকা থেকে সিলেট পৌছাতে সময় লাগতে পারে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা । তাই শাপলার আসল সৌন্দর্য্য দেখতে এমনভাবে টিকেট কাটুন যাতে খুব ভোরেই সিলেট পৌছানো যায় । শাপলার মূল সৌন্দর্য দেখতে হলে সূর্য্যের তেজ বাড়ার আগেই যেতে হবে । কেননা রোদ বাড়ার সাথে সাথে শাপলাগুলো গুটিয়ে যায় । ফলে আসল সৌন্দর্য্য লোপ পেতে থাকে ।

সেক্ষেত্রে রাত ১১টার বাসে করে আসলেই ভাল হবে । ভোরে কদমতলী পৌছানোর পর সেখানেই প্রাতরাশ সেরে ফেলতে হবে । তারপর কদমতলী থেকেই জাফলংগামী বাসে উঠতে হবে । তারপর বাসের হেল্পারকে বলে  জৈন্তা বাজারে নামতে হবে । ভাড়া নিবে জনপ্রতি ৪০ টাকা । সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘন্টা ।

 জৈন্তা বাজারে নেমে টমটম দিয়ে চলে যেতে পারেন ডিবির হাওর । জনপ্রতি লোকাল ভাড়া ১০ টাকা । রিজার্ভ নিলে ৬০ টাকা । টমটম যেখানে নামিয়ে দিবে সেখান থেকে গ্রাম্য উচু নিচু রাস্তা ধরে ১৫-২০ মিনিট হাটলেই চলে আসবেন ডিবির হাওরের শাপলা বিল ।
আরেকটি রাস্তায়ও এখানে আসা যায় । জাফলংগামী বাসে জৈন্তাবাজারে না নেমে এর একটু সামনে বিজিবি ক্যাম্পে নামতে হবে । সেখান থেকে ৩০ মিনিট হাটা পথ এই শাপলার রাজ্য ।
এছাড়াও সিলেট শহর থেকে সিএনজি রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন । ভাড়া পড়বে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। এক্ষেত্রে দরদাম করে নিতে হবে ।
শাপলা বিলের মনোরম দৃশ্যকে উপভোগ করার জন্য নৌকা ভাড়া করতে হবে । মাঝি পুরো বিল ঘুরিয়ে দেখাবে । নৌকা ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা ।

সতর্কতাঃ

যেহেতু শাপলা ফুল সূর্যের তেজ বাড়ার সাথে সাথে গুটিয়ে যায় সেহেতু অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসা উচিৎ । সাধারণত ভোর থেকে সকাল ১০ টা পর্যন্ত শাপলাগুলো তার পুরোপুরি রূপ ছড়ায় । এরপর আস্তে আস্তে আবার গুটিয়ে যায় । 

শাপলা বিলের আশেপাশে কোন রেস্টুরেন্ট বা খাবার ব্যবস্থা নেই । তাই জৈন্তা বাজার থেকে খাবার কিনে রাখা ভাল । যাতে ক্ষিদা লাগলে বিলের পাশেই মধ্যাহ্ন ভোজটা সেরে নেয়া যায় । তবে অবশ্যই কোন প্লাস্টিক, পলিথিন বা পরিবেশ বিপন্ন হয় এরকম কিছু ফেলে আসবেন না । আমাদের দেশ ও আমাদের প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই । 

কোথায় থাকবেনঃ

শাপলাবিলের আশেপাশে থাকার জন্য কোন হোটেল নেই । তবে জৈন্তা বাজার থেকে অদূরে জৈন্তা হিল রিসোর্টে থাকা যাবে । রিসোর্টটির সামনের ভিউ অনেক সুন্দর । এটির সামনেই মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে মেঘালয়ের সুউচ্চ পর্বতমালা । এখানে থাকার ভাড়া পড়বে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা । 

এছাড়া সিলেট শহরেও বিভিন্ন মানের ও বিভিন্ন ভাড়ার অসংখ্য হোটেল রয়েছে । www.amarrom.com থেকে খুব সহজেই এসব হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া করতে পারবেন ।

Travel

হাকালুকি হাওর – বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর ।

hakaluki haor

দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি । চারিদিকে থৈ থৈ করছে ফেনাতুলা ঢেউ । যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কেবল পানি আর পানি । সমুদ্রের মতো সমীহ জাগানিয়া ঢেউ দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর -হাকালুকি হাওরে । দিগন্ত জোড়া ঢেউয়ের খেলা দেখতে অবশ্যই বেছে নিতে হবে বর্ষাকালকে । বর্ষাকালে হাওরটি হয়ে ওঠে ভয়ংকর সুন্দর । এর ফণা তুলা ঢেউ রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষকে আন্দোলিত করে ।  বর্ষাকালে এই হাওরের এক রূপ আবার শীতকালে আরেক রূপ । এ যেন একের ভিতরে দুই । বর্ষাকালে এখানে পাওয়া যাবে সমুদ্র ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা । চারপাশের জল আর ঢেউ যে রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা দিবে সেটা  আর কোথাও খোঁজে পাওয়া যাবেনা । নৌকায় করে জিরো পয়েন্টের পথে ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে মনে হবে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য বোধ হয় ধরা দিয়েছে আপনার চোখের সামনে । জিরো পয়েন্টের ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশকে মনে হবে বিধাতার নিজ হাতে গড়া এক স্বর্গোদ্যান । নিজেকে মনে হবে অথৈ সাগরের একজন রাজা । 

শীতকালেও হাওর সাজে বর্ণীল সাজে । অতিথি পাখিদের আনাগোনায় হাওরটি হয়ে ওঠে মুখরিত । পাখির কিচির মিচির শব্দ ভুলিয়ে দেয় সকল ক্লেশ । মনে এনে দেয় স্বর্গীয় এক প্রশান্তি । শীতকালে হাকালুকি হাওর হয়ে ওঠে অফুরন্ত সজীবতার আবাস । ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা ঝাপটায় অসংখ্য অগণিত অতিথি পাখিরা । অতিথি পাখিদের আগমনে মুখর হয়ে থাকে চারিদিকের পরিবেশ । পাখিরা যেন পাখা মেলে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে ভ্রমণপিয়াসীদের । 

শীতকালে হাওরের দিগন্তজোড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো আক্ষরিক অর্থেই হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন । চারিধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া অল্প উঁচুভূমি বিলের পানিতে প্রতিচ্ছবি ফেলে অবতারনা করে অপরূপ সব দৃশ্যের । সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হাওরের জলরাশিতে সূর্যের প্রতিচ্ছবি মনে তৈরি করে অম্য ধরনের শিহরণ । 

হাওরের বর্ণনাঃ 

হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ হাওর । এশিয়ার অন্যতম মিঠাপানির জলাভূমিটির আয়তন উনিশ হাজার হেক্টর । হাওরটি সিলেটের ৩টি উপজেলা ও মৌলভীবাজারের ২টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত । উপজেলা গুলো হলো বড়লেখা, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার । ছোট বড় প্রায় ২৩৪টি বিল রয়েছে হাকালুকি হাওরে । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মায়াজুরি বিল, চাতলা বিল, চৌকিয়া বিল, পিংলারকোণা বিল, ফুটি বিল, তুরাল বিল, তেকুনি বিল, পাওল বিল, জুয়ালা বিল, কাইয়ারকোণা বিল, ডুলা বিল, বালিজুড়ি বিল, বিরাই বিল, রাহিয়া বিল, চিনাউরা বিল, দুধাল বিল, কুকুরডুবি বিল,, বারজালা বিল, পারজালাবিল, মুছনা বিল, লাম্বা বিল, দিয়া বিল, কাটুয়া বিল ইত্যাদি । এসব বিলে পাওয়া যায় স্বাদু ও মিঠাপানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে  আইড়, পাবদা, শিং, চিতল, বাউশ, মাগুর, কৈ । এগুলো ছাড়াও প্রায় ১৫০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ রয়েছে হাওরটিতে । হাকালুকি হাওরে জলজ উদ্ভিদসহ প্রায় ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে । রয়েছে ৪১৭ প্রজাতির পাখি । এর মধ্যে ৩০৫টি প্রজাতির দেশীয় পাখি ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা  ১১২ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি । এছাড়া রয়েছে  ১৪১ প্রজাতির অনান্য বন্যপ্রাণী । শীত মৌসুমে অতিরিক্ত শীতের কারণে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখিরা ঝাঁক বেঁধে এ অঞ্চলে আসে । তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আমাদের দেশীয় পাখিগুলো । হাওরে পরিযায়ী হাঁসের মধ্যে রয়েছে চখাচখি, রাজসরালী, গাডোয়াল, গরাদমাথা রাজহাঁস, ধলাবেলে হাঁস, ইউরেসীয় সিথীহাঁস, টিকীহাঁস, ইত্যাদি আরও অসংখ্য প্রজাতির হাঁস । দেশী প্রজাতির হাঁসের মধ্যে রয়েছে ডাহুক, বেগুনী কালেম, পানমুরসী, পাতিকুট, ইউরেসীয় মুরগি চ্যাগা, সাদা বক, রাঙ্গাচ্যাগা, জলাপিপি, ময়ূরলেজা পিপি, পাতি জিরিয়া, ভুবনচিল, শঙ্খচিল, কুড়াল ঈগল, হাট্টিটি, বড়খোঁপা ডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি, খয়রা বকসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি । 

হাকালুকি হাওরের দিগন্তজোড়া বিশাল জলরাশির মূল প্রবাহ হলো জুরী নদী ও পানাই নদী । এই জলরাশির স্রোত হাওরের উত্তর-পশ্চিম দিকে  অবস্থিত কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় । বর্ষা মৌসুমে হাওর সংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে বিশাল আকার ধারন করে । বর্ষায় হাওরটির পানির গভীরতা প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় । 

হাওরের নামকরণঃ 

হাওরের নামকরণ নিয়ে লোকমুখে নানান গল্প শোনা যায় । জনশ্রুতি আছে যে, এক সময় বড়লেখা থানার পশ্চিম দিকে “হেংকেল” নামে একটি উপজাতি বাস করতো । তাদের জাতির নামানুসারে সেই এলাকাকে ডাকা হতো “হেংকেলুকি” । পরবর্তিতে এই “হেংকেলুকি” নাম থেকে উৎপত্তি হয় হাকালুকি নাম । 

আরেকটি মত হচ্ছে, হাকালুকি হাওরের কাছাকাছি কোন একসময় বাস করতো কুকি এবং নাগা উপজাতিরা । তাদের নিজস্ব উপজাতীয় ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করা হয় “হাকালুকি” । তাদের ভাষায় হাকালুকি অর্থ ‘লুকানো সম্পদ’ । হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র‍্যের কারণেই এই নাম দেয়া হয়েছিল বলে শোনা যায় । 

আরেকটি জনশ্রুতি হচ্ছে, বহু বছর আগে ত্রিপুরার মহারাজা ওমর মানিক্যের সৈন্যদলের ভয়ে বড়লেখা অঞ্চলের কুকি উপজাতির দলপতি ‘হাঙ্গর সিং’ জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় লুকিয়ে যান । এই লুকিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার নাম হয় “হাঙ্গর লুকি” । কালক্রমে সেটি হয়ে যায় হাঙ্গর লুকি থেকে হাকালুকি । 

অন্য জনশ্রুতি মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে “ আকা” নামক এক রাজা ভূমিকম্পে তার রাজত্বসহ মাটির নিচ তলিয়ে যান । কালক্রমে এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় “আকালুকি” বা হাকালুকি ।

হাওরের মানুষের জীবন যাপনঃ

বর্ষাকালে হাওর হয়ে ওঠে স্থানীয়দের জন্য বিভীষিকার মতো । কারণ প্রত্যেক বর্ষাতেই বন্যায় প্লাবিত হয় পুরো জনপদ । বর্ষাতে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করে হাওরবাসী । তারা নৌকাতে করে বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মৎস আহরণ করে । এসব মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবিকা চালায় তারা।

শুষ্ক মৌসুমে হাওরের বিস্তৃত প্রান্তরে অবাধে বিচরন করে গরু, মহিষ, ছাগলসহ বিভিন্ন গৃহপালিত পশু । হাওর উপকূলবর্তি এলাকার লোকজন শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ করেন । ফসল উঠে গেলে নির্দিষ্ট কয়েক মাস তাদের গৃহপালিত গবাদি পশু পাঠিয়ে দেন হাওরে বসবাসরত একশ্রেণীর মানুষের কাছে । যারা বাথানি নামে পরিচিত । বাথানিরা এসব গৃহপালিত পশুগুলোর তত্ত্বাবধান করেন । বিনিময়ে বাথানিরা এসব পশুর দুধ পান । আবার বর্ষাকাল শুরু হলে প্রকৃত মালিক এসে গরু-বাছুর ফেরত নেয় । এই ব্যবস্থাটি হাওর এলাকায় “বাথান” নামে পরিচিত । বাথানের মালিকেরা এসকল গবাদি পশুর দুধ বিক্রী করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেন । বাথান ব্যাবস্থার কারণে হাকালুকি হাওর এলাকা থেকে প্রচুর পরিমানে দুধ ও দৈ উৎপাদন হয় ।

কিভাবে যাবেনঃ 

হাকালুকি হাওর অনেক বিশাল ও ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত । তাই হাওরটি দেখতে বিভিন্ন ভাবে যাওয়া যায় । তন্মধ্যে ৩টি রুট এখানে বলা হলো । 

১ম রুট-

ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেট আসার পথে কুলাউড়া স্টেশনে নামতে হবে । তারপর কুলাউড়া থেকে সিএনজি অথবা রিক্সা করে ভূকশিমইল হয়ে হাওরে চলে যেতে পারবেন । সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া পড়বে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা । রিক্সা ভাড়া পড়বে ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা ।  

২য় রুট-

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে মাইজগাঁও নামতে হবে । মাইজগাঁও থেকে রিক্সা করে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে আসতে হবে । সেখান থেকে নৌকাঘাটে যেয়ে নৌকা দরদাম করে পুরোদিনের জন্য ঠিক করে নিতে হবে । তারপর কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্য্য দেখাতে নিয়ে যাবে মাঝি ।

৩য় রুট-

ঢাকা থেকে বাসে করে সিলেটের কদমতলী আসতে হবে । এনা, ইউনিক, শ্যামলী, এস আলম, গ্রীন লাইন, সৌদিয়াসহ বিভিন্ন বাস ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে । প্রতিদিন ৩০ মিনিট পরপর এসব বাস ছাড়ে । নন এসি বাসের ভাড়া বাসভেদে ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা । এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৯০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা । 

সিলেট কদমতলীতে ফ্রেশ হয়ে রিক্সা নিয়ে আসতে হবে হুমায়ুন চত্বর । এখান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জগামী বাস ও সিএনজি পাওয়া যায় । সিলেট থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টার মতো । বাসে ভাড়া লাগবে ২০ টাকা ও সিএনজিতে ৪০ টাকা । ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সিএনজিতে ঘিলাছড়া জিরোপয়েন্ট যাওয়া যাবে । ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে ঘিলাছড়ার দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার ।

সিলেট থেকে সরাসরি মাইক্রোবাস/প্রাইভেট কার ভাড়া করেও আসা যাবে । ভাড়া পড়বে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা । মাইক্রোবাস ভাড়া করার সময় ভালমতো দরদাম করে নিবেন । 

কোথায় থাকবেনঃ

ফেঞ্চুগঞ্জে তেমন কোন আবাসিক হোটেল নেই । ফেঞ্চুগঞ্জ জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে অনুমতি সাপেক্ষে থাকা যাবে । তবে সবচেয়ে সুবিধাজনক হবে সিলেট শহরে ফিরে এসে হোটেল নেয়া । কারণ শহরেই সবথেকে ভাল ভাল হোটেল পাওয়া যাবে । আর আপনাদের জন্য হোটেল বুকিং করে দেয়ার জন্য সবসময় আপনাদের পাশেই আছে www..amarroom.com । মুহুর্তেই আপনার চাহিদা অনুযায়ী রুম বুক করার জন্য আমাদের সাথে আজই যোগাযোগ করুন ।