amarroom

amarroom

Travel

রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের প্রথম গন্তব্য বান্দরবান।

nafakhum

রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের প্রথম গন্তব্যই হচ্ছে বান্দরবান। বিধাতা যেন বান্দরবানেই ঢেলে দিয়েছেন পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য্য। বান্দরবানের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া ভার। পাহাড় ও পাহাড়ি এলাকা যারা পছন্দ করেন তারা বান্দরবানকেই পদচারনার জন্য বেছে নেন। পাহাড়ের বিশালতা মনে এনে দেয় এক টুকরো শান্তির পরশ। সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে মন হারিয়ে যায় অন্য কোন ভূবনে। বান্দরবানে শুধু পাহাড়ই নয়। রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় খুম। খুম হচ্ছে মারমাদের নিজস্ব ভাষার শব্দ। খুম শব্দের অর্থ জলপ্রপাত। পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলেছে ছোট বড় অসংখ্য খুম বা জলপ্রপাত। এসব জলপ্রপাতের সৌন্দর্য্য সুধা পান করতে হলে কিছু পথ যেতে হবে নৌকায় আবার কিছু পথ পায়ে হেটে ট্র‍্যাকিং করে। অন্যান্য জায়গার মতো এখানে ট্র‍্যাকিং করা কিন্তু মোটেও সহজ কর্ম নয়। কখনো পাথরের উপর দিয়ে কখনো ঢালু রাস্তা দিয়ে কখনো ছোট ছোট নদীর স্রোতের বিপরীতে হেটে চলতে হবে অনেকটা পথ। এই পথচলা যতটা না ক্লান্তি দিবে তার থেকে বেশি রোমাঞ্চের আনন্দ দিবে। রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের কাছে তাই এই কষ্ট অতি তুচ্ছ ব্যাপার। রোমাঞ্চের কাছে ক্লান্তি কোন ছার! রোমাঞ্চ উপভোগ করতে করতে যখন খুমগুলোর সামনে দাড়াবেন তখন পলকেই সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। খুমের সৌন্দর্য্য মুহুর্তেই আপনার হৃদয়কে শীতল করে দিবে। দূর করে দিবে অন্তরের সকল কাঠিন্য। খুমের জলধারায় গা ভিজিয়ে, নিতে পারেন স্বর্গের সুখ। শীতল জলধারা একরাশ ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়ে মাতিয়ে দিবে অফুরন্ত আনন্দে। জলকেলি করতে করতে কিভাবে যে সময় পার হয়ে যাবে টেরও পাবেন না। খুমের স্বচ্ছ জলরাশি যে কতটা সুন্দর তা কল্পনাতীত। সেই কল্পনাতীত সৌন্দর্য্য যখন নিজ চোখে ধরা দিবে তখন বিমোহিত হয়ে যাবে মন। 

থানচিঃ

 বান্দরবান জেলার সবথেকে বড় উপজেলা থানচি । এর আয়তন ১০২০ বর্গ কিলোমিটার । এর নামকরণ করা হয়েছে মার্মা শব্দ থাইন চৈ থেকে । থাইন চৈ শন্দের অর্থ বিশ্রামের স্থান । ধারণা করা হয়, ১৯৫০ সাল ও তার পূর্বে নৌপথে যাতায়াতকালে যাত্রীগণ বিশ্রামের জন্য এ স্থানে থামতেন । তাই মারমারা এই স্থানটিকে থাইন চৈ নামে ডাকতো ।  পরবর্তীতে থান চৈ থেকে থানচি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে পার্বত্য অঞ্চলের এই জায়গাটি । থানচি উপজেলায় রয়েছে ২টি মসজিদ, ২টি মন্দির, ৩১টি বৌদ্ধ বিহার এবং ২৯টি ছোট বড় গীর্জা ।
থানচি উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয় অসম্ভব সুন্দর নদী সাঙ্গু । এছাড়া এখানকার সব থেকে বড় আকর্ষণ রেমাক্রী খাল এ খাল ধরেই যেতে হয় থানচি উপজেলার সকল খুম তথা ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখতে । 

পদ্মঝিরিঃ

থানচি থেকে পদ্মমুখ পর্যন্ত নৌকায় আসতে হয় । বাকিটা পথ পাড়ি দিতে হয়ে পায়ে হেটে । পদ্মমুখ থেকে পদ্মঝিরি হয়ে আসতে হয় থুইসা পাড়ায় । বর্ষায় পদ্মঝিরি পাড়ি দেয়া বিশাল এক রোমাঞ্চের ব্যাপার । তখন পানির স্রোত বেশি থাকায় দড়ি ধরে ধরে অতি কষ্টে পাড়ি দিতে হয় খালটি । যারা সাতার জানেন না তাদের জন্য বলতে গেলে একটি বিভীষিকা খাল পার হওয়া । তবে মানতেই হবে রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ কখনও এই রোমাঞ্চ হাতছাড়া করতে চাইবে না ।

জলপ্রপাত গুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ 

আমিয়াখুমঃ 

পাথর আর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে স্ববেগে নেমে আসছে মায়াবী জলধারা। দুধসাদা ফেনা ছড়িয়ে তা ছোটে চলেছে পাথরের গা ঘেসে।
অবিরাম জলধারার শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে মায়াবী এক সুর। ঠিক এরকমই দৃশ্য পাবেন পাহাড় ঘেসে গড়ে উঠা আমিয়াখুম জলপ্রপাতে। আমিয়াখুমের সৌন্দর্য্যের এতই বিশালতা যে এটিকে বলা হচ্ছে বাংলার ভূস্বর্গ। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাতগুলোর একটি আমিয়াখুম জলপ্রপাতটি বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের পাশে বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাক্ষিয়ং এলাকায় অবস্থিত। 

নাফাখুমঃ

সাংগু নদী হতে নাফাখুম জলপ্রপাতের উৎপত্তি। পাহাড়ি নদী সাংগু  হতে জলপ্রপাত শুরু হয়ে ২৫-৩০ ফুট নিচে পর্যন্ত বিস্তৃত।  আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সব থেকে বড় জলপ্রপাত। বর্ষা মৌসুমে এর আয়তন সবথেকে বেশি থাকে। শীতে খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়। নাফাখুমের পড়ন্ত জলধারার নীচে বসে জলকেলি করতে করতে কখন যে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবেন টেরও পাবেন না।

পাহাড়ীরা নাফাখুমের পিছনে বসে মাছ শিকার করে। নাতিং নামের এক ধরনের উড়ুক্কু মাছ এই জলপ্রপাতে পাওয়া যায়। উজান ঠেলে এসে নাতিং মাছ নাফাখুমে বাধাপ্রাপ্ত হয়। লাফ দিয়ে এই প্রপাত-টা পার হতে গিয়ে জলপ্রপাতের ভিতরে ছোট্ট একটা গুহায় পড়ে।  সেখান থেকে স্থানীয় পাহাড়ীরা সহজেই মাছ আহরণ করে।

সাতভাইখুমঃ

আমিয়াখুম থেকে একটু দূরে অবস্থিত এই সাতভাইখুম। আমিয়াখুম ঝর্না থেকে পাহাড় বেয়ে কিছুক্ষণ হাটলেই সাতভাইখুমের অঞ্চলের শুরু। তবে সাতভাইখুমের আসল সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে ভেলায় করে যেতে হবে ১ ঘন্টার রাস্তা। এই ১ ঘন্টায় পাথুরে খাল দিয়ে যেতে যেতে পাহাড়ি ঠিকরে পড়া সৌন্দর্য্যের পুরোটা উপভোগ করতে পারবেন। এর স্বচ্চ জলরাশি দেখে প্রাণ জোড়াবে নিমেষেই।

ভেলাখুমঃ 

নামের মধ্যেই বুঝা যাচ্ছে এটি ভেলার সাথে সম্পর্কিত। সাতভাই খুমের মতো ভেলাখুমও ঘুরে বেড়াতে হবে ভেলা দিয়ে। ভেলাখুমে একটি ঝর্ণা রয়েছে। এটি নাইক্ষ্যারমুখ নামে পরিচিত। ভেলাখুমে অবশ্যই একটু সাবধানে থাকতে হবে। কারণ সেখানকার স্যাঁতসেঁতে জায়গাগুলোতে জোঁকে ধরার ভয় থাকে বেশি।

রেমাক্রিঃ 

বান্দরবানের থানচি উপজেলা হতে নৌকায় রেমাক্রি  যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ৩ ঘন্টা। থানচি থেকে রেমাক্রি যাওয়ার নৌকা ভ্রমণ মোহিত করবে। এই পথে চলার সময় দুটো জায়গা সবসময় পর্যটকদের টানে; তিন্দুর ও বড় পাথর বা রাজা পাথর জায়গাটা। সাঙ্গু নদীর মাঝখানে বড় বড় পাথরের ফাঁক গলে নৌকা যাত্রাটা সত্যিই অসাধারণ। আবার যদি কেউ আমিয়াখুম ভ্রমণে যান তবে আমিয়াখুম থেকে থুইসা পাড়া হয়ে হেটে চলে আসতে পারেন রেমাক্রি। সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো।

খাবারঃ

থুইসা পাড়ায় খাবার খেতে পারবেন। বন মোরগ, ডাল ও ভাতের দাম পড়বে ১২০ টাকা। রেমাক্রি বাজারেও খেতে পারবেন। থুইসা পাড়ার মতোই ব্যাবস্থা। ট্র‍্যাকিং করার সময় কোন খাবারের ব্যবস্থা থাকবেনা। তাই শুকনো খাবার নিজের সাথেই রাখুন। পাহাড়ি বিভিন্ন ফলও চোখে পড়তে পারে। পুরোপুরি না চিনে থাকলে এগুলো খাবেন না। পাহাড়ি চালতা পেয়ে যেতে পারেন পথ চলতে চলতে। রোমাঞ্চটা মনে রাখতে পাহাড়ি চালতা খেতে একদমই ভুলবেন না।

কিভাবে যাবেন কোথায় থাকবেন?

বান্দরবান একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল। এখানকার যোগাযোগ ব্যাবস্থা খুবই নাজুক। বেশিরভাগ সময়ই হেটে কিংবা নৌকাতে এসব অঞ্চলে চলাচল করতে হয়। 

দেখে নেয়া যাক বান্দরবান কিভাবে যাওয়া যাবে।

ঢাকা হতে বাসে করে বান্দরবান আসতে হবে। নন এসি বাসে জনপ্রতি ভাড়া ৬৫০ টাকা। বান্দরবান সদর থেকে থানচি উপজেলা আসতে হবে। থানচি দুইভাবে আসা যায়; চান্দের গাড়ি ও বাসে। গ্রুপে যদি মানুষ বেশি থাকে তবে চান্দের গাড়িতে আসাই উত্তম হবে। ভাড়া পড়বে  ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাসে করে আসলে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে মাত্র ২০০ টাকা। 

থানচি এসে ফ্রেশ হয়ে প্রথম কাজই হচ্ছে গাইড ঠিক করা। বলে রাখা ভাল থানচি থেকে গাইড থুইসা পাড়া পর্যন্ত যাবে। থুইসা অয়াড়া থেকে প্রথম গাইড আরেকজন গাইড ঠিক করে দিবে। দ্বিতীয় গাইড রেমাক্রি, আমিয়াখুমসহ বাকী জলপ্রপাতগুলো ঘুরে দেখাবে। প্রিথম জনের সাথে পুরো ট্রিপটি প্যাকেজ হিসেবে নিয়ে নিবেন। ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পড়বে পুরো প্যাকেজ। 

গাইড ঠিক করে থানচি থেকে নৌকায় করে যেতে হবে পদ্মমুখ। ভাড়া পরবে ৮০০ থেকে ১ হাজার। ৫-৬ জন একটি নৌকাতে উঠতে পারবেন।

পদ্মমুখ থেকে পদ্মঝিরি হয়ে আসতে হবে থুইসা পাড়া। এই পুরো রাস্তাই আসতে হবে ট্র‍্যাকিং করে। সময় লাগতে পারে ৪ থেকে ৬ ঘন্টা।

থুইসা পাড়ায় থাকতে হবে স্থানীয় আদিবাসিদের মাচাং এ। খরচ পড়বে জনপ্রতি ১০০ টাকা। যার মাচায় থাকবেন তার কাছেই পাবেন খাবার। খরচ পড়বে ১২০ টাকা জনপ্রতি। 

থুইসা পাড়ায় রাতে থেকে খুব ভোরে উঠে বের হবেন আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে পার হতে হবে দেবতার পাহাড়। থুইসা পাড়া থেকে আমিয়াখুম ট্র‍্যাকিং করে আসতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘন্টার মতো। 

আমিয়াখুমের পাশেই রয়েছে সাতভাইখুম ও ভেলাখুম। পুরোদিন নৌকায় ঘুরে ও ট্র‍্যাকিং করে রাতে ফিরে যেতে হবে থুইসা পাড়ায়। রাতে থুইসা পাড়ায় থেকে পরদিন ভোরে থুইসা পাড়া থেকে হেটে আসতে হবে নাফাখুম। সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো। নাফাখুমের সৌন্দর্য্য উপভোগের পর পায়ে হেটে চলে আসবেন রেমাক্রি বাজারে। আসতে সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো। রেমাক্রি বাজারে বেশ সুন্দর ছোট ছোট কটেজ পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। কটেজে উঠে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে যাবেন রেমাক্রি ঝর্ণাতে। রেমাক্রি বাজার থেকে একদম কাছেই রেমাক্রি ঝর্ণা। এখানে বাকি দিনটা কাটিয়ে কটেজে ফিরে বিশ্রাম করুন। 

পরদিন সকালে রেমাক্রি বাজার থেকে থানচির জন্য নৌকা ঠিক করুন। ভাড়া পড়বে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। পথিমধ্যে পড়বে তিন্দু ও বড় পাথর। শেষ লগ্নের এই নৌকা ভ্রমণটা পুরো ট্রিপের ক্লান্তি দূর করে দিবে। থানচি ফিরে আগের মতোই বাসে বা চান্দের গাড়িতে বান্দরবান আসতে হবে। বান্দরবান থেকে বাস করে ফিরতে হবে ঢাকায়।

সাবধানতাঃ 

জলপ্রপাতগুলোর আসল সৌন্দর্য্য দেখা যায় বর্ষাকালে। আর বর্ষাকালে ট্র‍্যাকিং করাটাই সব থেকে বেশি বিপজ্জনক ও কষ্টের। ট্র‍্যাকিং করার সময় হুট করেই চলে আসতে পারে বৃষ্টি। তাই রেইন কোট সাথে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে খেয়াল রাখবেন রেইনকোট যাতে পাতলা হয়। নাহলে ট্র‍্যাকিং করাটা বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। 

বৃষ্টির সময় পাহাড়ি রাস্তাগুলো একদম পিচ্ছিল থাকে। সাবধানে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। একটু অসাবধান হলেই বড় দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। 

পাহাড়ি জোঁক থেকে সাবধান। এরা বিষাক্ত সাপের থেকেও ভয়ংকর। একবার কামড়ালে অনেকক্ষণ ধরে রক্তপড়া বন্ধ হবেনা। জোঁক থেকে বাচতে পায়ে সাদা লম্বা মোজা পরে নিবেন। এবং কিছুক্ষণ পরপর দেখে নিবেন কোথাও জোঁকে ধরছে কি না। 

যারা সাতার জানেন না তারা অবশ্যই লাইফ জেকেট সাথে রাখবেন। কিছু কিছু খাল ও নদীতে অনেক পানি থাকে। এগুলো সাঁতরে কিংবা দড়ি ধরে পার হতে হয়। 

পাহাড়ি বনে ছোট ছোট কাটাযুক্ত অনেক গাছ আছে। এগুলোতে অসাবধাণতাবশত স্পর্শ করলে কেটে যেতে পারে। তাই সবসময় ফার্স্ট এইড সাথে রাখবেন। জ্বর,মাথা ধরা ও ব্যাথার ওষুধ রাখতে মোটেও ভুলবেন না। এগুলো অনেক কাজে দিবে।

Travel

বাংলার লুকায়িত রূপরাজ্য নিঝুম দ্বীপ !

Print

চারিদিকে সুনসান নিরবতা । নেই কোন হইচই, কোলাহল । শুধু আছে ঢেউয়ের মন্ত্রমুগ্ধ কলতান ।  দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত জলরাশি । পায়ের নিচে চিকচিক বালি । কল্পনা করুন বালির উপর দাড়িয়ে প্রকৃতির সেই অপূর্ব  রুপ অবলোকন করছেন আপনি । অসাধারণ সে মুহুর্ত, অসাধারণ সে অনুভুতি ।  

এরকম নিস্তব্ধতাময় অলৌকিক মুহুর্ত উপভোগ করতে হলে আপনাকে যেতে হবে বাংলার লুকায়িত রূপরাজ্য নিঝুম দ্বীপে। নিঝুম দ্বীপের নিস্তব্ধতা ভ্রমণপিপাসু মানুষকে পলকেই করে দেয় প্রকৃতির মত শান্ত। নির্মল পরিবেশে মুহুর্তেই যেন পাওয়া যায় শীতল এক প্রশান্তি। দ্বীপের সৈকতে দাড়িয়ে বিস্তৃত জলরাশির বিশালতা দেখতে দেখতে কঠিন হৃদয়টাও হয়ে যাবে কাননের মতো কোমল।

শুধুই সৈকত বা জলরাশি নয়, এই দ্বীপে রয়েছে অসংখ্য চিত্রা হরিণের বাস। চোখের সামনে হরিণের বিচরণ দেখতে দেখতে কতটা সময় অতীত হয়ে যাবে টেরও পাবেন না। বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য পাখির সমারোহে ভরে উঠবে আপনার মন। সে সাথে সৈকতের পাড়ে দেখা হয়ে যেতে পারে অসংখ্য লাল কাকড়া ও কচ্চপের সাথে। লাল কাকড়ার ব্যস্ত দৌড় ও কচ্চপের ধীরগতি। দুটো আলাদা বৈশিষ্ট্যের দুটি প্রাণী আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে পুরোটা সময়। 

অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যঃ

নিঝুম দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা ছোট্ট একটি দ্বীপ। এটি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি ইউনিয়ন। কামলার চর, চর ওসমান, চর মুরি ও বল্লার চর নিয়ে গঠিত এই দ্বীপটির আয়তন ১৪,০৫০ একর। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে ৯টি গুচ্ছ গ্রাম। এই গুচ্ছ গ্রাম ছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। 

নিঝুম দ্বীপের অবস্থান হাতিয়া উপজেলা হতে দুই কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে। বাংলাদেশ সরকার ২০০১ সালে সম্পূর্ণ দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বীপের ভিতরে বনবিভাগের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বন। এসব বনে রয়েছে কেওড়া ও বাইন গাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছালি। 

 বনবিভাগের কার্যালয়ের ভিতরে রয়েছে বেশ কিছু চিত্রা হরিণ। রয়েছে একটি বিশাল ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখতে পাওয়া যাবে আশপাশের প্রকৃতির রূপ-সুধা। বনবিভাগের কার্যালয়ের পাশেই রয়েছে আরেকটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও ট্র‍্যাকিং ট্রেইল। এই বনেও অন্যান্য বনের মতো রয়েছে কেওড়া গাছ ও বাইন গাছ। এছাড়াও দ্বীপজুড়ে রয়েছে ৪৩ ধরনের লতাগুল্ম ও ২৩ ধরনের অন্যান্য গাছ। এই দ্বীপের তিন চতুর্থাংশই ঘন বন দ্বারা আচ্ছাদিত। সুন্দরবনের পরই বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত এই নিঝুম দ্বীপ।

এসব বনে পরিক্ষামূলকভাবে ১৯৭৮ সালে ৪ জোড়া চিত্রা হরিণ ছাড়া হয়। বর্তমানে এ দ্বীপে চিত্রা হরিণের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। দ্বীপের একর প্রতি চিত্রা হরিণের ঘনত্ব সুন্দরবনের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। বাঘের মতো কোনো মাংসাশী প্রাণী না থাকায় দ্রুতগতিতে হরিণের বংশবৃদ্ধি ঘটছে।

নিঝুম দ্বীপে চিত্রা হরিণ ও মহিষ ব্যতিত অন্য কোন কোন হিংস্র প্রাণী নেই। তাই ভ্রমনের জন্য দ্বীপ ও দ্বীপের বনগুলি খুবই নিরাপদ। 

দ্বীপে রয়েছে নিশি বক, দেশি কানিবক, গোবক, ধূসর বক, কাদাখোঁচা, দেশি পানকৌড়ি, বালিহাঁস, কালোহাঁস, তিলা লালপা, তিলা সবুজপাসহ  প্রায় ৩৫ প্রজাতির পাখি। এছাড়া শীতকালে হাজার হাজার অতিথি পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় এই দ্বীপ। তখন পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে পুরো দ্বীপ। 

“মারসৃপারি” নামে একধরনের মাছ এই দ্বীপে পাওয়া যায়। এটি একটি উভচর প্রাণী। আকারে  ৬-৯ ইঞ্চি লম্বা এই মাছটি ৫ পর্যন্ত বাঁচে। 

বর্ষা মৌসুমে নিঝুম দ্বীপের জেলেরা মেঘনার মোহনা থেকে প্রচুর ইলিশ মাছ ধরে। তখন ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি মাছ বিক্রেতারা নিঝুম দ্বীপে মাছ কিনতে আসে। এছাড়া শীত মৌসুমে নিঝুম দ্বীপে “চেঁউয়া” মাছ নামক এক ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এই মাছ থেকে জেলেরা শুঁটকি তৈরি করেন।

এখানকার বাসিন্দারা খুবই সহজ সরল ও ধর্ম ভীরু। পর্যটকদের খুবই আন্তরিকভাবে সবাই সাহায্য করেন। দ্বীপ ঘুরে দেখানোর জন্য গাইড হিসেবে ছোট ছোট বাচ্চারা সাহায্য করে। দিন শেষে ৫০-১০০ টাকা দিলেই তারা খুশি হয়ে যায়। 

নিঝুম দ্বীপে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি বাজার রয়েছে। তবে এখানকার সব থেকে বড় যে বাজার সেটা হচ্ছে নামার বাজার। এই বাজারের উপরই দ্বীপের বাসিন্দারা নির্ভর করে থাকেন। প্রতিদিনের সকল খরচাপাতি সবাই এই বাজার থেকেই করেন। নামার বাজারে পর্যটকদের ক্যাম্পিং করার প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রও পাওয়া যায়।

নিঝুম দ্বীপের সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুতের সমস্যা। এখানে কোন বিদ্যুত নেই। তবে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে মোবাইল চার্জ দেয়ার ব্যাবস্থা রয়েছে। 

নিঝুম দ্বীপের নামকরণ ও ইতিহাসঃ

নিঝুম দ্বীপের পুরনো নাম চর ওসমান। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত জনবসতিহীন এই দ্বীপে ওসমান নামক একজন বাথানিয়া তার মহিষের পাল নিয়ে আসেন। এরপর থেকেই এই দ্বীপের নাম হয়ে যায় “চর ওসমান”। পরবর্তীতে হাতিয়ার সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম দ্বীপটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন নিঝুম দ্বীপ। 

 তবে দ্বীপের বালুকাময় মাটির জন্য জেলেরা এটিকে ডাকে বালুর চর। দ্বীপটিতে একসময়  বালুর ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেও ডাকত। বর্তমানে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করা হলেও স্থানীয়রা এখনো এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেই ডাকে। 

একসময় নিঝুম দ্বীপকে ইছামতী দ্বীপও ডাকা হতো। কারণ এই দ্বীপের আশপাশে অনেক ইছা মাছ (চিংড়ি মাছ) পাওয়া যেত। 

দর্শনীয় স্থানঃ

যারা ট্র‍্যাকিং করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য নিঝুম দ্বীপ বিশাল সুযোগ নিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। চোয়াখালি বন ট্র‍্যাকারদের জন্য হতে পারে আদর্শ জায়গা। ট্র‍্যাকিং করতে করতে চলে যেতে পারেন বনের একদম গহীনে। পথিমধ্যে দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণের বিশাল পালের সাথে। তবে ট্র‍্যাকিং করার সময় শ্বাসমূল থেকে সাবধান থাকবেন। এবং অবশ্যই সাথে কোন ছোট বাচ্চাকে গাইড হিসেবে রাখবেন। কারণ বনের ভিতর হারিয়ে গেলে পথ চেনা দুঃসাধ্য। আরো কি কি দেখবেন নিঝুম দ্বীপে? 

১. কমলার দ্বীপ:

নিঝুম দ্বীপের পাশেই অবস্থিত কমলার দ্বীপ। ছোট্ট এই দ্বীপটিতে ট্রলার নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। পুরো দ্বীপটা হেঁটে হেঁটে ঘুরে আসা যায। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পরে জাহাজ থেকে এই দ্বীপে কয়েক বাক্স কমলা ভেসে আসে। কমলাগুলো পড়ে থাকতে দেখে এর নামকরন করা হয় কমলার দ্বীপ।কমলার খালে অনেক ইলিশ মাছ পাওয়া যায়।

২. চৌধুরী খাল ও কবিরাজের চর

নিঝুম দ্বীপের আসল সৌন্দর্য্য এই কবিরাজের চর। চৌধুরী খাল হয়ে কবিরাজের চর যেতে যেতে দ্বীপের প্রকৃত সৌন্দর্য্য অবলোকন করা যায়। কবিরাজের চরেই সব থেকে বেশি হরিণের আবাস। তাই হরিণ দেখতে হলে কবিরাজের চরে আসাই বাঞ্চনীয়। মূল দ্বীপ থেকে এই চরে ট্রলারে করে আসা যায়। যাওয়া আসা মিলিয়ে ১০০০-১৫০০ টাকা দিতে হবে মাঝিকে। ট্রলারে ১০জন যাত্রী উঠা যাবে।

৩. চোয়াখালি সমুদ্র সৈকতঃ

চোয়াখালি সমুদ্র সৈকতও ঘুরে আসার তালিকায় রাখতে পারেন । এখানেও ভোরবেলা অসংখ্য মায়া হরিণের দেখা পাওয়া যায় । সাথে আছে হরেক রকম পাখির কলকাকলি । শীতকালে চোয়াখালি সমুদ্র সৈকত হয়ে যায় অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য । অসংখ্য পরিযায়ী পাখি ঝাঁক বেঁধে এই সৈকতে শীত পোহাতে আসে । তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজসরালী, গাডোয়াল, গরাদমাথা রাজহাঁস, ধলাবেলে হাঁস, ইউরেসীয় সিথীহাঁস । সমুদ্রপাড়ে বালিতে পা ভেজাতে ভেজাতে হাজারো পাখির কলরবের সাথে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হবে স্বর্গের কোন ভূবনে চলে এসেছেন । এখানে যেতে হলে আগের দিন বাইক চালককে বলে রাখতে হবে যেন ভোরেই নিয়ে আসে চোয়াখালিতে । ভোরে আসলেই হরিণের দেখা পাওয়া যাবে সহজে ।

৪. নামার বাজার সমুদ্র সৈকতঃ

নামা বাজার থেকে সব থেকে কাছের সমুদ্র সৈকত হচ্ছে নামার বাজার সমুদ্র সৈকত । নামার বাজার থেকে মাত্র ১০ মিনিট হাটলেই পৌছে যাবেন নামার বাজার সমুদ্র সৈকতে । এখান থেকেই প্রকৃতির রূপকে আলিংগন করে নিতে পারবেন গভীর মায়ায় । এই দ্বীপে পর্যটকদের আনাগোনা কম থাকে বলে সৈকতে হাটতে হাটতে নিজেকে মনে হবে এই প্রকৃতির রাজ্যের রাজা । এখান থেকে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি শিহরণ জাগাবে মনে । ক্লান্ত দেহ তৃপ্তি পাবে কোলাহল থেকে সহস্র বর্ষ দূরের এই সমুদ্র সৈকত দেখে ।

৫. দমারচর কুমারী সৈকতঃ

খুব সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের কোলে দমার চরে তৈরি হয়েছে এই সৈকতটি । এটি ভার্জিন সী বীচ বা কুমারী সৈকত বলে পরিচিতি লাভ করেছে । দমারচর কুমারী সৈকতের সৌন্দর্য্য অন্য কোন সৈকত থেকে কোন অংশেই কম নয় । বরং অনেকের কাছে এতি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের চেয়েও আকর্ষণীয় মনে হয় । 

অনিন্দসুন্দর কুমারি সমুদ্র সৈকতটি বঙ্গোপসারের কোল ঘেঁষা নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন দমার চরের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত । নিঝুম দ্বীপের সহজ সরল স্থানীয়  লোকেরা এই নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকতকে বলে ‘দেইলা’ বা বালুর স্তুপ । তারা জানেই না যে, আসলে এটা একটা সমুদ্র সৈকত । এখানে আসতে হলে ট্রলার রিজার্ভ করে আসতে হবে । ভাড়া আলোচনা করে নিতে হবে ।

অনিন্দসুন্দর কুমারি সমুদ্র সৈকতটি বঙ্গোপসারের কোল ঘেঁষা নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন দমার চরের দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত । নিঝুম দ্বীপের সহজ সরল স্থানীয়  লোকেরা এই নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকতকে বলে ‘দেইলা’ বা বালুর স্তুপ । তারা জানেই না যে, আসলে এটা একটা সমুদ্র সৈকত।

ক্যাম্পিংঃ 

নিঝুম দ্বীপের সব থেকে বড় আকর্ষণ হচ্ছে এখানকার ক্যাম্পিং ব্যবস্থা। বনবিভাগের পরিচালনায় এখানে রয়েছে ক্যাম্পিং এর সুব্যবস্থা। মাত্র ৫০০ টাকায় একটি তাবুতে দুইজন করে থাকতে পারবেন। নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বনবিভাগের নিরাপত্তা প্রহরী। রয়েছে রাতে ক্যাম্পফায়ার ও বার-বি-কিউ এর সুব্যস্থা। সামুদ্রিক মাছ কিংবা মোরগ দিয়ে সেরে নিতে পারেন সমুদ্রতটে বার বি কিউ এডভেঞ্চার। 

খাবারঃ 

নিঝুম দ্বীপে খাবারের জন্য বড় কোন রেস্টুরেন্ট নেই। ছোট ছোট কয়েকটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে দুপুর ও রাতের খাবার সেরে নেয়া যাবে। ছোট রেস্টুরেন্ট হলেও এখানে বিদ্যুৎ না থাকার বদৌলতে সব খাবারই টাটকা পাওয়া যায়। এখানকার রান্নার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সবাই কড়িকাঠ দিয়ে রান্না করে। আশিক রেস্টুরেন্ট এখানকার মোটামুটি পরিচিত রেস্টুরেন্ট। অন্যান্য রেস্টুরেন্ট থেকে এটির সুনাম বেশ ভাল। এখানকার খাবারের তালিকায় রয়েছে কোরাল মাছ, ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছসহ বেশ কিছু সামুদ্রিক মাছ। এগুলোর দাম পড়বে ৬০-১০০ টাকার মধ্যে। 

দ্বীপে মাত্র ২৫-৩০ টাকা দরে পেয়ে যাবেন সুস্বাদু পানীয় ডাব। খেতে একদমই ভুলবেন না। আরো আছে খেজুরের রস। প্রত্যেক গ্লাস খেজুরের রস মাত্র ২০ টাকা। 

বাহনঃ

অন্যান্য দ্বীপের মতোই এখানকার প্রধান বাহন হচ্ছে মোটরসাইকেল। তবে বেশ কিছু ব্যাটারি চালিত রিক্সাও পাওয়া যায়। অবশ্য রিক্সার চাইতে মোটরসাইকেলে চলাচল করাই বেশি সুবিধাজনক। 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে প্রথমে যেতে হবে হাতিয়া। এরপর হাতিয়া থেকে ট্রলারে করে নিঝুম দ্বীপ। 

প্রতিদিন সন্ধ্যা ৫:৩০ ও ৬ টায় এম ভি তাসরিফ ও এম ভি ফারহান হাতিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পরদিন সকাল ৭ টার দিকে মনপুরা দ্বীপে পৌছায়। সেখানে ১ ঘন্টা যাত্রা বিরতি দিয়ে সকাল ১০টায় পৌছায় হাতিয়ার তমরুদ্দিন ঘাটে। হাতিয়ার তমরুদ্দীন ঘাটে নেমে মোটরবাইকে করে যেতে হবে মোক্তারিয়া ঘাট। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২০০ টাকা। মোক্তারিয়া ঘাট থেকে ট্রলারে যেতে হবে নিঝুম দ্বীপে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২৫ টাকা। 

থাকাঃ

নিঝুম দ্বীপে থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট ও হোটেল। তার মধ্যে নিঝুম রিসোর্ট সবথেকে ভাল মানের রিসোর্ট এছাড়া রয়েছে হোটেল সোহেল, হোটেল শাহিন, 

হোটেল দ্বীপ সম্পদ, হোটেল শেরাটন, ও নিঝুম ড্রিমল্যান্ড রিসোর্ট। খুব সহজেই কোন ঝামেলা ছাড়া www.amarroom.com থেকে হোটেল বুকিং করতে পারবেন।

Travel

মনপুরা দ্বীপ, মেঘনার কূলে ভেসে থাকা একটি দ্বীপ !

11

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যে পরিপাটি করে সাজানো আমাদের এ দেশ । পাহাড়, নদী, সাগর ও দ্বীপের অপূর্ব মিশেলে সত্যিকারের পূর্ণতা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ । এই সৌন্দর্য্যের একটা বিরাট অংশ নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে একটি দ্বীপ, যার নাম মনপুরা ।

এর নামের মধ্যে যেমন রয়েছে ঐশ্বর্য্য তেমনি রয়েছে মনকে প্রজাপতির রঙে রাঙিয়ে দেয়ার মতো অফুরন্ত সৌন্দর্য্য । রয়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মতো অপার রূপবৈচিত্র । প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের বৈচিত্রে ভরপুর এ দ্বীপটি দিতে পারে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝখানে অফুরন্ত সজীবতা । দ্বীপের পাড়ে দাড়িয়ে ভোরের সূর্যোদয় ও স্নিগ্ধ আলোয় রয়েছে শত বছরের প্রশান্তি । ক্লান্ত শ্রান্ত মনকে সজীব করে দেয়ার বিশাল এক মায়া । মেঘনার কূলে ভেসে থাকা এই দ্বীপের পাড়ে দাড়িয়ে শেষ বিকেলের অন্তিম লগ্নে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ডুব দেয় তখন মনে হবেনা এটি এ ধরণীর কোন দৃশ্য ।

দৈবালোকের অসীম আনন্দে ছাপিয়ে যাবে হৃদয় । রাতে দ্বীপের কিনারায় বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনের সাথে জোছনা অবলোকন করতে করতে পাওয়া যায় অনাবিল প্রশান্তি ।

হরিণের পালের ক্লান্তিহীন ছুটোছুটি যে অনাবিল আনন্দ দিবে তা আর পৃথিবীর কোথাও খোজে পাওয়া যাবেনা । দ্বীপটির মাইলের পর মাইল সাজানো হাজার হাজার বৃক্ষরাজি গুলো ঠায় দাড়িয়ে আছে শিল্পীর ক্যানভাসের মতো । দেখে মনে হয় কোন শিল্পী যেন তুলি দিয়ে নিজ হাতে অপরূপ এই ক্যানভাসটি সাজিয়েছেন । 

শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে দ্বীপটির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায় কয়েকগুন । পাখির কিচির মিচির শব্দে মূখরিত থাকে পুরো দ্বীপ । বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতের পাখি দ্বীপটিতে আসে । তারা দ্বীপকে ঘিরে তৈরি করে অসম্ভব মায়াবী এক পরিবেশ । 

অবস্থানঃ

মনপুরা দ্বীপ ভোলা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ । এটি দ্বীপ জেলা ভোলার অন্তর্গত একটি উপজেলা । ৪টি ইউনিয়ন ও ছোট বড় ১০-১২টি চর নিয়ে প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো দ্বীপটি ভেসে আছে মেঘনার কূল ঘেসে । এর ৩ দিকে রয়েছে মেঘনা নদী এবং অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর । এই দ্বীপের চরগুলিতে ৬ মাস থাকে লবনাক্ত পানি ও ৬ মাস থাকে মিঠা পানি । এটি এই দ্বীপের একটি আশ্চর্য্যজনক বৈশিষ্ট্য । ৩৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের  এ দ্বীপটি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে দিন দিন বিস্তৃতি হারাচ্ছে । মনপুরা রক্ষায় ৭৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয় । যার অর্ধেকের বেশি মেঘনার গহবরে বিলীন হয়ে গেছে । প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসতি রয়েছে মনপুরায় । মানুষগুলি খুবই সহজ সরল আর মিশুক প্রকৃতির । পর্যটকদের তারা মন খুলে সাহায্য করেন । এই দ্বীপে নেই কোন চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয় ।

দ্বীপের ৮০ ভাগ লোকই কৃষক ও মৎসজীবি । নিজেরা জাল বুনে সেই জাল দিয়ে মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণ করে । ইলিশ মাছ,পোয়া মাছ,পাঙ্গাস মাছসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ ধরে বিক্রি করে ও নিজেরা খায় । বাকিরা রয়েছেন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত । মৌসুমভেদে তারা বিভিন ধরনের শাক সবজি ও ধান ফলান । অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ রয়েছেন যারা গরু ও মহিষের দুধ বিক্রি করেন । মনপুরার বিভিন্ন চরে অসংখ্য গরু ও মহিষ চরানো হয় । এসব চর গুলোতে শুধু রাখালরাই থাকে । তারা গরু ও মহিষের দেখাশুনা করে । রাখালরা একটি বিশেষ ধরনের উচু মাঁচাতে থাকে যার স্থানীয় নাম “বাথান” । বাথানের ভিতরেই থাকে রান্নাবান্নার অসম্ভব সুন্দর ব্যবস্থা । তারা প্রতিদিন পাইকারি বিক্রেতার কাছে দুধ বিক্রি করে । পাইকারি বিক্রেতা সেটা বিক্রি করে মূল দ্বীপের বাসিন্দাদের কাছে ।

মনপুরার প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ । এখানে বিদ্যুতের কোন সুব্যবস্থা নেই বললেই চলে । সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বিকেল ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বিদ্যুত সরবরাহ করা হয় । এই সময়টাতেই সবাই মোবাইল,টর্চ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ দিয়ে থাকে ।

ইতিহাসঃ

মনপুরার ইতিহাস ৬০০ বছরের পুরনো । ষোড়শ শতাব্দীতে এই দ্বীপটি চন্দ্রদ্বীপের (বর্তমান বরিশাল) অন্তর্গত একটি জমিদারি এলাকা ছিল । সেই সময়ে কয়েকজন পর্তুগিজ পর্যটক ঘুরতে আসেন জনমানবহীন এই দ্বীপে । দ্বীপের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে পর্যটকগণ ১৫১৭ সালের দিকে তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এটিকে নির্বাচিত করেন । তখন থেকে শুরু হয় মনপুরায় বসতি । এখনও মনপুরায় পাওয়া যায় ৬০০ বছর আগের পর্তুগিজদের বসবাসের স্মৃতিচিহ্ন । তাদের নিয়ে আসা বিশেষ প্রজাতির কুকুরের দেখা মিলে মনপুরার আনাচে কানাচে । লম্বা লোমওয়ালা এসব কুকুর বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যায়না ।

মনপুরার নামকরণে কয়েকটি আলাদা মত রয়েছে । একদল মনে করেন দ্বীপের সৌন্দর্য্য পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিত বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল মনপুরা । আরেকদল মনে করেন এই দ্বীপে মনগাজি নামে একজন মাঝি বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান । তার নামানুসারে দ্বীপের নাম হয়ে যায় মনপুরা । তবে ঐতিহাসিক বেভারিজ দুইটি মতের সাথেই দ্বিমত পোষণ করেন । তিনি মনে করেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মনগাজী নামে একজন জমিদার এই দ্বীপটি লিজ নেন । তখন থেকে এই দ্বীপের নাম মনপুরা । নামকরণের ইতিহাস যাই হোক যুগে যুগে মনপুরার সৌন্দর্য্য পর্যটকদের মনকে ভরিয়ে দিয়েছে এটি চিরন্তন সত্য ।

মনপুরায় কি কি দেখবেন ?

মনপুরায় ছোট বড় মিলিয়ে রয়েছে ২০টি ম্যানগ্রোভ বন। যেখানে রয়েছে প্রায় ১ কোটি জীবিত গাছ । এসব ম্যানগ্রোভ বনের ভিতরে রয়েছে মায়া হরিণের বাস । দ্বীপটির হরিণের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার । যারা ট্র‍্যাকিং করতে পছন্দ করেন তাদের পছন্দের তালিকায় ম্যানগ্রোভ বনগুলো শীর্ষে রাখাই বাঞ্চনীয় । বনের ভিতর সবুজের সমারোহ অবলোকন করতে করতে দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণের বিশাল পালের সাথে ।

দ্বীপ থেকে নদীর ভেতরে ৫০০ মিটার বিস্তৃত ল্যান্ডিং স্টেশন পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে । এর শেষ মাথায় দাড়িয়ে নদীর স্রোত ও ঢেউয়ের আওয়াজের সাথে পাখির কলতান যুক্ত হয়ে অদ্ভুত এক মায়াবি পরিবেশ সৃষ্টি করে । এখানে দাড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে মোটেও ভুলে যাবেন না । সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ডুব দিবে তখন মনে হবে সূর্যটা বুঝি নদীতেই ডুব দিল ।

ঘুরে আসতে পারেন চৌধুরী প্রজেক্ট থেকে । এটি একটি মাছের ঘের । এখানে রয়েছে ছোট বড় ৫টি পুকুর । পুকুর পাড়ে রয়েছে প্রায় ২ হাজার নারিকেল গাছ । নারিকেল গাছ গুলোর সৌন্দর্য্য নিজ চোখে না দেখলে কল্পনা করা সম্ভব নয় ।

যারা নৌকায় চড়তে পছন্দ করেন তারা নৌকা নিয়ে চলে যেতে পারেন ছোট ছোট চরে । সেখানে স্বচক্ষে দেখে আসতে পারেন কিভাবে “মাথানে” রাখালরা তাদের জীবন যাপন করে । মাথানের পরিপাটি জীবন ব্যাবস্থা মুগ্ধতা ছড়াবে । মাথানের সৌন্দর্য্য দেখে মনে হতেই পারে, আহা ! এখানে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলে মন্দ হতোনা ।

মাছ ধরা নৌকার সাথে চলে যেতে পারেন মেঘনাতে । যেকোন জেলেকে বললেই সাথে করে নিয়ে যাবে । যারা রোমাঞ্চপ্রিয় তারা কোনভাবেই মাছ ধরার রোমাঞ্চটা মিস করবেন না । আর যারা নদীতে যেতে ভয় পান । তারাও হতাশ হবেন না । এখানকার বাজারগুলোতে বিশেষ ধরনের মাছ ধরার যন্ত্র রয়েছে । স্থানীয়রা এটাকে ডাকেন “ফানুশ” । ফানুশের চারিদিক গ্লাস দিয়ে তৈরি । ফলে আলো রিফ্লেক্ট করে মাছকে আকর্ষণ করে । এটি দিয়ে সহজেই মাছ ধরা যায় । 

এছাড়াও সাথে করে বরশি নিয়ে যেতে পারেন । ছোট বড় অনেক মাছ ধরতে পারবেন । 

এগুলো ছাড়াও এই দ্বীপের আরেকটি বড় আকর্ষণ হচ্ছে ক্যাম্পিং । মনপুরা ক্যাম্পিং এর জন্য আদর্শ জায়গা । নদীর পাশে ক্যাম্পিং এবং সাথে বার বি কিউ পার্টি অসাধারণ আমেজ সৃষ্টি করে । 

বাহনঃ

মনপুরার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা অনুন্নত । মোটর সাইকেলের উপরই পর্যটকদের নির্ভর করতে হয় । এছাড়াও কিছু সংখ্যক অটো ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা রয়েছে । পুরোদিনের জন্য এগুলোর ভাড়া পড়বে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা । 

খাবারঃ

মনপুরায় সকালে নেমেই চা দিয়ে দিনটা শুরু করুন । কারণ মনপুরার চা হচ্ছে খাটি মহিষের দুধের তৈরি । এর অতুলনীয় স্বাদ মনে গেথে থাকবে অনেক দিন । শুধু মহিষের দুধের চা না, মনপুরায় পাওয়া যায় মহিষের দুধের তৈরি দই । এটি চেখে দেখতে মোটেও ভুলবেন না । 

বাজার গুলোতে আরো পাবেন খঁাটি দুধের ছানায় তৈরি সুস্বাদু মিষ্টি । শীতের মৌসুমে মনপুরায় খেজুরের রস পাওয়া যায় ।

দুপুর ও রাতের খাবারে রেগুলার আইটেমের পাশাপাশি পাওয়া যায় হাসের মাংস, টাটকা ইলিশ মাছের তরকারি ও কোরাল মাছ । 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে ৩টি রুটে মনপুরায় যাওয়া যায় । 

প্রথমটি হচ্ছে-

ঢাকা থেকে প্রথমে লঞ্চে করে ভোলা আসতে হবে । ভোলার তজুমদ্দিন ঘাট থেকে সি-ট্রাক মনপুরার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । সি-ট্রাকটি তজুমদ্দিন ঘাট থেকে দৈনিক বিকাল ৩টায় ছাড়ে এবং মনপুরা থেকে ছাড়ে সকাল ১০টায় ।

২য়টি হচ্ছে-

ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়াঘাট থেকে মনপুরার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন দুটি লঞ্চ ছেড়ে যায় । এগুলোর মাধ্যমেও আসা যাবে । তবে এই দুটি রুটে আসাই একটু বিরক্তিকর হবে । 

সব থেকে সুবিধাজনক উপায় হচ্ছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সরাসরি মনপুরা চলে আসা । 

এমভি ফারহান ও এমভি তাসরিফ নামের দুটি বিলাসবহুল লঞ্চ হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যথাক্রমে ৫:৩০ মিনিটে ও ৬:০০টায় ছাড়ে । লঞ্চগুলো সকাল ৭টার দিকে মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাটে পৌছায় । ১ ঘন্টা যাত্রাবিরতি দিয়ে আবার হাতিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে । ওইদিনই ১:৩০ এর দিকে লঞ্চ গুলো ফিরে আসে মনপুরায় ।

লঞ্চ গুলোর সিংগেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার টাকা, ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৮০০ টাকা, ভি আই পি কেবিনের ভাড়া পরবে ৫ হাজার টাকা এবং ডেকের ভাড়া মাত্র ৩০০ টাকা । 

থাকাঃ

মনপুরায় থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল ও ডাকবাংলো। অন্যান্য ট্যুরিস্ট স্পটের তুলনায় এখানকার হোটেল ভাড়া বেশ কম । আপনি www.amarroom.com এর মাধ্যমে সহজেই কোন ঝামেলা ছাড়া হোটেল বা বাংলো বুক করতে পারবেন ।

Travel

কান্তজীর মন্দির, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আশ্চর্য্য এক উদাহরণ !

photo_2019-12-02_15-37-49

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আশ্চর্য্য এক উদাহরণ কান্তজীর মন্দির । আঠারো শতকে নির্মিত এই মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে বিশাল এক বিস্ময়ের নাম । বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই মন্দিরটি দর্শনার্থীদের চোখ জোড়ায় ক্ষণিকেই । এর পরতে পরতে রয়েছে মধ্যযুগীয় শিল্পের ছোঁয়া । এর আশ্চর্য্য কারুকাজ বিস্ময়ের অভিব্যক্তি জাগায় সকলের মাঝে । মন্দিরের টেরাকোটার চিত্রগল্প শিহরিত করে দর্শনার্থীদের । এর শৈল্পিক আঁচ মন হরণ করে সুন্দরের পুজারীদের। টেরাকোটায় আচ্ছাদিত মন্দিরটি দেখলে মনে হবে এ যেন শিল্পখচিত পৌরাণিক মহাকাব্যের দৃশ্যমান উপস্থাপনা ।

ইটের তৈরি এই মন্দিরের সৌন্দর্য্য শুধু টেরাকোটায়ই নয় এর স্থাপত্যশৈলীও মুগ্ধ করার মতো । আঠারো শতকের স্থাপত্যশৈলী সাথে পোড়ামাটির কারুকাজ । এ যেন চোখের সামনেই চকচক করছে ইতিহাস । স্থাপত্য রীতি, গঠন বিন্যাস, শিল্পচাতুর্য মন্দিরটিকে এতই মাধুর্য্যমণ্ডিত করে তুলেছে যে এর চেয়ে নয়নাভিরাম মন্দির বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই ।

পোড়ামাটির অলংকরণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের  বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি মন্দিরের গায়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । অপুর্ব সুন্দর এই মন্দিরটিতে রয়েছে ১৮ হাজারের মতো টেরাকোটার ফলক । বাংলাদেশে এরকম টেরাকোটায় সাজানো মন্দির একটিই আছে । এমনকি বাংলাদেশের সর্বোৎকৃষ্ট টেরাকোটার নিদর্শন বলা হয় এই মন্দিরকে । 

পুরো মন্দিরে মধ্যযুগের কবি বরু চন্ডিদাসের শ্রী কৃষ্ণ কীর্ত্তনের বয়ান ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিল্পীরা । চোখ জোড়ানো মাটির ফলকে গল্পের আকারে সাজানো হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, পান্ডবদের জীবনাচার, শ্রীকৃষ্ণের শৈশব থেকে দেবতা হয়ে ওঠার গল্প । শুধু পৌরাণিক কাহিনিই নয় এসব ফলকে উঠে এসেছে মোঘল শাসন ব্যাবস্থা ও সামাজিক রীতিনীতির নানা চিত্র ।

মন্দিরের বৈশিষ্ট্যঃ

ঢেপা নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা কান্তজীর মন্দিরকে কান্তজীউ মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নামেও ডাকা হয় । চমৎকার এই ধর্মীয় স্থাপনাকে নবরত্ন মন্দিরও বলা হয় । অনেকটা পিরামিড আকৃতির এই মন্দিরটি ৩টি ধাপে উপরে উঠে গিয়েছে । ৩ ধাপের কোণগুলির উপরে মোট নয়টি অলংকৃত শিখর বা চূড়া ছিল । যা দূর থেকে মনে হতো প্রকান্ড ভিত্তির উপর অলংকৃত রত্ন । একারণেই এটিকে ডাকা হতো নবরত্ন মন্দির । তবে দূর্ভাগ্যবশত ভুমিকম্পের কবলে পড়ে চুড়াগুলো এখন অস্তিত্বহীন । 

মন্দিরের দেবমূর্তিগুলোকে চতুর্দিকের সবগুলো খিলান দিয়েই অবলোকন করা যায় । মন্দিরের প্রাঙ্গণটি অনেকটা আয়তাকার । তবে পাথরের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো মন্দিরটি বর্গাকার । মন্দিরটির বর্তমান উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট । নিচতলায় রয়ছে বেশ কয়েকটি প্রবেশ পথ । প্রবেশপথে রয়েছে অসংখ্য খাঁজযুক্ত খিলান । খিলানগুলোকে দৃষ্টিনন্দন দুটি স্তম্ভ দ্বারা আলাদা করা হয়েছে । চোখ জোড়ানো অলংকরণযুক্ত স্তম্ভগুলো খুবই নান্দনিক ও প্রশংসনীয় । উপরে উঠার সিড়ি রয়েছে মন্দিরের পশ্চিম দিকের বারান্দায় । মন্দিরের নিচতলায় রয়ছে ২১টি খিলান । দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় রয়েছে যথাক্রমে ২৭টি ও ৩ টি খিলান । ২০ শতকের শুরুর দিকে ভুমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর চুড়া বা শিখর বাদ দিয়েই মহারাজা গিরিজানাথ বাহাদুর সংস্কার করেন মন্দিরটি । 

মন্দিরের অভ্যন্তরে রয়েছে বৃন্দাবন থেকে নিয়ে আসা কৃষ্ণের মূর্তি সহ বিভিন্ন দেব দেবির মূর্তি । রয়েছে শিব মন্দির ।

মন্দিরে আরো রয়েছে পাথরের উপরে লিখা বিভিন্ন প্রাচীন শ্লোক । 

ইতিহাসঃ

সনাতন ধর্মাবলম্বী দেবতা কান্ত বা কৃষ্ণের নামানুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয়েছিল কান্তজীর মন্দির বা কান্তজীউ মন্দির। মন্দিরের স্থাপনার সময় নিয়ে ছিল বিভিন্ন মতভেদ । তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে এই মতভেদের অবসান ঘটে । প্রত্নতাত্ত্বিকরা মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানতে পারেন ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির স্থাপনার কাজ শুরু হয় ।  তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় মন্দিরটির স্থাপনা কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিল্পীরা এসে তাদের নিপুণ হাতে শুরু করেন মন্দিরের টেরাকোটার কাজ । মন্দির তৈরির কাজ সমাপ্ত না হতেই মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে মারা যান । তবে রামনাথ রায়ের শেষ ইচ্ছানুযায়ী মহারাজার স্ত্রী রূপমিনির আদেশে তাদের দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করেন । ৪৮ বছরে নির্মিত হয় কালের সেরা মন্দির । নির্মান শেষে মন্দিরের উচ্চতা ছিলো ৭০ ফুট । ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ভূমিকম্পের কারণে চূড়াগুলো পুরোপুরি ভেঙে যায় ও মন্দিরের অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে । চূড়াগুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় এটির বর্তমান উচ্চতা ৫০ ফুটে দাড়িয়েছে । 

সমতল থেকে মন্দিরটির ভিত্তিভূমির উচ্চতা ৩ ফুট। মেঝেতে ওঠার জন্য রয়েছে পাঁচ ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি । মন্দির ভবনের আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৬০০ ফুট । 

বর্তমানে এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংগঠন ইসকন ।

অবস্থানঃ 

কান্তনগর নামে পরিচিত এই এলাকার কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে ঢেপা নদী । সাঁওতাল ও শহুরে মানুষের মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ । দিনাজপুর শহর থেকে ১৪ মাইল উত্তরের কান্তজির মন্দিরটি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ।

দিনাজপুর শহর থেকে দুই ধারে গাছপালাবেষ্টিত সরু রাস্তা ধরে যখন কান্তজির মন্দিরে যাবেন তখন নিজের ভেতরে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি অনুভব করবেন । যে প্রশান্তির কোন তুলনা হয়না ।

রাসমেলাঃ

কান্তজিউ মন্দিরের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর নভেম্বের মাসে রাস পূর্ণিমায় এখানে বসে রাস মেলা । কান্তজি মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই রাস মেলা চলে মাসব্যাপী । মেলায় ভিড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থী । রাস মেলা উপলক্ষ্যে দিনাজপুরের রাজবাড়ি থেকে কান্তজি বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় । মন্দিরে রাসমেলা চলাকালীন জায়গাটার গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুগুন । পূন্যার্থী ও দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ । যেন রাস মেলা নয়, বসেছে আধ্যাত্মিক মিলন মেলা । মেলা উপলক্ষ্যে বসে বিভিন্ন ছোট ছোট দোকান । এসব দোকানে পাওয়া যায় পূজার বিভিন্ন উপকরণসহ বাচ্ছাদের বিভিন্ন ধরনের খেলনা । আছাড়াও থাকে মেয়েদের চুড়ি শাখাসহ বিভিন্ন কসমেটিকস । আরো পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠাসহ অন্যান্য মুখরোচক খাবার ।

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেনে দিনাজপুর যাওয়া যায় । ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে কেয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, নাবিল পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদি বাসগুলো দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । এসি বাসগুলোর ভাড়া পড়বে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা । নন এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৫০০-৬০০ টাকা । এছাড়াও উত্তরা থেকে বেশকিছু বাস দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেশ কিছু ট্রেন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । “দ্রুতযান এক্সপ্রেস” ট্রেন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রাত ৮ টায় ঢাকা ছেড়ে যায় । “একতা এক্সপ্রেস” সকাল ১০ টায় ঢাকা ছাড়ে । আর “পঞ্চগড় এক্সপ্রেস” ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে যায় বেলা ১২ টা ১০ মিনিটে । শ্রেনীভেদে এসব ট্রেনের টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা । দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস স্টেশন নেমে পীরগঞ্জের বাসে উঠে কান্তনগর নামতে হবে । সময় লাগবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট । কান্তনগর নেমে ঢেপা নদী পার হয়ে একটু সামনে হাটলেই চোখে পড়বে কান্তজীর মন্দিরটি । শীতের সময় নদী পায়ে হেঁটেই পার হওয়া যায় । আর বর্ষায় পার হতে হয় নৌকা দিয়ে । 

কোথায় খাবেনঃ

দিনাজপুরে খাবারের জন্য রয়েছে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ । রুস্তম রেস্টুরেন্ট, ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট, দিলশাদ রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন ধরনের তরকারি পাওয়া যায় । আরো পাওয়া যায় বিখ্যাত কাঠি কাবাব । এছাড়া দিলশাদ রেস্তোরাঁর পাটিসাপটার সুনাম শহরজোড়া ।

দিনাজপুরে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা পাওয়া যায় । তার মধ্যে ভাপা পিঠা, চিতল পিঠা ও জামাই পিঠা অন্যতম । দিনাজপুর গেলে কেউই এই পিঠাগুলো চেখে দেখতে ভুলবেন না ।

কোথায় থাকবেনঃ

দিনাজপুর শহরে ভাল মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে । সব থেকে ভাল হোটেল হচ্ছে “পর্যটন মোটেল” । পর্যটন মোটেলের ভাড়া পড়বে রুমভেদে ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা । রুম বুকিং করুতে এখনি যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে । আর নিশ্চিত করুন ভাবনাহীন ভ্রমণ ।

পর্যটন মোটেল ছাড়াও আরো একধিক সাশ্রয়ী হোটেল রয়েছে দিনাজপুরে । এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- হোটেল ডায়মন্ড, হোটেল আর রশীদ, হোটেল রেহানা, হোটেল নবীন ইত্যাদি ।  এই হোটেল গুলোও খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে বুকিং দিতে পারবেন ।

Travel

Top 8 Visiting Places Near Dhaka

12Sadarbari (Sardar Bari) Rajbari palace, Folk Arts Museum in Sonargaon town, Bangladesh

Living in Dhaka might seem depressing at times, mainly due to traffic and chaos. We know, sometimes even you think of quitting everything and go someplace quiet and peaceful. Well, you cannot go for hill climbing or sea surfing, but there are some great visiting places near Dhaka that you shouldn’t miss.

We will not suggest you names that are far away from the capital rather almost all the places on our list today would be fairly close, and you can make a round trip within a day. Some of these places are so magnificent that they can be included in the list of the best tourist places in Bangladesh.

Travel

Tanguar Haor Tour Guide – A Short Overview

Blog-Tanguar-Haor-4

Tanguar haor is found within the Dharmapasha and Tahirpur upazilas of Sunamganj District in Bangladesh, is an interesting wetland environment of national significance and has come into worldwide focus. The range of Tanguar haor counting 46 towns inside the haor is almost 100 km2 of which 2,802.36 ha2 is wetland. It is the source of job for more than 40,000 individuals. The Government of Bangladesh announced Tanguar haor as an Environmentally Basic Zone in 1999 considering its basic condition as a result of overexploitation of its normal assets. In 2000, the hoar bowl was pronounced a Ramsar location – wetland of worldwide significance. With this affirmation, the Government is committed to protect its characteristic assets and has taken a few steps for assurance of this wetland.

In case you’ll be able oversee at slightest 2 days & 3 night out of your chaotic mechanical life and want to spend a few quality time within the heart of the nature at that point, Expensive reader, Tanguar Haor in Sonam Ganj is the perfect spot you’ll be able ever inquire for. Here you’ll be able get to see and live Mountains, Hillocks, Haor (Characteristic Lakes) all within the same put.

Travel

চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে

sremongol feature Images

ছোটবেলায় টিভিতে ফিনলে ও ইস্পাহানী টি ব্যাগের বিজ্ঞাপনে দেখতাম চা-বাগানের ভেতর আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে মানুষ জন চায়ের পাতা তুলতো। একটা লম্বা ঝুড়ি পিছনে রেখে, কপালে বেঁধে। কিশোর বয়সে এই মনোরম দৃশ্য রেখে খুব আগ্রহ জন্মে আবার চা বাগান দেখার। পারিবারিক ভাবে আর যাওয়ার সুযোগ আসে নাই।