Travel

প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল !

borishal

ধান নদী খাল, তিনে মিলে বরিশাল । বরিশাল নাম আসলেই চোখের সামনে ভাসে বড় বড় নদী ও ছোট ছোট খাল । প্রাচ্যের ভেনিস নামেই সমধিক পরিচিত বাংলাদেশের এই জেলাটি । বরিশাল মানেই কীর্তনখোলা নদী আর বড় বড় লঞ্চ ও স্টিমার । চোখ ধাধানো মন মাতানো সব দর্শনীয় স্থান বুকে নিয়ে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে আছে জেলাটি । হাজার বছরের ইতিহাস সাথে প্রাকৃতিক সাম্রাজ্য মিলে তৈরি হয়েছে বরিশাল । বরিশাল নামকরণের খুব সুন্দর একটি ইতিহাস রয়েছে । ব্রিটিশ শাসনামলে এখানের তৈরি লবণকে বলা হতো বরি সল্ট । সেই বরি সল্ট থেকে কালক্রমে নাম হয়ে ওঠে বরিশাল । এর নামকরণের ইতিহাস যত সুন্দর তার থেকেও সুন্দর তার রূপ । বরিশালের পথে যাত্রা দিয়েই শুরু হয় বরিশালের সৌন্দর্য্য সুধা পান । নদীর ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে ছোটে চলা লঞ্চে যে কল্পনাতীত ভাললাগার অনুভূতি তৈরি হয় তা কল্পনাকেও হার মানায় । নৈসর্গিক সৌন্দর্যের শহরের যাত্রা শুরু হয় অসম্ভব ভাল লাগা দিয়ে । এই শহরেই জন্মেছিলেন প্রেমের কবি জীবনানন্দ দাশ । সবুজ বেষ্টনী ঘেরা এই শহরেই বেড়ে ওঠেছিলেন জননেতা এ. কে. ফজলুল হক । এছাড়া বাংলার অসংখ্য কৃতি সন্তানের জন্মভূমি এ বরিশাল । প্রাচীন আমলে চন্দ্রদ্বীপ নামে পরিচিত এই শহরটিতে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারা বাজার । নিজ নিজ নৌকাতে করে পেয়ারা বাগান থেকে মাঝিরা পেয়ারা নিয়ে আসে বিক্রির জন্য । পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে এরকম বাজারের অস্তিত্ব থাকলেও আমাদের দেশে এই একটি মাত্র ভাসমান বাজার রয়েছে । 

বরিশালের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বরিশালে রয়ছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান ।সেগুলোর মধ্যে ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের প্রথম পছন্দগুলিকে দেয়া হল। 

কীর্তনখোলা নদীঃ 

কীর্তনখোলা বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত একটি নদী । কীর্তনখোলা নদীকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠেছে বরিশাল জেলা । এই নদীর কাছে বরিশালবাসীর হাজার বছরের ঋণ । কীর্তনখোলা নদী দিয়েই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে বিভাগীয় এ শহরটি । কীর্তনখোলা নদীর উপরে বরিশাল নদী বন্দর অবস্থিত । এটি বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম নদী-বন্দর । নদীটির সূচনা হয়েছে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ এলাকা থেকে । নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার । নদীটি সবচেয়ে প্রশস্ত নলছিটি এলাকায় । এ জায়গায় নদীটির প্রস্থ প্রায় আধা কিলোমিটার । ব্রিটিশ শাসনামলে নদীটি আরো বেশি প্রমত্তা ছিলো । সেসময়ে এর প্রস্থ ছিলো ১ কিলোমিটারের মতো । গত শতাব্দী ধরে নদীটির প্রস্থ ও নাব্যতা কমে গেলেও এর সৌন্দর্য্য হারায়নি এক বিন্দুও । বরং কালে কালে এর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগণে ।

কড়াপুর মিয়া বাড়ি মসজিদঃ 

কড়াপুর মিয়া বাড়ি মসজিদ বরিশালের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন । মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি বরিশাল সদরের কড়াপুর এলাকায় অবস্থিত । দোতলাবিশিষ্ট বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই মসজিদে রয়েছে মোট ৯টি দরজা, ৩টি গম্বুজ ও ২০টি ছোট বড় মিনার ।
মোঘল স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদটি নির্মাণে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস । ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে তখনকার জমিদার হায়াত মাহমুদকে প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয় এবং তার জমিদারিও কেড়ে নেয়া হয় । সুদীর্ঘ ষোল বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি এই দোতলা মসজিদটি নির্মাণ করেন ।
মসজিদটি কাশিপুর চৌমাথা থেকে ৩.৫ কিলোমিটার দূরত্বে উত্তর কড়াপুরে অবস্থিত ।
দর্শনার্থীরা কাশিপুর থেকে সিএনজি অথবা  আলফা গাড়িতে করে মসজিদটিতে আসতে পারবেন ।

 
আবদুর রব সেরনিয়াবাদ সেতুঃ
মুক্তিযুদ্ধে নিহত বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব সেরনিয়াবাদের নামানুসারে এই সেতুর নামকরণ করা হয় । বরিশাল জেলার সবথেকে বড় সেতু এটি। সেতুটির উপর থেকে কীর্তনখোলার আসল রূপ ও সৌন্দর্য্য দর্শন করা যায় । বরিশাল জেলা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দক্ষিনে কর্ণকাঠি এলাকায় অবস্থিত এই সেতুটিতে সিএনজি যোগে আসা যাবে । 

দুর্গাসাগর দিঘীঃ 

চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যে ২০০ বছর শাসন করেছেন বিভিন্ন রাজারা । পুরো বরিশালজুড়ে তাদের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এরকমই একটি নিদর্শন দুর্গাসাগর দিঘী । ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন, ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ন রায় এই দিঘীটি খনন করেন । দিঘীটির ইতিহাসে রয়েছে প্রেমের এক অসাধারণ কাহিনি । বাংলা বারো ভুইয়াদের একজন রাজা শিব নারায়ন রায় স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে এই দিঘীটি খনন করেন । কথিত আছে, রাজার অনুরোধে রানী দূর্গাবতী যতটুকু জায়গা না থেমে হেটেছিলেন ততটুকু জায়গাজুড়ে এই দিঘীটি খনন করা হয়েছিল । রানী দূর্গাবতীর নামেই দীঘিটির নামকরন করা হয় দুর্গাসাগর দীঘি । সরকারী হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দীঘিটি ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমিতে অবস্থিত ।


শেরেবাংলা কে ফজলুল হক জাদুঘরঃ
দুর্গাসাগর দিঘীর অদূরেই রয়েছে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জাদুঘর । বানারীপড়ার চাখারে অবিস্থিত এ জাদুঘরটি শেরেবাংলার জন্মভিটাকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে । 

বিবির পুকুরঃ 

শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কৃত্রিম জলাশয় বিবির পুকুর । নজরকাড়া এই পুকুরের রয়েছে একটি অসাধারণ ইতিহাস । ব্রিটিশ শাসনামলে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা বরিশালে আসে । উইলিয়াম কেরি নামক একজন ধর্মপ্রচারক পর্তুগিজ দস্যুদের কাছ থেকে জিন্নাত বিবি নামের এক মুসলিম মেয়েকে উদ্ধার করেন । কেরি মেয়েটিকে পালিত মেয়ে হিসেবে লালন পালন করেন । ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জিন্নাত বিবি তৎকালীন সময়ে জনগণের জলকষ্ট দূর করার জন্য জলাশয় খনন করেন । তখন থেকেই এই পুকুরটি বিবির পুকুর নামে পরিচিতি পায় । 

লাকুটিয়া জমিদার বাড়িঃ

৩০০ বছরের পুরনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি বরিশাল শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে লাকুটিয়া গ্রামে অবস্থিত । ১৭০০ সালে রুপচন্দ্র রায়ের পুত্র রাজতন্ত্র রায় নির্মান করেন ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি । লাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি মঠ, সুবিশাল দীঘি এবং সবুজের সমারোহে পরিপূর্ণ একটি মাঠ । উনিশ শতকেও জমিদার রাজচন্দ্র রায়ের এই জমিদার বাড়িটি এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল । কিন্তু কালক্রমে সবই এখন মরচে পড়া স্মৃতি ।
লাকুটিয়া জমিদার বাড়িতে যেতে হলে
বরিশাল শহরের নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে । সেখান থেকে শ্মশান মোড়ে এসে লাকুটিয়া বাবুরহাটে যাওয়ার সিএনজি অথবা টেম্পোতে করে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে । ভাড়া পড়বে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা ।
গুটিয়া মসজিদঃ



বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কপথে উজিরপুর উপজেলা । সড়কের পাশে গুঠিয়ার চাংগুরিয়া গ্রাম । এ গ্রামেই আছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ মসজিদ । শিক্ষানুরাগী এস. সরফুদ্দিন আহম্মেদ সান্টু চাংগুরিয়ার নিজবাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির উপর তৈরি করেন এই মসজিদটি । 

২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মসজিদটিতে রয়েছে একটি সুবিশাল মিনার, প্রায় ২০ হাজার অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ্, এতিমখানা, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, বিশাল পুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান ।  মসজিদ লাগোয়া মিনারটির উচ্চতা ১৯৩ফুট । ঈদগাহের প্রবেশ পথের দুই ধারে দুটি ফোয়ারা রয়েছে । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় মসজিদের নির্মাণ কাজে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার শ্রমিক নেওন্তর কাজ করেছে ।

৩০ গোডাউন (রিভার ভিউ পার্ক বধ্যভূমি) :


বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এর বিপরীতে অবিস্থিত ৩০ গোডাউন এলাকা । এখানে রয়েছে বধ্যভূমি ও রিভার ভিউ পার্ক। কীর্তণখোলা নদীর ধারে অবস্থিত এই পার্ক সহজেই দর্শনার্থীদের মন কাড়ে । বরিশাল সদর থেকে রিক্সা যোগে ১০ মিনিটেই পৌছে যাওয়া যাবে ৩০ গোডাউন । ভাড়া পড়বে ২০ টাকা । 


 হিজল তলার বিলঃ 

একই সাথে ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক একটা স্থান হিজল তলার বিল । এই বিলে অতি প্রাচীন দুটি হিজল গাছ আছে যার বয়স প্রায় ১২০ বছর । গাছগুলো একটি বিলের মধ্যে ঠায় দাড়িয়ে আছে । তাই বিলের নামটিও হয়েছে হিজল তলা বিল । এখানে আসলে দর্শনার্থীদের চোখ ক্ষনিকেই ধাধিয়ে যায় । 

এখানে আসতে ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চে সফিপুর নামতে হবে । সফিপুর ইউনিয়নের ৩ ও ৪নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এই বিলটি ।

ব্রজমোহন কলেজঃ 

কালের স্বাক্ষী এই ব্রজমোহন কলেজ । বরিশালের বেশিরভাগ নামি-দামি ব্যাক্তিত্ব এই কলেজ থেকে অধ্যয়ন করেছেন । 

 জীবনানন্দ দাশ এর বাড়িঃ 

প্রেমের কবি বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশের জন্মস্থান এই বরিশালে । বরিশাল সদরেই তার বসতভিটা । লঞ্চঘাট থেকে রিক্সাযোগে অথবা পায়ে হেটেই যাওয়া যাবে জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে ।

অক্সফোর্ড মিশন গীর্জাঃ 

বরিশাল সদরে অবস্থিত বেশ পুরোনো গীর্জা -অক্সফোর্ড মিশন গীর্জা । বরিশাল শহরেই এই গীর্জাটির অবস্থান । 

 বঙ্গবন্ধু উদ্যান বা বেলস পার্কঃ 

পূর্বের নাম বেলস পার্ক । বর্তমানে সবাই বঙ্গবন্ধু উদ্যান নামেই চিনে । বরিশাল শহরের মানুষদের বিকালে আড্ডা ও হাটাহাটির জন্য এই পার্কটি প্রসিদ্ধ । 

শ্বেতপদ্ম পুকুরঃ 

বরিশাল সদরে এই পুকুরটির অবস্থান। বর্ষায় সাদা পদ্মের বাহারে আলোকিত হয়ে থাকে এই পুকুরটি । 

বরিশাল কিভাবে যাবেনঃ 

সড়ক পথে, নদী পথে কিংবা আকাশপথে বরিশালে যেতে পারবেন । ফেরিঘাটে জ্যামে না পরলে  ঢাকা থেকে বরিশাল সড়ক পথে যেতে সময় লাগবে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা । ঢাকার গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে ভোর ৬ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত আধা ঘন্টা পরপর বাস ছেড়ে যায় বরিশালের উদ্দেশ্যে । বেশিরভাগ বাসগুলো সাধারণত পাটুরিয়া ঘাট হয়ে বরিশাল যায় । তবে কিছু বাস মাওয়া ঘাট পাড়ি দিয়ে বরিশালে যায় । শাকুরা, হানিফ, শ্যামলী ইত্যাদি বাসগুলো উল্লেখযোগ্য । এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৭০০ টাকা, নন-এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা । 

বরিশালে নদীপথে ভ্রমণই সবথেকে আরামদায়ক । ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ বরিশালের পথে যাত্রা করে । সন্ধ্যায় ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলো  ভোর ৪ থেকে ৫ টার মধ্যে পৌঁছায় বরিশাল লঞ্চঘাটে । লঞ্চের জনপ্রতি ডেক ভাড়া ২০০ টাকা, নন এসি সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ টাকা এবং নন এসি ডাবল কেবিন ভাড়া ১৮০০ টাকা, এসি সিংগেল রুম ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, এসি ডাবল রুম ভাড়া ২০০০ টাকা থেকে ২২০০ টাকা ।

বিমানপথে ভাড়া পড়বে ৩ হাজার টাকা । বিমানপথে মাত্র ১ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন ঢাকা থেকে বরিশাল। 

কোথায় থাকবেনঃ 

বরিশাল শহরেই বেশ ভাল মানের হোটেল রয়েছে । ভ্রমণে ঝামেলা এড়াতে আগে থেকেই আমাদের মাধ্যমে হোটেলের রুম বুকিং করে রাখুন । খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে হোটেল রুম বুকিং করতে পারবেন ।

amarroom