Travel

ডিবির হাওরের শাপলা বিল, সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে ।

dibir haor shapla bil 2

প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত সিলেট । সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে জৈন্তাপুরে অবস্থিত ডিবির হাওরের শাপলা বিল । লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত সিলেটের ডিবির হাওর । মেঘালয় সীমান্তবর্তী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সিলেটের এই অনিন্দ্য সুন্দর হাওরটি । 

এখানে প্রতিদিন ভোরে নিজ নিজ সৌন্দর্য্য নিয়ে ফুটে ওঠে অগণিত শাপলা ফুল । শাপলার লাল সৌন্দর্য্যকে দেখতে প্রতিদিন ভোর হওয়ায় সাথে সাথেই দলবেধে নৌকায় ভেসে বেড়ান অগণিত ভ্রমণপিপাসু মানুষ । ভোরে শাপলাগুলোকে মনে হয় সদ্য বিবাহিত বধুর ঠোটের গাঢ় লাল লিপস্টিক । সূর্যের সাথে শাপলাগুলোর যেন পূর্ব জনমের মিতালী । পুব আকাশ আলোকিত করে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে যখন সূর্যটা ভোরের জানান দেয় তখন সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে ফুটতে থাকে গাঢ় লাল শাপলাগুলো । অপূর্ব মোহনীয় সকালে পাহাড় ও মেঘের সাথে রক্তিম লাল শাপলাগুলোকে মনেই হবেনা এটি এই পৃথিবীর কোন ফুল । পৃথিবীর সকল ফুলের সৌন্দর্য্য যেন লুটিয়ে পড়ে শাপলার পদতলে । যেদিকে চোখ যায় শুধু শাপলা আর শাপলা । প্রায় ৭০০ একর জায়গা জুড়ে ডিবির হাওরের অবস্থান । এবং প্রায় পুরোটা জুড়ে রয়েছে লাল শাপলার বাহারী রূপ । দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশিতে এ যেন শাপলার মেলা । ইন্দ্রলোকের কোন পরীর রূপ যেন ফুটে উঠেছে প্রত্যেকটি স্থানে স্থানে । 

হাওরের লাগোয়াই রয়েছে মেঘালয় রাজ্যের সুউচ্চ পাহাড় । পাহাড়ের পাদদেশের শাপলার সৌন্দর্য্য না দেখলে এর রূপ-মাধুর্য কল্পনাই করা দুষ্কর । প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের এই শাপলার রাজ্যটি চারটি বিল নিয়ে গঠিত হয়েছে । ডিবির বিল, হরফকাটা বিল, ইয়াম বিল ও কেন্দ্রী বিল মিলে গঠিত হয়েছে ডিবির হাওর । এই বিলগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় বিল হচ্ছে ডিবির বিল । তাইতো পুরো হাওরের নামই রাখা হয়েছে ডিবির হাওর । 

ইতিহাসঃ 

এক সময় এই বিলে কোনো ধরনের শাপলা ছিল না । সীমান্তের ওপারে থাকা খাসিয়ারা লাল শাপলা দিয়ে পূজা -অর্চনা করতো । সে শাপলা পাহাড়ি ঢলের মাধ্যমে এখানে এসে দিনে দিনে তৈরি করেছে বিশাল এক শাপলার রাজ্য । 

ডিবির হাওরের ইতিহাস বেশ পুরোনো । এখানে রয়েছে প্রাচীন বিভিন্ন রাজার সমাধিস্থল । এ হাওর ঘিরে রয়েছে নানা করুণ কাহিনী । এখানে রয়েছে সর্বশেষ স্বাধীন জৈন্তারাজ্যের রাজা বিজয় সিংহের সমাধিস্থল ।
প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ স্বাধীন রাজ্য ছিল জৈন্তাপুর রাজ্য । শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) তথা ভারতবর্ষের অধিকাংশ এলাকা তখন মোঘল সাম্রাজ্যের অধীনে । তখনো জৈন্তিয়া তার স্বাধীনতার ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছিল । জৈন্তিয়া রাজ্য প্রায় ৩৫ বছর স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিচালিত হয় । হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রামায়নেও জৈন্তিয়া রাজ্যের উল্লেখ আছে ।
১৮৩৫ সালে ইংরেজরা রাজা বিজয় সিংহের সেনাপতি রাজেন্দ্র সিংহকে কৌশলে বন্দি করে রাজ্যের সবকিছু লুট করে নিয়ে যায় । এই রাজ্যেরই স্মৃতি বিজড়িত অংশ হচ্ছে ডিবির হাওর । ডিবির হাওরের পাশেই সমাধিস্থ করা হয় রাজা বিজয় সিংহকে ।

এছাড়াও এখানে রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এক মন্দির । ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, জৈন্তা রাজ্যের রাজা রাম সিংহকে প্রেমের অপরাধে এই ডিবির হাওরের কেন্দ্রী বিলে ডুবিয়ে হত্যা করা হয় । তার স্মৃতিতেই গড়ে উঠেছিল এই মন্দির । সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান । ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের কাছেই অবস্থিত । স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরকেও পর্যটকরা দেখে আসতে পারেন । প্রেমের স্বাক্ষী এই মন্দিরকে কেইবা উপেক্ষা করতে পারে ! 

ডিবির বিলে অতিথি পাখিঃ 

পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি রয়েছে । এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতির পাখি শীতের মৌসুমে অতিরিক্ত শীতের কারণে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তুলনামূলক কম শীতের দেশে অস্থায়ীভাবে আবাস গড়ে ।  বাংলাদেশে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি শীত কাটাতে আসে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে । যেসব জায়গায় খাবারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে সেসব জায়গায় অস্থায়ী ঘর বাঁধে এসব পাখিরা ।

ডিবির হাওরে অসংখ্য মাছ পাওয়া যায় তাই শীতকালে এটি শাপলার রাজ্যের পাশাপাশি হয়ে উঠে অতিথি পাখির রাজ্য । চারিদিকে অজস্র লাল শাপলা, সাথে অসংখ্য অগণিত অতিথি পাখি । না দেখে কেউ এই চিত্রের কল্পনাও করতে পারবেনা । শীতকালে ডিবির হাওর যেন হয়ে ওঠে সৌন্দর্য্যের এক মিলনমেলা ।

পাখির মুক্ত বিচরণভূমি ডিবির হাওরে বালিহাঁস, পাতিসরালি,পানকৌড়ি, সাদাবক ও জল ময়ুরীর মতো অতিথি পাখিরা আসে । তাদের ডানার ঝাপটায় অন্যরুপে সাজে ডিবির হাওর ।
শীতকালে আকাশে মুক্ত ডানায় ভর করে বাতাসে গা ভাসিয়ে দলবেঁধে হেলে-দুলে মনের সুখে উড়ে বেড়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি । 

পাখিদের মুখরতায় ডিবির হাওর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে উচ্ছল । ঝিলে ধূসর রঙের হরেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখি মেলে ধরে সীমান্তের সৌন্দর্যকে, ফুটিয়ে তুলে শাপলার রঙ বহুগুনে । 

পর্যটকরা ডিবির হাওরকে চিনেন শুধু লাল শাপলার বিল হিসেবে । কিন্তু শীতকালে এটি যে অতিথি পাখিরও আস্তানা সেটা অনেকেরই অজানা ।
হাওরের এরকম বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য হাওরের চারপাশে রাস্তার উপর হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে হবে অথবা নৌকায় করে পুরো বিল ঘুরতে হবে । তবেই পান করার যাবে ডিবির বিলের প্রেম-সুধা ।

কিভাবে যাবেনঃ 

প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর সিলেট জেলা । সিলেটের উত্তর পূর্বে অবস্থিত জৈন্তাপুর উপজেলা। এই উপজেলায়ই অবস্থিত ডিবির হাওরের শাপলা বিল । একেবারে কম খরচেই ঘুরে আসতে পারেন সৌন্দর্যের লিলাভূমি সিলেটের শাপলা বিল থেকে ।
ঢাকা থেকে সরাসরি ট্রেনে করে সিলেট আসা যায় । ভাড়া পড়বে শ্রেণিভেদে ১৭৫ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত । অথবা বাসে করেও সিলেট আসা যায় । ঢাকা থেকে বাসগুলো সাধারণত সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ছাড়ে । শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক ইত্যাদি নন এসি বাসে ভাড়া পড়বে ৪৭০ টাকা । গ্রীনলাইনসহ অন্যান্য এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৯০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত । 

বাস বা ট্রেন যেটাতেই আসেন না কেন আপনাকে নামতে হবে কদমতলীতে । কদমতলী হচ্ছে বাস এবং ট্রেনের শেষ স্টপেজ । ঢাকা থেকে সিলেট পৌছাতে সময় লাগতে পারে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা । তাই শাপলার আসল সৌন্দর্য্য দেখতে এমনভাবে টিকেট কাটুন যাতে খুব ভোরেই সিলেট পৌছানো যায় । শাপলার মূল সৌন্দর্য দেখতে হলে সূর্য্যের তেজ বাড়ার আগেই যেতে হবে । কেননা রোদ বাড়ার সাথে সাথে শাপলাগুলো গুটিয়ে যায় । ফলে আসল সৌন্দর্য্য লোপ পেতে থাকে ।

সেক্ষেত্রে রাত ১১টার বাসে করে আসলেই ভাল হবে । ভোরে কদমতলী পৌছানোর পর সেখানেই প্রাতরাশ সেরে ফেলতে হবে । তারপর কদমতলী থেকেই জাফলংগামী বাসে উঠতে হবে । তারপর বাসের হেল্পারকে বলে  জৈন্তা বাজারে নামতে হবে । ভাড়া নিবে জনপ্রতি ৪০ টাকা । সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘন্টা ।

 জৈন্তা বাজারে নেমে টমটম দিয়ে চলে যেতে পারেন ডিবির হাওর । জনপ্রতি লোকাল ভাড়া ১০ টাকা । রিজার্ভ নিলে ৬০ টাকা । টমটম যেখানে নামিয়ে দিবে সেখান থেকে গ্রাম্য উচু নিচু রাস্তা ধরে ১৫-২০ মিনিট হাটলেই চলে আসবেন ডিবির হাওরের শাপলা বিল ।
আরেকটি রাস্তায়ও এখানে আসা যায় । জাফলংগামী বাসে জৈন্তাবাজারে না নেমে এর একটু সামনে বিজিবি ক্যাম্পে নামতে হবে । সেখান থেকে ৩০ মিনিট হাটা পথ এই শাপলার রাজ্য ।
এছাড়াও সিলেট শহর থেকে সিএনজি রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন । ভাড়া পড়বে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। এক্ষেত্রে দরদাম করে নিতে হবে ।
শাপলা বিলের মনোরম দৃশ্যকে উপভোগ করার জন্য নৌকা ভাড়া করতে হবে । মাঝি পুরো বিল ঘুরিয়ে দেখাবে । নৌকা ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা ।

সতর্কতাঃ

যেহেতু শাপলা ফুল সূর্যের তেজ বাড়ার সাথে সাথে গুটিয়ে যায় সেহেতু অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসা উচিৎ । সাধারণত ভোর থেকে সকাল ১০ টা পর্যন্ত শাপলাগুলো তার পুরোপুরি রূপ ছড়ায় । এরপর আস্তে আস্তে আবার গুটিয়ে যায় । 

শাপলা বিলের আশেপাশে কোন রেস্টুরেন্ট বা খাবার ব্যবস্থা নেই । তাই জৈন্তা বাজার থেকে খাবার কিনে রাখা ভাল । যাতে ক্ষিদা লাগলে বিলের পাশেই মধ্যাহ্ন ভোজটা সেরে নেয়া যায় । তবে অবশ্যই কোন প্লাস্টিক, পলিথিন বা পরিবেশ বিপন্ন হয় এরকম কিছু ফেলে আসবেন না । আমাদের দেশ ও আমাদের প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই । 

কোথায় থাকবেনঃ

শাপলাবিলের আশেপাশে থাকার জন্য কোন হোটেল নেই । তবে জৈন্তা বাজার থেকে অদূরে জৈন্তা হিল রিসোর্টে থাকা যাবে । রিসোর্টটির সামনের ভিউ অনেক সুন্দর । এটির সামনেই মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে মেঘালয়ের সুউচ্চ পর্বতমালা । এখানে থাকার ভাড়া পড়বে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা । 

এছাড়া সিলেট শহরেও বিভিন্ন মানের ও বিভিন্ন ভাড়ার অসংখ্য হোটেল রয়েছে । www.amarrom.com থেকে খুব সহজেই এসব হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া করতে পারবেন ।

amarroom