Travel

ডিম পাহাড়, মেঘের ওপরে ভাসছে একটি সড়ক ।

Dim-Pahar-Bandarban

মেঘের ওপরে ভাসছে একটি সড়ক । সড়কের ধারে ধারে ফুটে আছে নানা রঙের পাহাড়ি ফুল । সাদা মেঘে আচ্ছন্ন রাস্তাটি পাড়ি দিতে দিতে চারিদিকের সবুজের সমারোহ অবলোকন । যেন স্বর্গের কোন অপ্সরী ভুল করে তার রুপ মাধুর্য্য নিয়ে চলে এসেছে এ পৃথিবীতে । অসাধারণ ভাল লাগার এরকম অনুভূতি পাওয়া যাবে বান্দরবানের ডিম পাহাড়ে । অদ্ভুত সুন্দর এই পার্বত্য অঞ্চলের রুপ যেন পূর্ণতা পেয়েছে ডিম পাহাড়ের জন্য । দূর থেকে দেখতে এই পাহাড়কে ডিমের মতো মনে হয় বলেই এই পাহাড়ের নাম ডিম পাহাড় । সাদা মেঘে আচ্ছন্ন থাকা এই পাহাড়কে শুধু স্বর্গের সাথেই তুলনা করা যায় । বান্দরবানের অপরূপ সবুজের মাঝ দিয়ে নির্মিত দেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা ‘থানচি-আলীকদম’ এর সৌন্দর্য্যের বর্ণনা এভাবে লিখে দেয়া সম্ভব না । নিজের চোখে না দেখলে এর রুপগাথা বিশ্বাস হবে না । চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ । গাড়ি দিয়ে ওঠার সময় আকাশটাকে মনে হবে ছাদ আর নিচের দিকে তাকালে মনে হবে পাতালপুরি । মাথার উপরে আকাশের ছাদ আর পায়ের তলায় পাতালপুরি নিয়ে মনে হবে আপনি আছেন কোন কল্পনার রাজ্যে । যে রাজ্যের রুপের মাধুর্য বর্ণনাতীত । মেঘদল গুলো যেন অসীম আনন্দের বার্তা জানান দেয় প্রতি মুহুর্তে । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজারফুট উঁচুতে তৈরি করা এই রাস্তায় যেতে যেতে মনে হবে যেন মেঘের ওপরে ভাসছেন । কল্পনার সীমারেখাকেও হার মানায় এই পাহাড়ের সৌন্দর্য্য । 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে নির্মিত ডিম পাহাড়ের ওপর থানচি-আলি কদম রাস্তাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ । ডিম পাহাড় বান্দরবানের আলীকদম এবং থানচি উপজেলার ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত । রাস্তাটি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু সড়কপথ । ৩৩ কিলোমিটার সবুজাভ পাহাড়ে আঁকাবাঁকা সর্পিল এই পথ । 

থানচি-আলীকদম রাস্তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটার নাম এই ডিম পাহাড় । পাহাড়টা দেখতে ডিমের মত বলেই এমন নাম । স্থানীয় ম্রো আদিবাসীরা এই পাহাড় কে ডাকে ‘ক্রাউডং’ পাহাড় । এত সুন্দর পাহাড়  বাংলাদেশের আর কোথাও অয়াওয়া যাবে না  । আপনি যদি বাইকে করে এই পাহাড়ের উপর আসেব তবে অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা বাতাস সারা শরীর দিয়ে শিহরণ বইয়ে দিবে । ডিম পাহাড় মেঘের এত কাছে হওয়ায় বোধ হয় সবসময় ঠাণ্ডা বাতাস থাকে । শীতলতা  একদম সরাসরি অনুভব করা যায় । প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ডিম পাহাড়ে পৌঁছালেই গা হিম করা ঠান্ডা বাতাস । আর পাহাড় থেকে যে অনাবিল সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় সেটা স্মৃতির মানস্পটে গাথা থাকবে চিরদিন । 

ঘনসবুজ পাহাড়ের পাথুরে ঢাল বেয়ে বয়ে চলছে  ঝর্ণাধারা । ঝর্ণার শীতল জলের কলকল শব্দে মুখরিত থাকে আশপাশের পরিবেশ । অন্যদিকে ডিম পাহাড়ে রাস্তায় দাড়িয়ে ছোঁয়া যায় আকাশের সাদা মেঘ ! বান্দরবানের থানচি থেকে আলীকদম হয়ে এই রাস্তা চলে গেছে আরেক পর্যটন নগরী কক্সবাজারের দিকে । 

রাস্তা তৈরির ইতিহাসঃ

 এ সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে । প্রথম দুই বছরে মাত্র ৬ কিলোমিটার রাস্তার  নির্মাণ কাজ শেষ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) । এরপর সওজ জানিয়ে দেয় তাদের পক্ষে পাহাড়ের চূঁড়ায় সড়ক বানানো সম্ভব নয় । সওজ রাস্তা তৈরি করতে ব্যর্থ হলে সড়কটি নির্মানের।জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ডাকা হয় । এরপরে ২০০১ সালে সেনাবাহিনীকে রাস্তাটি নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয় । হেলিকপ্টারে করে রাস্তার ম্যাপ তৈরি করা হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে । তারপর  পাহাড়ের পর পাহাড়ের গা কেটে তৈরি হয় এ পথটি । সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ টানা এক যুগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে সড়কটি নির্মাণ করে । সড়কটি নির্মানের জন্য সেনাবাহিনীর ইসিবি ১৬ ও ১৭ ইউনিটের কাছে থানচি আলিকদমসহ ভ্রমণপিপাসু সকল মানুষ কৃতজ্ঞ । ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা । এবং সময় লেগেছে প্রায় ১ যুগ । 

নির্মাণ-কালীন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ৩ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেন ।

বান্দরবানের দুই প্রতিবেশী উপজেলা থানচি আর আলীকদমের মধ্যে সড়ক পথে দূরত্ব ছিল ১৯০ কিলোমিটার ।  এই পথটি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই সবার জন্য উন্মুক্ত করা হলে।দূরত্ব হয়ে যায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার । 

এ সড়ককে ঘিরে একে একে সন্ধান মিলছে অসংখ্য ঝিরি, ঝরণা ও জলপ্রপাতের ।

আদিবাসীদের উপকথাঃ 

আলীকদমে বসবাসকারী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের মধ্যে ডিম পাহাড় নিয়ে অত্যন্ত চমৎকার একটি উপকথা প্রচলিত রয়েছে । উশে নামে অত্যন্ত মা ভক্ত এক ছেলে ছিল । ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় মা’ই তার একমাত্র সম্বল ছিল । সেই মা একদিন অজানা রোগে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন । এখন মরেন কি তখন মরেন অবস্থা । গ্রাম্য ওঝা উশের মায়ের অবস্থা দেখে জানালেন এই রোগ কোনভাবে নিরাময় হবে না । ধীরে ধীরে প্রাণ হরণ করবে আত্মঘাতী এই ব্যাধী ।
তবে মাকে বাঁচানোর জন্য একটা উপায় রয়েছে । উশের সম্প্রদায় যেখানে বাস করে সেখান থেকে ৩ দিনের হাঁটা দূরত্বে ডিম পাহাড়ের অবস্থান । পূর্ণিমা রাতে ডিম পাহাড়ের চূড়ায় এক স্বর্গীয় ফুল ফোটে । আবার ভোর হতেই সেই ফুল ঝরে যায় । এই ফুলের রস যদি তার মাকে খাওয়ানো যায় তবেই তিনি সুস্থ হবেন ।
এদিকে ডিম পাহাড়ে কেউই কখনও পৌঁছাতে পারে নি । যারা সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তারা কখনও ফিরে আসেনি । কারণ সেই পাহাড়ে এক দানব থাকে যে স্বর্গীয় ফুলগুলোকে পাহারা দেয় । কেউ পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করলেই দানবটা তাকে খুন করে ফেলে । এসব জানার পরেও মা ভক্ত উশে সিদ্ধান্ত নিলে সে যেভাবে হোক যাবেই । যেকোনো মূল্যে তার মাকে বাঁচাতে হবে । তার বন্ধু থুই প্রু তাকে একা যেতে দিবেনা তাই তাকেও সাথে নিয়ে রওনা দিল ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে । পাহাড়ি পথে তিন দিন তিন রাত হাঁটার পর অবশেষে তারা পৌঁছালো ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি ।
থুই প্রু কে চূড়ার নিচে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে রওনা দিল । ঠিক মধ্যরাতে পূর্ণিমার আলোয় উশেকে আবারও দেখতে পেল থুই । একটা থলের ভেতরে সেই কাঙ্ক্ষিত ফুল দিয়ে থিকে ছুড়ে দিল উশে ।  উশেকে ইশারা দিয়ে থুই জানাল যে সে ফুলগুলো পেয়েছে । উত্তরে উশে জানাল সে নিচে নামবে, থুই যেন তার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু আর কখনও থুই নিচে নেমে আসেনি । 

অদ্ভুত ঘটনাঃ 

সম্প্রতি ডিবিসি নিউজের একটি খবরে দেখানো হয় ডিম পাহাড়ের আশ্চর্য্য একটি ঘটনা । রাস্তাটির সমতল জায়গাতে গাড়ি রাখা হলে সেটি আপনা আপনি নিচের দিকে যেতে শুরু করে । গাড়ির চালকরা তাই সাবধানে গাড়ি পার্কিং করেন । শুধু যে গাড়ি নিচের দিকে নামে তাই না । মানুষজন হাটার সময় মনে হয় অদৃশ্য কেউ একজন নিচের দিক থেকে টেনে রেখেছে । ডিবিসি নিউজের সাংবাদিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকের সাথে কথা বলেন । তিনি বলেন হয়তোবা সেখানে মধ্যাকর্ষন বল কাজ করছেনা । তবে সেটা জানার জন্য প্রাথমিক ভাবে একটি বিশেষ চুম্বকীয় পরিক্ষা করা প্রয়োজন । 

কিভাবে যাবেন ডিম পাহাড়ঃ

ঢাকা থেকে প্রথমে আসতে হবে চট্রগ্রাম – কক্সবাজার সড়কের চকোরিয়া বাস টার্মিনালে । ঢাকা থেকে নন এসি বাস ভাড়া পড়বে  ৭৫০ টাকা । সেখান থেকে লোকাল বাসে কিংবা চান্দের গাড়িতে করে থানচি বাজার চলে যান । এরপর সেখান থেকে চান্দের গাড়ি কিংবা মোটরবাইকে করে ডিম পাহাড়ের অদ্ভুত মায়াবী সৌন্দর্য্য দেখে আসুন ।

অথবা ট্রেনেও যাওয়া যাবে । ট্রেনে প্রথমে আসতে হবে চট্রগ্রাম তারপর চট্রগ্রাম থেকে বাসে করে আসতে হবে চকোরিয়া । চট্রগ্রাম থেকে চকোরিয়াতে জনপ্রতি বাস ভাড়া ১৭০ টাকা । চকোরিয়া বাস টার্মিনাল থেকে মাতামুহুরী পরিবহণ প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত আলিকদমের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । আলিকদম থেকে প্রতিদিন সকাল ৭.০০ টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫.৩০ পর্যন্ত চকোরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দুই দিক থেকেই ৪০ মিনিট পরপর গাড়ী ছেড়ে যায় । ভাড়া জনপ্রতি ৬০ টাকা । সময় লাগবে ১ ঘন্টা ৪০ মিনিটের মতো । চকরিয়া থেকে আলীকদম চাঁন্দের গাড়িতে আসা যাবে । লোকাল ভাড়া জন প্রতি ৬৫ টাকা । রিজার্ভআয়া ভাড়া পড়বে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকার মতো । 

আলীকদম থেকে থানচির পথে বাইকে চড়াই উত্তম । কারণ এই রাস্তার আসল সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে বাইকে চড়ার জুড়ি নেই । 
থানচি বাজার এবং আলীকদম বাজার থেকে বাইক পাওয়া যায় । এরা সারাদিন থানচি থেকে আলীকদম আসা যাওয়া করে । বাইকে চালকসহ তিনজন বসা যাবে । ২ জনের জন্য ভাড়া ৬০০ টাকা এবং ১ জনের জন্য ৫০০ টাকা । 

কোথায় থাকবেনঃ

থাকার জন্য চট্টগ্রাম শহরে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত বিভিন্ন হোটেল রয়েছে । www.amarroom.com এর মাধ্যমে আপনার পছন্দের যেকোন হোটেল মুহুর্তেই বুকিং দিতে পারবেন ।

amarroom