Hotel

ভীমরুলী ভাসমান পেয়ারা বাজার

floating market1

পেয়ারা বাজারঃ 

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাসমান বাজার বা ফ্লোটিং মার্কেট রয়েছে । পানির ওপরে ভাসমান নৌকাতে করে বিভিন্ন জিনিষ বিক্রি করা হয় সেসব বাজারে । বাংলাদেশেও রয়েছে এরকম সুন্দর ভাসমান বাজার । এগুলো অবস্থিত ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় । নাম ভীমরুলী, আটঘর ও কুড়িয়ানা ভাসমান বাজার । মূলত এগুলও ভাসমান পেয়ারা বাজার নামে পরিচিত হলেও এখানে আখ ও আমড়াসহ বিভিন্ন সবজি বিক্রি করা হয় । এই তিনটি বাজারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভিমরুলী ভাসমান বাজার । ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলী বাজারে রয়েছে বাংলাদেশের এই ভাসমান বাজারটি । বাজারটি তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় বসে সবুজের ঢালা সাজিয়ে । জুলাই ও  আগস্ট পেয়ারার মৌসুম হলেও মাঝে মাঝে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে বাজারের কেনা বেচা । 

এই বাজারের পাশ ঘিরেই রয়েছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম পেয়ারা বাগান ।

পেয়ারার জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলে মাইলের পর মাইল জুড়ে রয়েছে পেয়ারা বাগান । 

আটঘর, কুড়িয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার, সদর ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪,০০০ একর জমি জুড়ে চাষ হয় পেযারার । জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বলে দুপাশের মাটি তুলে মোটা আইল বানানো হয় । তারপর আইলের উপরে লাগানো হয় পেয়ারা গাছ । পেয়ারা গাছের সারির দুপাশে তৈরি করা হয়  ডিঙ্গি নৌকা চলার জন্য নালা । আর এসব পেয়ারা বিক্রির জন্য ঝালকাঠির ভিমরুলিতে জমে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার । এই এলাকায় রয়েছে অসংখ্য অগণিত পেয়ারার বাগান । চাষিরা সরাসরি নৌকাতে করে বাগান থেকে পেয়ারা পেড়ে নিয়ে আসে ভাসমান বাজারে । তারপর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে । প্রতি বছরের জুলাই, আগষ্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকশ কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদন ও কেনাবেচা হয় । 

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বড় বড় ইঞ্জিন বোট নিয়ে বাজারে উপস্থিত হয়ে পেয়ারা কিনেন । পেয়ারা কেনা হয় নৌকা হিসেবে কিংবা মন হিসেবে । 

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ পেয়ারাই আসে এ অঞ্চল থেকে ।  তাই সারাদেশই এই বাজার ও বাগানের ওপর নির্ভরশীল বলা চলে । ভিমরুলি গ্রামের আশেপাশে শুধু পেয়ারা বাগানই না, রয়েছে অসংখ্য আখ ও আমড়ার বাগান । পেয়ারা আর আখের মৌসুম শেষ হলে আসে আমড়ার মৌসুম । এ অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই হয় আমড়ার ফলন । আর সবশেষে আসে সুপারি মৌসুম । এ অঞ্চলের সুপারিও বিক্রি হয় দেশজুড়ে । 

পর্যটকরা সাধারণত বিভিন্ন জিনিষ কিনে নিয়ে যায় । আবার ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে পেয়ারা বাগানের ভিতরে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি ইচ্ছামত খেতে পারবেন পেয়ারা । 

বাজারের বর্ণনা

বরিশালের এই অঞ্চলে ভিমরুলীসহ তিনটি ভাসমান বাজার রয়েছে । তিনটিই একই খালে অবস্থিত । বাকি দুইটি হলো কুড়িয়ানা বাজার ও আটঘর বাজার । 

ভিমরুলী বাজারেই হয় পেয়ারার বেশি কেনাবেচা । বাগান মালিকেরা নৌকায় করে পেয়ারা নিয়ে আসেন বাজারে । এই হাটগুলোর সবচেয়ে জমজমাট সময় হচ্ছে জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ।

যাওয়ার উপযুক্ত সময়ঃ

ভাসমান পেয়ারা বাজারগুলো দেখতে আগস্ট মাসই সবচেয়ে উপযোগী সময় । সকাল ১১ টার পর পেয়ারা বাজারের ভীড় কমতে থাকে । তাই জমজমাট বাজারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সকাল ১১ টার আগেই বাজারে যেতে হবে ।


কি দেখবেন

বাংলাদেশের এই প্রাকৃতিক পরিবেশে খালের উপরে ভাসমান বাজারটি ছাড়াও অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্য আছে উপভোগ করার জন্য । 

এই বাজারে নৌকায় যেতে যেতে চারপাশটাকে স্বর্গের অপ্সরী মনে হবে । খালের সাথে লাগোয়া গাছ গাছালি সম্মোহনী রুপ ধারণ করে । খালের মধ্য দিয়ে চলার সময় চাইলে হাত বাড়িয়ে পেয়ারা ধরা যায় । আর যদি ভাগ্যক্রমে বৃষ্টি শুরু হয় তাহলে তো কথাই নেই । চারপাশটাকে মনে হবে স্বর্গরাজ্য । অপার্থিব সৌন্দর্য্যে মোহনীয় হয়ে উঠবে পরিবেশ । নৌকায় বসে ভিজতে ভিজতে খালে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না ।

খালের মধ্যে বাঁক নিয়ে চলা পথে ঘুরতে ঘুরতে মনে হবে এ যেন অপরুপ মায়ার জগত । পুরো খাল জুড়ে রয়েছ সবুজের ছড়াছড়ি । বর্ষাকাল হওয়ায় আকাশেও থাকে মেঘেদের বিরামহীন খেলা ।
ছোট নৌকা হলে ঢুকে পড়া যায় বাগানের মাঝের আইল গুলোতে । আর ট্রলার হলে খালের পাড়ে নেমে বাগানে হেঁটে বেড়ানো যাবে । এসব তৈরি করবে অসাধারন ভালো লাগার সব অনুভূতি । নতুন এক স্বাদ যুক্ত হবে ভ্রমনে ।
ফিরতি পথে সন্ধ্যের আধাঁরীতে খালের মাঝে বয়ে চলা দিবে গা শিরশিরে অনুভূতি । অস্পষ্ট পথ ধরে দক্ষ মাঝির বয়ে চলা মন কাড়বে সবার । আকাশে তারাদের মেলা, সে এক অসাধারণ দৃশ্য । মেঘের আড়ালে ক্ষনিক পর পর উঁকি দিবে শশী আর তা তীর ভাংগা আলো । ট্রলারের ছাদে শুয়ে সেই আলো আঁধারির আকাশ দেখতে দেখতে বাঁচতে ইচ্ছে হবে আরো বহু বছর ।

খাবার

খাবারের জন্যেও এ এলাকার রয়েছে অসামান্য খ্যাতি । এ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বিখ্যাত খাবার । 

কুড়িয়ানা বাজারের ঋতুপর্ণা হোটেলের গরম গরম রসগোল্লার স্বাদ নিতে কোন ভাবেই ভুলে যাবেন না । কুড়িয়ানা বাজারে বৌদির হোটেল দুপুরের খাবারের জন্য বিশেষ ভাবে খ্যাত ।  কুড়িয়ানা বাজারে ভাসমান এই হোটেলের খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু । এখানকার গুঠিয়ার সন্দেশ খুবই জনপ্রিয় । 

ভিমরুলী বাজারের সাদা ও লাল মিষ্টিও অনেক জনপ্রিয় । এটিও চেখে দেখতে পারেন ।
এছাড়া বরিশাল শহরের পুরান বাজার এলাকার হক এর রসমালাই, রসগোল্লা ও ছানা । বটতলা এলাকার শশীর রসমালাই ও নয়াবাজার মোড়ের নিতাই মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্পঞ্জ মিষ্টিও অত্যন্ত সুস্বাদু ।
 


কিভাবে যাবেনঃ 

বরিশালে রেলপথে যাওয়ার কোন ব্যাবস্থা নেই । তবে নদীপথ অথবা সড়ক পথের পাশাপাশি আকাশপথেও যাওয়া যাবে বরিশাল । যারা সাশ্রয়ে ও আরামে ভ্রমণ করতে চান তাদের জন্য নদী পথে বরিশাল যাওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক ।


নদীপথে যেতে হলে আসতে হবে ঢাকার সদরঘাটে । ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে । সন্ধ্যায় যাত্রা লঞ্চে বরিশাল যেতে জনপ্রতি ডেক ভাড়া ২০০-২৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ (নন এসি) টাকা এবং ডাবল কেবিন ভাড়া ১৮০০ (নন এসি) টাকা । এছাড়া ২০০ টাকা বেশি দিয়ে এক কেবিনে ৩ জনও যাওয়া যাবে ।  বরিশাল লঞ্চ ঘাটে পৌছানোর সেখান   থেকে সিএনজি বা রিক্সায় নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে আসতে হবে । সেখান থেকে লোকাল বাসে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট আসতে হবে । স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করে পর্যায়ক্রমে আটঘর, কুড়িয়ানা ও ভীমরুলী বাজার ঘুরতে পারবেন। ট্রলারভেদে ভাড়া লাগবে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা । 

অথবা স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ২০ টাকা সিএনজি ভাড়ায় কুড়িয়ানা বাজার এসেও নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করা যাবে । এখান থেকে ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ।


বাসে যারা যেতে চান তারা গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকেও যেতে পারবেন ।  ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কয়েকটা বাস বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । গাবতলী থেকে সরাসরি স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাটে যাওয়ার বাস রয়েছে । বাসে বরিশাল কিংবা স্বরূপকাঠি নেমে আগের উল্লেখিত রুটে আসতে  পারবেন ভাসমান পেয়ারা বাজার । 

সাতলা শাপলা বিলঃ 

গ্রামের নাম সাতলা । সাতলার লাল শাপলার সমারোহের কারণে সেটার নাম এখন শাপলা গ্রাম । এই শাপলা গ্রাম যেন এক লাল শাপলার রাজ্য । বিলের পানিতে ফুটে থাকা অনিন্দ্য সুন্দর হাজারো লাল শাপলা যেন সূর্য্যের রক্তিম আভাকেও হার মানায় ।

এই শাপলা বিলের লাল আর সবুজের মাখামাখি দূর থেকেই চোখে পড়বে পর্যটকদের । কাছে গেলে ধীরে ধীরে সবুজের পটভূমিতে লালের অস্তিত্ব আরো গাঢ় হয়ে ধরা দেয় । চোখ জুড়িয়ে দেয় শাপলার বাহারি সৌন্দর্য । সূর্যের সোনালি আভা শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে বিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ । নৌকা দিয়ে বিলের ভেতর ঢুকলে মনে হবে বাতাসের তালে তালে এপাশ-ওপাশ দুলতে দুলতে হাসিমুখে অভ্যর্থনা দিচ্ছে শাপলারা । সে হাসিতে বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দধারা । পেয়ারা বাজার ঘুরে বরিশাল শহরে রাত কাটিয়ে পরদিন ছুটতে পারেন শাপলা বিলের উদ্দেশ্যে । 

অবস্থানঃ 

বরিশাল শহর থেকে শাপলা গ্রামের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার । বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামে রয়েছে এই অসীম সৌন্দর্যের শাপলা বিল ।
গোটা সাতলা গ্রাম জুড়েই শাপলার চাষ করা হয় । সাতলার প্রায় ১০ হাজার একর জলাভুমিতে শাপলার চাষ করা হয় । শাপলা গ্রামের প্রায় ৭০% অধিবাসীই শাপলা চাষ এবং শাপলা বিক্রির সাথে যুক্ত । 

কখন যাবেনঃ

অন্যান্য শাপলা বিলে শীতকালে শাপলা ফুটলেও এখানে সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই ৩ মাস শাপলা ফোটে । বছরের এই মাসগুলোতে সাতলা গেলে হাজারো শাপলা দেখতে পাবেন ।

শাপলার আসল রূপ দেখতে হলে অবশ্যই খুব ভোরে যেতে হবে কারণ বেলা গড়ানোর সাথে সাথেই শাপলা ফুল বুজে যায় । 

কিভাবে যাবেনঃ

সড়কপথে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল যাওয়ার সময় উজিরপুরের নুতনহাট মোড়ে বাস থেকে নামতে হবে । সেখান থেকে সরাসরি অটো করে সাতলার শাপলা বিল যেতে পারবেন । যারা নদীপথে আসবেন তাদেরকে বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে রিক্সা করে প্রথমে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড আসতে হবে । সেখান থেকে মাহেন্দ্র দিয়ে সাতলা বাজার আসতে হবে ।  সাতলা বাজার থেকে ভ্যানে করে আসতে হবে পূর্ব সাতলা জনতা বাজার । এখানে আসলেই দেখা মিলবে আপনার কাঙখিত শাপলার ভূবনের ।

amarroom