Travel

হাকালুকি হাওর – বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর ।

hakaluki haor

দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি । চারিদিকে থৈ থৈ করছে ফেনাতুলা ঢেউ । যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কেবল পানি আর পানি । সমুদ্রের মতো সমীহ জাগানিয়া ঢেউ দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর -হাকালুকি হাওরে । দিগন্ত জোড়া ঢেউয়ের খেলা দেখতে অবশ্যই বেছে নিতে হবে বর্ষাকালকে । বর্ষাকালে হাওরটি হয়ে ওঠে ভয়ংকর সুন্দর । এর ফণা তুলা ঢেউ রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষকে আন্দোলিত করে ।  বর্ষাকালে এই হাওরের এক রূপ আবার শীতকালে আরেক রূপ । এ যেন একের ভিতরে দুই । বর্ষাকালে এখানে পাওয়া যাবে সমুদ্র ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা । চারপাশের জল আর ঢেউ যে রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা দিবে সেটা  আর কোথাও খোঁজে পাওয়া যাবেনা । নৌকায় করে জিরো পয়েন্টের পথে ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে মনে হবে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য বোধ হয় ধরা দিয়েছে আপনার চোখের সামনে । জিরো পয়েন্টের ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশকে মনে হবে বিধাতার নিজ হাতে গড়া এক স্বর্গোদ্যান । নিজেকে মনে হবে অথৈ সাগরের একজন রাজা । 

শীতকালেও হাওর সাজে বর্ণীল সাজে । অতিথি পাখিদের আনাগোনায় হাওরটি হয়ে ওঠে মুখরিত । পাখির কিচির মিচির শব্দ ভুলিয়ে দেয় সকল ক্লেশ । মনে এনে দেয় স্বর্গীয় এক প্রশান্তি । শীতকালে হাকালুকি হাওর হয়ে ওঠে অফুরন্ত সজীবতার আবাস । ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা ঝাপটায় অসংখ্য অগণিত অতিথি পাখিরা । অতিথি পাখিদের আগমনে মুখর হয়ে থাকে চারিদিকের পরিবেশ । পাখিরা যেন পাখা মেলে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে ভ্রমণপিয়াসীদের । 

শীতকালে হাওরের দিগন্তজোড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো আক্ষরিক অর্থেই হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন । চারিধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া অল্প উঁচুভূমি বিলের পানিতে প্রতিচ্ছবি ফেলে অবতারনা করে অপরূপ সব দৃশ্যের । সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হাওরের জলরাশিতে সূর্যের প্রতিচ্ছবি মনে তৈরি করে অম্য ধরনের শিহরণ । 

হাওরের বর্ণনাঃ 

হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ হাওর । এশিয়ার অন্যতম মিঠাপানির জলাভূমিটির আয়তন উনিশ হাজার হেক্টর । হাওরটি সিলেটের ৩টি উপজেলা ও মৌলভীবাজারের ২টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত । উপজেলা গুলো হলো বড়লেখা, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার । ছোট বড় প্রায় ২৩৪টি বিল রয়েছে হাকালুকি হাওরে । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মায়াজুরি বিল, চাতলা বিল, চৌকিয়া বিল, পিংলারকোণা বিল, ফুটি বিল, তুরাল বিল, তেকুনি বিল, পাওল বিল, জুয়ালা বিল, কাইয়ারকোণা বিল, ডুলা বিল, বালিজুড়ি বিল, বিরাই বিল, রাহিয়া বিল, চিনাউরা বিল, দুধাল বিল, কুকুরডুবি বিল,, বারজালা বিল, পারজালাবিল, মুছনা বিল, লাম্বা বিল, দিয়া বিল, কাটুয়া বিল ইত্যাদি । এসব বিলে পাওয়া যায় স্বাদু ও মিঠাপানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে  আইড়, পাবদা, শিং, চিতল, বাউশ, মাগুর, কৈ । এগুলো ছাড়াও প্রায় ১৫০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ রয়েছে হাওরটিতে । হাকালুকি হাওরে জলজ উদ্ভিদসহ প্রায় ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে । রয়েছে ৪১৭ প্রজাতির পাখি । এর মধ্যে ৩০৫টি প্রজাতির দেশীয় পাখি ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা  ১১২ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি । এছাড়া রয়েছে  ১৪১ প্রজাতির অনান্য বন্যপ্রাণী । শীত মৌসুমে অতিরিক্ত শীতের কারণে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখিরা ঝাঁক বেঁধে এ অঞ্চলে আসে । তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আমাদের দেশীয় পাখিগুলো । হাওরে পরিযায়ী হাঁসের মধ্যে রয়েছে চখাচখি, রাজসরালী, গাডোয়াল, গরাদমাথা রাজহাঁস, ধলাবেলে হাঁস, ইউরেসীয় সিথীহাঁস, টিকীহাঁস, ইত্যাদি আরও অসংখ্য প্রজাতির হাঁস । দেশী প্রজাতির হাঁসের মধ্যে রয়েছে ডাহুক, বেগুনী কালেম, পানমুরসী, পাতিকুট, ইউরেসীয় মুরগি চ্যাগা, সাদা বক, রাঙ্গাচ্যাগা, জলাপিপি, ময়ূরলেজা পিপি, পাতি জিরিয়া, ভুবনচিল, শঙ্খচিল, কুড়াল ঈগল, হাট্টিটি, বড়খোঁপা ডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি, খয়রা বকসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি । 

হাকালুকি হাওরের দিগন্তজোড়া বিশাল জলরাশির মূল প্রবাহ হলো জুরী নদী ও পানাই নদী । এই জলরাশির স্রোত হাওরের উত্তর-পশ্চিম দিকে  অবস্থিত কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় । বর্ষা মৌসুমে হাওর সংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে বিশাল আকার ধারন করে । বর্ষায় হাওরটির পানির গভীরতা প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় । 

হাওরের নামকরণঃ 

হাওরের নামকরণ নিয়ে লোকমুখে নানান গল্প শোনা যায় । জনশ্রুতি আছে যে, এক সময় বড়লেখা থানার পশ্চিম দিকে “হেংকেল” নামে একটি উপজাতি বাস করতো । তাদের জাতির নামানুসারে সেই এলাকাকে ডাকা হতো “হেংকেলুকি” । পরবর্তিতে এই “হেংকেলুকি” নাম থেকে উৎপত্তি হয় হাকালুকি নাম । 

আরেকটি মত হচ্ছে, হাকালুকি হাওরের কাছাকাছি কোন একসময় বাস করতো কুকি এবং নাগা উপজাতিরা । তাদের নিজস্ব উপজাতীয় ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করা হয় “হাকালুকি” । তাদের ভাষায় হাকালুকি অর্থ ‘লুকানো সম্পদ’ । হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র‍্যের কারণেই এই নাম দেয়া হয়েছিল বলে শোনা যায় । 

আরেকটি জনশ্রুতি হচ্ছে, বহু বছর আগে ত্রিপুরার মহারাজা ওমর মানিক্যের সৈন্যদলের ভয়ে বড়লেখা অঞ্চলের কুকি উপজাতির দলপতি ‘হাঙ্গর সিং’ জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় লুকিয়ে যান । এই লুকিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার নাম হয় “হাঙ্গর লুকি” । কালক্রমে সেটি হয়ে যায় হাঙ্গর লুকি থেকে হাকালুকি । 

অন্য জনশ্রুতি মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে “ আকা” নামক এক রাজা ভূমিকম্পে তার রাজত্বসহ মাটির নিচ তলিয়ে যান । কালক্রমে এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় “আকালুকি” বা হাকালুকি ।

হাওরের মানুষের জীবন যাপনঃ

বর্ষাকালে হাওর হয়ে ওঠে স্থানীয়দের জন্য বিভীষিকার মতো । কারণ প্রত্যেক বর্ষাতেই বন্যায় প্লাবিত হয় পুরো জনপদ । বর্ষাতে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করে হাওরবাসী । তারা নৌকাতে করে বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মৎস আহরণ করে । এসব মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবিকা চালায় তারা।

শুষ্ক মৌসুমে হাওরের বিস্তৃত প্রান্তরে অবাধে বিচরন করে গরু, মহিষ, ছাগলসহ বিভিন্ন গৃহপালিত পশু । হাওর উপকূলবর্তি এলাকার লোকজন শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ করেন । ফসল উঠে গেলে নির্দিষ্ট কয়েক মাস তাদের গৃহপালিত গবাদি পশু পাঠিয়ে দেন হাওরে বসবাসরত একশ্রেণীর মানুষের কাছে । যারা বাথানি নামে পরিচিত । বাথানিরা এসব গৃহপালিত পশুগুলোর তত্ত্বাবধান করেন । বিনিময়ে বাথানিরা এসব পশুর দুধ পান । আবার বর্ষাকাল শুরু হলে প্রকৃত মালিক এসে গরু-বাছুর ফেরত নেয় । এই ব্যবস্থাটি হাওর এলাকায় “বাথান” নামে পরিচিত । বাথানের মালিকেরা এসকল গবাদি পশুর দুধ বিক্রী করে প্রচুর টাকা উপার্জন করেন । বাথান ব্যাবস্থার কারণে হাকালুকি হাওর এলাকা থেকে প্রচুর পরিমানে দুধ ও দৈ উৎপাদন হয় ।

কিভাবে যাবেনঃ 

হাকালুকি হাওর অনেক বিশাল ও ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত । তাই হাওরটি দেখতে বিভিন্ন ভাবে যাওয়া যায় । তন্মধ্যে ৩টি রুট এখানে বলা হলো । 

১ম রুট-

ঢাকা থেকে ট্রেনে করে সিলেট আসার পথে কুলাউড়া স্টেশনে নামতে হবে । তারপর কুলাউড়া থেকে সিএনজি অথবা রিক্সা করে ভূকশিমইল হয়ে হাওরে চলে যেতে পারবেন । সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া পড়বে ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা । রিক্সা ভাড়া পড়বে ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা ।  

২য় রুট-

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে মাইজগাঁও নামতে হবে । মাইজগাঁও থেকে রিক্সা করে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে আসতে হবে । সেখান থেকে নৌকাঘাটে যেয়ে নৌকা দরদাম করে পুরোদিনের জন্য ঠিক করে নিতে হবে । তারপর কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্য্য দেখাতে নিয়ে যাবে মাঝি ।

৩য় রুট-

ঢাকা থেকে বাসে করে সিলেটের কদমতলী আসতে হবে । এনা, ইউনিক, শ্যামলী, এস আলম, গ্রীন লাইন, সৌদিয়াসহ বিভিন্ন বাস ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে । প্রতিদিন ৩০ মিনিট পরপর এসব বাস ছাড়ে । নন এসি বাসের ভাড়া বাসভেদে ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা । এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৯০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা । 

সিলেট কদমতলীতে ফ্রেশ হয়ে রিক্সা নিয়ে আসতে হবে হুমায়ুন চত্বর । এখান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জগামী বাস ও সিএনজি পাওয়া যায় । সিলেট থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টার মতো । বাসে ভাড়া লাগবে ২০ টাকা ও সিএনজিতে ৪০ টাকা । ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সিএনজিতে ঘিলাছড়া জিরোপয়েন্ট যাওয়া যাবে । ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে ঘিলাছড়ার দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার ।

সিলেট থেকে সরাসরি মাইক্রোবাস/প্রাইভেট কার ভাড়া করেও আসা যাবে । ভাড়া পড়বে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা । মাইক্রোবাস ভাড়া করার সময় ভালমতো দরদাম করে নিবেন । 

কোথায় থাকবেনঃ

ফেঞ্চুগঞ্জে তেমন কোন আবাসিক হোটেল নেই । ফেঞ্চুগঞ্জ জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে অনুমতি সাপেক্ষে থাকা যাবে । তবে সবচেয়ে সুবিধাজনক হবে সিলেট শহরে ফিরে এসে হোটেল নেয়া । কারণ শহরেই সবথেকে ভাল ভাল হোটেল পাওয়া যাবে । আর আপনাদের জন্য হোটেল বুকিং করে দেয়ার জন্য সবসময় আপনাদের পাশেই আছে www..amarroom.com । মুহুর্তেই আপনার চাহিদা অনুযায়ী রুম বুক করার জন্য আমাদের সাথে আজই যোগাযোগ করুন । 

amarroom