Travel

মহেশখালী, বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ !

moheshkhali1

শীত বসন্ত কিংবা বর্ষা, যেকোন ঋতুতেই ঘুরে বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে মহেশখালী দ্বীপ । পাহাড় আর সমুদ্রের মিশেলে গড়া এই দ্বীপ অপার সৌন্দর্য্য লালন করছে যুগের পর যুগ ধরে । বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর সৌন্দর্য্য দর্শন শুরু হয় বিশাল এক রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে । কক্সবাজার থেকে বড় বড় সাম্পানে ফেনাতুলা বিশাল বিশাল ঢেউয়ের বুক চিরে আসতে হয় এই দ্বীপে । বুকে কাপন ধরানো বিশাল বিশাল ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে সাম্পানের গায়ে তখনও বুক চিতিয়ে সামনের দিকে এগুতে থাকে হার না মানা সাম্পান । ঢেউ এর সাথে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চলে দৈত্যাকৃতির কাঠের নৌকাটি । সাম্পান যখন মাঝপথে তখন আর খালি চোখে পাড় দেখা যায় না । মাঝ সাগরে ধ্বক করে ওঠে বুকের ভেতর । সে এক ভয়ানক সুন্দর রোমাঞ্চের অনুভূতি । 

নৌকা দ্বীপের কাছাকাছি আসার সাথেই চোখে পড়ে উপকূলীয় বনের শ্বাসমূল । শ্বাসমূল গুলো যেন জানান দেয় আপনি চলে এসেছেন আপনার কাঙ্ক্ষিত দ্বীপ মহেশখালী ।

মহেশখালীতে রয়েছে থরে থরে সাজানো ছোট বড় টিলা ও পাহাড় । কোন এক শিল্পী যেন তুলি দিয়ে খুব যত্ন করে সাজিয়েছেন তার ক্যানভাস । পাহাড় কেটে তৈরি করা রাস্তায় রোমাঞ্চের স্বাদ পাওয়া যাবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে । 

পাহাড়ি রাস্তাগুলোয় ভরদুপুরেও থাকে আবছা আলো । পাহাড়ময় অরণ্য ফুঁড়ে রোদ যেন তাতিয়ে উঠতে পারেনা । আলো ছায়ার অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় । টিলাময় সবুজ বন আর উপত্যকায় বিস্তৃত এই দ্বীপটি খুব সহজেই মন কাড়ে পর্যটকদের । কালের স্বাক্ষী আদিনাথ মন্দিরকে বুকে ধারণ করে আছে দ্বীপের সবচেয়ে বড় পাহাড় মৈনাক পর্বত । এ পর্বতের চূড়া থেকে প্রকৃতির মন মাতানো সব দৃশ্য দেখা যায় । পাহাড়ের চূড়ায় দাড়িয়ে ফুরফুরে বাতাসের সাথে প্রাকৃতিক দৃশ্যের অবলোকন- এ যেন স্বর্গের কোন পরীর ডানায় ভর করে স্বর্গভ্রমণ ! মৈনাক পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরে বিস্তৃত সাগর আর রাশিকৃত উপকূলীয় বন দেখতে দেখতে কতোটা সময় যে কেটে যায় তা একদমই টের পাওয়া যায়না ।

পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে মিষ্টি পানের বিশালাকার বরজ । পাহাড়ের গা ছোঁয়া লতানো গাছগুলো আক্ষরিক অর্থেই চোখ ধাধায় । 

মহেশখালী জেটিতে যাওয়ার রাস্তায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে আরেক বিস্ময় !  রাস্তার দু’ধারে রয়েছে চোখ জুড়িয়ে দেওয়া প্যারাবনের সবুজের সমারোহ । সবুজের আচ্ছাদনে সূর্য্যের উঁকিঝুঁকির সাথে শত শত ডানা ঝাপটানো পাখি তৈরি করে বিশাল এক মায়া। 

অবস্থানঃ 

মহেশখালী দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড় দ্বীপ । এটি কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা । কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপটির আয়তন ৩৮৯ বর্গকিলোমিটার । মহেশখালী দ্বীপটি সোনাদিয়া দ্বীপ, মাতারবাড়ী দ্বীপ ও ধলঘাটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত । ১৯৮৩ সালে মহেশখালী থানা থেকে উপজেলা পদমর্যাদা পাওয়া এ দ্বীপটির রয়েছে ১টি পৌরসভা এবং ৮টি ইউনিয়ন । 

দ্বীপের নামকরণঃ 

মহেশখালী নামকরণের দুটি কিংবদন্তি রয়েছে । একটি কিংবদন্তি হচ্ছে, বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর দ্বারা প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল মহেশখালী । 

আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে, মহেশখালীর তৎকালীন এক প্রভাবশালী বাসিন্দা ছিলেন নূর মোহাম্মদ শিকদার । তিনি একদিন পাহাড়ে শিকার করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন তার হারিয়ে যাওয়া গাভীটি পাহাড়ের মধ্যে একটি সুন্দর শিলাখন্ডে বাট থেকে দুধ ঢালছে । তিনি শিলা খন্ডটিসহ তার গাভী নিয়ে বাড়ি আসেন । সেদিন রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখতে পান যে, শিলা খন্ডটি একটি দেব বিগ্রহ । 

এ বিগ্রহ যে জায়গা থেকে নিয়ে এসেছেন সে জায়গায় রেখে তার উপর একটি শিব মন্দির নির্মাণ করতে হবে । নাহলে তার অমঙ্গল হবে । এরপরই তিনি সেখানে শিব মন্দিরটি নির্মাণ করেন । শিবের ১০৮টি নামের মধ্যে আদিনাথ ও মহেশ অন্যতম । আদিনাথ নামে সেই মন্দির স্থাপিত হয় ও নাম রাখা হয় আদিনাথ মন্দির । এবং এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় মহেশখালী। 

দ্বীপের ইতিহাসঃ

মহেশখালী এক সময় কক্সবাজারের সাথে যুক্ত ছিল । প্রায় ৪০০ বছর আগে প্রচন্ড ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূখন্ড থেকে পৃথক হয়ে জন্ম হয় এই দ্বীপের । মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই দ্বীপে কোন সুশৃঙ্খল জাতির আবাস ছিলোনা । তবে ধারণা করা হয় পর্তুগিজ জলদস্যুরা এই দ্বীপটি ব্যবহার করতো । ব্রিটিশ শাসনামলে এই দ্বীপটি বন্দোবস্তি প্রথার মাধ্যমে মালিক হন রবার্ট ওয়ারলেজ নামক একজন ইংরেজ । ওয়ারলেজ পরবর্তীতে ইংরেজ কালেক্টর চার্লস ক্রাফটসের নিকট মালিকানা বিক্রি করে দেন । চার্লস ক্রাফটস যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে স্থানীয় দেওয়ান কালিচরণ কানুনগোর কাছে বিক্রি করে দেন দ্বীপটির মালিকানা । নিঃসন্তান কালিচরণের মৃত্যুর পর মহেশখালীর মালিক হন তার স্ত্রী প্রভাবতী । প্রভাবতীর বৃদ্ধ অবস্থায় পালকপুত্র চন্ডিচরণের মৃত্যু হয় । ফলে প্রভাবতীর পরে মহেশখালীর মালিক হন চন্ডিচরণের পুত্র শরৎচন্দ্র । শরৎচন্দ্র ছিলেন মহেশখালীর একজন প্রজাবৎসল জমিদার । তিনি তার প্রজাদের পানীয় জলের অভাব মোচনের জন্য বিশাল একটি দিঘী খনন করেন । যার একটি অংশ এখনও বিদ্যমান । দেশ বিভাগের পর জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত অজিত কুমার রায় বাহাদুর চৌধুরী মহেশখালী দ্বীপের জমিদার ছিলেন । 

আদিনাথ মন্দিরের লোক কাহিনীতে নূর মোহাম্মদ শিকদারের উল্লেখ পাওয়া যায় । গোরক্ষ বিজয়ে ফয়জুল্লাহ, সুকুর মুহাম্মদ প্রভৃতি মুসলমানের নামও পাওয়া যায় । এতে করেই বুঝা যায় যে, আদিনাথ মন্দির ছিল হিন্দু-মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক সেতুবন্ধন । বর্তমানে এই মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে বৌদ্ধদের একটি রাখাইন বৌদ্ধ বিহার ও মুসলমানদের একটি মসজিদ । এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অপরুপ বহিঃপ্রকাশ ।  

কি কি দেখবেনঃ 

পুরো দ্বীপটিই একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান । এর প্রতিটি কোণে কোণে জড়িয়ে রয়েছে বহুকালের ইতিহাস, রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্য্য । যে কয়েকটি জায়গা পর্যটকদের সবথেকে বেশি আকৃষ্ট করে সেগুলো হলো মৈনাক পর্বতে অবস্থিত আদিনাথ মন্দির, আদিনাথ জেটি ও রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির । 

মৈনাক পর্বত আদিনাথ মন্দিরঃ

কালের স্বাক্ষী এই মৈনাক পর্বত । যার বুক চিরে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো আদিনাথ মন্দির । আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান মৈনাক পাহাড়ে হওয়ায় এই পাহাড়ের আরেক নাম আদিনাথ পাহাড় । সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ৩০০ ফুট উচুতে আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান । ইতিহাসবিদদের মতে,  মন্দিরটির অবকাঠামো ষোড়শ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল । মৈনাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত রয়েছে পাকা সিঁড়ি । সিঁড়ির বাম পাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠেছে তাঁতের কাপড়ের দোকান । স্থানীয় তাঁতে বোনা কাপড়ের দোকানগুলোর বিক্রেতা প্রায় সবাই রাখাইন মহিলা ও তরুণী । দোকানে দোকানে শোভা পাচ্ছে বাহারি ডিজাইনের বিভিন্ন রঙের শাড়ী । এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন আসবাবপত্র ও হাতে বুনা বিভিন্ন ধরনের ক্রাফটস ।

চূড়ার একপাশে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে গেছে সংকীর্ণ ট্রেইল । রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের জন্য এই ট্রেইলটি অনবদ্য এক উপঢৌকন ।

পাহাড়ের ঠিক মধ্যখানে আদিনাথ মন্দিরের অবস্থান । দর্শনার্থীদের বসার জন্য ভেতরে রয়েছে পাকা মেঝের এক পাশে দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চ । দেয়ালের অন্য পাশে পাহাড়ের খাদ নেমে গেছে নিচে । এর একটু সামনে এগিয়ে গেলেই মূল মন্দির আর শিবমূর্তি । প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে মন্দিরকে কেন্দ্র করে বসে আদিনাথ মেলা । মেলা চলে টানা ১৩ দিন ধরে । তখন দেশ-বিদেশ থেকে পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের ঢল নামে মন্দর প্রাঙ্গণে ।

 আদিনাথ জেটিঃ 

মৈনাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু হয়ে মহেশখালী চ্যানেলে গিয়ে থেমেছে পাকা আদিনাথ জেটি । সামুদ্রিক লাল কাঁকড়া আর উভচর মাডস্কিপারের খেলা দেখতে হলে জেটির রাস্তা ধরে এগুতে হবে সামনের দিকে । জেটির পুরো পথটাই গিয়েছে উপকূলীয় প্যারাবনের ওপর দিয়ে । মহেশখালী ডক পর্যন্ত চলে গেছে জেটির সরু পথ । মহেশখালীর এই প্যারাবনের মোট আয়তন প্রায় ১৭ হাজার একর । প্যারাবনজুড়ে রয়েছে বাইন গাছসহ বিভিন্ন গাছ-গাছালি ও শ্বাসমূল । 

বড় রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির
মহেশখালীতে অন্যতম আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো ঐতিহাসিক রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির । শতাব্দীর অন্যতম পুরানো রাখাইন সম্প্রদায়ের এই মন্দির দেখার জন্য মহেশখালীতে পর্যটকদের ঢল নামে । মূল বৌদ্ধ মন্দিরটি আনুমানিক প্রায় ২৮০ বৎসর পূর্বে নির্মিত হয় । তবে বিভিন্ন পর্যায়ে এর সংস্কার সাধনের পর বর্তমান অবস্থায় রয়েছে । এর কারুকাজ দেখলে যে কারো চোখ ধাধিয়ে যাবে । সৌন্দর্য্যমন্ডিত এই মন্দিরটি রাখাইন পাড়ার বৌদ্ধদের মিলনস্থল ।  

স্থানীয়দের জীবিকাঃ 

এই দ্বীপের বাসিন্দারা প্রায় সবাই কৃষিজীবি অথবা মৎস্যজীবি । পান, লবণ, শুটকি, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং মুক্তা চাষ করেই বেশিরভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে । দ্বীপটি লবণ ও পান ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র । মহেশখালীর মিষ্টি পানের সুনাম সারাদেশজুড়ে রয়েছে। পান চাষ এখানকার ঐতিহ্যবাহী পেশা । এছাড়া এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ বালি ।

কীভাবে যাবেন :

মহেশখালিতে স্থলপথ ও নদীপথ দুদিকেই যাওয়া যায় । 

স্থলপথে মহেশখালী যেতে চাইলে প্রথমে আসতে হবে চট্টগ্রাম । তারপর চট্টগ্রামের চকোরিয়া হয়ে আসতে হবে বদরখালী । বদরখালি থেকে আসতে হবে গোরকঘাটা । এই রুটে চট্টগ্রাম থেকে মহেশখালী আসতে জনপ্রতি খরচ পড়বে ১৫০ টাকা এবং সময় লাগবে দেড় থেকে দুই ঘন্টা । 

নদীপথে যেতে চাইলে প্রথমে আসতে হবে কক্সবাজারে । তারপর মহেশখালী যাওয়ার ৬নং ঘাটে যেতে হবে । তারপর সেখান থেকে ট্রলার, স্পীড বোট অথবা সাম্পানে করে  আসবেন মহেশখালী । ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা । মহেশখালি এসে সবকিছু ঘুরে দেখার জন্য রিক্সা অথবা ইজিবাইক রিজার্ভ করে নিতে পারেন । 

কোথায় থাকবেনঃ

মহেশখালীতে থাকার তেমন কোন সুব্যবস্থা নেই । কোন হোটেল বা রিসোর্ট এখনও গড়ে ওঠেনি । তাই থাকার জন্য কক্সবাজারে ফিরে আসতে হবে । কক্সবাজারে অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্টের মধ্য থেকে আপনার পছন্দের সবথেকে সেরা রিসোর্টটি খুব সহজেই www.amarroom.com এর মাধ্যমে বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন । নিরাপদ ও ঝামেলাহীন ভ্রমণে www.amarroom.com সবসময় আছে আপনার পাশে । 

amarroom