Travel

মনপুরা দ্বীপ, মেঘনার কূলে ভেসে থাকা একটি দ্বীপ !

11

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যে পরিপাটি করে সাজানো আমাদের এ দেশ । পাহাড়, নদী, সাগর ও দ্বীপের অপূর্ব মিশেলে সত্যিকারের পূর্ণতা নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ । এই সৌন্দর্য্যের একটা বিরাট অংশ নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে একটি দ্বীপ, যার নাম মনপুরা ।

এর নামের মধ্যে যেমন রয়েছে ঐশ্বর্য্য তেমনি রয়েছে মনকে প্রজাপতির রঙে রাঙিয়ে দেয়ার মতো অফুরন্ত সৌন্দর্য্য । রয়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার মতো অপার রূপবৈচিত্র । প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের বৈচিত্রে ভরপুর এ দ্বীপটি দিতে পারে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝখানে অফুরন্ত সজীবতা । দ্বীপের পাড়ে দাড়িয়ে ভোরের সূর্যোদয় ও স্নিগ্ধ আলোয় রয়েছে শত বছরের প্রশান্তি । ক্লান্ত শ্রান্ত মনকে সজীব করে দেয়ার বিশাল এক মায়া । মেঘনার কূলে ভেসে থাকা এই দ্বীপের পাড়ে দাড়িয়ে শেষ বিকেলের অন্তিম লগ্নে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ডুব দেয় তখন মনে হবেনা এটি এ ধরণীর কোন দৃশ্য ।

দৈবালোকের অসীম আনন্দে ছাপিয়ে যাবে হৃদয় । রাতে দ্বীপের কিনারায় বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনের সাথে জোছনা অবলোকন করতে করতে পাওয়া যায় অনাবিল প্রশান্তি ।

হরিণের পালের ক্লান্তিহীন ছুটোছুটি যে অনাবিল আনন্দ দিবে তা আর পৃথিবীর কোথাও খোজে পাওয়া যাবেনা । দ্বীপটির মাইলের পর মাইল সাজানো হাজার হাজার বৃক্ষরাজি গুলো ঠায় দাড়িয়ে আছে শিল্পীর ক্যানভাসের মতো । দেখে মনে হয় কোন শিল্পী যেন তুলি দিয়ে নিজ হাতে অপরূপ এই ক্যানভাসটি সাজিয়েছেন । 

শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে দ্বীপটির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায় কয়েকগুন । পাখির কিচির মিচির শব্দে মূখরিত থাকে পুরো দ্বীপ । বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতের পাখি দ্বীপটিতে আসে । তারা দ্বীপকে ঘিরে তৈরি করে অসম্ভব মায়াবী এক পরিবেশ । 

অবস্থানঃ

মনপুরা দ্বীপ ভোলা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ । এটি দ্বীপ জেলা ভোলার অন্তর্গত একটি উপজেলা । ৪টি ইউনিয়ন ও ছোট বড় ১০-১২টি চর নিয়ে প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো দ্বীপটি ভেসে আছে মেঘনার কূল ঘেসে । এর ৩ দিকে রয়েছে মেঘনা নদী এবং অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর । এই দ্বীপের চরগুলিতে ৬ মাস থাকে লবনাক্ত পানি ও ৬ মাস থাকে মিঠা পানি । এটি এই দ্বীপের একটি আশ্চর্য্যজনক বৈশিষ্ট্য । ৩৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের  এ দ্বীপটি নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে দিন দিন বিস্তৃতি হারাচ্ছে । মনপুরা রক্ষায় ৭৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয় । যার অর্ধেকের বেশি মেঘনার গহবরে বিলীন হয়ে গেছে । প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসতি রয়েছে মনপুরায় । মানুষগুলি খুবই সহজ সরল আর মিশুক প্রকৃতির । পর্যটকদের তারা মন খুলে সাহায্য করেন । এই দ্বীপে নেই কোন চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয় ।

দ্বীপের ৮০ ভাগ লোকই কৃষক ও মৎসজীবি । নিজেরা জাল বুনে সেই জাল দিয়ে মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরে মাছ আহরণ করে । ইলিশ মাছ,পোয়া মাছ,পাঙ্গাস মাছসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ ধরে বিক্রি করে ও নিজেরা খায় । বাকিরা রয়েছেন কৃষিকাজের সাথে যুক্ত । মৌসুমভেদে তারা বিভিন ধরনের শাক সবজি ও ধান ফলান । অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ রয়েছেন যারা গরু ও মহিষের দুধ বিক্রি করেন । মনপুরার বিভিন্ন চরে অসংখ্য গরু ও মহিষ চরানো হয় । এসব চর গুলোতে শুধু রাখালরাই থাকে । তারা গরু ও মহিষের দেখাশুনা করে । রাখালরা একটি বিশেষ ধরনের উচু মাঁচাতে থাকে যার স্থানীয় নাম “বাথান” । বাথানের ভিতরেই থাকে রান্নাবান্নার অসম্ভব সুন্দর ব্যবস্থা । তারা প্রতিদিন পাইকারি বিক্রেতার কাছে দুধ বিক্রি করে । পাইকারি বিক্রেতা সেটা বিক্রি করে মূল দ্বীপের বাসিন্দাদের কাছে ।

মনপুরার প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুৎ । এখানে বিদ্যুতের কোন সুব্যবস্থা নেই বললেই চলে । সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বিকেল ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বিদ্যুত সরবরাহ করা হয় । এই সময়টাতেই সবাই মোবাইল,টর্চ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ দিয়ে থাকে ।

ইতিহাসঃ

মনপুরার ইতিহাস ৬০০ বছরের পুরনো । ষোড়শ শতাব্দীতে এই দ্বীপটি চন্দ্রদ্বীপের (বর্তমান বরিশাল) অন্তর্গত একটি জমিদারি এলাকা ছিল । সেই সময়ে কয়েকজন পর্তুগিজ পর্যটক ঘুরতে আসেন জনমানবহীন এই দ্বীপে । দ্বীপের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে পর্যটকগণ ১৫১৭ সালের দিকে তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য এটিকে নির্বাচিত করেন । তখন থেকে শুরু হয় মনপুরায় বসতি । এখনও মনপুরায় পাওয়া যায় ৬০০ বছর আগের পর্তুগিজদের বসবাসের স্মৃতিচিহ্ন । তাদের নিয়ে আসা বিশেষ প্রজাতির কুকুরের দেখা মিলে মনপুরার আনাচে কানাচে । লম্বা লোমওয়ালা এসব কুকুর বাংলাদেশের আর কোথাও পাওয়া যায়না ।

মনপুরার নামকরণে কয়েকটি আলাদা মত রয়েছে । একদল মনে করেন দ্বীপের সৌন্দর্য্য পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিত বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল মনপুরা । আরেকদল মনে করেন এই দ্বীপে মনগাজি নামে একজন মাঝি বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান । তার নামানুসারে দ্বীপের নাম হয়ে যায় মনপুরা । তবে ঐতিহাসিক বেভারিজ দুইটি মতের সাথেই দ্বিমত পোষণ করেন । তিনি মনে করেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মনগাজী নামে একজন জমিদার এই দ্বীপটি লিজ নেন । তখন থেকে এই দ্বীপের নাম মনপুরা । নামকরণের ইতিহাস যাই হোক যুগে যুগে মনপুরার সৌন্দর্য্য পর্যটকদের মনকে ভরিয়ে দিয়েছে এটি চিরন্তন সত্য ।

মনপুরায় কি কি দেখবেন ?

মনপুরায় ছোট বড় মিলিয়ে রয়েছে ২০টি ম্যানগ্রোভ বন। যেখানে রয়েছে প্রায় ১ কোটি জীবিত গাছ । এসব ম্যানগ্রোভ বনের ভিতরে রয়েছে মায়া হরিণের বাস । দ্বীপটির হরিণের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার । যারা ট্র‍্যাকিং করতে পছন্দ করেন তাদের পছন্দের তালিকায় ম্যানগ্রোভ বনগুলো শীর্ষে রাখাই বাঞ্চনীয় । বনের ভিতর সবুজের সমারোহ অবলোকন করতে করতে দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণের বিশাল পালের সাথে ।

দ্বীপ থেকে নদীর ভেতরে ৫০০ মিটার বিস্তৃত ল্যান্ডিং স্টেশন পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে । এর শেষ মাথায় দাড়িয়ে নদীর স্রোত ও ঢেউয়ের আওয়াজের সাথে পাখির কলতান যুক্ত হয়ে অদ্ভুত এক মায়াবি পরিবেশ সৃষ্টি করে । এখানে দাড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে মোটেও ভুলে যাবেন না । সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ডুব দিবে তখন মনে হবে সূর্যটা বুঝি নদীতেই ডুব দিল ।

ঘুরে আসতে পারেন চৌধুরী প্রজেক্ট থেকে । এটি একটি মাছের ঘের । এখানে রয়েছে ছোট বড় ৫টি পুকুর । পুকুর পাড়ে রয়েছে প্রায় ২ হাজার নারিকেল গাছ । নারিকেল গাছ গুলোর সৌন্দর্য্য নিজ চোখে না দেখলে কল্পনা করা সম্ভব নয় ।

যারা নৌকায় চড়তে পছন্দ করেন তারা নৌকা নিয়ে চলে যেতে পারেন ছোট ছোট চরে । সেখানে স্বচক্ষে দেখে আসতে পারেন কিভাবে “মাথানে” রাখালরা তাদের জীবন যাপন করে । মাথানের পরিপাটি জীবন ব্যাবস্থা মুগ্ধতা ছড়াবে । মাথানের সৌন্দর্য্য দেখে মনে হতেই পারে, আহা ! এখানে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলে মন্দ হতোনা ।

মাছ ধরা নৌকার সাথে চলে যেতে পারেন মেঘনাতে । যেকোন জেলেকে বললেই সাথে করে নিয়ে যাবে । যারা রোমাঞ্চপ্রিয় তারা কোনভাবেই মাছ ধরার রোমাঞ্চটা মিস করবেন না । আর যারা নদীতে যেতে ভয় পান । তারাও হতাশ হবেন না । এখানকার বাজারগুলোতে বিশেষ ধরনের মাছ ধরার যন্ত্র রয়েছে । স্থানীয়রা এটাকে ডাকেন “ফানুশ” । ফানুশের চারিদিক গ্লাস দিয়ে তৈরি । ফলে আলো রিফ্লেক্ট করে মাছকে আকর্ষণ করে । এটি দিয়ে সহজেই মাছ ধরা যায় । 

এছাড়াও সাথে করে বরশি নিয়ে যেতে পারেন । ছোট বড় অনেক মাছ ধরতে পারবেন । 

এগুলো ছাড়াও এই দ্বীপের আরেকটি বড় আকর্ষণ হচ্ছে ক্যাম্পিং । মনপুরা ক্যাম্পিং এর জন্য আদর্শ জায়গা । নদীর পাশে ক্যাম্পিং এবং সাথে বার বি কিউ পার্টি অসাধারণ আমেজ সৃষ্টি করে । 

বাহনঃ

মনপুরার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা অনুন্নত । মোটর সাইকেলের উপরই পর্যটকদের নির্ভর করতে হয় । এছাড়াও কিছু সংখ্যক অটো ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা রয়েছে । পুরোদিনের জন্য এগুলোর ভাড়া পড়বে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা । 

খাবারঃ

মনপুরায় সকালে নেমেই চা দিয়ে দিনটা শুরু করুন । কারণ মনপুরার চা হচ্ছে খাটি মহিষের দুধের তৈরি । এর অতুলনীয় স্বাদ মনে গেথে থাকবে অনেক দিন । শুধু মহিষের দুধের চা না, মনপুরায় পাওয়া যায় মহিষের দুধের তৈরি দই । এটি চেখে দেখতে মোটেও ভুলবেন না । 

বাজার গুলোতে আরো পাবেন খঁাটি দুধের ছানায় তৈরি সুস্বাদু মিষ্টি । শীতের মৌসুমে মনপুরায় খেজুরের রস পাওয়া যায় ।

দুপুর ও রাতের খাবারে রেগুলার আইটেমের পাশাপাশি পাওয়া যায় হাসের মাংস, টাটকা ইলিশ মাছের তরকারি ও কোরাল মাছ । 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে ৩টি রুটে মনপুরায় যাওয়া যায় । 

প্রথমটি হচ্ছে-

ঢাকা থেকে প্রথমে লঞ্চে করে ভোলা আসতে হবে । ভোলার তজুমদ্দিন ঘাট থেকে সি-ট্রাক মনপুরার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । সি-ট্রাকটি তজুমদ্দিন ঘাট থেকে দৈনিক বিকাল ৩টায় ছাড়ে এবং মনপুরা থেকে ছাড়ে সকাল ১০টায় ।

২য়টি হচ্ছে-

ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়াঘাট থেকে মনপুরার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন দুটি লঞ্চ ছেড়ে যায় । এগুলোর মাধ্যমেও আসা যাবে । তবে এই দুটি রুটে আসাই একটু বিরক্তিকর হবে । 

সব থেকে সুবিধাজনক উপায় হচ্ছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সরাসরি মনপুরা চলে আসা । 

এমভি ফারহান ও এমভি তাসরিফ নামের দুটি বিলাসবহুল লঞ্চ হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যথাক্রমে ৫:৩০ মিনিটে ও ৬:০০টায় ছাড়ে । লঞ্চগুলো সকাল ৭টার দিকে মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাটে পৌছায় । ১ ঘন্টা যাত্রাবিরতি দিয়ে আবার হাতিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে । ওইদিনই ১:৩০ এর দিকে লঞ্চ গুলো ফিরে আসে মনপুরায় ।

লঞ্চ গুলোর সিংগেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার টাকা, ডাবল কেবিনের ভাড়া ১৮০০ টাকা, ভি আই পি কেবিনের ভাড়া পরবে ৫ হাজার টাকা এবং ডেকের ভাড়া মাত্র ৩০০ টাকা । 

থাকাঃ

মনপুরায় থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেল ও ডাকবাংলো। অন্যান্য ট্যুরিস্ট স্পটের তুলনায় এখানকার হোটেল ভাড়া বেশ কম । আপনি www.amarroom.com এর মাধ্যমে সহজেই কোন ঝামেলা ছাড়া হোটেল বা বাংলো বুক করতে পারবেন ।

amarroom