Travel

রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের প্রথম গন্তব্য বান্দরবান।

nafakhum

রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের প্রথম গন্তব্যই হচ্ছে বান্দরবান। বিধাতা যেন বান্দরবানেই ঢেলে দিয়েছেন পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য্য। বান্দরবানের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া ভার। পাহাড় ও পাহাড়ি এলাকা যারা পছন্দ করেন তারা বান্দরবানকেই পদচারনার জন্য বেছে নেন। পাহাড়ের বিশালতা মনে এনে দেয় এক টুকরো শান্তির পরশ। সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে মন হারিয়ে যায় অন্য কোন ভূবনে। বান্দরবানে শুধু পাহাড়ই নয়। রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় খুম। খুম হচ্ছে মারমাদের নিজস্ব ভাষার শব্দ। খুম শব্দের অর্থ জলপ্রপাত। পাহাড়ের গা বেয়ে বয়ে চলেছে ছোট বড় অসংখ্য খুম বা জলপ্রপাত। এসব জলপ্রপাতের সৌন্দর্য্য সুধা পান করতে হলে কিছু পথ যেতে হবে নৌকায় আবার কিছু পথ পায়ে হেটে ট্র‍্যাকিং করে। অন্যান্য জায়গার মতো এখানে ট্র‍্যাকিং করা কিন্তু মোটেও সহজ কর্ম নয়। কখনো পাথরের উপর দিয়ে কখনো ঢালু রাস্তা দিয়ে কখনো ছোট ছোট নদীর স্রোতের বিপরীতে হেটে চলতে হবে অনেকটা পথ। এই পথচলা যতটা না ক্লান্তি দিবে তার থেকে বেশি রোমাঞ্চের আনন্দ দিবে। রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের কাছে তাই এই কষ্ট অতি তুচ্ছ ব্যাপার। রোমাঞ্চের কাছে ক্লান্তি কোন ছার! রোমাঞ্চ উপভোগ করতে করতে যখন খুমগুলোর সামনে দাড়াবেন তখন পলকেই সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। খুমের সৌন্দর্য্য মুহুর্তেই আপনার হৃদয়কে শীতল করে দিবে। দূর করে দিবে অন্তরের সকল কাঠিন্য। খুমের জলধারায় গা ভিজিয়ে, নিতে পারেন স্বর্গের সুখ। শীতল জলধারা একরাশ ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়ে মাতিয়ে দিবে অফুরন্ত আনন্দে। জলকেলি করতে করতে কিভাবে যে সময় পার হয়ে যাবে টেরও পাবেন না। খুমের স্বচ্ছ জলরাশি যে কতটা সুন্দর তা কল্পনাতীত। সেই কল্পনাতীত সৌন্দর্য্য যখন নিজ চোখে ধরা দিবে তখন বিমোহিত হয়ে যাবে মন। 

থানচিঃ

 বান্দরবান জেলার সবথেকে বড় উপজেলা থানচি । এর আয়তন ১০২০ বর্গ কিলোমিটার । এর নামকরণ করা হয়েছে মার্মা শব্দ থাইন চৈ থেকে । থাইন চৈ শন্দের অর্থ বিশ্রামের স্থান । ধারণা করা হয়, ১৯৫০ সাল ও তার পূর্বে নৌপথে যাতায়াতকালে যাত্রীগণ বিশ্রামের জন্য এ স্থানে থামতেন । তাই মারমারা এই স্থানটিকে থাইন চৈ নামে ডাকতো ।  পরবর্তীতে থান চৈ থেকে থানচি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে পার্বত্য অঞ্চলের এই জায়গাটি । থানচি উপজেলায় রয়েছে ২টি মসজিদ, ২টি মন্দির, ৩১টি বৌদ্ধ বিহার এবং ২৯টি ছোট বড় গীর্জা ।
থানচি উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয় অসম্ভব সুন্দর নদী সাঙ্গু । এছাড়া এখানকার সব থেকে বড় আকর্ষণ রেমাক্রী খাল এ খাল ধরেই যেতে হয় থানচি উপজেলার সকল খুম তথা ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখতে । 

পদ্মঝিরিঃ

থানচি থেকে পদ্মমুখ পর্যন্ত নৌকায় আসতে হয় । বাকিটা পথ পাড়ি দিতে হয়ে পায়ে হেটে । পদ্মমুখ থেকে পদ্মঝিরি হয়ে আসতে হয় থুইসা পাড়ায় । বর্ষায় পদ্মঝিরি পাড়ি দেয়া বিশাল এক রোমাঞ্চের ব্যাপার । তখন পানির স্রোত বেশি থাকায় দড়ি ধরে ধরে অতি কষ্টে পাড়ি দিতে হয় খালটি । যারা সাতার জানেন না তাদের জন্য বলতে গেলে একটি বিভীষিকা খাল পার হওয়া । তবে মানতেই হবে রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ কখনও এই রোমাঞ্চ হাতছাড়া করতে চাইবে না ।

জলপ্রপাত গুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ 

আমিয়াখুমঃ 

পাথর আর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে স্ববেগে নেমে আসছে মায়াবী জলধারা। দুধসাদা ফেনা ছড়িয়ে তা ছোটে চলেছে পাথরের গা ঘেসে।
অবিরাম জলধারার শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে মায়াবী এক সুর। ঠিক এরকমই দৃশ্য পাবেন পাহাড় ঘেসে গড়ে উঠা আমিয়াখুম জলপ্রপাতে। আমিয়াখুমের সৌন্দর্য্যের এতই বিশালতা যে এটিকে বলা হচ্ছে বাংলার ভূস্বর্গ। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জলপ্রপাতগুলোর একটি আমিয়াখুম জলপ্রপাতটি বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের পাশে বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাক্ষিয়ং এলাকায় অবস্থিত। 

নাফাখুমঃ

সাংগু নদী হতে নাফাখুম জলপ্রপাতের উৎপত্তি। পাহাড়ি নদী সাংগু  হতে জলপ্রপাত শুরু হয়ে ২৫-৩০ ফুট নিচে পর্যন্ত বিস্তৃত।  আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের সব থেকে বড় জলপ্রপাত। বর্ষা মৌসুমে এর আয়তন সবথেকে বেশি থাকে। শীতে খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়। নাফাখুমের পড়ন্ত জলধারার নীচে বসে জলকেলি করতে করতে কখন যে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবেন টেরও পাবেন না।

পাহাড়ীরা নাফাখুমের পিছনে বসে মাছ শিকার করে। নাতিং নামের এক ধরনের উড়ুক্কু মাছ এই জলপ্রপাতে পাওয়া যায়। উজান ঠেলে এসে নাতিং মাছ নাফাখুমে বাধাপ্রাপ্ত হয়। লাফ দিয়ে এই প্রপাত-টা পার হতে গিয়ে জলপ্রপাতের ভিতরে ছোট্ট একটা গুহায় পড়ে।  সেখান থেকে স্থানীয় পাহাড়ীরা সহজেই মাছ আহরণ করে।

সাতভাইখুমঃ

আমিয়াখুম থেকে একটু দূরে অবস্থিত এই সাতভাইখুম। আমিয়াখুম ঝর্না থেকে পাহাড় বেয়ে কিছুক্ষণ হাটলেই সাতভাইখুমের অঞ্চলের শুরু। তবে সাতভাইখুমের আসল সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে ভেলায় করে যেতে হবে ১ ঘন্টার রাস্তা। এই ১ ঘন্টায় পাথুরে খাল দিয়ে যেতে যেতে পাহাড়ি ঠিকরে পড়া সৌন্দর্য্যের পুরোটা উপভোগ করতে পারবেন। এর স্বচ্চ জলরাশি দেখে প্রাণ জোড়াবে নিমেষেই।

ভেলাখুমঃ 

নামের মধ্যেই বুঝা যাচ্ছে এটি ভেলার সাথে সম্পর্কিত। সাতভাই খুমের মতো ভেলাখুমও ঘুরে বেড়াতে হবে ভেলা দিয়ে। ভেলাখুমে একটি ঝর্ণা রয়েছে। এটি নাইক্ষ্যারমুখ নামে পরিচিত। ভেলাখুমে অবশ্যই একটু সাবধানে থাকতে হবে। কারণ সেখানকার স্যাঁতসেঁতে জায়গাগুলোতে জোঁকে ধরার ভয় থাকে বেশি।

রেমাক্রিঃ 

বান্দরবানের থানচি উপজেলা হতে নৌকায় রেমাক্রি  যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ৩ ঘন্টা। থানচি থেকে রেমাক্রি যাওয়ার নৌকা ভ্রমণ মোহিত করবে। এই পথে চলার সময় দুটো জায়গা সবসময় পর্যটকদের টানে; তিন্দুর ও বড় পাথর বা রাজা পাথর জায়গাটা। সাঙ্গু নদীর মাঝখানে বড় বড় পাথরের ফাঁক গলে নৌকা যাত্রাটা সত্যিই অসাধারণ। আবার যদি কেউ আমিয়াখুম ভ্রমণে যান তবে আমিয়াখুম থেকে থুইসা পাড়া হয়ে হেটে চলে আসতে পারেন রেমাক্রি। সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো।

খাবারঃ

থুইসা পাড়ায় খাবার খেতে পারবেন। বন মোরগ, ডাল ও ভাতের দাম পড়বে ১২০ টাকা। রেমাক্রি বাজারেও খেতে পারবেন। থুইসা পাড়ার মতোই ব্যাবস্থা। ট্র‍্যাকিং করার সময় কোন খাবারের ব্যবস্থা থাকবেনা। তাই শুকনো খাবার নিজের সাথেই রাখুন। পাহাড়ি বিভিন্ন ফলও চোখে পড়তে পারে। পুরোপুরি না চিনে থাকলে এগুলো খাবেন না। পাহাড়ি চালতা পেয়ে যেতে পারেন পথ চলতে চলতে। রোমাঞ্চটা মনে রাখতে পাহাড়ি চালতা খেতে একদমই ভুলবেন না।

কিভাবে যাবেন কোথায় থাকবেন?

বান্দরবান একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল। এখানকার যোগাযোগ ব্যাবস্থা খুবই নাজুক। বেশিরভাগ সময়ই হেটে কিংবা নৌকাতে এসব অঞ্চলে চলাচল করতে হয়। 

দেখে নেয়া যাক বান্দরবান কিভাবে যাওয়া যাবে।

ঢাকা হতে বাসে করে বান্দরবান আসতে হবে। নন এসি বাসে জনপ্রতি ভাড়া ৬৫০ টাকা। বান্দরবান সদর থেকে থানচি উপজেলা আসতে হবে। থানচি দুইভাবে আসা যায়; চান্দের গাড়ি ও বাসে। গ্রুপে যদি মানুষ বেশি থাকে তবে চান্দের গাড়িতে আসাই উত্তম হবে। ভাড়া পড়বে  ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। বাসে করে আসলে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে মাত্র ২০০ টাকা। 

থানচি এসে ফ্রেশ হয়ে প্রথম কাজই হচ্ছে গাইড ঠিক করা। বলে রাখা ভাল থানচি থেকে গাইড থুইসা পাড়া পর্যন্ত যাবে। থুইসা অয়াড়া থেকে প্রথম গাইড আরেকজন গাইড ঠিক করে দিবে। দ্বিতীয় গাইড রেমাক্রি, আমিয়াখুমসহ বাকী জলপ্রপাতগুলো ঘুরে দেখাবে। প্রিথম জনের সাথে পুরো ট্রিপটি প্যাকেজ হিসেবে নিয়ে নিবেন। ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পড়বে পুরো প্যাকেজ। 

গাইড ঠিক করে থানচি থেকে নৌকায় করে যেতে হবে পদ্মমুখ। ভাড়া পরবে ৮০০ থেকে ১ হাজার। ৫-৬ জন একটি নৌকাতে উঠতে পারবেন।

পদ্মমুখ থেকে পদ্মঝিরি হয়ে আসতে হবে থুইসা পাড়া। এই পুরো রাস্তাই আসতে হবে ট্র‍্যাকিং করে। সময় লাগতে পারে ৪ থেকে ৬ ঘন্টা।

থুইসা পাড়ায় থাকতে হবে স্থানীয় আদিবাসিদের মাচাং এ। খরচ পড়বে জনপ্রতি ১০০ টাকা। যার মাচায় থাকবেন তার কাছেই পাবেন খাবার। খরচ পড়বে ১২০ টাকা জনপ্রতি। 

থুইসা পাড়ায় রাতে থেকে খুব ভোরে উঠে বের হবেন আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে পার হতে হবে দেবতার পাহাড়। থুইসা পাড়া থেকে আমিয়াখুম ট্র‍্যাকিং করে আসতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘন্টার মতো। 

আমিয়াখুমের পাশেই রয়েছে সাতভাইখুম ও ভেলাখুম। পুরোদিন নৌকায় ঘুরে ও ট্র‍্যাকিং করে রাতে ফিরে যেতে হবে থুইসা পাড়ায়। রাতে থুইসা পাড়ায় থেকে পরদিন ভোরে থুইসা পাড়া থেকে হেটে আসতে হবে নাফাখুম। সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো। নাফাখুমের সৌন্দর্য্য উপভোগের পর পায়ে হেটে চলে আসবেন রেমাক্রি বাজারে। আসতে সময় লাগবে দুই ঘন্টার মতো। রেমাক্রি বাজারে বেশ সুন্দর ছোট ছোট কটেজ পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। কটেজে উঠে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে যাবেন রেমাক্রি ঝর্ণাতে। রেমাক্রি বাজার থেকে একদম কাছেই রেমাক্রি ঝর্ণা। এখানে বাকি দিনটা কাটিয়ে কটেজে ফিরে বিশ্রাম করুন। 

পরদিন সকালে রেমাক্রি বাজার থেকে থানচির জন্য নৌকা ঠিক করুন। ভাড়া পড়বে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। পথিমধ্যে পড়বে তিন্দু ও বড় পাথর। শেষ লগ্নের এই নৌকা ভ্রমণটা পুরো ট্রিপের ক্লান্তি দূর করে দিবে। থানচি ফিরে আগের মতোই বাসে বা চান্দের গাড়িতে বান্দরবান আসতে হবে। বান্দরবান থেকে বাস করে ফিরতে হবে ঢাকায়।

সাবধানতাঃ 

জলপ্রপাতগুলোর আসল সৌন্দর্য্য দেখা যায় বর্ষাকালে। আর বর্ষাকালে ট্র‍্যাকিং করাটাই সব থেকে বেশি বিপজ্জনক ও কষ্টের। ট্র‍্যাকিং করার সময় হুট করেই চলে আসতে পারে বৃষ্টি। তাই রেইন কোট সাথে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে খেয়াল রাখবেন রেইনকোট যাতে পাতলা হয়। নাহলে ট্র‍্যাকিং করাটা বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। 

বৃষ্টির সময় পাহাড়ি রাস্তাগুলো একদম পিচ্ছিল থাকে। সাবধানে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। একটু অসাবধান হলেই বড় দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। 

পাহাড়ি জোঁক থেকে সাবধান। এরা বিষাক্ত সাপের থেকেও ভয়ংকর। একবার কামড়ালে অনেকক্ষণ ধরে রক্তপড়া বন্ধ হবেনা। জোঁক থেকে বাচতে পায়ে সাদা লম্বা মোজা পরে নিবেন। এবং কিছুক্ষণ পরপর দেখে নিবেন কোথাও জোঁকে ধরছে কি না। 

যারা সাতার জানেন না তারা অবশ্যই লাইফ জেকেট সাথে রাখবেন। কিছু কিছু খাল ও নদীতে অনেক পানি থাকে। এগুলো সাঁতরে কিংবা দড়ি ধরে পার হতে হয়। 

পাহাড়ি বনে ছোট ছোট কাটাযুক্ত অনেক গাছ আছে। এগুলোতে অসাবধাণতাবশত স্পর্শ করলে কেটে যেতে পারে। তাই সবসময় ফার্স্ট এইড সাথে রাখবেন। জ্বর,মাথা ধরা ও ব্যাথার ওষুধ রাখতে মোটেও ভুলবেন না। এগুলো অনেক কাজে দিবে।

amarroom