Travel

নীলাচল, স্বর্ণ মন্দির, মেঘলা প্রান্তিক লেক !

17378683836_6838e00b9e_h

চিম্বুক পাহাড়

পাহাড় নাকি সাগর, এই দুটি প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মধ্যে কোনটা বেশি প্রিয় তা হয়তো নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য । তবে পাহাড়ী সৌন্দর্যের রোমান্টিকতা মন ছুয়ে যায়নি এমন পর্যটক পাওয়া মুশকিল বটে । আর বাংলাদেশের পাহাড়ী সৌন্দর্যের মধ্যে পাহাড়ের রানী হলো চিম্বুক পাহাড়। বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কারনে দেশের গন্ডী পেরিয়ে আজ বিদেশেও পরিচিত দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাহাড় চিম্বুকের ।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে এই পাহাড়টি  সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ ফুট উঁচু । চিম্বুক যাওয়ার রাস্তার দুই পাশের পাহাড়ী দৃশ্য এবং সাঙ্গু নদী ভ্রমণকে করে তুলে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক । পাহাড়ের মাঝে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়ার সময়টা সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর ।  মনে হবে মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছেন অন্য কোন জগতে । এ পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের দৃশ্য সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর । পরিকল্পিতভাবে সাজানো এ পাহাড়চূড়াতে উঠা সবচেয়ে চমকপ্রদ । উঠেই দক্ষিণে সিঁড়ি নেমে গেছে বিশাল নব চত্বরে । শরতে এই ভিউ পয়েন্ট থেকে দাঁড়িয়ে দেখা যায় বিশাল মেঘের সমুদ্র আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপেও শীতল বাতাস মনে এনে দেয় প্রশান্তি । দিগন্তজুড়ে আঁকাবাঁকা পাহাড় মনে হয় যেন সমুদ্রের ঢেউ । প্রায় পঁচিশ শত ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা কক্সবাজার আর চট্টগ্রাম এর বিভিন্ন অঞ্চল গুলোকে দেখা যায় । বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে মনে হয় মেঘের স্বর্গরাজ্যে ভাসছে চিম্বুক ।

পাহাড়ি রাস্তায় জিপে করে আদিবাসীদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের অতি সাধারণ জীবনযাত্রা আপনাকে করবে অবাক আর বিস্মিত । গ্রামের এসব আদিবাসীরা প্রকৃতির মতই অত্যন্ত সরল আর  সাধারণ । তারা তাদের ঘরগুলো মাচার মতো উঁচু করে তৈরি করে জীবন যাপন করে । 

চিম্বুকের  উত্তর দিক দিয়ে সড়ক চলে গেছে থানচি আর পূর্বকোণ বরাবর নীলগিরি ৷ উত্তর দিকেও কয়েক স্তরে নির্মাণ করা হয়েছে মনোরম ভিউ পয়েন্ট যার কারণে অনায়াসে পর্যবেক্ষণ করা যায় চারপাশ । এর আরও  একটি বিশেষত্ব হলো ঠিক নিচে রাস্তার পাশে বারো মাস মেলে পাহাড়ের ফল যার মধ্যে রয়েছে পেঁপে, কলা, আখ, ডাব, কমলা, বরই ইত্যাদি । সব ফলই টাটকা হওয়ায়  পর্যটকরা এসব ফল খেতে খুবই পছন্দ করেন । কিছু বার্মিজ ও আদিবাসী পণ্যও পাওয়া যায় এখানে ।  

কীভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে প্রথমে বান্দরবান শহরে যেতে হবে এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বেশকিছু বাস ছেড়ে যায় । 

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে পূরবী এবং পূর্বাণী নামে দুটি নন এসি বাস ৩০ মিনিট পর পর বান্দরবানের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায় ।

  বান্দরবান শহরে পৌছার পর রুমা বাস স্টেশন থেকে চাঁদের গাড়ি হিসেবে পরিচিত জীপ, ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার, পাজেরো ইত্যাদি  যানবাহনের সাহায্যে চিম্বুক যাওয়া যায় । গ্রুপ করে বাস এ যেতে চাইলে বান্দরবান-থানচি পথে যাতায়াত করা বাস ভাড়া নিতে হবে । এসব বাস স্পেশাল বাস যা দূর্গম পাহাড়ী পথে চলাচল করতে সক্ষম ৷ তবে  বাসে যাতায়ত করা ঝুঁকিপূর্ণ । মনে রাখতে হবে চিম্বুক-থানচি পথে বিকেল ৪ টার পরে কোনো বাস চলাচল করে না । তাই ৪ টার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে বান্দরবান ।  

স্বর্ণ মন্দিরঃ  

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট হচ্ছে বুদ্ধ ধাতু জাদি ক্যাং । এই জাদিটি বান্দরবান স্বর্ণ মন্দির নামে সুপরিচিত । বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তীর্থ স্থান এই মন্দিরটি দেশী বিদেশী পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষনীয় স্পট । এটি স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত হলেও এটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত নয় । মূলত এর সোনালী রঙের কারণেই এটির নামকরণ করা হয়েছে স্বর্ণমন্দির । বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা বড় এই হীনযান বৌদ্ধ মন্দিরে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি । 

অপরূপ সৌন্দর্যের এই মন্দিরটি বান্দরবান শহরের বালাঘাটা এলাকায় অবস্থিত । এই মন্দির থেকে বান্দরবানের বালাঘাটা উপশহর ও এর আশপাশের সুন্দর নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখা যায় । মন্দিরটি বালাঘাট থেকে ৪ কিমি এবং বান্দরবন সদর থেকে ১০ কিমি দূরে অবস্থিত। 

বান্দরবানে যেসব মারমা জাতিগোষ্ঠী বসবাস  করে তারা হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী 

। ২০০০ সালে পূর্ব এশীয় ধাচে নির্মিত এই মন্দির স্থানীয়দের কাছে কিয়াং নামে পরিচিত । এই পাহাড়ে দেবতা পুকুর নামে একটি লেক আছে, লেকটি সাড়ে তিনশত ফুট উচুতে হলেও সব মৌসুমেই পানি থাকে । স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনে করে এটি দেবতার পুকুর তাই এখানে সব সময় পানি থাকে ।

মন্দিরটিতে প্রবেশের জন্য কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয় । বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের টিকিটের বিনিময়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয় । জনপ্রতি টিকেট মূল্য ২০ টাকা ।  তবে মন্দিরের মূল অংশে যেখানে জাদিটি আছে সেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ । সন্ধ্যা ছয়টার পরে ভিন্ন ধর্মালম্বীদের প্রবেশের অনুমতি নেই । তাছাড়া মন্দির চত্ত্বরে শর্টপ্যান্ট, লুঙ্গি এবং জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ । 

কীভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান এর  বাস রয়েছে । এসি বা নন এসি বাসে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে । উল্লেখযোগ্য বাসগুলো হলো শ্যামলি, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি । 

চট্টগ্রাম থেকেও বান্দরবান আসা যাবে । বহদ্দরহাট বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বান্দরবান এর বাস রয়েছে । পূরবী এবং পূর্বাণী নামক দুটি নন এসি বাস রয়েছে । ৩০ মিঃ পর পর এসব বাস বান্দরবানের উদ্দ্যেশে রওনা দেয় । সকাল ৮টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত বান্দরবানে লোকাল গাড়ী চলাচল করে ।

মেঘলাঃ 

মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রটি বান্দরবান শহরের প্রবেশদ্বার বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের পাশে অবস্থিত । জেলা শহরে প্রবেশের ৫ কি:মি: আগে এ পর্যটন এলাকার অবস্থান ।  এখান থেকে দেখা যায়  সবুজ প্রকৃতি, লেকের স্বচ্ছ পানি আর পাহাড়ের চূঁড়ায় চড়ে ঢেউ খেলানো বান্দরবানের নয়নাভিরাম দৃশ্য । বেশ কিছু উঁচু নিচু পাহাড় দ্বারা ঘেরা একটি কৃত্রিম লেককে ঘিরে গড়ে উঠেছে মেঘলা । বৈচিত্র্য পিয়াসী মানুষ আত্মিক ক্ষুধা মেটাতে মেঘলায় ছুটে আসে বারংবার । লেকের উপর রয়েছে দুটি ঝুলন্ত ব্রীজ সাথে রয়েছে চিত্তবিনোদনের নানা উপকরণ যেমন –  সাফারি পার্ক, শিশুপার্ক, চিড়িয়াখানা, উন্মুক্ত মঞ্চ, চা বাগান, ক্যাবল কার ও প্যাডেল বোট । সাথে পাহাড়ী কন্যা বান্দরবান এর নজরকাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য তো রয়েছেই ।   

এইখানে জনপ্রতি  প্রবেশ ফি ২০ টাকা এবং গাড়ির পার্কিংয়ের জন্য ১৫০-২০০ টাকা।

নীলাচলঃ 

মেঘলার কাছে অবস্থিত আরেকটি অপূর্ব  পর্যটন স্থানের নাম নীলাচল যার অবস্থান সমুদ্র থেকে ২০০০ ফুট উঁচুতে । বান্দরবান শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়ায় অবস্থিত এ পর্যটন স্পটটি অসাধারন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে আছে । নীলাচলের আরেক নাম টাইগার হিল । নীলাচল থেকে বান্দরবানকে পাখির চোখে দেখা যায় যা  ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর । বর্ষা, শরৎ কি হেমন্ত— তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ ।

নীলাচল থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি রাতের বেলা চিরসবুজ আলোকেও উপভোগ করা যায় মনের মতো করে । শীতের সকালে নীলাচল কুয়াশায় ঢাকা থাকে । বেলা বাড়ার সাথে সাথে সোনালী রোদটা অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা করে । এখানকার পাহাড়ের গায়ে গায়ে পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে । টিকেট ঘরের পাশে ‘ঝুলন্ত নীলা’ থেকে শুরু করে ক্রমশ নীচের দিকে আরও কয়েকটি বিশ্রামাগার আছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘নীহারিকা’ এবং ‘ভ্যালেন্টাইন’ পয়েন্ট । পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো এ পয়েন্টগুলো  একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা ।

তবে মূল নীলাচল থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় আরও ভালোভাবে ।

নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের একেবারে চূড়ায় আছে  কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র । নীলাচলের মূল পাহাড়ের শিখরের চারপাশেই মনোরম স্থাপনা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্রগুলো । এ জায়গায় দর্শনার্থীদের জন্য সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি রয়েছে ।  

নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হল এখানকার রিসোর্ট যার নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট । 

কিভাবে যাবেনঃ 

বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় নীলাচলে বাস স্ট্যান্ড থেকে জিপ অথবা অটোরিকশা করে নীলাচল যাওয়া যায় । এক্ষেত্রে ভাড়াটা আলোচনা করে নিতে হবে ।   

কিভাবে যাবেনঃ 

বান্দরবান শহরের অদূরে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে সিএনজি ও লোকাল বাসে খুব সহজেই আসা যাবে । ৪-৫ জনের গ্রুপ হলে সি এনজি রিজার্ভ নিয়ে আসাই ভাল হবে । 

প্রান্তিক লেকঃ

প্রকৃতিকণ্যা বান্দরবান শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে হলুদিয়া নামক স্থানে অন্যন্য সুন্দর প্রান্তিক লেকের অবস্থান । বান্দরবান জেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত এ প্রান্তিক লেক ও পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত বলে এই লেকের নাম হয়েছে প্রান্তিক লেক । পাহাড় বেষ্টিত ৬৮ একর এলাকা জুড়ে প্রান্তিক পর্যটন কেন্দ্রের মাঝে ২৫ একর জুড়েই রয়েছে বিশাল প্রান্তিক লেক । এখানে শিক্ষা সফর ও পিকনিকের ব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে মাটির তৈরি উন্মুক্ত মঞ্চ । । অপূর্ব সুন্দর এ লেকের চারপাশ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ গাছালিতে টইটম্বুর।  কোলাহলমুক্ত শান্ত এ পরিবেশে রয়েছে শুধু হরেক রকম পাখির কলকাকলি । লেকের পাশে পাহাড়ে রয়ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস । পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা । লেকের নীল জল আর পাড়ের সবুজ বনানী যেন তৈরী করে দৈবালোকের মায়া । গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস প্রাণে দেয় অসাধারণ প্রশান্তি ।   

এসব অসাধারণ দৃশ্য অবলোকনের জন্য দর্শনার্থীদের ২০ টাকা প্রবেশ মূল্যের টিকিট কাটতে হবে ।  

কিভাবে যাবেনঃ

বান্দরবান জেলা সদর থেকে সিএনজি নিয়ে খুব সহজেই প্রান্তিক লেক পৌছাঁ যায় । 

অথবা ঢাকা বা চট্রগ্রাম থেকে বান্দরবানগামী যে কোন বাসে সুয়ালক হলুদিয়া নামক স্থানে নেমেও সিএনজি দিয়ে এখানে আসা যাবে ।

কোথায় থাকবেনঃ

বান্দরবানে থাকার জন্য বেশ কিছু ভাল মানের হোটেল রয়েছে । এসব হোটেলে রয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা । www.amarroom.com থেকে খুব সহজেই হোটেলগুলো বুকিং করে রাখা যাবে ।

amarroom