Travel

নীলগিরি, পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা রাস্তা !

nilgiri2

নীলগিরিঃ

প্রকৃতি ও রোমাঞ্চপ্রেমিদের প্রথম পছন্দ বান্দরবান । বিশাল বৈচিত্র্যময় পর্যটনভূমি বান্দরবান জেলায় রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান । বৈচিত্র‍্যে ভরপুর আকর্ষনীয় বান্দরবানকে বিধাতা সাজিয়েছেন আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে । পাহাড়কন্যা বান্দরবানের সব থেকে সৌন্দর্য্যের মাধুরী মাখা জায়গা হচ্ছে নীলগিরি । নীলগিরিকে  বাংলার দার্জিলিং বলে অভিহিত করা হয় । কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাংলার দার্জিলিং বললে বরং কমই বলা হবে নীলগিরিকে । রুপ-মাধুর্যে দার্জিলিং থেকে সহস্র গুণ এগিয়ে আছে আমাদের নীলগিরি । 

রূপসী কন্যা নীলগিরির দীগন্ত জোড়া সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরির রূপ দিয়ে বিমোহিত করে রাখে ভ্রমণপিয়াসীদের । সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় যদি মেঘ ছোঁয়ার ইচ্ছে থাকে তাহলে নীলগিরি আপনার সেই ইচ্ছে পুর্ন করবে সহাস্যে । 

নীলগিরির চূড়া থেকে চারপাশে চোখ মেলে তাকিয়ে সারি সারি মেঘদলের পাহাড়ে আছড়ে পড়ার দৃশ্য আপনাকে বিমোহিত করবে । কী নেই নীলগিরিতে ! প্রকৃতি যেন তার সবটুকু সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে আছে নীলগিরির বুকে । নীলগিরির চূড়া থেকে পাহাড়ের সারির পাশাপাশি আকাশ পরিস্কার থাকলে আপনার চোখে পড়বে বগালেক, কেওক্রাডং পাহাড়, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ চট্টগ্রাম বন্দর ও সাঙ্গু নদী । 

নীলগিরি তার রূপের পসরা সারা বছর সকল ঋতুতেই মেলে রাখে । একেক সময়ে একেক রূপ নিয়ে সাজে নীলগিরি । সকালে মেঘের ভেলার আছড়ে পড়া সাথে সূর্যোদয়ের আলোর খেলা । পাহাড়ের সবুজ বনে  বিকেলের সূর্যাস্ত কিংবা জ্যোৎস্না রাতের মায়াময় পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ হতে বাধ্য করবেই । সাধারণত বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তে মেঘের ভেলার লুকোচুরি খেলা দেখার উত্তম সময় । এ সময় মেঘ পাহাড় থেকে গয়না নিয়ে সাজে অপরুপ সাজে । আর এই সাজ দেখতে নীলগিরিতে যেতে হবে খুব সকালে । শরৎ আর হেমন্তে নীল আকাশের মেঘ ও পাহাড়ে সবুজ বৃক্ষরাজি মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে । শীতে কুয়াশার চাদরে মুড়ে থাকে চারপাশ । সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য ! শীতের কুয়াশার সাথে মেঘের মিলন ঘটে তৈরি করে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের মুহূর্ত । 

এখানকার প্রকৃতির কারুকাজ সবার হৃদয়ে ছড়ায়  সীমাহীন মুগ্ধতা । বর্ষার বৃষ্টি আর আকাশে মেঘের গর্জন সেই সাথে রংধনুর হাসিমাখা আলোক রশ্মি, বাতাসের সাথে ছন্দ আর তাল মিলিয়ে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় এই পরিবর্তনের দৃশ্যগুলো পর্যটকদের ডাকে নিবিড় আহ্বানে । ছোট ছোট পাহাড়ের কোল ঘেষে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সবাইকে আকর্ষণ করে মায়াবী এক টানে ।

নীলগিরি চূড়ায় হেঁটে ওঠার জন্য রয়েছে নান্দনিক কারুকাজে তৈরি ওয়াক ওয়ে । নীলগিরি পাহাড়ের চূড়াতেই রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত মনোমুগ্ধকর একটি পর্যটন কেন্দ্র । এখান থেকে সহজেই নীলগিরির আসল রুপ চাক্ষুষ করা যাবে ।
পর্যটনকেন্দ্রে রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত ছিমছাম একটি রেস্টুরেন্ট । নানা ঢংয়ে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি অতীব সুন্দর প্রশস্ত চত্বর । চত্বরে বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে নজরকাড়া নকশায় দৃষ্টিনন্দন বেঞ্চ ও শেড । যেখানে বসে অপরুপ সাজের নীলগিরিকে আপাদমস্তক দেখা যাবে অসীম আনন্দে । 

কিভাবে যাবেন নীলগিরিতেঃ 

নীলগিরিতে আসার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি কোন বাস বা ট্রেন নেই । ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা বান্দরবান আসতে হবে নীলগিরি যাওয়ার জন্য । ট্রেনে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে হবে । চট্টগ্রামের বদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাস বান্দারবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ।  এ দুটি বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া লাগে । চট্রগ্রামের দামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকেও বিভিন্ন বাসে করে বান্দরবান আসতে পারবেন ।

বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে সরাসরি চলে আসুন বান্দরবানে । সময় লাগবে ৮-১০ ঘন্টা । ভাড়া পড়বে ৬০০-৭০০ টাকা ।
বান্দরবান থেকে জীপ, চান্দের গাড়ি, মাহেন্দ্র, সিএনজি অথবা লোকাল বাস দিয়ে নীলগিরি যেতে পারবেন । 

কোথায় থাকবেন
নীলগিরিতে রাত্রি যাপনের জন্য রয়েছে সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত বেশ কিছু কটেজ । এগুলোর নামও বেশ চমকপ্রদ ।   মেঘদূত, নীলাঙ্গনা, আকাশনীলা, হেতকরা রাইচা, মারমা রাইচা নামের কটেজগুলো শুধু নামেই সুন্দর নয়, এগুলোর সুযোগ সুবিধাও বেশ উন্নতমানের ।
পাহাড়ে অবস্থিত এসব কটেজে অবস্থানের জন্য দিনপ্রতি গুণতে হবে কটেজ ভেদে ৪ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত । 

যারা সাশ্রয়ে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তারা 

বান্দরবান শহরে  আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত যেকোন হোটেলে থাকতে পারেন । যেকোন হোটেল বুকিং করতে ভিজিট করুন www.amarroom.com । এখান থেকে খুব সহজেই পছন্দের যেকোন হোটেল বুকিং করতে পারবেন । 

শৈলপ্রপাতঃ 

পাহাড় আর ঝর্ণার দেশে যাবেন অথচ শৈলপ্রপাত যাবেন না তা কি করে হয় ? বান্দরবান ভ্রমণে শৈলপ্রপাত ঝর্ণা একটি বোনাস দর্শনীয় স্থান । বান্দরবান শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে থানচি সড়কে অসাধারণ এই ঝর্ণাটির অবস্থান । 

নীলগিরি যাওয়ার পথেই এই শৈলপ্রপাত ঝর্ণার অবস্থান বলে সহজেই  যাওয়া যায় । গাড়ী রাস্তার পাশে থামিয়েই বেড়াতে পারবেন প্রকৃতির অপরুপ দান এই ঝর্ণাটিতে । অনন্য এই জলপ্রপাতটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে অবাক বিস্ময়ে । বর্ষা মৌসুমে এর রূপ থাকে ভয়ংকর সুন্দর । বর্ষায় ঝর্ণা ধারার বেগ বেড়ে যায় দ্বিগুণ । বর্ষাকালে এ ঝর্ণার দৃশ্য নয়ন জোড়ালেও স্রোতের বেগের কারণে ঝর্ণাতে নামা দুস্কর হয়ে পড়ে । রাস্তার পাশেই শৈলপ্রপাতের অবস্থান হওয়ায় বছরের বেশীর ভাগ সময়ই দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরপুর থাকে ঝর্ণাটি ।
। শৈলপ্রপাত ঝর্ণা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব এক সৃষ্টি । এখানে সর্বদা ঝর্ণার হিমশীতল পানি বহমান থাকে । এই ঝর্ণার পানির ধারা খুবই স্বচ্ছ এবং হিমশীতল ।

এছাড়া পাহাড়, ঝর্ণা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার মিতালী দেখতে দেখতে এখানে করা যাবে বনভোজন । ঝর্ণার পাশেই রয়েছে বনভোজন করার জন্য আদর্শ পরিবেশ ।
এখানে দুর্গম পাহাড়ের কূল ঘেসে রয়েছে বম নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস । এখানে আসলে তাদের সংগ্রামী জীবন প্রত্যক্ষ করা যায় । ঝর্ণার পাশেই গড়ে ওঠেছে  উপজাতি তরুণীদের হাতের তৈরী বস্ত্র ও নানা প্রকার তৈজসপত্রের ছোট ছোট দোকান । বম উপজাতীয় তরুণীরা হাতে বোনা চাদর, মাফলার, বেডশিট, বেত ও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র বিক্রি করে । এগুলো স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে কিনে নেয়া যাবে । এছাড়া বমদের উৎপাদিত বিভিন্ন মৌসুমী ফলমূলের স্বাদ চেখে দেখা যাবে সহজেই ।
এই ঝর্ণার পানি ব্যবহার করতে পারার কারনে বম উপজাতি ছাড়াও গড়ে ওঠেছে কয়েকটি গ্রাম । এই ঝর্ণার পানি স্থানীয় মানুষদের একমাত্র পানীয় জলের উৎস । গৃহস্থলীর কাজেও তারা ব্যবহার করে শৈলপ্রপাতের পানি । 


কিভাবে যাবেনঃ
যেহেতু শৈলপ্রপাতকে উদ্দেশ্য করে আলাদাভাবে আসা দরকার পড়বেনা সেহেতু এখানে আসার তেমন কোন ঝক্কি নেই । নীলগিরি ভ্রমণের পথে চালককে বলে রাখলেই দর্শন করিয়ে আনবে অপার্থিব সৌন্দর্য্যের শৈলপ্রপাতকে । তবে কেউ যদি চান আলাদাভাবে শুধু শৈলপ্রপাত দর্শনে যাবেন সেক্ষেত্রে বান্দরবান থেকে সিএনজি অথবা চান্দের গাড়িতে করে শৈলপ্রপাত যেতে পারবেন । গাড়ি রিজার্ভ করলে  যাওয়া আসা মিলিয়ে ভাড়ার পড়বে ৫০০-৮০০ টাকা । 

মিলন ছড়ি হিলসাইড রিসোর্টঃ

পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান প্রকৃতির অপূর্ব মহিমার এক উদাহরণ । যান্ত্রিক জীবনের কংক্রিটের মিছিলে মন আকুপাকু করে এরকম প্রকৃতির সাজানো বাগানে হারিয়ে যেতে ।  খোলা প্রাণে নিশ্বাস নিতে উতলা হয়ে ওঠে হৃদয় । হাঁপিয়ে উঠা জীবন মনকে শান্তির পরশ দিতে চলে যেতে পারেন মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে । 

রিসোর্টটি বান্দরবান শহর থেকে ৩ কিঃমিঃ দক্ষিণ পূর্বে নীলগিরি ও শৈলপ্রপাত ঝর্ণায়  যাওয়ার পথে পড়ে । বান্দরবানের পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা মিলনছড়ি রিসোর্টটি সাজানো হয়েছে বিশাল সৌন্দর্যে । পাহাড়ি পরিবেশে প্রশান্তিময় একান্ত কিছু সময় কাটাতে জুড়ি নেই মিলনছড়ি রিসোর্টের । 

রিসোর্ট থেকে অবারিত সবুজের খেলা এবং সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে সর্পিল গতিতে বয়ে চলা মোহনীয় সাঙ্গু নদীটি অনাবিল সুখ দিবে মনে । 

এই রিসোর্টটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যা দেখে মনেই হয়না এটি কোন কৃত্রিম ঘর । মনে হবে এ যেন প্রকৃতির খেয়ালে আপনা হতেই তৈরি হওয়া আবাস । কটেজগুলো বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সুনিপুণ ভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রকৃতির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ।

কটেজগুলোকে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাড়ির আদল । চমৎকার এই কটেজ গুলো নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের ঢালে । যা সৃষ্টি করেছে অপার্থিব সৌন্দর্য্য ।  কটেজগুলোর নামও বেশ সুন্দর । কোনটার নাম পাখির নামে, কোনটা আবার আদিবাসী নৃগোষ্ঠীর নামে । কটেজের ওপর দেয়া হয়েছে পাতার ছাউনি । আর ঘরের সিলিং ও দেয়ালগুলো শীতলপাটি দিয়ে সুনিপুণ ভাবে মোড়ানো হয়েছে ।  পোকামাকড় ও মশা থেকে বাঁচার জন্য রয়েছে নেট ।  

রিসোর্টের সম্পূর্ণ এলাকাটি ঘন সবুজ গাছ দিয়ে মোড়া । চারপাশের নিবিড় জঙ্গলে রয়েছে নানা ধরনের গাছের সমাহার । আরো আছে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা হরেক রঙের ফুলের শোভা ও মোহনীয় সুবাস । কটেজের বারান্দায় পাতা চেয়ারে গা এলিয়ে সামনের অবারিত সৌন্দর্যে ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতে পারবেন সবুজের সমারোহে ।
তাই প্রাকৃতিক পরিবেশে আনন্দময় অবকাশ যাপনের জন্য এই রিসোর্টের কোন তুলনাই হয়না ।  এই যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ দূর করতে জুড়ি নেই মিলনছড়ির । কিছুটা প্রশান্তিময় সময় কাটাতে ছুটিতে চলে আসতে পারেন এই হিলসাইড রিসোর্টে ।

কি খাবেন রিসোর্টেঃ

রিসোর্টটিতে রয়েছে একসাথে ১০০ জন বসে খাওয়ার মতো একটি রেস্টুরেন্ট । এটির নামও বেশ অনন্যসুলভ; রিগ্রী ক্ষ্যাং রেস্তোরাঁ ।  এখানে জনপ্রিয় ব্যাম্বু চিকেনসহ বান্দরবানের নানা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আদিবাসী খাবার পাওয়া যাবে । 

কিভাবে যাবেনঃ

বান্দরবান শহরের অদূরে এই রিসোর্টে যেতে খুব বেশি সময় লাগেনা । এখানে রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্যে গেলে বান্দরবান শহর থেকে সিএনজি বা চান্দের গাড়িতে করে যেতে পারবেন । আর যদি শুধু ঘুরার উদ্দেশ্যে যান তাহলে আলাদা করে গাড়ি ভাড়া করতে হবেনা । নীলগিরি বা শৈলপ্রপাত যাওয়ার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে খুব সহজেই ঘুরে দেখে আসতে পারেন মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট । 

রিসোর্টের ভাড়াঃ 

রিসোর্টটিতে রয়েছে দুটি ডরমিটরি, ১২টি নন-এসি রুম এবং ১১টি এসি রুম ।

এসব রুমে একসাথে ৮০ জনের থাকার সু-ব্যবস্থা রয়েছে ।
ডরমিটরি তে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৯০০-১০০০ টাকা। অন্যান্য রুমের ভাড়া পড়বে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ।

amarroom