Hotel

নুহাশ পল্লী, কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের বাগানবিলাস ।

nuhash polli1

বাংলা কথা সাহিত্যের অনন্য রূপকার হুমায়ুন আহমেদ । হিমু, মিসির আলি ও শুভ্রের মতো চরিত্রের স্রষ্টা তিনি । কথার জাদুতে মুগ্ধ করে রাখতে জুড়ি ছিলোনা অনন্য সাধারণ এই কথাশিল্পীর । তার কারণে তরুনরা নতুন করে বৃষ্টির প্রেমে পড়তে শিখেছে । শিখেছে জোছনাকে আলিঙ্গন করতে । তার কথার জাদুতে তৈরি হয়েছে শত শত হিমু, শুভ্র আর মিসির আলী ।  

তার অবদান শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয় । বাংলা সাহিত্য ছাড়িয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যেও রেখে গেছেন অনন্য সাধারণ একটি উপকরণ । যার নাম তিনি রেখেছিলেন নুহাশ পল্লী । খেয়ালি এই কথার জাদুকর ঠিক তার কথামালার মতোই কল্পনার রঙে রাঙিয়েছেন অসম্ভব সুন্দর এই নন্দনকানন । 

নিজের কল্পনা দিয়ে যেমনটা তৈরি করতেন বিভিন্ন চরিত্র ঠিক যেন সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তার এই বাগানবিলাস ।  

কথার জাদুকর তার এই দৃষ্টিনন্দন বাগান বাড়িটি রাজধানীর অদূরে গাজিপুরে নির্মাণ করে গেছেন। বাগানে রয়েছে নানা ধরনের স্থাপনা । রয়েছে অসংখ্য ফলজ, বনজ গাছের ছড়াছড়ি । পাশাপাশি তিনি বানিয়েছেন ঔষধি গাছের সুবিশাল বাগান । কল্পনার যত মাধুর্য তার হৃদয়ে ছিল তার সবটা মিলিয়ে মনের মতো করেই এক স্বপ্নজগত তৈরি করে গেছেন প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ । তাইতো একটুখানি সময় পেলেই সবুজে ছাওয়া বাগান বাড়িটিতে বারবারই ছুটে গেছেন তিনি । এই নুহাশ পল্লীতেই তিনি  গড়ে তুলেছেন শুটিং স্পট, বিশাল আকৃতির দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো । একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটি ছিল তার শৈল্পিক চিন্তাধারার আরেক রূপ । শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো মনকাড়া বাংলোটির নাম দিয়েছেন ‘ভূত বিলাস’ । রয়েছে  রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষস আকৃতির মূর্তি । আরো রয়েছে অনন্য সাধারণ একটি সাদা পদ্মের পুকুর ও মন মাতানো সুইমিং পুল । 

বর্ণনাঃ
হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন একজন নিখাদ প্রকৃতিপ্রেমী । প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ভালবাসতেন তিনি । জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নুহাশ পল্লীতে হেঁটে বেড়িয়েছেন এবং একান্ত কিছু মুহূর্ত প্রকৃতির একদম কাছে থেকে অতিবাহিত করেছিলেন । 

নুহাশ পল্লীতে প্রবেশ করেই চোখে পড়বে বড় একটি চত্বর । উত্তর দক্ষিণে লম্বা পুরো জায়গাটা । বা পাশে গাছের নিচে গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা । ডান পাশে সুন্দর একটি জল ফোয়ারা ও সুইমিং পুল । পাশেই মা-ছেলের স্ট্যাচু ।

নুহাশ পল্লীর উত্তর প্রান্তে রয়েছে একটি বড় পুকুর  যেটির উপর নির্মিত হয়েছে চোখ জোড়ানো একটি কাঠের সেতু । কাঠের সেতু দিয়ে পুকুরের মাঝে কৃত্রিম দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা । হুমায়ুনের জীবদ্দশায় এই পুকুরের মাঝেই কৃত্রিম দ্বীপে একটি তাঁবু টানানো হত । সেখানে মাঝমাঝেই সময় কাটাতেন খেয়ালি হুমায়ুন । 

হুমায়ুন  ও তাঁর স্ত্রী শাওনের প্রথম কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা যায় । হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সেই কন্যার নাম দিয়েছিলেন লীলাবতি । এই পুকুরটির নামও কন্যা সন্তানের নামানুসারে রাখা হয়েছে লীলাবতি পুকুর । পুকুরের সামনে দাড়ালেই “দিঘী লীলাবতী” লেখা ফলকটি চোখে পড়ে । 

পুকুরের উত্তর পাড়ে রয়েছে মাঝারি সাইজের বটগাছ । দক্ষিণে একটি একতলা ছোট ঘর ।
হুমায়ুন আহমেদ বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই পুকুরের পাশেই ‘ভুতবিলাস’ নামে একটি বাংলো নির্মাণ করা হয় । জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর হুমায়ুন আহমেদ ভুত বিলাস বাংলোর উদ্বোধন করেছিলেন । তিনি ভাবতেন মধ্যরাতে ভুতবিলাসের বারান্দায় বসে থাকলে ভুতের সাথে সাক্ষাত হতে পারে । 

নুহাশপল্লীর সুইমিং পুলের পানি বড্ড বেশি নীলাভ । এই সুইমিং পুলেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং হুমায়ূন আহমেদ একসঙ্গে সাঁতার কেটেছিলেন । এখনো জলজ্যান্ত সেই উপজীব্য । সেখানে এখন কেবলই স্মৃতির ছোট্ট ঢেউ আছড়ে পড়ে পাড়ে । পাশেই রয়েছে  শুষ্ক কেয়া বন । 

হুমায়ুন আহমেদ ভালবাসতেন বৃষ্টি এবং ভরা পূর্ণিমার জোছনা । বৃষ্টি দেখার জন্য তিনি ‘বৃষ্টি বিলাস’ নামে একটি বাংলো নির্মাণ করেছিলেন ।  টিনশেডের বিশাল বারান্দাসহ ‘বৃষ্টিবিলাস’ বাংলো তৈরি করা হয়েছিল । এই বাংলোর বারান্দাতে বসেই হুমায়ূন আহমেদ রিনিঝিনি বৃষ্টিপড়া দেখতেন। এখান থেকে তিনি জোছনা দেখতেও পছন্দ করতেন ।

হুমায়ুন আহমেদ যাতে নির্বিঘ্নে জোছনার খেলা দেখতে পারেন এজন্য এখানকার সবুজ উঠান সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখা হত ।

স্থপতি আসাদুজ্জামান খানের তৈরি করা বেশকিছু ভাস্কর্য রয়েছে নুহাশ পল্লীতে। শিশুদের আনন্দ দিতে এখানে ভুত এবং ব্যাঙের আকারের বিভিন্ন ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে । রয়েছে ড্রাগন আকৃতির ভাস্কর । আরো আছে মৎস্যকন্যার মূর্তিসহ একটি পানির রিজার্ভার । এটির পাশেই অবস্থিত একটি রাক্ষসের মূর্তি । স্থাপনা গুকির মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে কনক্রিট দিয়ে তৈরি ডাইনোসারের মূর্তি । বাচ্ছাদের আনন্দ দিতে এসব মূর্তির জুড়ি নেই । ঢালুতে লাগানো বাচ্চাদের খেলনাগুলোতে অবশ্য জং ধরে আছে আগের মতো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় । 

এছাড়া এখানকার নান্দনিক ট্রি হাউজটি শিশুদের আনন্দের অন্যতম একটি উৎস ।
বৃক্ষপ্রেমি হুমায়ুন যখনই দেশ বিদেশে ভ্রমন করতেন তখনই বিভিন্ন রকমের গাছের চারা সংগ্রহ করতেন । একবার বৃক্ষমেলায় গাঁজার গাছ দেখে সেটা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন ।  কিন্তু দোকানী জানালো এটা শুধু প্রদর্শনীর জন্য, বিক্রি করা যাবেনা । অনেক চেষ্টার পরও কিনতে না পেরে মনঃক্ষুণ্ন হলেও শেষে একজন প্রকাশকের মাধ্যমে একটি গাঁজার গাছ নিয়ে এসে এই নন্দন কাননে ঔষধি গাছের সাথে রোপন করেন । নুহাশ পল্লীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফল গাছ এবং ঔষধি গাছ রয়েছে । এছাড়া তিনি এখানে খেজুর গাছ এবং চা বাগান করেছেন । তার খেজুর গাছের ফল জীবদ্দশায় দেখে যেতে না পারলেও এখন অসংখ্য খেজুর ধরে প্রতি বছর ।  

এছাড়াও রয়েছে শালবন ও অর্কিডের বাগান ।
নুহাশপল্লীতে রয়েছে দাবা খেলার জন্য বিশেষ একটি ঘর । যেখানে হুমায়ূন অতিথিদের সাথে দাবা খেলতেন । রয়েছে নামাজ পড়ার জন্য সুন্দর পরিপাটি একটি  নামাজ ঘর ।
হুমায়ুন তার চলচ্চিত্র নির্মাণের স্টুডিও হিসাবেও এই বাগান বাড়িটি ব্যবহার করতেন । কাদামাটি ও টিন দিয়ে তৈরি করা শুটিং স্টুডিও এখনও জানান দেয় হুমায়ুনের স্মৃতি ।
এই বিশাল নন্দনকাননের স্রষ্টা ১৯ জুলাই ২০১২ সালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন । নিজের তৈরি বিশাল এই বাগান বাড়িতেই তিনি শায়িত আছেন শান্তির চিরনিদ্রায় । 

তার ভক্তরা নুহাশপল্লীতে ঢুকেই প্রথমেই খোঁজেন তার সমাধিস্থল । প্রবেশপথ দুয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বা পাশে শায়িত আছেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ । কথার জাদুকর হুমায়ুন আহমেদের সমাধিস্থলে গিয়ে মনে হবে এই চত্বরের প্রতিটি বালুকনায়, ঘাসে, জলে-স্থলে মিশে আছেন তিনি । এখানে যতটা অক্সিজেন আছে নিশ্বাস নেওয়ার সবটুকুতে মিশে আছেন ওই মানুষটি । তিনি হারিয়ে যান নি অমর হয়ে আছেন তার কর্মে ও রেখে যাওয়া স্মৃতিতে । 

ইতিহাসঃ 

নুহাশ পল্লী হুমায়ুনের বড় পুত্র নুহাশ হুমায়ুনের নামানুসারে রাখা । হুমায়ুন  এই নন্দনকাননটি গাজিপুরের পিরুজালি বা পিরোজ আলি গ্রামে নির্মাণ করেন । অভিনেতা ডাঃ ইজাজ এখানকার জমিটি কিনতে সহায়তা করেন হুমায়ুন আহমেদকে । ১৯৯৭ সালে ২২ বিঘা জমির উপর স্থাপিত নুহাশপল্লীর বর্তমান আয়তন প্রায় প্রায় ৪০ বিঘা । পিরুজালী গ্রামের বেশীরভাগ পথই ঘন শালবনে আচ্ছাদিত । আলো আধারিতে ঢেকে থাকা এমনই একটি পথে গাজীপুর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নুহাশপল্লীতে যেতে হবে । কথার জাদুকর হুমায়ুন আহমেদের জন্য নুহাশপল্লী ছিল একখন্ড স্বর্গ । টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করার পর তিনি তাঁর বেশীরভাগ অবসর সময় এখানেই কাটিয়েছেন ।


কিভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে গাজীপুরে আসার জন্য বিভিন্ন বাস পাওয়া যায় । ঢাকার আজিমপুর গুলিস্তানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে টঙ্গীর বাস পাওয়া যায় । 

এছাড়া সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন গাজিপুর ।
ট্রেনেও ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরে যাওয়া যাবে । 

ঢাকা থেকে যে মাধ্যমেই আসুন না কেন গাজীপুরের হোতাপুর বাস স্ট্যান্ডে আসতে হবে । ঢাকা থেকে হোতাপাড়া যেতে বাসে চড়ার স্থানভেদে ভাড়া লাগবে ৫০ থেকে ৮০ টাকা । হোতাপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে টেম্পো, রিকশা অথবা সিএনজিতে করে নুহাশ পল্লী যাওয়া যাবে । টেম্পোর ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা । রিকশা ভাড়া পড়বে ৫০ থেকে ৬০ টাকা । এবং সিএনজি ভাড়া পড়বে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা । ৩-৪ জন একটি সিএনজি তে যাওয়া যাবে । 

টিকেটঃ 

এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নুহাশ পল্লী সকল দর্শনার্থীদের জন্য সপ্তাহের ৭ দিনই ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে । ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য প্রবেশ ফি দরকার হয়না । ১২ বছরের উপরে জনপ্রতি ২০০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে ভিতরে আসতে হবে । তবে যারা শুধু হুমায়ূন আহমেদের কবর জিয়ারত করতে  আসেন তাদের জন্য কোন প্রবেশ ফি লাগেনা । কবর জিয়ারতের জন্য মূল গেটের বাইরে বাম দিক দিয়ে  আলাদা আরেকটি গেট আছে।  যে কেউ সেই গেট দিয়ে সমাধির ভএতরে ঢুকে কবর জিয়ারত করতে পারবেন ।
নুহাশপল্লী পিকনিকের জন্যও ভাড়া দেয়া হয় । প্রতিদিন পিকনিকের জন্য ১টি গ্রুপে সর্বোচ্চ ৩০০ জন আসতে পারবে । এবং সব কটি বাংলো ব্যবহার করতে পারবে ।  পিকনিকের জন্য সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া পড়বে ৬০ হাজার টাকা এবং অন্যদিন সরকারি ছুটি ব্যাতিত ৫০ হাজার টাকা । তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি ছুটির দিনে ভাড়া ৫০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য দিনগুলোতে ভাড়ার পড়বে ৪০ হাজার টাকা।

খাওয়াঃ 

নুহাশ পল্লীতে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই । তবে পিকনিকের দল যদি বড় হয় তবে নুহাশ পল্লীর সাথে আগে থেকে যোগাযোগ করলে উনারা খাবারের ব্যবস্থা করে দিবেন ।

থাকাঃ 

নুহাশপল্লীতে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই । তবে চাইলে গাজিপুরে এসে থাকা যাবে । গাজীপুরে বেশ কয়েকটি ভাল মানের হোটেল রয়েছে । হোটেল বুকিং করতে আজই যোগাযোগ করুন www.amarroom.com এর সাথে ।

amarroom