Travel

খৈয়াছড়া ঝর্ণা, পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলের স্রোত !

khoiachora1

প্রকৃতির রহস্যময়তার সীমানা নেই । পৃথিবীর জায়গায় জায়গায় রহস্যের চাঁদর বিছিয়ে পৃথিবীর বাসিন্দাদের বিস্মিত করে রাখে প্রকৃতি । এরকম হাজারো বিস্ময়ের মাঝে অন্যতম উপাদান হলো জলপ্রপাত । পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলের স্রোত বিস্ময়ে হতবাক করে, মনে দেয় অফুরন্ত সুখ ও আনন্দ । প্রতিদিনের ক্লান্তি ভূলে অফুরন্ত জীবনিশক্তি করাগত করতে তাইতো পর্যটকরা ছুটেন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে । এরকমই অসংখ্য জলপ্রপাত নিয়ে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম জেলাটি । পাহাড়ের গা বেয়ে নিরন্তর জলপতন দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীরা আসেন চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডে । মিরসরাইকে জলপ্রপাতের জননী বলা যেতে পারে । কারণ এখানে রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় জলপ্রপাত । পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে চলা জলের এ এক অসাধারণ সমাহার । প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা চট্রগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের উপর দিয়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ অনেক দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যান । কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না পথিমধ্যে এই মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের বুকে রয়েছে অনন্য সাধারণ সব ঝর্ণা ও ঝিরি । পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এসব ঝর্ণাসমুহ সর্বদা বিলিয়ে দিচ্ছে তার রুপ-মাধুর্য । এসব ঝর্ণার মধ্যে অন্যতম  জলপ্রপাত হচ্ছে খৈয়াছড়া ঝর্ণা, সুপ্তধারা ঝর্ণা ও সহস্রধারা ঝর্ণা । 

খৈয়াছড়া ঝর্ণাঃ 

মিরসরাই তথা বাংলাদেশের সব থেকে রুপবতী ঝর্ণা এই খৈয়াছড়া । রুপে গুণে অনন্য এই ঝর্ণাটিকে ঝর্ণার রাণী বলে ডাকা হয় । এই ঝর্ণার রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব । ঝর্ণাটির রয়েছে মোট ৭টি ধাপ । 

অন্যান্য ঝর্ণার মতো এটি সরাসরি পাহাড় বেয়ে নিচে এসে পড়েনি । এই ৭টি ধাপে ঝর্ণাটি নিরন্তর পানি বর্ষণ করে পাহাড়ের পাদদেশে ।

ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তাটি খুবই মনোমুগ্ধকর । গাড়ির রাস্তা পার হয়ে যখন পায়ে হেঁটে চলা শুরু করবেন তখন এর চারপাশের দৃশ্য আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে । উঁচু-নিচু রাস্তা পার হয়ে একসময় এসে পড়বেন পাহাড়ি ঝিরিপথে । এরপরই শুরু হবে আপনার আসল রোমাঞ্চ । ঝিরি পথ ধরেই এগিয়ে যেতে হয় ঝর্ণার পথে । কখনো হাঁটুপানিতে পাথরের ওপর দিয়ে হাটতে হবে তো কখনো কখনো সেই পানিই কোমর ছাড়িয়ে বুক পর্যন্ত উঠে আসবে । গড়পরতায় দেড় ঘণ্টার মতো হাটার পর চলে আসবেন ঝর্ণার কাছে । এরপর যখন খৈয়াছড়ার দর্শন পাবেন, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাবেন । স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি দেখে মাথা আপনা আপনি নুইয়ে আসবে কৃতজ্ঞতায় । 

৭ ধাপের এই ঝর্ণার নিচের তিনটি ধাপই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে খুব সহজেই দেখা যাবে । ওপরের চারটি ধাপ দেখতে হলে বাম পাশের প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে বেশ খানিকটা ওপরে ।
ওপরের ওঠার পর ঝর্ণার রূপ-সুধা পাহাড়ে ওঠার পরিশ্রমের কষ্ট ভুলিয়ে দিবে নিমেষেই । ওপরে উঠলে প্রথমেই দেখা মিলবে একটি ধাপের । এর বাম পাশ দিয়ে সামান্য হাঁটলেই দেখা মিলবে অপর তিনটি ধাপের । চাইলে এই তিনটি ধাপের পাশ দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে যেতে পারেন আরো ওপরে । সেখানে আশপাশের বহুদূর বিস্তৃত পাহাড় আর জঙ্গলের অপূর্ব দৃশ্য কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনাকে ভুলিয়ে দেবে আপনার পরিশ্রম আর নিরাপদে নিচে ফিরে যাওয়ার ভাবনার কথা ।
এই ঝর্ণার পানিতে গোসল করার লোভ সামলানো অসম্ভবেরও অনেকটা উপরে । তাই সাথে অতিরিক্ত কাপড় ও তোয়ালে নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে । ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিয়ে মনকে শান্ত ও পবিত্র করতে করতে কতোটা সময় যে কেটে যাবে টেরও পাবেন না । 

অবস্থানঃ 

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম এই ঝর্ণাটি চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারে অবস্থিত । ঝর্ণাটির একদম পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত বলে সরসরি কোন যানবাহন ঝর্ণাটির পাদদেশে যেতে পারেনা । প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে প্রবাহিত হওয়া এই ঝর্ণাটিতে যেতে হলে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে পায়ে হেঁটে। 

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩০ মিনিট পরপরই বাস ছেড়ে আসে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে । সেসব বাসে করেই আসতে হবে মিরসরাই । চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে মিররসরাই পার হয়ে বারতাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামতে হবে । বাসের সহযোগীকে বললেই নামিয়ে দিবে । বড়তাকিয়া পর্যন্ত আসতে সময় লাগবে ৫ ঘন্টার মতো । বড়তাকিয়া বাজারে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের কাছে গিয়ে স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলেই পেয়ে যাবেন খৈয়াছড়া ঝর্ণার রাস্তা । গ্রামের রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলে পথে রেললাইন পরবে, রেললাইন পার হয়ে আরো দশ মিনিটের মতো হাঁটলে ঝিরিপথ পাবেন । চাইলে বড়তাকিয়া থেকে ঝিরি পর্যন্ত  সি.এন.জি নিয়ে আসা যাবে । ভাড়া পড়বে ৭০-৮০ টাকা । এখান থেকে শুরু হবে খৈয়াছড়া ঝর্ণার মূল ট্র্যাকিং । প্রয়োজনে সেখান থেকে সাথে গাইডও নেয়া যাবে । তবে ঝর্ণায় যাওয়ার রাস্তা যেহেতু একটিই আর প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা এ রাস্তায় যাতায়াত করেন সেহেতু পথ হারিয়ে ফেলার ভয় নেই ।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা পাবেন বহূল আকাঙখিত খৈয়াছড়া ঝর্ণার ।

সুপ্তধারা ঝর্ণা সহস্রধারা ঝর্ণাঃ 

রূপবতী ঝর্ণাধারা তার মোহিনী রূপ দিয়ে যুগে যুগে মানব হৃদয়ে পাগলহারা ঢেউয়ের দোলা তুলে বয়ে গেছে অবিরত । কলকল সুরের মূর্ছনায় আত্মহারা করেছে হৃদয় । বর্ষাকাল ঝর্ণা প্রেমীদের জন্য আদর্শ সময় । ঝর্ণাগুলোও এইসময় পূর্ণ রূপ আর যৌবন নিয়ে হাজির হয় সবার সামনে । এইসময় নিবিড় সজীবতা ধারণ করে প্রকৃতি । চির সবুজ গাছপালা ঘেরা পাহাড় হতে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়া জল আশ্চর্য ভাব জাগায় মনে । বর্ষা ব্যতীত বছরের অন্যান্য সময় প্রায় শুষ্ক থাকে সুপ্তধারা । কেবল বর্ষা ঋতুতেই এটি অম্লান বদনে হাজির হয় আর সবাইকে মুগ্ধ করে প্রাণচাঞ্চল্য রূপ দিয়ে ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় চন্দ্রনাথ রির্জাভ ফরেস্টের চিরসবুজ বনাঞ্চলের ইকোপার্কের পাশেই অবস্থিত অনন্য সুন্দর প্রাকৃতিক জলপ্রপাত সুপ্তধারা ঝর্ণা । সুপ্তধারা ঝর্ণার কাছেই সহস্রধারা ঝর্ণা নামে আরো একটি জলপ্রপাত রয়েছে । তাই ভরা বর্ষায় ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সীতাকুন্ডের ইকোপার্কটিতে ঢুঁ মারার জুড়ি নেই । 

ইকোপার্কের সিঁড়ি পথ বেয়ে নেমে খানিকটা ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে সুপ্তধারা এবং সহস্রধারা ঝর্ণার । সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে এই দুটি ঝর্ণাধারা বর্ষাকালে তার রূপের পেখম মেলে অবিরত কাছে ডাকে প্রকৃতি প্রেমীদের । বর্ষা মৌসুমে মোহনীয় রূপ নেয় সীতাকুণ্ডের সহস্র ধারা ও সুপ্ত ধারা নামের এ দুটি পাহাড়ি ঝর্ণা । বর্ষা মৌসুমে অবিরত ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে । তবে বর্ষাকাল ছাড়া বছরের বাকি সময় এই দুটি ঝর্ণায় পানি খুবই কম থাকে । তাই শুষ্ক মৌসুমে দূর থেকে দেখলে মনে হবে ঝর্ণায় কোন পানি নেই । তবে ঝর্ণার কাছে গেলে সামান্য কিছু পানির দেখা মিলে ।
আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে ওঠা,
আবার জঙ্গলাকীর্ণ লম্বা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামা । কোথাও কোথাও আবার সিঁড়ি না থাকায় পাহাড়ি ঝর্ণা ধরে হেঁটে যাওয়া । এ যেন রোমাঞ্চপ্রিয়দের চরম আকাঙখিত স্থান । রোমাঞ্চ প্রিয় পর্যটকদের কাছে ঝর্ণা দু’টি এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে ।
বছরের অধিকাংশ সময় সুপ্তধারায় পানি কম থাকে বলে এটির নামকরণ করা হয়েছিলো সুপ্তধারা । তবে বর্ষা মৌসুমে এসে সুপ্ত ধারা আবার নবযৌবন ফিরে পায় । সুপ্তধারার একদম কাছেই সহস্রধারা ঝর্ণা । তাই চাইলে একইসাথে দুটি ঝর্ণার রূপ-মাধুর্যকে আলিঙ্গন করা যাবে ।


কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বাসে  সীতাকুন্ড বাস স্টপেজ থেকে ২ কিলোমিটার দূরে ফকিরহাট নামক জায়গায় নামতে হবে । ফকিরহাট থেকে সিএনজি করে যেতে পারবেন সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে ।
আবার চট্টগ্রাম শহর থেকেও সরাসরি ইকোপার্কে আসা যাবে । চট্টগ্রাম শহর থেকে সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার । চট্টগ্রাম শহরের মাদারবাড়ী ও কদমতলী বাস ষ্টেশন থেকে সীতাকুণ্ড যাবার লোকাল বাসগুলো পাওয়া যায় । 

ঢাকা থেকে ট্রেনেও আসা যাবে সীতাকুন্ড ইকোপার্কে । ঢাকা মেইল ট্রেনটি সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে থামে । ঢাকা থেকে রাত ১১ টায় যাত্রা শুরু করে পরদিন সকাল ৬ টা থেকে ৭ টার মধ্যে ট্রেনটি সীতাকুণ্ড স্টেশনে পৌঁছায় । 

 আন্তঃনগর ট্রেনে আসতে চাইলে নামতে হবে ফেনী স্টেশনে । কারণ আন্তঃনগর ট্রেন সীতাকুণ্ডে থামেনা । ফেনী স্টেশনে নেমে  ১০ থেকে ১৫ টাকা অটোরিক্সা ভাড়ায় মহিপাল বাসস্ট্যান্ড আসতে হবে । মহিপাল বাসস্ট্যান্ড হতে ৬০-৮০ টাকা ভাড়ায় লোকাল বাসে সীতাকুণ্ড যাওয়া যাবে । সেখানে নেমে রিক্সা করেই যাওয়া যাবে ইকোপার্কে। 

কোথায় থাকবেনঃ

মিরসরাই ও সীতাকুন্ড উভয় জায়গাতেই মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে । তবে শহরের তুলনায় এগুলোর সুযোগ সুবিধা অনেক কম । অধিক সুযোগ সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম শহরে থাকার জন্য হোটেল বেছে নেওয়াই উত্তম হবে । www.amarrom.com সবসময় আপনাদের সাথেই আছে হোটেল বুকিং এর ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতে । তাই দেরী না করে এখনই আমাদের মাধ্যমে আপনার চাহিদা অনুযায়ী রুম বুকিং করে নিন ।

khagrachori3
Travel

খাগড়াছড়ি, ঐশ্বর্য্যময় সৌন্দর্য্যের অহঙ্কার !

ঐশ্বর্য্যময় সৌন্দর্য্যের অহঙ্কার খাগড়াছড়ি জেলা । ঝর্ণা ও পাহাড়ের অসম্ভব সুন্দর মিশেলের এই পাহাড়ি জেলা । অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির...

dibir haor shapla bil 2
Travel

ডিবির হাওরের শাপলা বিল, সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে ।

প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত সিলেট । সিলেটের রূপকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে জৈন্তাপুরে অবস্থিত ডিবির হাওরের শাপলা বিল । লাল...