Travel

চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মহামায়া লেক

chandranath3

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবাসভূমি সীতাকুন্ড উপজেলা । পাহাড় আর সমতলের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এ জনপদটি শুধু হিন্দুদের বড় তীর্থস্থানই নয় বরঞ্চ ভ্রমণপিয়াসীদের অন্যতম গন্তব্যও বটে । চন্দ্রনাথ মন্দির এরকমই একটি তীর্থস্থান । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ঠিক চূড়ায় এই মন্দিরের অবস্থান । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সবুজের রাজ্য আর সুবিশাল সমুদ্র অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডকে দিয়েছে অনন্য পুর্ণতা ।

আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়ার পর চূড়ায় উঠার পর রাজ্যের সব ভাললাগা ভর করে । পাহাড়ের উপর থেকে দেখা সুবিশাল সমুদ্র হারিয়ে যাওয়ার ডাক দেয় পর্যটকদের । 

 পাহাড়টির অবস্থান সীতাকুণ্ড বাজার থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার পূর্বে । সীতাকুণ্ড বাজার থেকে পায়ে হেঁটে, রিক্সায় করে কিংবা অটোরিকশা দিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উঠার রাস্তার কাছে যাওয়া যায় । পায়ে হেঁ‌টে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গেলেই উপভোগটা বেশি করা যায় । পায়ে হেটে হেটে পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তায় চোখে পড়বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনা । অধিবাসীদের জীবন যাত্রার চিত্রটাও চাক্ষুষ করা যাবে । এছাড়াও পাহাড়ের একটু গভীরে গেলে চোখে পড়বে জুম চাষ । পাহাড়ের বুকে জুম চাষ সে এক অসাধারণ দৃশ্য । পাশাপাশি রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা ফুলের বাগান ।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে রয়েছে ছোট একটি ঝর্ণা । এই ঝর্ণার কাছ থেকে পাহাড়ে উঠার দুটি পথ রয়েছে । ডান দিকের পথটিতে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের চূড়া অবধি সিঁড়ি । বাম পাশের পথটি সম্পূর্নই পাহাড়ি । সাধারণত পাহাড়ি পথ দিয়ে উপরে উঠা তুলনামুলক সহজ এবং রোমাঞ্চকরও বটে । তবে নামার জন্য পাহাড়ি পথের চেয়ে সিঁড়ির পথ ধরে নামাটাই সহজ । 

 ১১৫২ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়টি হেঁটে উঠা পরিশ্রমের কাজ হলেও আশপাশের অসাধারণ দৃশ্যগুলো আপনাকে যোগাবে অলৌকিক শক্তি । প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এই পরিবেশ এক মুহূর্তের জন্যও আপনাকে ক্লান্তি অনুভব করতে দিবেনা । বরং রোমাঞ্চের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সুখের অতলে ।  সাধারণত ১ ঘন্টা ৩০ মিনিটের মত সময় লাগে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে । তবে সময়টা নির্ভর করে একান্তই হাটার গতির উপর । ধীরে হাটলে আরো বেশি সময় লাগবে । দ্রুত হাটলে ১ ঘন্টায়ও চূড়ায় উঠা যাবে । বর্ষাকালে পাহাড়কে পরিপূর্ণ যৌবনা মনে হলেও পাহাড়ে উঠা বেশ বিপজ্জ্বনক । তাই তখন অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ ।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের একদম চূড়াতেই অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মাঝামাঝিতে এবং একদম চূড়ায় মন্দিরের পাশে রয়েছে ছোট ছোট টং দোকান । এই দোকানগুলোতে হালকা খাবার এবং পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায় ।

চন্দ্রনাথ মন্দিরের উৎসবঃ  

বাংলাদেশের সবথেকে প্রাচীন মন্দিরগুলোর একটি এই চন্দ্রনাথ মন্দির । পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দিরে বছরজুড়ে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হয় । উৎসব উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত সাধু-সন্ন্যাসী, পূজারী ও দর্শনার্থীদের আগমণ ঘটে । উৎসবের সময় এলাকাটি জনাকীর্ণ আকার ধারণ করে । সবথেকে বড় যে উৎসব এখানে উদযাপন করা হয় সেটা হচ্ছে শিবচতুর্দশী মেলা । চন্দ্রনাথ মন্দিরে প্রতিবছর শিবরাত্রি তথা শিবচতুর্দশিতে বিশেষ পূজা হয় । এই পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বিশাল মেলার । এটিই শিব চতুর্দশী মেলা নামে পরিচিত । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আশেপাশে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর  ফাল্গুন মাসে এই মেলার আয়োজন করে থাকে । মেলাটি দোলপূর্ণিমা পর্যন্ত স্থায়ী থাকে ।

কিভাবে যাবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ঃ

সীতাকুণ্ডে অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়ে বাস বা ট্রেনে করে আসা যাবে । ঢাকা থেকে সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও মহাখালি  থেকে চট্রগ্রাম গামী যে কোন বাসে করেই যেতে পারবেন সীতাকুন্ড । নন-এসি বাসের ভাড়া ৪২০- ৪৮০ টাকা। এসি বাসের  ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা।

ঢাকা থেকে ট্রেনে সীতাকুন্ডে দুইভাবে আসা যাবে । ঢাকা থেকে চট্রগ্রামগামী যে কোন আন্তঃনগর ট্রেনে এসে ফেনী স্টেশনে নামতে হবে । ফেনী স্টেশন থেকে রিক্সা বা অটো দিয়ে ফেনী মহিপাল বাস স্ট্যান্ড যেতে হবে । ভাড়া নিবে ১৫ থেকে ২০ টাকা । সেখান থেকে ৫০-৮০ টাকা ভাড়ায় লোকাল বাসে সীতাকুন্ড যেতে পারবেন । সীতাকুণ্ড থেকে সিএনজি বা রিক্সা করএ চলে যেতে পারবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে ।

আবার ট্রেনে সরাসরি চট্টগ্রাম নেমেও যাওয়া যাবে সীতাকুণ্ড । চট্টগ্রামে রেলস্টেশন থেকে অটোরিক্সা রিজার্ভ নিয়ে সীতাকুণ্ডে আসতে ভাড়া লাগবে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা । লোকাল বাসে করেও যাওয়া যাবে সীতাকুণ্ড । সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম নগরীর অলংকার, এ কে খান মোড় অথবা কদমতলী যেতে হবে । লোকাল বাসে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে আগের রাস্তার মতোই  সিএনজি বা রিক্সা করে চলে যেতে পারবেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উঠার প্রবেশমুখে ।

সীতাকুন্ড ইকোপার্কঃ 

বন্যপ্রানী ও জীব-বৈচিত্র যাদের টানে তাদের জন্য সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের জুড়ি নেই । 

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত এই ইকোপার্কটু বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য । ১৯৯৮ সালে সীতাকুন্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয় । বন্যপ্রাণীর এই অভয়ারণ্যটি প্রায় ৮০০ হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত । চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই ইকোপার্কটি  দুটি অংশে বিভক্ত । ১,০০০ একর জায়গা নিয়ে অবস্থান বোটানিক্যাল  গার্ডেনের ও ৯৯৬ একর জায়গা জুড়ে ইকোপার্ক এলাকার অবস্থান । বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং পর্যটকদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই পার্কটিতে রয়েছে বিরল প্রজাতির সব গাছ গাছালি, হাজারো রকমের চোখ ধাধানো ফুলের গাছ ও নান ধরনের জীবজন্তু । 

উঁচুনিচু নির্জন পাহাড়, হরিণ, ভালুক, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, খরগোশ এবং হনুমানসহ নানা প্রজাতির পাখির কলরব, প্রাকৃতিক ঝর্ণা, চিরসবুজ বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ ইকোপার্কটি মন কাড়বে যে কারো ।
 সন্ধ্যার আকাশে সূর্য যখন গোধূলীর রক্তিম আভা তৈরি করে তখন ইকোপার্কে এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয় । দুই অংশে বিভক্ত ইকোপার্কের প্রধান ফটকের ভেতরের ডান পাশে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন ।  এখানেই রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা প্রচলিত ও বিলুপ্ত প্রজাতির ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ গাছড়া।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে একটি চমৎকার অর্কিড হাউস । দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০ ধরনের অর্কিড রয়েছে এখানে । রয়েছে দুর্লভ কালো গোলাপসহ প্রায় ৩৫ জাতের গোলাপ, পদ্ম, জবা, নাইট কুইন, স্থলপদ্ম, রঙ্গন, নাগবল্লী, রাধাচূঁড়া, কাঠ মালতী, কামিনী, বাগানবিলাস, অলকানন্দা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, ফনিকাসহ ১৫০ জাতের ফুল । এখানকার পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে দেখতে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আর বন্যপ্রাণী । পার্কটিতে রয়েছে
মায়া হরিণ, বানর, হনুমান , শূকর ,
সজারু, মেছোবাঘ, ভালুক, বনরুই ও
বনমোরগ । এছাড়াও আছে দাড়াঁশ ,
গোখরা, কালন্তি, লাউ ডগাসহ নানা প্রজাতির সাপ ও জলজ প্রাণী ।

ইকো পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার ভেতরের ওয়াচ টাওয়ার । ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনেক দুর পযর্ন্ত সবুজের সমারোহ চাক্ষুষ করা যায় । এর আশপাশের এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের গাছ, বুনোফুল এবং গুল্মলতায় পরিপূর্ণ । পার্কটিতে রয়েছে আলাদা পিকনিক কর্নার । খাবার পানি, রেস্টহাউস এবং টয়লেটসহ পিকনিকের সব ব্যবস্থাই রয়েছে পার্কটিতে । 

কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে । সীতাকুন্ড বাস স্ট্যান্ড থেকে নেমে মাত্র ২ কি. মি. দক্ষিণে ফকিরহাট নামক স্থান দিয়ে এ পার্কে প্রবেশ করতে হয় । 

মহামায়া লেকঃ 

চট্রগ্রাম সদর থেকে ৪৫ কিঃ মিঃ দুরে মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে  দেশের এই দ্বিতীয় বৃহত্তম এ কৃত্রিম লেকটির অবস্থান । আশপাশের সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানির লেক । চারিদিকে পাহাড়কে ধারন করে অপরূপ সৌন্দর্য ছড়ায় এ লেকটি । ঠিকরে পড়া সৌন্দর্য্যে রয়েছে অপরুপ মায়া । তাইতো এই লেকের নাম হয়েছে মহামায়া লেক । অপার্থিব সৌন্দর্যের এই লেকটি দেখে চোখ জোড়াবে যে কারো ।
প্রায় ১১ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত স্বচ্ছ পানির লেকটি ছড়ায় অপরূপ মাধুর্য । এখানকার ঠান্ডা পানির ঝরনা, সবুজের সমারোহ আর নীলাকাশ যে অসীম মায়া ছড়ায় তা নিজ চোখে না দেখে কল্পনা করাও কঠিন ।
এই জলাধারের চারপাশে তাকালে মনে হয় সবুজের চাদর বিছিয়ে সুধা পানের আহবান জানাচ্ছে লেকটি ।
নৌকা দিয়ে ঘুরে লেকটির আসল রূপ অবলোকন করা যায় ।  ঘুরাঘুরির পাশাপাশি চাইলে বর্শি দিয়ে মাছ ধরাও যায় । এজন্য কোন পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই । শুধু সাথে করে একটি বর্শি আর টোপ নিয়ে আসলেই হবে ।
নীল স্বচ্ছ পানির এই কৃত্রিম হ্রদে নৌকা ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ হবে ৪০ টাকা । আর পুরো নৌকা রিজার্ভ করলে নৌকা ভেদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ।
লেকটির পাড়ে চাইলে পিকনিকও করা যাবে । পিকনিকের জন্য সবুজের সমারোহ আর স্বচ্ছ পানির এই লেকটি একটি আদর্শ জায়গা ।  পিকনিকের ফাকে খেলাধুলা করার মতোও জায়গা রয়েছে গাছের ফাকে ফাকে । 


 কিভাবে যাবেনঃ 

ঢাকার সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে আসে। এসব বাসে করে মিরসরাই বাসস্ট্যান্ডে  আসতে হবে । মিরসরাই বাস স্ট্যান্ড থেকে সিএনজি অটোরিক্সা দিয়ে ঠাকুরদিঘী বাজারে আসতে হবে । ঠাকুরদিঘী বাজারের পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে মহামায়ায় প্রবেশ করা যাবে । 

কোথায় থাকবেনঃ

থাকার জন্য মিরসরাই বা সীতাকুণ্ডে  মোটামুটি মানের হোটেল পাওয়া যাবে । খুব ভাল মানের হোটেল না থাকায় চট্টগ্রামের হোটেল গুলোতে থাকাই বেশি আরামদায়ক হবে । চট্টগ্রামে আপনার পছন্দের হোটেল থেকে বাছাই করে www.amarroom.com এর মাধ্যমে খুব সহজেই বুকিং করতে পারবেন ।

amarroom